'বাঙালি মুসলমান: সংস্কৃতির সংকট'— একটি পুনঃপাঠ

অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত

আইরিন শবনম বাঙালি মুসলমান সমাজের এই সংকটের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন- তার উৎস, নানা পর্যায়-প্রকরণ, বিবর্তন ও অভিযোজন এবং পরিণতি সুশৃঙ্খল তথ্য ও যুক্তিজালে বেঁধে সুখপাঠ্য বয়ান উপস্থিত করতে যে পেরেছেন, তা আমার মতো এই সামাজিক পরিচিতি বৃত্তের বাইরে থাকা পাঠকের অনুধাবন করতে কোনোও সমস্যা হয় নি।

এমন নয় যে মুজফ্ফর আহ্‌মদ স্মৃতি পুরস্কার পাওয়ার পর বইটি নিয়ে আগ্রহী হয়েছি, এই বইয়ের প্রস্তুতি পর্বের খবর পাচ্ছিলাম লেখিকা আইরিন শবনম এর সঙ্গে পরিচিতির কারণেই। এই পর্বেই আমাদের গৌড়বার্তার জন্য একটি লেখা লিখেছিলেন, ‘আ-মরি বাঙলা ভাষা - বাঙালি মুসলমানের ভাষা সংকট’। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিক সংকট নিয়ে কথা বলার সূত্রপাত সেখানেই লক্ষ্য করি। যদিও ভাষাকে নিয়েই, তবুও তার বাইরে যে সার্বিক সাংস্কৃতিক বিপন্নতা, দ্বন্দ্ব… আইরিনের ভাষায় সেই দ্বন্দ্ব যতটা না ভাষা নিয়ে, তার থেকেই বেশি ঐতিহ্য আর ইতিহাসকে নিয়ে; সেই স্বল্প পরিসরের লেখাতে তার সামনে তিনি আমাদের দাঁড় করিয়ে ছিলেন- ‘এভাবে সমস্ত দিক দিয়ে লাগাতার বাইরের যোগসূত্রের কথা বলে, বাইরের সভ্যতা-সংস্কৃতির কথা বলে, সাধারণ মুসলমানের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি করা হয় যে - বাংলা তাদের স্বভূমি নয়, বাংলা অমুসলিমদের ভূমি-‘দারুল হারব’। সুতরাং সেই তখন থেকে এই ভাবনাটি বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, মুসলমানরা বাঙালি নয়, স্থানীয় সমস্ত সম্পৃক্ততা থেকে মুক্ত হয়ে শুধুই মুসলমান, হিন্দুরাই কেবল বাঙালি।  তাই আজও, মুসলমান বলে চেনা যায় না এমন অনেককে শুনতে হয়—‘ও! তুমি মুসলমান! আমি বাঙালি ভেবেছিলাম।’ এই কথাগুলোরই এক বিস্তৃত ব্যাখান এই বইটি। 

বইটি পাঠের সময় প্রতিবারই মনে হয়, আইরিন শবনম যদি জন্মসূত্রে মুসলমান না হতেন, লিখতেন এই বইটি? সম্ভবত না, কিংবা হ্যাঁ ও হতে পারে। কিন্তু লিখলেও যে সমাজ বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে লেখিকা বড় হয়েছেন, যাকে ভিতর থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন, যে সংকটের সঙ্গে লড়াই করেছেন, তিনি ও তাঁর মতো সবাইকে লড়াই করতে দেখেছেন … সেগুলিকে ঝুলিতে না রেখে এই বিস্তৃত আলোচনা সম্ভব হতো না। আইরিন শবনম বাঙালি মুসলমান সমাজের এই সংকটের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন- তার উৎস, নানা পর্যায়-প্রকরণ, বিবর্তন ও অভিযোজন এবং পরিণতি সুশৃঙ্খল তথ্য ও যুক্তিজালে বেঁধে সুখপাঠ্য বয়ান উপস্থিত করতে যে পেরেছেন, তা আমার মতো এই সামাজিক পরিচিতি বৃত্তের বাইরে থাকা পাঠকের অনুধাবন করতে কোনোও সমস্যা হয় নি।

আইরিন তার বইয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন আত্মপরিচয়ের সন্ধানে। সামাজিক-সংস্কৃতির অন্দরে। এই উপরিকাঠামোর ভিত্তি অবশ্যই অর্থনৈতিক। তার ভাবনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে– বাংলায় মুসলমান শাসনের সূত্রপাত, বাঙালি সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে উঠেছে, কখন ও কীভাবে বাঙালি ও হিন্দু সমার্থক হ’ল, কিংবা কিভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা লোকায়ত মুসলমান ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বদলে যেতে থাকলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানে। তিনি ইতিহাস ও সাহিত্যে খুঁজলেন বাংলা ও বাঙালির জন্মপরিচয় ও তার উৎপত্তিস্থল। তুলনা করলেন সুলতানি আমলের সঙ্গে মুঘল আমলের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিস্তারের। আলোচিত হয়েছে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ও অভিযোজন, মুসলমান সমাজের উপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব, মুসলিম সমাজের পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণে দোদুল্যমানতা, আশরাফ এবং আতরাফ - এই দুই মুসলমান শ্রেণীর উৎপত্তি ও তার প্রভাব … ইত্যাদি নানান গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। 

বইটির দ্বিতীয় অধ‍্যায়ের ছয়টি পর্বে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের বাংলায় মুসলমানদের কেন্দ্র করে সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানকে সহজ বয়ানে তুলে ধরেছেন লেখিকা। যদিও কোথাও মনে হয়েছে বইটি অল্প হলেও পুনরাবৃত্তির ভারে ভারাক্রান্ত হয়েছে, আর একটু সম্পাদনার প্রয়োজন ছিল। তৃতীয় অধ্যায়ের তিনটি অংশও পূর্বাপর। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বটি, ‘ইসলামীকরণ এক নিঃশব্দ সংস্কৃতি বিপ্লব’ ও ‘বাঙালি না মুসলমান?’ - এই দুটি পর্বের পাঠ অভিজ্ঞতা অপূর্ব। উনবিংশ শতক জুড়ে কিভাবে একটু একটু করে বাংলার গ্রামে শুদ্ধ ইসলামিকরণের প্রক্রিয়া বহমান হতে শুরু করে, এবং ক্রমশ বাঙলার মুসলমানের আত্মচেতনার উন্মেষ ঘটায় ও তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় পরস্পরের দূরে সরে যায় … তার বিস্তারিত আলোচনা এই সংকটের ইতিহাসকে স্পষ্ট করে। আইরিন একইসঙ্গে মুসলমানের সংকটের প্রসঙ্গে প্রতিবেশী হয়ে থাকা হিন্দু সমাজের ভূমিকাও বিশ্লেষণ করেছেন প্রায় দুটি অধ্যায়জুড়ে, দ্বিতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়, পরেও নানা প্রসঙ্গে বাংলার রেনেসাঁর সূত্র ধরে কিংবা স্বদেশী আন্দোলনে  হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। একদিকে রামমোহন থেকে শুরু করে কেশবচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ (ব্রাহ্ম ধর্ম যদিও আদতে হিন্দু রিভিশিনালিস্ট আন্দোলনই), রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের মতো সমাজসংস্কারকদের কথা। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সাহিত্যিকদের হাত ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদের গোড়ার কথা। জানিয়েছেন কেন হিন্দু বাঙালি মানসের পরিবর্তনের আঁচ মুসলমান সমাজে লাগল না। কীভাবে এল জিহাদের ডাক। কিভাবে মধ্যযুগে গড়ে ওঠা লোকায়ত বা বাঙালি মুসলমানের ধারণা যা বহন করে চলে নতুন পুরোনো সমস্ত উত্তরাধিকার আর সংমিশ্রণের ঐতিহ্যগুলি (হিন্দু, বৌদ্ধ বা জৈন উৎসের), তার উল্টোদিকে ক্রমশ মুসলিম সংস্কারবাদের হাত ধরে এক বিশুদ্ধ মুসলিম পরিচিতির বিকাশ ঘটতে থাকে - ওয়াহাবি কিংবা ফারাজী আন্দোলনের হাত ধরে। যার গতিপথ শহর থেকে গ্রাম অভিমুখে। আইরিন দেখিয়েছেন এই সংস্কার আন্দোলনগুলো কিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক গরিব মুসলমান চাষিদের ভিতরে কৌম এর ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল .. কিন্তু তার সঙ্গে  অর্থনৈতিক কারণে, বিশেষ করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রসূত বাংলার কৃষি ব্যবস্থায় মূলত হিন্দু জমিদার শ্রেণির অত্যাচারে বিপর্যস্ত এই কৃষিকশ্রেণী, এমনকি অমুসলমান নিম্নবর্গীয় কৃষকদেরও একত্রিত করে ক্রমশ ব্রিটিশ বিরোধী একের পর এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। 

আলোচনায় এসেছে কীভাবে ১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পরাজয়ের পর মুসলমানরা ইংরেজ তোষণের পথে পা বাড়িয়েছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সৈয়দ আহম্মদ খানের হাত ধরে তৈরি হওয়া আলীগড় আন্দোলন ক্রমশ সংগঠিত হতে থাকা নবীন  মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজের চেতনা নির্মাণ করছিল। নানা তথ্যসূত্র উল্লেখ করে আইরিন সঠিকভাবেই দেখিয়েছেন যে ব্রিটিশরা ভারতের শাসনকালের শুরুতে স্থানীয় হিন্দুদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারাই পরবর্তী সময়ে কিছুটা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্রিটিশ বিরোধিতার কারণে মুসলিম মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষাকে, এদের ভিন্নতাকে স্বাগত জানাল। শাসনের সুবিধায় হিন্দু-মুসলিম বিভেদ মূলক নীতির প্রচলন ঘটালো। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বদেশী বা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অলক্ষ্যে যে “হিন্দু” ধর্ম নির্ভর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় এই মুসলিম অংশের মধ্যে জাতি পরিচিতি সংঘবদ্ধ করার ঝোঁক শুরু হ’ল, এর হাত ধরে বাংলার গ্রামেগঞ্জেও উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে আরেক ধরনের রাজনৈতিক ইসলামীকরণের নি:শব্দ প্রক্রিয়ার ঢেউ গিয়ে পৌঁছালো সংগতভাবেই। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধতা কোথাও নষ্ট হয়েছিল। লেখিকা অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠভাবে, বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই ডিপারচার এর বিবরণ দিয়েছেন। এবং হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষকেই এই স্থানান্তরকরণের দায়ভার অর্পণ করেছেন। 

১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম আকাঙ্ক্ষার নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলনকে দেখা, নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে শুরুতে অংশগ্রহণ করলেও যে ১৯০৬ এর পরবর্তী সময়ে কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের, যাকে আইরিন চিহ্নিত করেছেন আসলে এই আন্দোলনের হিন্দু ঝোঁক হিসেবে, তার বিরুদ্ধচারণ করতে শুরু করেছিল। তার কারণ পূর্ববাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পশ্চাদপদতা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ই নয়, যাদের মধ্যে আবার গরিব মুসলমান চাষীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রান্তিক নিম্নবর্গীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীও কোথাও এই বঙ্গভঙ্গের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতে থাকে। ১৯১১ তে একে রদ করা হলে পূর্ববাংলার মুসলিম অংশের স্বপ্নভঙ্গ হয়। ফলে এই ডিপারচার স্থায়ী হয়। কোথাও গিয়ে ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গই পরবর্তীকালে দুই জাতিভিত্তিক পৃথক জাতীয়তাবাদের বাস্তবতায় দেশভাগকে ত্বরান্বিত করেছিল। আইরিন সেটাই বলেছেন। এবং তথ্য ও যুক্তি সহকারে। 

লেখক নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্তে এসেছেন যে স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের যোগ না থাকলে হয়তো এই আন্দোলন হিন্দু-মুসলমানের যৌথ আন্দোলন হতে পারতো। এবং এও বললেন -শুধু হিন্দুরা নয়, মুসলমানরাও একসময় নিজেদের বাঙালী বা লোকায়ত পরিচয়কে অস্বীকার করেছিল। যুক্তিপূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করে দেখালেন, একদিকে যেহেতু বাঙালি মুসলমানের জন্ম ও কর্ম এই বাংলায় সেইহেতু বাংলার সঙ্গে তার নাড়ির যোগ - তার ভাষা, খাবারদাবার, পোশাকআশাক এমনকি লোকজ সাহিত্য সংস্কৃতির নির্মাণ ইত্যাদি; অন্যদিকে মুসলিম সংস্কারবাদীদের প্রভাবে তার প্যান-ইসলামী ঝোঁক, যেহেতু এই ধর্মের উৎসভূমি আরবদেশ তাই আরবের প্রতি তার অন্তরের আকর্ষণ - এই সাংস্কৃতিক দ্বৈততার টানাপোড়েনেই সে ছিল দ্বিধান্বিত। এই দ্বিধাই তার সাংস্কৃতিক সংকটের মূল। আমরা দেখতে পেলাম এই পরিবর্তন এল নামকরণে, এলো শব্দ ব্যবহারে, এল দৈনিক আচারেও। ধর্মীয় পরিচিতি থেকে ক্রমশ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাতে। এসবই দুই তরফ থেকেই দ্বিজাতি তত্ত্বের বীজ বপন করেছিল। বাঙালি মুসলমান বারংবার তার নিজস্ব পরিচিতিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি বোধকে আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের বেড়াজালে নিজেকে কিভাবে জড়িয়েছে, আবার নিজেরাই স্বাধীনচেতা মানসিকতা নিয়ে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কিভাবে সেই বেড়াজাল কেটে বেরিয়ে এসেছে, এ বই সে বিষয়ে বিশদে আলোকপাত করেছে। এমনকি স্বাধীনতার পরেও, পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু জাতীয়তাবাদের বিপ্রতীপে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে, যা পরিণতি পায় বাংলাদেশ গঠনের মধ্যে দিয়ে। একই দাঁড়িপাল্লার দুইদিকে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে রেখে কথাবার্তা বলার যে সাহসিকতা আইরিন শবনম দেখিয়েছেন, তাকে প্রশংসা করতেই হয়। এমনকি এই সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ‍্যায় ও তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন‍্যাসকেও হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সংকটের পিছনে দায়ী করে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। পরিশিষ্ট অংশে জাকির তালুকদারের মুসলমান মঙ্গল বইটির আলোচনা বইটিকে আজকের সমকালেও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। 

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকগুলোয় যখন এই উপমহাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ, ভারতে হিন্দুত্ব কিংবা বাংলাদেশে, পাকিস্তানে মুসলিম মৌলবাদের আগ্রাসন সুনিশ্চিত করে; সেই সমকালে আইরিন শবনমের এই বই মুসলমান সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের সংকটের কথাই শুধুই নয়, এই গোটা উপমহাদেশে সংখ্যালঘুর সংকটের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়। হিন্দু-মুসলমানের নিজস্ব বয়ানের বাইরে থাকা প্রগতিশীল ভাষ্যগুলিকেও অল্প হলেও জায়গা করে দেয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এবং প্রগতিশীল মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবনার প্রসারের কথাও এসেছে (পঞ্চম অধ্যায়) -বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, মুসলমান সাহিত্য সমাজ ইত্যাদি থেকে যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে শিখা পত্রিকা, কৃষক-প্রজা পার্টির উত্থান, এই তার যাত্রাপথ। মোঃ শহীদুল্লাহ, কাজী আব্দুল ওদুদ, ইমদাদুল হক, এস ওয়াজেদ আলী, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, মুজফ্ফর আহ্‌মদ, ফজলুল হক এবং অবশ্যই নজরুল ইসলাম … এদের হাত ধরেই বিংশ শতাব্দীর ৩০ ও ৪০ দশকে নতুন মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ, যাদের উৎপত্তি হচ্ছিল কৃষক পরিবারগুলি থেকে, এই নতুন ভাবনায় তারাও রাজনৈতিকভাবে ব্রিটিশ বিরোধিতায় অংশ নেয়, এবং এই প্রথম ততটা র‍্যাডিক্যাল না হলেও অন্তত ভাষাগত ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অংশ হয়েই। তাদের কেউ কেউ মূল ধারার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও যুক্ত হয়।

সকল মানুষের মতোই বাঙালি মুসলমানরাও একাধিক পরিচয় বহন করে। একজন ব্যক্তি একই সাথে একটি ভাষাগত সম্প্রদায়, একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, একটি ভৌগোলিক অঞ্চল, একটি জাতি এবং একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। এই স্তরগুলো আবশ্যিকভাবে একে অপরকে বাতিল করে না, কিংবা করে। তবুও, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সাধারণত ভাষা, অভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, ভূখণ্ড, স্মৃতি এবং দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই গঠিত হয়। ভারতে আগে আসার সূত্রে হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পরিচিতির সংকট কম। যা বাঙালি মুসলমানদের তাড়িত করে। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ অবলোকন যে বাঙালি শব্দটা প্রথম এই পুরো পূর্বভারতীয় ভূখণ্ডের অধিবাসীদের সম্পর্ক ব্যবহৃত হতে থাকে মুসলমান আগমনের পরেই, মধ্যযুগে। বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের আগেই সুফি সহজিয়াদের হাত ধরে বাংলায় মুসলমান ধর্মের যে যাত্রা শুরু হয়, সেই বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচিতির জন্য দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নটি আইরিন সঠিকভাবেই তুলে ধরেছেন, তাদের প্রধান সমষ্টিগত পরিচয়কে বাঙালি হিসেবে বোঝা উচিত, নাকি মুসলিম হিসেবে? এই সংকটের স্বরূপ পরিষ্কার হলে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়াও সহজ হয়। এই বইটি থেকে সেটাই প্রাপ্তি। 

তবুও সেই ছোটগল্পের মতই, শেষ হয়েও শেষ হতে চায় না। লেখিকা আইরিন শবনমের প্রতি প্রত্যাশা বেড়েই চলে। মনে হয় বইটি আরো কিছু কথাকে যুক্ত করতে পারলে ভালো হতো। কতগুলি জায়গায় নিঃসন্দেহে দ্বিমত আছে, যেমন ‘শেষ নাহি যে..’ তে আইরিন লিখছেন ‘এদেশে একেশ্বরবাদী ঈশ্বর এসেছিল শত্রুর বেশে’ (পৃষ্ঠা ২৯৪) - কিন্তু এই ভারতভূমিতে বহিরাগত কোনও জনগোষ্ঠীই কি শান্তির বার্তা নিতে এসেছিল! না। আর্য থেকে মুসলিম পূর্ববর্তী যারাই ভারতে এসেছে অস্ত্র হাতে এসেছে, এসে দখল করেছে। এই ইতিহাস তো দখলেরই ইতিহাস। এবং তার বিপ্রতীপে সাধারণ মানুষের সংগ্রামের। লেখিকা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরকে আলাদা করে দেখতে চেয়েছেন , যা কোথাও স্ববিরোধী হয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদের হিন্দু ও মুসলিম সংকীর্ণতার উল্টোদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের যে সংযুক্ত ধারণা, সেও তো মিথ্যা নয়। এবং সবটাই শুধুই হিন্দু বা শুধুই মুসলিম নয়। এবং নয় বলেই ভারতের সংবিধানে তার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে। এবং ভারত হিন্দু রাষ্ট্র হয় না। এরকম আরো বেশকিছু। যেমন, রেজাউল করিম এর কথা। করিম যুক্তি দেন যে, হিন্দু ও মুসলমান দুটি স্বতন্ত্র জাতি এই ধারণাটি ইতিহাস-বিবর্জিত। ‘রেজাউল করিম একটি বাঙালি মুসলিম মিশ্র জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল এক কাল্পনিক, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ভারতের প্রেক্ষাপটে ধর্ম, অঞ্চল ও জাতিকে সংযুক্ত করা’ (নীলেশ বসু)। সারাজীবন ধরে তিনি হিন্দু-মুসলমানের ‘কমন কালচারে’র কথাই বলে গিয়েছেন। যে ‘কমন কালচার’ তৈরি হয় প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাব-ভাষা-রুচির লেনদেনে। তাঁর বাঙালি সত্তা, যা এক বিশেষ আঞ্চলিক চেতনার ধারক, মুসলিম রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এই ধারাটিকে এক স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছিল; ঔপনিবেশিক ভারতের যেসব অঞ্চল বর্তমানে ‘সংখ্যালঘু মুসলিম’ অধ্যুষিত প্রদেশ হিসেবে পরিচিত, সেখানকার মুসলিমদের মতোই রেজাউল করিমের লেখালেখির ধারা ছিল মূলত সেই সব মুসলিমের চিন্তাধারার অনুসারী—যাঁরা ঔপনিবেশিক ভারতে এক ‘মিশ্র জাতীয়তা’র (composite nationality) ধারণার সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখার স্বার্থে ভারতীয় মুসলিম ইতিহাসের একটি বিশেষ বয়ানকে নিজেদের পরিচয় ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন; অর্থাৎ, তিনি তাঁর নিজ অঞ্চলের বাঙালি মুসলিমদের ভাবনার অনুসারী ছিলেন না। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তান ধারণার পক্ষে যে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে উঠেছিল, তার বিপরীতে ১৯৪১ সালে প্রকাশিত করিমের ইংরেজি গ্রন্থ “পাকিস্তান এক্সামিনড” মুসলিম একরৈখিকতার বিপরীতে একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তিনি এই প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একটি  চ্যালেঞ্জের বিষয়টি তুলে ধরেন; দেখান যে ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ পর্যায়ে মুসলমানদের অগ্রগতির পথ হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট 'পাকিস্তান'ই কার্যকর সমাধান দিতে পারত না তার অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই। 

বইটিতে সমতার অভাব আছে কি? মুসলমান সংস্কৃতির উৎস এবং বিবর্তনের, দ্বন্দ্বের বিবরণে লেখিকা যত্নশীল হলেও শেষের অধ্যায়গুলি খুব দ্রুত শেষ হয়েছে। এই আলোচনার ভারসাম্যে বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী সময়ের, বিশেষ করে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৭ মধ্যবর্তী সময়ের মুসলমান পরিচিতি নির্ভর জাতীয়তাবাদের আলোচনাকে, দ্বিজাতি তত্ত্ব ও তার রাজনৈতিক ঘটনাপরম্পরাকে খুব বেশি জায়গা দেননি। বিক্ষিপ্তভাবে জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বের উৎসের উল্লেখ করেছেন, এটাও দেখিয়েছেন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাবনার সূত্রপাত আরও আগে মূলত হিন্দুপক্ষের হাত ধরেই, তবুও স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত, এমনকি পরেও মুসলমান জাতিসত্ত্বার আবেগ যে তার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিসরের নির্ধারক হয়ে উঠেছিল সেই বিষয়ের বিস্তৃত আলোচনা থাকলে সংকটের চিত্র সম্পূর্ণ হতো। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় তারা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার শিকার হয়েছিল, যেখানে সাম্প্রদায়িক পরিচয় ক্রমশ প্রতিনিধিত্ব ও দাবি আদায়ের ভিত্তি হয়ে উঠছিল, যার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে মুসলিম লীগ ও তার মুসলিম জাতিসত্ত্বার প্রকাশে। শুধুমাত্র মাইনরিটি হওয়ার আশঙ্কা নয়, আসলেই ভারতের মুসলিম জাতি পরিচিতি সম্পূর্ণ একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পৃথক একটি সত্তা। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলমানও এই দ্বিজাতি তত্ত্বের পৃথক রাষ্ট্রের ভাবনায় বাংলার ভাষাগত-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র মুসলিম সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বও প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। যদিও অনেক হিন্দু রক্ষণশীল নেতৃত্ব ঠিক এভাবেই ভেবেছিলেন, তবুও কংগ্রেসের সম্মিলিত উদার জাতীয়তাবাদের ধারণার বিপ্রতীপে সেগুলি খুব বেশি সাফল্য লাভ করেনি, যা করেছিল মুসলমান আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠা মুসলিম লীগ ও তার দ্বিজাতি তত্ত্ব। তারা এই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ নিয়েছিল। এই বাংলাতেও। এই আলোচনার অনুপস্থিতি মুসলমানের সাংস্কৃতিক সংকটের স্বরূপকে অসম্পূর্ণ রাখে। 

এই লেখাটি লিখতে লিখতে আলী উসমান কুরেশি ও মেগান রব সম্পাদিত “মুসলিম এগেইনস্ট দ্যা মুসলিম লীগ: ক্রিটিক্স অফ দা আইডিয়া অফ পাকিস্তান” বইটি হাতে এলো। বইয়ের ভূমিকার এক অংশে সম্পাদকেরা লিখলেন ভারতের মুসলিম কওমের কথা। জাতীয়তাবাদের নির্মাণে রিয়াসত, মুল্ক ও কওম (‘রাষ্ট্র’, ‘দেশ’ ও ‘লোক’) - এই শব্দগুলোর মাধ্যমে যথাক্রমে জাতি, মাতৃভূমি ও জনগণকে বোঝানোর বিষয়টি ক্রমশ সুনির্দিষ্ট হয়ে ওঠে; আর এই প্রক্রিয়াটি দ্বন্দ্ব ও বোঝাপড়ার এক চলমান পর্যায়, যেখানে আঞ্চলিক পরিচিতি ও তার প্রতি একাত্মবোধের সাথে ভারতীয় জাতীয় পরিচিতির প্রতিনিয়ত এক টানাপড়েন বজায় ছিল। আঞ্চলিক ও জাতীয় পরিচিতির মধ্যকার এই সম্পর্কটি ছিল জটিল। তারা বাংলায় ইসলামী কওমের ধারণায় উল্লেখ করছেন, মুসলিম কওমের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে ছিল এক স্বতন্ত্র বাঙালি মুসলিম সাহিত্যকেন্দ্রিক পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ক্রম-সুদৃঢ়করণের প্রক্রিয়া। সেইজন্যই বরাবর বাঙালি জাতিচেতনার পেছনে একটা সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচিতির শেয়ারড কমনলিটি, মেমোরি কাজ করেছে: বাঙালি হোক, ভারতীয় হোক কিংবা পাকিস্তানি, যে জাতীয়তাবাদই হোক না কেন, তার মধ্যে একদিকে আধুনিক সমাজ সৃষ্টির আগ্রহ ও উপাদান, অন্যদিকে তার বিরোধী উপাদানগুলি - সে উপাদান হতে পারে ধর্মীয়, হতে পারে লোকজ সংস্কৃতি প্রভাবিত, হতে পারে আদি কোনো জাতি-পরিচয় থেকে উত্সারিত;  এই দুই উপাদান বা শক্তির মধ্যে কোন শক্তির ভূমিকা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রাধান্য পাবে, তার উপরই নির্ভর করে জাতীয়তাবাদের ভাগ্য। কোন ধারায় সে বেড়ে উঠবে, সমাজকে সে কি আধুনিকতামুখী করবে, নাকি নিয়ে যাবে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ছত্রচ্ছায়ায় এক অনাধুনিক সমাজের পথে। দেশভাগের পর্বে এই দ্বন্দ্ব বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে ছিল। তার প্রকাশ ঘটেছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের রাজনৈতিক প্রকল্পে। আইরিনের লেখায় সেই প্রসঙ্গ খুব সুস্পষ্টভাবে এলো না। 

যেমন এলো না ১৯২০ এর পরে ভারতের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির কথাগুলি, কমিউনিস্ট আন্দোলন ও তাদের উত্থাপিত জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি। কিংবা শ্রেণি আন্দোলনের মধ্যে মুসলিম শ্রমজীবী শ্রেণির- বিশেষ করে কৃষকদের, শ্রমিকদের বিপুল অংশগ্রহণের কথাগুলো। শওকত ওসমানী, মুজজফর আহমেদ, হসরাত মোহানি, আব্দুর রাজ্জাক খান থেকে সাজ্জাদ জহির … এবং সিপিআই এর ভূমিকা। ১৯২০-এর দশকে ঔপনিবেশিক-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় মুসলিমরা অগ্রসর হচ্ছিলেন; কারণ, তৎকালীন উদীয়মান ঔপনিবেশিক-বিরোধী চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপরেখা হিসেবে কমিউনিজম এবং রাজনৈতিক ইসলাম, উভয়ই ছিল সম্ভাব্য বিকল্প। যদিও সাম্রাজ্যবাদী উদারতাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সন্ধানের তাগিদ থেকেই উভয়ের উদ্ভব ঘটেছিল। তবুও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাজকে কল্পনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইসলাম ও কমিউনিজমের মধ্যে পার্থক্য ছিল। যার প্রভাব পড়েছিল সমকালীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। শওকত ওসমানীর হাত ধরে  রাজনৈতিক ইসলাম ও কমিউনিজমের এই মেলবন্ধন কেবল মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারার এমন এক গতিপথকেই উন্মোচিত করে না, যা ভারতে মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় রাজনীতির এক বর্জনবাদী  রূপকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে গণ্য করার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল; বরং এটি মুসলিম কর্মীদের দ্বারা কল্পিত এমন এক বিকল্প পথের রূপরেখাও তুলে ধরে, যার মাধ্যমে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া সম্ভব। সম্ভবত মুসলিমদের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামের এই অন্তঃস্রোত - যা সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামপন্থী সহিংসতার নৈরাজ্যবাদী ও ধ্বংসাত্মক আবহে আড়ালে পড়ে গিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন কোনো বিকল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ফ্রন্টের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে একঝাঁক মুসলিম লেখক আগুন জ্বেলেছিল নতুন যুগের সাহিত্যের, সংস্কৃতির চর্চার, বিষয় হিসাবে উঠে এসেছিল প্রান্তিক মানুষের, বিশেষ করে মহিলাদের কথা। এই বাংলায় নজরুল এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিলেন। অবশ্য পাকিস্তান আন্দোলন এই জাতীয় আন্দোলনের বামপন্থী ধারার সামনে এক অদ্ভুত সমস্যা তৈরি করেছিল। লেনিনের পথে হেঁটে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সকল জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে দলটি সমর্থন করলেও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে উত্থাপিত ভূখণ্ডগত দাবির মুখোমুখি হয়ে তাদের ‘জাতি’ বা ‘জাতীয়তা’-র ধারণাকে নতুন করে বিবেচনা করতে হয়েছিল। ঠিক এই কারণেই মুসলিম লীগের বিষয়ে দলটির অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে; এক পর্যায়ে তারা পাঞ্জাবে মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছিল, অথচ পরবর্তী সময়ে দলটিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছিল। কমিউনিজমের শ্রেণি সত্তা মুসলিম জাতিসত্তার বিচ্ছিন্নতার দাবিকে সমর্থন করেনি। বরং বাংলায় ঐক্যবদ্ধ বাংলা তাদের কাঙ্খিত ছিল। দেখা যাবে রাজনৈতিক ইসলাম ও কমিউনিজমের সমসাময়িক উদ্ভবের মুহূর্তটি থেকে তাদের মধ্যকার জটিল সম্পর্ককে ধারণাগতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে পরস্পর-অতিক্রমী অথচ বৈরী গতিপথের ওপর আলোকপাত করা যেতো এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশে এদের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাবকে বোঝা যেতো। ১৯৩০ এর পর থেকে মুসলমান পরিচিতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের থেকে পৃথক অবস্থানে থাকা কমিউনিস্টরা ১৯৪৬ এ বাংলায় তেভাগা আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মুসলমান কৃষককে সংগঠিত করেছিল, তাদের প্রতি জমিদারবর্গের, মূলতঃ হিন্দু, অর্থনৈতিক শোষণের প্রতিরোধে। এই প্রতিরোধ কোথাও পরবর্তী কয়েক মাস পরেই মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আহ্বানে বাঙলার মুসলমান কৃষকের পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনে রূপান্তরিত হয়। ইসলামী সমাজতন্ত্র তাই কেবল একটি লিখিত বক্তব্য ছিল না; এটি বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িত মুসলমানদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও প্রভাবিত করেছিল। ঔপনিবেশিক যুগে, ইসলাম ও মার্কসবাদ উভয়ের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগ অনুরাগে অনুপ্রাণিত মুসলমানরা ট্রেড ইউনিয়ন, বাম দল এবং শ্রমিক ও কৃষক দল, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং গদর আন্দোলনের মতো বিপ্লবী আন্দোলন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল। ইসলামী সমাজতন্ত্রীরা হয়তো শ্রেণি-সংঘাতের মার্ক্সবাদী ভাষা ব্যবহার করেননি, বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিগত পার্থক্যের সমালোচনা করার জন্য ‘জুলম’ (অবিচার) এবং ‘আদল’ (ন্যায়বিচার)-এর ইসলামী ধারণা ব্যবহার করেছে। 

অনেক পরে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে হলিডে পত্রিকায় বদরুদ্দীন উমর ‘The Basis of Bengali Nationalism’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘এটি কি সত্য নয় যে এই অতি উল্লেখযোগ্য বিবর্তন, শাসক এবং শোষক শ্রেণীর এই যে সাম্প্রদায়িক চরিত্র, তার ওপরই ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বাংলার মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনা? সেটি যদি ঠিক হয়, তাহলে কি বুঝতে হবে না যে বাংলা জাতীয়তাবাদ হলো সাম্প্রদায়িকতার নির্ভুল বহিঃপ্রকাশ, যা কেবল লুকিয়ে আছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পোষাকে? বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া আর কিছুই নয়, যার মূলে রয়েছে ধর্ম এবং তাকে দেখা উচিত নতুন এক প্রতারণার পোষাকে দ্বিজাতিতত্ত্বের পুনরুত্থান হিসেবে।’ ওই ‘আঁতাতের’ সঙ্গে পূর্ব বাংলার যোগাযোগ বলতে একদিকে ঢাকাকেন্দ্রিক নবাব পরিবারের হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের উত্সাহকে বোঝায়, যারা ছিল ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত প্রথার প্রতিনিধি এবং যাদের আদর্শের মূল ভিত ছিল ধর্ম বা মুসলিম জাতীয়তাবাদ। অন্যদিকে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে বাংলার মুসলমান কৃষকসমাজের যুক্ত হওয়ার কারণ ছিল, তারা মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবিকে শ্রেণী-শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ হিসেবে দেখেছিল। যদিও নতুন দেশে তাদের সেই আশা অচিরেই ধূলিসাৎ হয়েছিল। এবং এই স্বপ্নভঙ্গ নতুন করে বাঙালি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পথ প্রশস্ত করে। 

লেখিকার আরেকটি অনুল্লেখ বাংলায় লোকজ সংস্কৃতির পরিসরে মুসলিম পরিচিতির প্রভাবের ধারাবাহিক লড়াইয়ের কথাগুলো। সংস্কার আন্দোলনের হাত ধরে একটি বিশুদ্ধ ইসলামী পরিচিতি তৈরি হলেও সেটি কি সম্পূর্ণভাবে লোকজ সংস্কৃতির মিলমিশের পরিসরকে মুছে দিতে পেরেছিল? উত্তর হচ্ছে, না। পারেনি। বরং পাশাপাশি প্রবাহিত হতে হতে সীমান্ত অঞ্চলে উভয়েই এক অন্যের সঙ্গে আরও মিশে গেছে। বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্তর্নিহিত গভীরে লোকায়ত মুসলিম ভাবনা, সুফি দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজও সক্রিয়ভাবে বেঁচে আছে। আমাদের গাজন, আমাদের গম্ভীরা, আলকাপ, খন, মাশান, আমাদের পুঁথিপাঠ, পীরের গান, সারি জারি, ভাওইয়া ভাটিয়াল, বাউল দরবেশী … বাংলার গ্রামীণ জনপদে ইসলাম ধর্মের মানবতাবাদী ও মরমি ধারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে, রক্ষণশীল মুসলমানির এবং হিন্দুত্বের শত আক্রমণ সহ্য করেও।  বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমন্বয় ও সহাবস্থানের কথাগুলি লোকসংস্কৃতির অন্তরেই জন্ম নিয়েছে। মুসলমানের সংস্কৃতির সংকটের আলোচনায় একে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। 

তবুও আইরিন শবনম এর কলম থেমে থাকবে না। যা কিছু অসম্পূর্ণতা, অচিরেই ভরে উঠবে নতুন পাতায়। বাকিটা আইরিন শবনমের পরিশ্রম তার বইয়ের বিস্তৃত তথ্যের সূচিতে প্রমাণিত হয়। তার বই আমাদের সচেতন করে, যে শুধু মুসলমানের সমস্যা এটা নয়– এ আমাদের সকলের সংকট। আদতে, বাঙালি ও মুসলিম হওয়ার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়াটা আসল চ্যালেঞ্জ নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এটা উপলব্ধি করা যে, একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ও আত্মবিশ্বাসী সমাজের বৃহত্তর আঙ্গিকে উভয় পরিচয়ই সহাবস্থান করতে পারে।


প্রকাশের তারিখ: ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org