বাংলা কবিতায় মন্বন্তর ও সুকান্তর আকাল

সৌমিত্র লাহিড়ী
শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারী ও ম্যালেরিয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল৷ গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে সাধারণ মানুষ কলকাতা মহানগরী ও অন্যান্য শহর এলাকায় বিপন্নতা নিয়ে এসেছিলেন এক মুঠো খাবারের আশায়৷ কলকাতার রাজপথ মৃতদেহের স্তূপে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল, আর নগর কলকাতার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল একটু ফ্যানের জন্য কর্ণভেদী চিৎকারে৷ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : 'কী দিনই না গেছে৷ উপোসী মানুষের চিৎকার---ফ্যান দাও, ফ্যান দাও৷ রাস্তায় চোখকান খুঁজে মড়া ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে হাঁটা৷ ভাবলে আজও বুকের মধ্যে হাঁফ ধরে৷ তবু গেলে চলবে না৷ যেন মনে থাকে৷ সে ইতিহাসের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়৷'

বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সুলেখক সরোজ মুখোপাধ্যায় তাঁর তিনটি দশক গ্রন্থে গত শতাব্দীর চল্লিশের দশককে অগ্নিগর্ভ দশক বলে চিহ্ণিত করে লিখেছিলেন: '১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতেই দ্বিতীয় মহা সমরের রণদামামা বেজে উঠলো৷ ব্রিটিশ সরকার নাৎসী জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই বড়লাট ৩রা সেপ্টেম্বর ভারত রক্ষা অর্ডিন্যান্স জারী করেন৷ দমন-পীড়নের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে এলো৷ দেশ রক্ষার বিরুদ্ধে যে-কোনো অজুহাতে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার, যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর, মৃত্যুদণ্ড প্রভৃতি নানা সাজা দেবার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করলো৷’

চল্লিশের দশককে বাংলার আরেক রকম নবজাগরণ নামে অভিহিত করেছেন অনেক বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদ৷ চল্লিশের দশকেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়ে ওঠেছিল৷ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ও মদতে শ্রমজীবী মানুষের বিপুল অংশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে৷ ছাত্রদের সংগঠিত আন্দোলন শিক্ষাঙ্গনের সীমাবদ্ধ পরিসর অতিক্রম করে যৌবনের উদ্দাম উচ্ছ্বাসকে সংগঠিত রূপ দিতে সক্ষম হয়৷ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হওয়ার পর, লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সংগঠিত আন্দোলনের স্পর্শ অনুভব করা যায়৷ তারাশংকর, বুদ্ধদেব, মানিক, বিভূতি, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট এবং সম্মানীয় শিল্পী-সাহিত্যিক সৃজন-প্রতিভা হাতিয়ার করে আন্দোলনে অবগাহন করেন৷ সৃষ্টির জগৎ চঞ্চল হয়ে উঠে৷ নাটক, গান, চলচ্চিত্র, সাহিত্য সর্বত্র স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে৷ এই দশকের বর্ণোজ্জ্বল চরিত্র বাংলার গণআন্দোলনের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে৷

স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ প্রহরে ব্রিটিশের বিশ্বাসঘাতকতা, শঠতা, হিংস্র বর্বরতা এবং নৃশংস অত্যাচার যেমন তীব্ররূপ ধারণ করে, তেমনিই শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষের লড়াই ছাত্র-যুব বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রাম এবং দেশপ্রেম নতুন মাত্রায় উপনীত হয় যা ইতিহাসের এক অনন্য মহাকাব্য৷ এই দশকেই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং মানুষের তৈরি মন্বন্তর ও ম্যালেরিয়া মহামারীর আবির্ভাব ঘটেছিল৷

শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারী ও ম্যালেরিয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল৷ গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে সাধারণ মানুষ কলকাতা মহানগরী ও অন্যান্য শহর এলাকায় বিপন্নতা নিয়ে এসেছিলেন এক মুঠো খাবারের আশায়৷ কলকাতার রাজপথ মৃতদেহের স্তূপে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল, আর নগর কলকাতার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল একটু ফ্যানের জন্য কর্ণভেদী চিৎকারে৷ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : 'কী দিনই না গেছে৷ উপোসী মানুষের চিৎকার---ফ্যান দাও, ফ্যান দাও৷ রাস্তায় চোখকান খুঁজে মড়া ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে হাঁটা৷ ভাবলে আজও বুকের মধ্যে হাঁফ ধরে৷ তবু গেলে চলবে না৷ যেন মনে থাকে৷ সে ইতিহাসের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়৷'

মন্বন্তরের ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষে এই কথাগুলি লিখেছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ২০০৩ সালে৷ এ বছর ২০২৩, মন্বন্তরের আশি বছর৷ আবার নতুন করে ইতিহাসের নব মূল্যায়নে অতীতের পাতায় আলো ফেলে দেখার চেষ্টা হচ্ছে সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলিকে৷ গবেষকরা ম্যান মেড ফেমিন-এর প্রকৃত চেহারা তুলে আনার চেষ্টা করছেন৷ এখানে আমরা সীমিত পরিসরে দেখব সেদিন গুলি আমাদের বাংলা কবিতায় কী ধরনের ছাপ ফেলেছিল৷

মনে রাখা দরকার বাংলা কবিতায় চল্লিশের দশকে এক ঝাঁক কবি সমাজ বাস্তবতা ও মার্কসীয় চেতনায় সম্পন্ন হয়ে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন৷ বাংলা কবিতা এবং সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পাথেয় করে লিখতে শুরু করেছিলেন৷ প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, বিমলচন্দ্র ঘোষ, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, দিনেশ দাস, সমর সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ দত্ত, ফররুখ আহমেদ, গোলাম কুদ্দুস, রাম বসু, বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, মণীন্দ্র রায়, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশংকর রায় প্রমুখ৷ আরও অজস্র কবির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এই সময়ে৷ এদের অনেকেই হয়তো লিখতে শুরু করেছিলেন বিশ-তিরিশের দশকে৷ কিন্তু এদের কবি প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটতে লক্ষ্য করা যায় এই সময়েই সবচেয়ে প্রবলভাবে৷ কয়েকটি মাত্র নাম উল্লেখ করা হল এই কারণে যে বাংলা কবিতার সৃজনভূমিতে এঁরা দীর্ঘ সময় কবিতা চর্চা করেছেন এবং নানাভাবে বাংলা কবিতা তাঁদের সৃজনে সমৃদ্ধ হয়েছে৷ অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন কবিদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে নিজেদের পথ বদল করেছিলেন, কেউবা অল্প দিনের মধ্যেই কলম থামিয়ে দিয়ে সাহিত্যের অন্য মাঠে পদচারণা করেছেন৷ চল্লিশের দশকে আত্মপ্রকাশ করে চল্লিশের দশকেই আকস্মিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন অথচ যাঁর আজও উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রতিমুহূর্তে অনুভব করা যায় একজন মাত্র কবির কবিতাতেই, তিনি অকাল প্রয়াত সুকান্ত ভটাচার্য৷ বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের আক্ষেপ হয়ে থাকবেন কবি সুকান্ত৷ মাত্র ২০ বছর ৮ মাস কয়েকটা দিন বেঁচেছিলেন তিনি৷ কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে যখন তাঁর বয়স ১৪/১৫ বছর৷ হয়তো তার আগেও হাত মকসো করেছেন বালক বয়সে, বিশেষত বাড়ির দেওয়ালে, সাধারণ সাদা কাগজে সুযোগ পেলেই দু-চারটে পংক্তি লিখে ফেলতেন তিনি৷ যে অভ্যাস কতদিনের ছিল তা এখন আর জানার উপায় নেই৷ তবে তাঁর স্মৃতি চারণে বন্ধু অরুণাচল বসুর মা সরলা দেবী বলে লিখেছেন, দু'বছর বয়স থেকেই সুকান্ত নাকি গানের ছন্দে দোল খেতেন আপন মনে৷ অর্থাৎ ছন্দবোধ ছিল তাঁর সহজাত৷ বাংলার মর্মান্তিক মন্বন্তর সম্ভবত তাঁর কবি মানসেই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল৷ অল্পসময়ের সাহিত্য জীবনে তিনি বোধনের মতো অসামান্য দীর্ঘ কবিতা, অভিমান গীতি আলেখ্য, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’র মতো প্রত্যয় দৃপ্ত কবিতা শুধু লিখেছিলেন না, নিজেকে সরাসরি আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তাঁর নানা কবিতায় মন্বন্তরের কথা এসেছে, এসেছে প্রতিরোধ করার দৃঢ় প্রত্যয়ও৷ আর তাঁর সাহিত্য জীবনের অন্যতম স্মরণীয় কাজটিও তিনি করেছিলেন বাংলার মন্বন্তরকে কেন্দ্র করে৷ আমাদের গভীর বেদনা ও দুঃখের কথা, মাত্র কয়েকটি দিনের জন্য কবি সুকান্ত তাঁর নিজের প্রথম কবিতার সংকলন ছাড়পত্র নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাননি৷ সেই সময়ের মারণরোগ যক্ষ্মা তাঁর প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল কয়েক দিন আগে৷ সেই সময় এখনকার মত আধুনিক মুদ্রণ ব্যবস্থা ছিল না, তাই দ্রুত ছাপার কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি৷ বাংলার আর এক অসামান্য প্রতিভা সাহিত্যিক সুকুমার রায়ও নিজের বই নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাননি৷

সেদিক থেকে সুকান্তর সান্ত্বনা ছিল তিনি তাঁর সম্পাদিত একটি কবিতা সংকলন নিজের চোখে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন৷ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর সম্পাদনায় 'আকাল' কবিতা সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম ১৩৫১ বঙ্গাব্দে (১৯৪৪)৷ প্রথম সংস্করণেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সংকলিত সমস্ত কবিতাই ১৩৫০ সালে  রচিত এবং নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত৷ সংকলক সুকান্ত সম্ভবত বয়সে সবচেয়ে তরুণ ছিলেন৷ সংকলিত কবিদের মধ্যে ছিলেন : অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব বসু, বিমলচন্দ্র ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নবেন্দু রায়, মণীন্দ্র রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিয় চক্রবর্তী, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সমর সেন, অবন্তীকুমার সান্যাল, গোলাম কুদ্দুস এবং কিরণশংকর সেনগুপ্ত৷ কথা-মুখ বা প্রাসঙ্গিক ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং সংকলক কবি সুকান্ত৷ প্রচ্ছদশিল্পীর নাম প্রথম সংস্করণে ছিল কিনা আমার জানা নেই, তবে দ্বিতীয় সংস্করণে বা প্রথম সারস্বত সংস্করণে মুদ্রিত হয়নি৷ প্রথম সংস্করণটি দেখার সুযোগ আমার হয়নি, তবে অনুমান করা যায় চিত্তপ্রসাদ-এরই নির্মাণ অসামান্য দ্যুতিময় প্রচ্ছদটি৷ নির্মম ভয়ঙ্কর সেই ছবি, ভাতের হাঁড়ি ফেলে ভীত সন্ত্রস্ত পায়ে শিশু কোলে মা ছুটে চলেছেন৷  কবি সুকান্তর কবি প্রতিভার নানাদিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এখনও পত্রপত্রিকায় নতুন আলোচনা উঠে আসে কিন্তু তুলনামুলকভাবে তাঁর সম্পাদনা দক্ষতার অন্যতম স্বাক্ষর বহনকারী ‘আকাল’ কবিতা সংকলন নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না কেন তা বলা মুশকিল৷ কিন্তু সম্পাদক হিসাবে মাত্র তিন ফর্মারও কম একটি কবিতা সংকলনেই সুকান্ত দেখিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিভার অন্য আর একটি দিক৷ কৈশোর পার করার সমসময়ে কবি সুকান্তকে কমিউনিস্ট পার্টি তৎকালীন ‘স্বাধীনতা’ দৈনিক পত্রিকার কিশোর বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিল কেন তা তাঁর সংকলন সম্পাদনার দিকে একটু নজর দিলেই অনুমান করা যায়৷

কবি সুকান্ত তাঁর সংকলন সাজিয়ে ছিলেন প্রচলিত সব সাধারণ রীতি খারিজ করে পত্রিকায় প্রকাশের সময়কে মান্যতা দিয়ে৷ বয়স ভিত্তিক, নামের আদ্যাক্ষর ভিত্তিক, পরিচিতিভিত্তিক ইত্যাদি নানা পদ্ধতি চালু থাকলেও তিনি যে পথের পথিক হননি৷ তাই কবিতাগুলি প্রকাশের তারিখ অনুযায়ী সূচিবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে, দ্বিতীয় লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন ছিল এই সংকলনের ভূমিকা লেখার জন্য তিনি অন্য কারও দ্বারস্থ হননি৷ সাধারণভাবে বিশিষ্ট নেতা, প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের কেউ এ ধরনের দায়িত্ব বহন করেন৷ কিন্তু সতেরো/আঠারো বছরের তরুণ সুকান্ত নিজেই লিখেছিলেন ভূমিকা বা কথা মুখ৷ তাতে বেশ কিছু মূল্যবান নীতিগত এবং সাহিত্যের আদর্শগত বিষয়ে তিনি মত প্রকাশ করেছিলেন দু'পৃষ্ঠারও কম জায়গার মধ্যে৷ শারদীয় যুগান্তর, বার্ষিক দিগন্ত, অরণি, কবিতা, জনযুদ্ধ, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকা থেকে মূলত কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছে৷ কবি সুকান্ত জানিয়েছেন সব কবিতা ও সব পত্রিকা দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর৷ সম্ভবত কারো পক্ষেই তা সম্ভব হয় না৷ পত্রপত্রিকা অনুসন্ধান করে ঝাড়াই-বাছাই করেছেন কবি৷ যেখানে ‘মন্বন্তর’ কেবলমাত্র প্রাসঙ্গিক কিন্তু কবিতা হয়ে ওঠেনি, তা তিনি গ্রহণ করেননি৷ ‘সংকলনে বিভিন্ন মনোভাব ও উদ্দেশ্যের কবিতা সংকলিত করা হয়েছে৷ সংকলনের সমস্ত কবিতাই দুর্ভিক্ষ-বিষয়ক এবং তেরোশো পঞ্চাশ সালে রচিত৷

সংকলনটি কেন করলেন পাঠকদের জানাতে গিয়ে কবি সুকান্ত বলছেন: ‘বাংলাদেশের আধুনিক কবিরা কি চিত্তে ও চিন্তায়, ধ্যানে ও জ্ঞানে, প্রকাশে ও প্রেরণায় জন সাধারণের অভাব-অনাহার পীড়া পীড়ন আর মৃত্যু মন্বন্তরকে প্রবলভাবে উপলব্ধি করেন? তারা কি নিজেকে মনে করেন দুর্গত জনের মুখপাত্র? তাদের অনুক্ত ভাষাকে কি করেন নিজের ভাষায় ভাষান্তরিত? এক কথায় তাঁরা কি জন-মনের কবি? এই জাতীয় প্রশ্ণের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে চেয়েছে এই সংকলন৷’

সুকান্ত একজন মার্কসীয় দর্শনে অনুরাগী সংগঠক কবি, তাই তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সাহিত্য সমাজেরই প্রতিচ্ছায়া৷ কথামুখ এবং তাঁর তাৎপর্যময় মন্তব্য ছিল সাহিত্য যে সমাজেরই প্রতিচ্ছায়া, জীবনেরই প্রতিভূ-তেরোশ পঞ্চাশ সালে প্রগতিশীল লেখকরা অংশত এই কথাই প্রমাণ করেছেন তাঁদের গল্পে উপন্যাসে কবিতায়৷ এরপরই তাঁর তির্যক মন্তব্য: ‘অবশ্য এমন কবিও আমাদের দেশে আছেন, যাঁরা কবিতাকে দুর্ভিক্ষের বর্ণনায় কণ্টকিত হতে দেখলে শিউরে উঠেন৷ তাঁরা নিজেদের না পারেন, কবিতাকে দুর্ভিক্ষের ছোঁয়াচ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন’।

তেরোশ পঞ্চাশ সালের মর্মান্তিক মন্বন্তর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার কোনো প্রয়োজন অনুভব করেননি কবি সুকান্ত৷ তিনি বলছেন: ‘তেরোশো পঞ্চাশ সম্বন্ধে কোনো বাঙালীকে কিছু বলতে যাওয়া অপচেষ্টা ছাড়া আর কী হতে পারে? কেননা তেরোশো পঞ্চাশ কেবল ইতিহাসের একটা সাল নয়, নিজেই একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস৷ সে-ইতিহাস একটা দেশ শ্মশান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস, ঘরভাঙা গ্রামছাড়ার ইতিহাস, দোরে দোরে কান্না আর পথে পথে মৃত্যুর ইতিহাস, আমাদের অক্ষমতার ইতিহাস’। কবি সুকান্ত তাই যাঁরা প্রকৃত কবির মতো স্বদেশ বৎসলের মতো পঞ্চাশ সালের দুর্ভিক্ষের বিভ্রান্ত জনমনকে দিলেন সান্ত্বনা, অন্ধকারে বসে গাইলেন ‘সূর্যোদয়ের গান’, তাদের কয়েকটি কবিতা সংগ্রহ করার কর্তব্য পালন করেন৷ কেমন লিখেছিলেন সুকান্ত নির্বাচিত এই কবিরা। দুএকটি কবিতায় প্রবেশ করা যেতে পারে৷

‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকার পাতা থেকে সংগৃহীত কবিতায় (১৪ বৈশাখ ১৩৫৯০) কবি অরুণ মিত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছেন—

প্রাচীন বণিক ফেরে অন্তিম দাপটে

ঘরে ঘরে,

অন্য সদাগর

সশস্ত্র তাগিদ দেয় দ্বারে;

মাঝখানে ছিনিমিনি অন্ন গেল উড়ে

উপোসী গ্রাসের আগে৷

এ নিরন্ন রাজ্যের সীমায়

দুর্জয় মিলনে মরি বাঁচি৷

ভুখ মিছিলের সামনে শুধু

সূচ্যগ্র লক্ষের বিধ৷

আমাদের ইতিহাসে চিহ্ণ দিক

ক্ষুধিত জঠর৷’

কবি বুদ্ধদেব বসু শ্রাবণ (বার্ষিক দিগন্ত আশ্বিন ১৩৫০) কবিতায় গভীর আবেগে বলছেন মনোবেদনার কথা--- 

হে শ্রাবণ, হৃদয়ের প্রিয়তম ঋতু, ক্ষমা করো 

এবার কবিরে, এবার আনন্দঘন অভ্যর্থনা, 

অকুণ্ঠিত কবি কণ্ঠ উচ্ছ্বসিত হলো না, 

হলো না তোমার উদ্দেশে৷

কেন উচ্ছ্বসিত হলো না৷ কবি বলছেন---

এবার শ্রাবণে দেখি বুভুক্ষার করাল রাক্ষস

রেখেছে বন্দিনী করে জীবনের সোনার সীতারে,

লঙ্কার পাপাঘ্নিধুমে দিকে দিকে পুঞ্জিত প্রলয়৷

এই দিগন্ত পত্রিকা থেকে সংগৃহীত কবিতায় কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ বলছেন—

‘ছন্নছাড়া বৈতরণী বুকে

ধূসর ধূলায় ধুঁকে ধুঁকে

প্রবঞ্চিত নরগোষ্ঠী চলে,

রক্তাক্ত অনলে---

পোড়ে মুখ, ভাঙে বুক

মৌন মূক হাজার হাজার

পাইনে উদ্দেশ খুঁজে ও পোড়া মনটার'৷

সবচেয়ে তীক্ষ্ণ এবং তীব্র ঝাঁঝালো কবিতা পাওয়া গিয়েছিল কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রর কলম থেকে৷ শারদীয় যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাটিতে কবি বলছেন—

‘নগরের পথে পথে দেখেছ অদ্ভূত এক জীব,

ঠিক মানুষের মত

কিম্বা ঠিক নয়

—যেন তার ব্যঙ্গচিত্র বিদ্রূপ বিকৃত৷’

ঠিক মানুষ নয়, মানুষের মত চেহারা কিন্তু মন্বন্তরের করাল গ্রাস তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে৷ ফ্যান দাও ফ্যান দাও চিল চিৎকারে নগর সভ্যতাকে বিদ্রূপ করছে যেন—

রক্ত নয়, মাংস নয়

নয় কোনো পাথরের মত ঠাণ্ডা সবুজ কলিজা

মানুষের সৎ ভাই চায় শুধু ফ্যান৷

অন্নদাতারা অন্নহীন হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছে একটু ফ্যানের আশায়৷ তারা যেন ভুলে গেছে---

কত ধানে কত হয় চাল;

ভুলে গেছে লাঙলের হাল

কাঁধে তুলে নেওয়া যায়,

কোনো দিন নিয়ে ছিল কেউ,

জানে নাক আছে এক সমুদ্রের ঢেউ

পাহাড় টলানো৷

নগর সভ্যতার গর্বে গর্বিত মানুষ অন্ন ছেঁকে তুলে নিয়ে ক্ষুধা-শীর্ণ মুখে যেই তুলে দিই ‘ফ্যান’ মনে হয় সাধি একি পৈশাচিক নিষ্ঠুর কল্যাণ৷

কবি আবেগমথিত চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়ে বলছেন, ফ্যান না দিয়ে ফেলে রাখলে হয়তো কিছুদিন পর তার থেকে তৈরি হবে সুরা যা মৃত প্রায় এই মানুষগুলিকে দিলে ক্ষুধাতৃষ্ণা ভুলে তারা চিরনিষ্কৃতি পেয়ে যেতে পারে৷ কবি প্রশ্ন তুলে বলছেন—

রাজপথে কচি কচি এইসব শিশুর কঙ্কাল

মাতৃস্তন্যহীন

দধীচির হাড় ছিল এর চেয়ে আরো কি কঠিন?

লাশ (মোহাম্মদী আশ্বিন ১৩৫০) কবিতায় ফারুখ আহমদ তীব্র ঝাঁঝালো স্বরে উচ্চারণ করেছেন নিরন্ন মানুষের ঘৃণা এবং অবর্ণনীয় জীবন যন্ত্রণার কথা৷

কবি বলছেন—

জানি মানুষের শব মুখ গুঁজে পড়ে আছে ধরণীর পর ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ বনাড়ী নাড়ী তাপে পড়ে আছে নিঃসাড় নিথর

পাশ দিয়ে চলে যায় সজ্জিত পিশাচ, নারী-নর,

পাথরের ঘর

মৃত্যু কারাগার৷

কবির নরম হৃদয় বিচলিত বিধ্বস্ত৷ পড়ে আছে মৃত মানবতা৷ ‘সফী তোদের বর্বর সভ্যতা/এ পাশবিকতা, শতাব্দীর ক্রুরতম এই অভিশাপ, বিষাইছে দিনের পৃথিবী/রাত্রির আকাশ

কবি ঝাঁঝালো কণ্ঠে প্রশ্ন করছেন—

এ কোন্‌ সভ্যতা আজ মানুষের চরম সত্ত্বাকে

করে পরিহাস?

কোন্‌ ইবলিস আজ মানুষেরে ফেলি মৃত্যু পাকে

করে পরিহাস?

এভাবেই কবি সত্য সমাজের অশ্লীল ভূমিকাকে প্রশ্নবাণে একের পর এক জর্জরিত করে মানুষের তৈরি মন্বন্তরকে মানুষের সামনে তুলে ধরেন তাঁর দীর্ঘ কবিতায়৷

কবি সংগীত শিল্পী গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সমকালের অসঙ্গতি অনন্বয় এবং সংকট নিয়ে বেশ কিছু কবিতা ও গান রচনা করেছিলেন৷ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্ঘ সংগীত তারই রচিত৷ বর্তমান সংকলনে শারদীয় যুগান্তর পত্রিকা থেকে নেওয়া ‘আমাদের গান’ কবিতাটিতে কবি ইঙ্গিতময় ভাষায় মন্বন্তর এবং মানুষের অবর্ণনীয় জীবন যন্ত্রণা অতিক্রম করে গণসংগীতের পতাকাতলে সরমবেত হয়ে সাংস্কৃতিক লড়াই করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে উপসংহারে বলেন—

পরিত্যক্ত শূন্য নীড় করে হাহাকার,

নিরঙ্কুশ নীল এই আকাশ কাঁপায়

নিষ্পত্র কঙ্কালসার গাছের শাখায়৷

তবু গান করি,

জনতার নিগৃহীত প্রাণের মেলায়

ডঙ্কা বাজে তালে তালে

শঙ্কা চূর্ণ করি৷

তবু গান করি৷৷

রবীন্দ্র অনুসারি কবি অমিয় চক্রবর্তী ‘অন্নদাতা’ কবিতায় বলছেন—

পাথরে মোড়ানো হৃদয় নগরে

জন্মে না কিছু অন্ন—

এখানে তোমার আসার কিসের জন্য৷

কলকাতা মহানগরীতে পাষাণ হৃদয়ে অন্নদাতার উদ্দেশে বলছেন—

আনো যদি তবে শাবল হাতুড়ি

আনো ভাঙবার যন্ত্র,

নতুন চাষের মন্ত্র৷

তারপর শেষ করছেন এইভাবে—

চাবে না অন্ন, আন্‌বে অন্ন ভেঙে এ দৈত্যপুরী

তোমরা অন্নদাতা

জয় করো এই শান-বাঁধা কলকাতা৷

কবি কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় অভিশাপ কবিতায় চমৎকারভাবে দুর্ভিক্ষ পীড়িত কলকাতার ছবি এঁকেছেন৷ বলছেন—

সারি সারি চলে তারা কঙ্কালে মিছিলের মতো

তাদের কিছুই নেই শুধু এক মরণ উদ্যত৷

খাদ্য নেই ক্ষুধা আছে : এ কি অভিশাপ?

দেহ নেই প্রাণ আছে, হৃদয়ে উত্তাপ৷

এদের বঞ্চিত করে মাঠে-ধান লুটে

ধন্য তুমি মহাজন, সোনা বাঁধ খুঁটে৷

কামাক্ষীপ্রসাদই সরাসরি মহাজনের লুট ও মানুষের তৈরি মন্বন্তরের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন৷

চল্লিশের দশকের অন্যতম সেরা কবি সমর সেন দীর্ঘ পাঁচ পৃষ্ঠার কবিতায় নিজস্ব ভঙ্গিমায় গৃহস্থ বিলাপ শুনিয়েছেন৷ কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত এই কবিতা পাঁচটি পর্বে বিভক্ত৷ প্রতিটি পর্বেই শাণিত বিদ্রূপ, তীব্র কষাঘাত এবং কবি হৃদয়ের যন্ত্রণার অভিব্যক্তি চমৎকার শৈল্পিক আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে যার দু-চারটি পংক্তি বিচ্ছিন্ন করা প্রায় অসম্ভব৷ তবু একটি ছোট্ট নমুনা—

একাগ্র ক্ষুধার জ্বালা

দেহ জীর্ণ ক’রে চোখের অঙ্গারে জমে,

নীড় নেই, মারী দিগ্বিজয়ী,

স্ত্রী কন্যা গিয়েছে অন্য পথে

নিরুদ্দেশ নরকে...

সুকান্ত সম্পাদিত আকাল বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অমুল্য সম্পদ৷ শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা অগণিত মানুষ ফিরে ফিরে দেখবেন অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তাদের জীবন সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য৷ সুকান্ত নিজেই বলেছেন বাংলার মন্বন্তর নিজেই ইতিহাস৷ বলছেন তেরোশ পঞ্চাশ কেবল ইতিহাসের একটা সাল নয়, নিজেই একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস৷ সেই ইতিহাস পাঠ ও পুনঃপাঠ সভ্যতার বিকাশের জন্য বিশেষ প্রয়োজন৷ তাই বারবার এই সংকলন পাঠকের সামনে উপস্থিত করাও জরুরি৷ পঞ্চাশ ষাটের দশকে স্বাধীন দেশের স্বাধীন পতাকার আড়ালে খাদ্যচোর ভূমিচোর মজুতদার ও তার সাকরেদ শাসকদলের গভীর থেকে গভীরতর খাদ্যভাব ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিত৷ অন্নদাতা অন্নহীন তাই পথে পথে খাদ্য আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে৷ ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনে একদিনে স্বাধীন দেশের পুলিশ ও গুণ্ডা বাহিনী আক্রমণে ৮০ জন কৃষক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী সংগঠক শহিদ হয়েছিলেন৷ ষাটের দশকে খাদ্য আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল৷ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল কিশোর নুরুল ইসলাম৷ সেই খাদ্য আন্দোলনের সময় সারস্বত প্রশাসন সংস্থা থেকে দ্বিতীয় বার ছাপা হয়েছিল সুকান্ত সম্পাদিত ‘আকাল’৷ এই সংস্করণে নতুন আকাল শিরোনামায় ছোট্ট একটি গদ্য সংযোগ করেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়৷ কবি সুভাষ লিখেছিলেন :

আবার নতুন করে ছাপানো হল আকাল৷

মধ্যে দু-দুটো যুগ৷ অথচ পড়ে দেখুন, আজও মনে হবে এর কাব্যবস্তু একেবারে টাটকা তরতাজা৷

কবি সুভাষ গভীর ক্ষোভের সঙ্গে লিখলেন : আমাদের মাথার ওপর আজ আবার উদ্যত আকালের খাঁড়া৷ বিদেশি শাসকদের বদলে আমাদের বহুবাঞ্ছিত স্বাধীনতার পতাকার নীচে আজ দেশী লুটেরাদের রাজত্ব৷ দেশ জুড়ে নিরন্নের হাহাকারে শোনা যাচ্ছে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি৷

দীর্ঘ আলোচনা আর বিস্তার ঘটানোর প্রয়োজন বোধহয় নেই৷ শুধু শেষ করার আগে বলতেই হবে কবি সুকান্তর কবিতা প্রসঙ্গে দুএকটি কথা৷ কবি সুকান্ত সন্দেহ নেই তাঁর সময়ের সবচেয়ে দৃপ্ত কবি৷ তেরোশ পঞ্চাশের মন্বন্তর তাঁকে যে গভীরভাবে বিচলিত ও আলোড়িত করেছিল তা স্পষ্ট হয় অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বোধন, অভিমান, 'রবীন্দ্রনাথের প্রতি' ইত্যাদি বেশ কয়েকটি কবিতা ও গীতি আলেখ্য রচনা করেছিলেন মন্বন্তরকে কেন্দ্র করে৷ আকাল সংকলনে রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিতাটি সংগ্রহ করেছেন স্বয়ং সুকান্তই৷ কবিতাটি অরণি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল৷ সুকান্ত-অনুরাগী পাঠকমাত্রই জানেন সুকান্ত ছিলেন রবীন্দ্র ভক্ত এক সম্ভাবনাময় কবি৷ গভীর নিষ্ঠায় তিনি রবীন্দ্রচর্চা করেছিলেন, স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব বই গ্রন্থাগারে থেকে এনে পড়েছিলেন যা আমাদের এখনও অবিশ্বাস্য মনে হয়৷ রবীন্দ্রনাথ-সুকান্ত সম্পর্ক এক গভীর গবেষণার বিষয়৷ শুধু এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে, তার সমসময়ে অনেক শক্তিশালী তরুণ কবি যখন রবীন্দ্রপ্রভাব চূর্ণ করে নতুন ধারার কবিতা চর্চা করছেন, তখন সুকান্ত বিষয়বস্তুতে গুণগত পরিবর্তন এনেও, শেষপর্যন্ত রবীন্দ্রনাথেই ছিলেন তদ্‌গত৷ তাই 'রবীন্দ্রনাথের প্রতি' কবিতাটি ছিল তাঁর স্বাভাবিক নির্বাচন৷ তবে এই পর্বের তাঁর সেরা কবিতা অবশ্যই বোধন৷ দীর্ঘ ৯৫ পংক্তির এই কবিতাটিকে কবি সমালোচক এবং সর্বজন মান্য অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য চিহ্ণিত করেছিলেন ‘মন্বন্তরের মহাকাব্য’ বলে৷ তিনি বলেছিলেন ‘বোধন’-ই সুকান্তর শ্রেষ্ঠ কবিতা৷ সুকান্তর মৃত্যুর সাতাশ বছর পরে তিনি নিজের মতো সংশোধন করে বলেছিলেন ‘বোধন’ নয় 'রানার' সুকান্তর শ্রেষ্ঠ কবিতা৷ কেন মত পরিবর্তন করলেন তা বিস্তারিত বলেছিলেন, তবে একই সঙ্গে মন্বন্তর মহাকাব্য বোধন মতেই দৃঢ় ছিলেন৷ 'রানার' শ্রেষ্ঠ হতে পারে, কিন্তু 'বোধন'-এর নির্মাণ শৈলী ও জীবনবোধ একজন ১৮ বছর বয়সী তরুণ কীভাবে আয়ত্ত করেছিলেন সে এক বিস্ময়৷ একটি পংক্তিও এখানে পুনরুদ্ধার করার প্রয়োজন নেই৷ বাচিকশিল্পীদের কণ্ঠে অজস্রবার ধ্বনিত হয়ে চলেছে এই মহৎ কবিতা৷ বারবার শুনলেও মনে হয়, সম্পূর্ণ নতুন একটি কবিতা পাঠ এইমাত্র সমাপ্ত হল৷ বাংলার মন্বন্তর নিয়ে কোনো আলোচনাই সুকান্তকে আড়ালে রেখে আর সম্ভব নয়৷ আর সুকান্ত সম্পাদিত ‘আকাল’ সংকলন গ্রন্থটিও ইতিহাসের দলিলরূপে বার বার উচ্চারিত হবে তা বলাই বাহুল্য৷


প্রকাশের তারিখ: ২৭-আগস্ট-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org