|
বাংলাদেশ, ‘হিন্দু চশমা’ ও ভারতের বিদেশনীতিঅমিত বড়ুয়া |
রাস্তার আগ্রাসী কার্যকলাপ এবং আরএসএস-বিজেপির ভাষা দেখিয়ে দিল, যখন এদেশে হিন্দু উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি কী হবে সেবিষয়ে নির্দেশ দিতে শুরু করেছে, তখন মোদি সরকার নীরব থাকার পথ বেছে নিতে নারাজ নয়। আরএসএস ও বিজেপির প্রতিনিধিরা যে ধরনের বিবৃতি দিচ্ছেন এবং যেসব কার্যকলাপ করছেন, সেগুলোকে সহজভাবে দেখলে হবে না। ভারতের প্রতিবেশী দেশ সহ অন্য সব দেশ ভারতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্বকরণের যে প্রক্রিয়া চলছে সে দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। |
‘হিন্দু’ চশমার কাচ দিয়ে প্রতিটি দেশকে আলাদা আলাদাভাবে পরখ করা, শেষ পর্যন্ত এটাই কি হবে ভারতের বিদেশ নীতির পরিণতি? যখন একটা দেশে রাস্তার আন্দোলনের জেরে জমানা বদল হয়ে যাচ্ছে, তখন আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন। আর নিজের সেই অকর্মণ্যতার কারণে আপনি কি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে জলাঞ্জলি দিতে পারেন? প্রতিবেশী দেশে কিংবা অন্যত্র একমাত্র নিজেদের পছন্দমাফিক সরকারের সঙ্গেই কাজ করবে, এমন পছন্দ করার সুযোগ কি ভারতের আছে? হ্যাঁ, আমরা বাংলাদেশ প্রসঙ্গেই কথাগুলো বলছি। ধীরগতিতে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এগোচ্ছে একেবারে পাকিস্তানের মতো সম্পর্কের দিকে। গত এক দশকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একেবারে কানা গলিতে গিয়ে পৌঁছেছে। শুধু মাঝে মাঝে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথাচাড়া দিয় ওঠে। এখন পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য হয় না, কোনওরকম বিমান, বাস বা রেল যোগাযোগ নেই। এটা এমন একটা পরিস্থিতি যা বিজেপির দেশজ রাজনীতির সঙ্গে একেবারে খাপে খাপে মিলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তো সেরকম ছিল না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ বিপুল, ভারত বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ বিক্রি করে, জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন রয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনেকগুলি সড়ক ও রেল যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। এখন যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন শুধুমাত্র সেই কারণেই ভারতের বিদেশ নীতি বাংলাদেশের সঙ্গে এমন সম্পর্ককে একেবারে এলোমেলো করে তুলবে, এটা দেখলে আশ্চর্য হওয়া ছাড়া অন্য কিছু করার থাকে না। যে বিদেশনীতিতে প্রাজ্ঞতার ছাপ থাকে, সেই বিদেশ নীতি, অন্য দেশে যে ধরনের সরকারই থাকুক না কেন, সেই সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। যখন আফগানিস্তানে তালিবানদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করার সমস্যা এল, তখন এই বিষয়টি ভারত বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু যখন হাসিনা পরবর্তী প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রশ্ন আসছে, তখন ভারত একেবারে অন্য পথ বেছে নিয়েছে। ডিসেম্বরের ২ তারিখ হিন্দু উগ্রজাতীয়তাবাদীরা ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাই কমিশনারের দপ্তরে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সহকারী হাই কমিশনের দপ্তরে ভাঙচুর করে। অথচ ঘটনাটা ভারত সরকার যেন দেখেও দেখল না। এই হামলার একটা পরিপ্রেক্ষিত ছিল। ইস্কনের সঙ্গে সম্পর্কিত হিন্দু সাধু চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে বিচিত্র কারণে গ্রেপ্তার করেছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটাও একেবারে অবাস্তব। যিনি এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শীর্ষস্তরের নেতা সেই শুভেন্দু অধিকারী চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেপ্তারির দিন হুমকি দিয়েছিলেন যে, যদি হিন্দুদের ওপর হামলা বন্ধ না হয় তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত হল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ভারত ‘রাজাকারদের নতুন বাচ্চাদের’ বাধ্য করবে ঠিক সেই ১৯৭১ সালের মতো আত্মসমর্পণ করতে। রাজাকাররা হল পাকপন্থী মিলিশিয়া। ৩০ নভেম্বর আরএসএস একটা বিবৃতি দিল। তারা ‘ভারত সরকার’কে বলল, ‘সম্ভাব্য সবরকমভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে’ যাতে বাংলাদেশে হিন্দুদের এবং অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর আরও নির্যাতন বন্ধ করা যায়। একইসঙ্গে আরএসএস ভারত সরকারকে বলল ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে যাতে এব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা যায়।’ রাস্তার আগ্রাসী কার্যকলাপ এবং আরএসএস-বিজেপির ভাষা, মীম, পোস্ট দেখিয়ে দিল, যখন এদেশে হিন্দু উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি কী হবে সেবিষয়ে নির্দেশ দিতে শুরু করেছে, তখন মোদি সরকার নীরব থাকার পথ বেছে নিতে নারাজ নয়। ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘ভারতের উদ্বেগ’কে কেন অনেকটা ‘হিন্দু উদ্বেগ’এর মতো শোনাচ্ছে? হিন্দু হোমল্যান্ড রাজনীতিই কি এখন ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতির ভিত্তি? কেন ভারতের বিদেশনীতির বেশির ভাগ বিশ্লেষণকারী দ্রুত পরিবর্তনের এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে নারাজ? তাঁরা কি এই পরিবর্তনের সঙ্গে একমত?’ এই কথাগুলি পোস্ট করেছেন অংশুমান চৌধুরী। তিনি লন্ডনের কিংস কলেজের পিএইচডি স্কলার এবং রয়েছেন সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। চৌধুরী বলেছেন, ‘অন্য প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার। সেক্ষেত্রে এদেশের অভ্যন্তরে হিন্দু রাজনীতি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতের ধার ভোঁতা করে দেবে। যেসব দেশে সংস্কৃিতগত ভাবে অন্য কোনও উপাদানকে আলাদা গুরুত্ব না দিয়ে সব রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে বেজিং সফলভাবে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে, হিন্দু হোমল্যান্ড রাজনীতির কারণে সে সব দেশের সঙ্গে ভারতের দর কষাকষির ক্ষমতা কমবে।’ আরএসএস ও বিজেপির প্রতিনিধিরা যেধরনের বিবৃতি দিচ্ছেন এবং যেসব কার্যকলাপ করছেন, সেগুলোকে সহজভাবে দেখলে হবে না। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলি সহ অন্য সব দেশ ভারতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিন্দুত্বকরণের যে প্রক্রিয়া চলছে সে দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। হিন্দুদের স্বার্থরক্ষাকারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলি আদালতে আর্জির ভিত্তিতে নিরন্তরভাবে এদেশের অতীত ঘটনাগুলিকে খুঁড়ে বের করছে এবং আদালত সেগুলিতে অনুমতি দিচ্ছে। মোদি সরকার অত্যন্ত খুশি মনে এ সব ঘটনায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। দেশের মধ্যে যে হিন্দু ধর্মান্ধতা চলছে তার বিরোধিতা করার কোনও ইচ্ছা মোদি সরকারের তরফে দেখা যাচ্ছে না। বিদেশে এসবের বহুতর প্রভাব পড়বে। ভারতকে এখন আর অ-পশ্চিমী ধরনের সফল গণতন্ত্রের উদাহরণ হিসাবে দেখা হয় না, যে গণতন্ত্র ধর্মবিশ্বাস নিরপেক্ষভাবে দেশের সব নাগরিককে সমান অধিকার দেয়। আদর্শ স্থাপনা করার জন্য যে শক্তি ভারতের ছিল, দেশ এখন তা হারিয়ে ফেলেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যদি বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষ সেখানকার হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নামিয়ে আনে, সেক্ষেত্রে এদেশে যেহেতু রাষ্ট্রীয় নীতিতে মুসলিম বিরোধী পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে, তাহলে কি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের হয়ে ভারত সরকারের কথা বলার নৈতিক অধিকার থাকে? যদি মোদি সরকার তাদের প্রতিশ্রুত সবকা সাথ, সব কা বিকাশ দৃষ্টিভঙ্গী বাস্তবে মেনে চলত, তাহলে এই অঞ্চল এবং গোটা বিশ্ব দিল্লির কথা শুনতে বাধ্য হত। বস্তুত, ঘৃণার ধিকধিক আঁচে ভারতে যে ভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে উত্তপ্ত করে তোলা হয়েছে, তারই ফলে ইসলামি মৌলবাদীদের পক্ষে ভারতকে টার্গেট করা সহজ হয়ে গেছে। সেই মৌলবাদীরা এখন ইউনূস সরকারের আশ্রয়ে স্বস্তিতে রয়েছে। জামাত-এ -ইসলামির বিরুদ্ধে নিষেধজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, এবং সব ধরনের উগ্র মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশে মাথাচাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা অক্সিজেন পাচ্ছে ভারত রাষ্ট্রে মুসলিম বিরোধী কার্যকলাপ থেকে। হাসিনাকে ঘিরে সমস্যা লুটিয়েন্সের দিল্লির কোনও একটা জায়গা থেকে হাসিনাকে বিবৃতি দেওয়ার এবং অনলাইনে ভাষণ দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে ভারত। বিষয়টাকে ঢাকা মোটেই ভালভাবে নেয়নি। ফলে ঢাকা আরও জোরেসোরে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগী প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যার্পণের জন্য চাপ দিতে পারে। ছাত্র রাজনীতিক ও বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের পারমর্শদাতা নাহিদ ইসলাম এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ও সমর্থন চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ভারত সরকার দুদেশের মধ্যে মান্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্বকে খাটো করার ঝুঁকি নিচ্ছে। ভারতের নিশ্চয়ই একথা ভুললে চলবে না যে, তাদের স্থায়িত্ব ও সংহতি বাংলাদেশের স্থায়িত্ব ও সংহতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।’ নাহিদ এক্স হ্যান্ডলে আরও লিখেছেন, বিজেপি বাংলাদেশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যদি এমনটা ঘটে, তাহলে সেটা হবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পক্ষে ক্ষতিকর। বাংলাদেশ-বিরোধী কিংবা মুসলিম-বিরোধী রাজনীতি ভারতের জাতীয় রাজনীতির স্বার্থবাহী হবে না কিংবা ভারতের ঐক্য রক্ষায় কোনও ভূমিকা নিতে পারবে না। তাই ভারতের কাছে আমাদের আর্জি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত প্রচার বন্ধ করুন, সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দিন এবং গণতন্ত্রকে সম্মান জানান। ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবাদপত্র দ্য ডেলি স্টার-এ ঢাকার ইন্টারন্যাশলাল ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)র অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আলম ভারত ও বাংলাদেশে জাতীয় পতাকার অবমাননার নিন্দা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দুদেশের সরকার ও নাগরিক সমাজের অবশ্যই উচিত উত্তেজনা প্রশমনের দায়িত্ব নেওয়া। এর মানে যে কোনও ঘটনায় ভাবনাচিন্তা-রহিতভাবে এলোমেলো প্রতিক্রিয়া না দেখানো এবং দীর্ঘকালীন সমাধানের ওপর জোর দেওয়া। এই ধরনের কাণ্ডকারখানার শিকড় ধরে টান দেওয়া উচিত দুদেশের নেতাদের, তা সে ভ্রান্ত তথ্য ছড়ানোই হোক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি হোক কিংবা রাজনৈতিক বিষয়ে অভিযোগ হোক।‘ মৌলাবাদীরা তাদের নিজেদের পরিসরে তখনই বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় যখন তারা একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে যায়। এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে উত্তেজনা রয়েছে তা দুদিকের মৌলবাদীদের হাতেই যথেষ্ট অস্ত্র যুগিয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতিতে একটা রুপোলি রেখা হল ঢাকায় সাংবাদিকদের কাছে ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় কুমার বর্মার অত্যন্ত সুবিবেচকের মতো মন্তব্য। আগরতলায় সহকারী হাই কমিশনারের দপ্তরে হামলার পর বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিল। এর পরেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে ওই মন্তব্য করেন। দুদেশের সম্পর্ক ঘিরে যত ঝুঁকি রয়েছে, তাতে এটুকুই আশা করা যায় এবং প্রার্থনা করা যায় যে, দুদেশের সরকারই মৌলবাদী শক্তিগুলিকে কড়া নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে এবং মতপার্থক্য বেড়ে চলা সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করবে। তবে এই কথাটা বলা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন।
সূত্র: ফ্রন্টলাইন, শিরোনাম মার্কসবাদী পথ-এর প্রকাশের তারিখ: ১২-ডিসেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |