|
বাংলার মানুষের পরাজয় নেইশান্তনু দে |
আমরা গুজরাট দেখেছি, উত্তর প্রদেশ দেখেছি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বাতাবরণ সাম্প্রতিক অতীতে কখনও দেখিনি। নিজের চেনা জায়গা এখন নিজেরই কেমন অচেনা লাগে। পরিচিত মানুষকেও মনে হয় অপরিচিত। এমন তো দেড়দশক আগেও ছিল না। ভোট আসবে-যাবে। কিন্তু যে দেওয়াল তুলে দেওয়া হচ্ছে, তাকে ভাঙবে কে! যত দিন বামপন্থীরা ছিলেন, তত দিন বিজেপি ছিল একেবারে প্রান্তিক শক্তি। মাথা তুলতে পারেনি উগ্র দক্ষিণপন্থীরা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী, বিধানসভায় ছিল না একজনও বিজেপি-র বিধায়ক। বামপন্থীদের সমর্থনের হার কমে এখন সওয়া ৬ শতাংশ। বামপন্থীরা যত দুর্বল হয়েছে, তত মাথাচাড়া দিয়েছে উগ্র দক্ষিণপন্থা। |
বছর আট আগে বাংলাদেশের প্রথম আলো পত্রিকায় আনিসুল হকের একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘ফুল, তোমাকে ফুটিতেই হবে’। ওঁর সব লেখা, বা বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই। হওয়ার কথাও না। কিন্তু এই নিবন্ধের শেষাংশের সঙ্গে পূর্ণ সহমত। আনিসুল লিখছেন: ‘আমরা জানি, আমাদের মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে বাধা আছে। বাধা আছে এবং আক্রমণও আছে। তা সত্ত্বেও সরকার বা রাষ্ট্রের শক্তি নয়, আমরা আমাদের সমাজের শক্তির ওপরই আস্থা রাখতে পারি। বাংলাদেশের মানুষের পরাজয় নেই, কারণ তার সংস্কৃতি আছে।’ এপার বাংলায় বসে আনিসুলের প্রত্যয় নিয়েই বলি: ঠিক, বাংলার মানুষের পরাজয় নেই, কারণ তার আছে সংস্কৃতি। আমরা গুজরাট দেখেছি, উত্তর প্রদেশ দেখেছি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বাতাবরণ সাম্প্রতিক অতীতে কখনও দেখিনি। নিজের চেনা জায়গা এখন নিজেরই কেমন অচেনা লাগে। পরিচিত মানুষকেও মনে হয় অপরিচিত। এমন তো দেড়দশক আগেও ছিল না। ভোট আসবে-যাবে। কিন্তু যে দেওয়াল তুলে দেওয়া হচ্ছে, তাকে ভাঙবে কে! যত দিন বামপন্থীরা ছিলেন, তত দিন বিজেপি ছিল একেবারে প্রান্তিক শক্তি। মাথা তুলতে পারেনি উগ্র দক্ষিণপন্থীরা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী, বিধানসভায় ছিল না একজনও বিজেপি-র বিধায়ক। বামপন্থীদের সমর্থনের হার কমে এখন সওয়া ৬ শতাংশ। বামপন্থীরা যত দুর্বল হয়েছে, তত মাথাচাড়া দিয়েছে উগ্র দক্ষিণপন্থা। স্বাভাবিক। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। অন্যদিকে, বিরোধীদের শূন্য করতে গিয়ে মমতা আজ নিজেই বিপর্যয়ের মুখে। ২০১১, পালাবদলের পরেই হাজার হাজার বামপন্থী পরিবার গ্রামছাড়া, ঘরছাড়া। ২১৩ জন বামপন্থী কর্মী-সমর্থক খুন। হাজারো বামপন্থী কর্মীর বিরুদ্ধে ভুয়ো মামলা। শয়ে শয়ে পার্টি অফিস, গণসংগঠনের অফিস বেদখল। বিরোধী স্বর, বিরোধী মত শুনলেই টুঁটি চেপে ধরে রক্তশূন্য করে দেওয়া। এক শ্বাসরোধী অবস্থা। নির্বাচনে অবাধ লুট। ভোটকেন্দ্র থেকে গণনা-কেন্দ্র। রক্তাক্ত সন্ত্রাস। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বামপন্থাকে নিকেশ যজ্ঞের সেই অভিযান থেকেই আজ বিজেপি-র উত্থান। বামপন্থীরা হারিয়েছেন অনেক কিছু। হারিয়েছেন সমর্থনের শক্ত জমি। কিন্তু সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনও আছে অনেক কিছু। নির্বাচনী পরাজয়ে হারিয়ে যায়নি জ্বলন্ত ইস্যুগুলো। কৃষকরা ভালো নেই। ফসলের দাম নেই। আত্মহত্যা করছেন। ছেলেমেয়েরা গাদাগাদা নম্বর পাচ্ছে। চাকরি পাচ্ছে না। সরকারি দপ্তরে নতুন নিয়োগ নেই। স্কুল-কলেজে নিয়োগ বন্ধ। অথচ, দেড়দশক আগেও ছিল। প্রতিবছর, নিয়ম করে। এখন কিছু-বা নিয়োগ হলে তাতেও বেপরোয়া দুর্নীতি। মন্ত্রীরা জেলে। প্যানেল বাতিল। এক নৈরাজ্যের রাজ্য। বাড়ছে বেকারত্ব। নেই নতুন কোনও শিল্প। শুকিয়ে যাচ্ছে পুরোনো শিল্প। হুগলি নদীর দু’ধারে সারি সারি কারখানার কঙ্কাল। বন্ধ সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা। বেতন কমিশন ডিপ ফ্রিজে। গ্রাম উজাড় করে সবাই ভিনরাজ্যে। শহর ছেড়ে অন্য রাজ্যে, অন্য দেশে। দায়ী কে? সঙ্ঘ-বিজেপি বলছে: ‘ওরা। ওদের জন্যই আমাদের হচ্ছে না।’ কে বলবে, দায়ী আসলে নীতি। ‘ওরা-আমরা’ সবার জীবনই তাই অন্ধকারে। ভুলে গেলে চলবে না এই পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ইতিহাস। ছেচল্লিশের দাঙ্গা। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস। দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি। ইন্ধন পাচ্ছে সংখ্যালঘুর মৌলবাদ। সাতচল্লিশে স্বাধীনতা। দেশভাগ। বাংলা ভাগ। কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় কাঁটাতার। ভিটে হারানোর যন্ত্রণা। স্বদেশ, স্বজন হারানোর হাহাকার। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু। ১৯০৫, উচ্চবর্ণের যে হিন্দুরা প্রথম বঙ্গভঙ্গ রুখে দিয়েছিলেন, ৪২-বছর পর দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গে কিন্তু তাঁরাই ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা! একথা যেমন ঠিক, তেমন এও দস্তুর, দুই বাংলার সংস্কৃতির ভিত্তি বা উৎসও কিন্তু ধর্ম নয়। বরং লোকায়ত চিন্তা ও ভাবাদর্শ, যা প্রজন্ম-পরম্পরায় চলে আসছে। সেই চর্যাপদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত। নভেম্বর, ১৯৩৭। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা দীনেশচন্দ্র সেনের ডাক পরল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান’। সেসময় চারটি বক্তৃতা দেন তিনি। বছরতিনেক বাদে ঢাকার বিজয়া প্রেস থেকে সেগুলির সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়। সেদিন দীনেশচন্দ্র তাঁর বক্তৃতায় আধুনিক হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের এই জটিলতার বিপরীতে হাজির করেছিলেন বাংলা ভাষার পুরনো সাহিত্যের নজির। তিনি বারবারই বলেছিলেন, ইংরেজ উপনিবেশ পর্বে হিন্দু বাঙালি আর মুসলমান বাঙালি পরস্পরের সঙ্গে যে লড়াই করছে, সেই ভেদবিভেদের ইতিহাসের থেকেও অনেক পুরনো, অনেক দীর্ঘ হিন্দু আর মুসলমান বাঙালির মিলনের ইতিহাস। বাঙালির ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি, যার উপর নির্ভর করে বাঙালি বাঙালি হয়ে উঠেছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান দুইয়েরই অবদান আছে। তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘বাঙ্গালার জনসাধারণ বলিতে কাহাদিগকে বুঝিতে হইবে?’ নিজেই সে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন দীনেশচন্দ্র, ‘ইহারা জৈন নহেন, বৌদ্ধ নহেন, খৃষ্টান নহেন, হিন্দু নহেন, মুসলমান নহেন– ইঁহারা বাঙ্গালী।’ বাঙালির চিন্তাধারার পরম্পরার মধ্যে যে দিকগুলি নজর করার মতো, তার মধ্যে একটি গুণ হল বাঙালি সভ্যতার গ্রহণশক্তি এবং সমন্বয়প্রীতি। অন্যদের সংস্কৃতি গ্রহণ, নতুন সংস্কৃতি চয়ন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের ইতিহাস ও পরম্পরাকে ধারণ করা। ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া/ বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’ বাঙালি সভ্যতার গ্রহণশীলতা আর প্রশ্ন-প্রবণতা দুই-ই আছে। যে গুণগুলি একসময় বড় রকমের স্বীকৃতি পেয়েছে। তার থেকে বিচ্যুত হলে, সেগুলি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এটা পশ্চাৎমুখী চিন্তা নয়। নজরুলের ভাষায় বিদ্রোহী চিন্তার মধ্যেও অতীতের ঐতিহ্যের স্বীকার খুবই প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় শুধু আধুনিক লিখিত সাহিত্যে নয়– পালা, পাচালি, পল্লিগান, যাত্রা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আমরা দেখি এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রকাশ ও বিস্তার। যার মধ্যে কিছু ধর্মীয় বিষয় ও কখনও কখনও রাজপুরুষদের কাহিনি থাকলেও, মর্মবস্তুর মধ্যে যা প্রধান ছিল, তা হলো মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদারপন্থী মতবাদ। চৈতন্য থেকে চণ্ডীদাস। চৈতন্য নিজে ব্রাহ্মণ হলেও জাতিভেদের বিরুদ্ধে ছিলেন। এবং তাঁর অনেক মুসলমান শিষ্য ছিল। বাংলার সামাজিক ইতিহাসে চৈতন্যের ভূমিকা বিরাট। কবি চণ্ডীদাসই বলেছিলেন, ‘শুন হে মানুষ ভাই, সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।’ আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ে আছে বাউল সাধকেরা। তাঁদের গানে কিছু আধ্যাত্মিক বিষয় থাকলেও মানবিক দিকটাই ছিল প্রধান। এবং তা ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগীত সাধনা। বাউলসংগীতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমতির প্রতিষ্ঠা হয়নি, এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে। কোরান-পুরাণ ঝগড়া বাধেনি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদ বিরোধে বর্বরতা।’ (মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন কর্তৃক বাউল সংকলন হারামণি-র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য)। কবি বলছেন, ‘আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়েস– শিলাইদহ অঞ্চলের এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল– কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে!’ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় চেতনা কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করেনি। বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি। সেই কবে লালনের উচ্চারণ: ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। তাই আনিসুল হকের কথার প্রতিধ্বনি করে আবারও বলব, বাংলার মানুষের পরাজয় নেই, কারণ তার আছে সংস্কৃতি। প্রকাশের তারিখ: ১৫-এপ্রিল-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |