|
ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাইপার্থপ্রতিম বিশ্বাস |
সন্দেহ নেই দেশ তথা রাজ্যের গেরুয়া শাসক রাজনীতির ক্ষেত্রে হিন্দুত্ব এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে। ফলে শহরের উন্নয়ন তথা সৌন্দর্যায়নের অর্থ শহরের ‘অসুন্দর’ দরিদ্র মানুষকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা, শহর জুড়ে প্রসাধনী পরিবর্তনের আবহে। ফলে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকারে এসেই উচ্ছেদের মতো অপ্রিয় কাজ কর্পোরেট সংস্কারের স্বার্থে শাসক করতে চাইছে ‘লোহা গরম থাকতে থাকতেই’ দুর্বল মানুষগুলোর মেরুদণ্ড ঘা মেরে বেঁকিয়ে দিতে। আর সরকারের এমন জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে যে প্রধান বিরোধীদের রাস্তায় প্রতিবাদে প্রতিরোধে নামার কথা তাঁরা আজ শাসকের ‘গৃহে পালিত’ বিরোধীতে পরিণত হয়েছে। |
ভোটের আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজ্যে প্রচারে এসে এক হকারের দোকান থেকে দশ টাকার ঝালমুড়ি খেয়েই প্রচারে বাজিমাত করেছিলেন। ইতিপূর্বে প্রকাশিত, প্রধানমন্ত্রী বাল্যকালে তার পিতৃদেবের সঙ্গে রেলস্টেশনে যে চা বিক্রি করতেন সেটিও আদপে ছিল হকারের জীবিকা। পাশাপাশি এদেশের সংঘটিত কাজের সংকটের বাজারে প্রধানমন্ত্রী থেকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রত্যেকেই এক নিঃশ্বাসে বিকল্প জীবন-জীবিকা বোঝাতে পকোড়া থেকে শুরু করে চপ-তেলেভাজার যে উদাহরণ দিয়েছেন সে সবই হকারের পেশা। ফলে পেশা হিসেবে হকারি অবৈধ নয়। বরং হকারি এদেশে দশকের পর দশক ধরে চলে এসেছে সমাজসিদ্ধ হয়ে, যেটা স্বাধীন ভারতে ২০১৪ সালে আইনসিদ্ধ ঘোষিত হয়। ফলে হকার মানেই অবৈধ দখলদার কিংবা ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ অনুপ্রবেশকারী এমনটা নয়। অথচ, এই হকার উচ্ছেদ নিয়েই এখন সরগরম রাজ্যের রাজনীতি। ইতিমধ্যে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী রাজ্যের গেরুয়া শাসক উচ্ছেদের উৎসবে নেমেছে অবৈধ হকার তোলার নামে। ‘ভয় ইন, ভরসা আউট’ রাজ্যে ভোটের আগে গেরুয়া নেতাদের ভাষণ থেকে শুরু করে খবরের কাগজের পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে ফলাও করে প্রচার হয়েছিল ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’। আর ভোট শেষেই উলট পুরান। সন্দেহ নেই যে ঘাসফুলের দুঃশাসনের ভয় থেকে রেহাই পেতে রাজ্যের বহু মানুষ পদ্মফুলকে ভরসা করে ক্ষমতায় এনেছে। কারন রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ধাক্কায় আইনের শাসন উঠে গিয়ে শাসকের আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ফলে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, জনজীবনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আজ সরকার পরিবর্তনের পর বুলডোজার রাজের আবহে আবার সেই ভয় নতুন করে ফিরে এলে প্রশ্ন ওঠে ঐ পরিবর্তনের গুণগত চরিত্র নিয়েই। গেরুয়া শাসকের দল ভোটপর্ব জুড়ে মানুষের কাছে ভরসার সরকার গড়ার অঙ্গীকার করেছিল। অথচ সরকারের প্রথম ইনিংস-এর স্লগ ওভারেই রাজ্য জুড়ে বুলডোজার নিয়ে শুরু হয়েছে হকার উচ্ছেদ অভিযান। প্রতিদিন নিয়ম করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের রেলস্টেশনে রাজ্য ও রেল পুলিশের ডবল ইঞ্জিন আক্রমণে ভেঙে পড়ছে সমাজের প্রান্তিক ঐ শ্রমজীবী মানুষ, হকারদের আস্তানা। ফলে রাজ্যজুড়ে এমন অসহায় মানুষদের মধ্যে সংক্রামিত হচ্ছে ভয়ের বাতাবরণ, জীবন-জীবিকা হারানোর ভয় রাজরোষের কোপে। কিল মারার গোঁসাই গত পনেরো বছরে ভয়াবহ দুর্নীতিতে আক্রান্ত এই রাজ্যের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। মানব সম্পদ উন্নয়ন সুচকের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ এখন দেশের ২৭-তম রাজ্য। ফলে এহেন রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার স্বাভাবিক অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হওয়া উচিত ছিল নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। কারণ একদা বাম আমলের ভূমি সংস্কার এবং পঞ্চায়েতের সাফল্যে রাজ্যে যে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছিল তার উত্তরনের জন্যই প্রয়োজন ছিল রাজ্যে ছোট বড় মাঝারি শিল্পের বিকাশ। প্রয়োজন ছিল কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নতুন নীতি প্রণয়নের কার্যকরী উদ্যোগের। কিন্তু হল উল্টোটা। সিঙ্গুর অধ্যায়ের পর রাজ্যের শিল্পের যে খরা সৃষ্টি হয়েছিল তা আজও বহমান। ফলে হাল আমলের শিল্প-পরিষেবা ভিত্তিক কাজের বাজারে শোচনীয় হাল হয়েছে অকৃষি ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষজনের। এই প্রেক্ষিতে সরকারি অনুদানের বাইরে দুবেলা আত্মসম্মান নিয়ে সৎভাবে বাঁচার অন্যতম পেশা হয়ে উঠেছে ছোট খুচরো ব্যবসা। আর সেই খুচরো ব্যবসায়ীদের একাংশ রেলস্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড কিংবা পর্যটন ক্ষেত্র থেকে হাটে-বাজারে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বিকল্প জীবিকার পথ ধরেছে হকার হয়ে। ফলে সরকারি অদক্ষতা এবং অপরিকল্পনার কবলে পড়ে রাজ্যে উন্নয়নের পথ যখন বন্ধ, তখন এই বিপুল অংশের অসংগঠিত ক্ষেত্রের খেটে খাওয়া মানুষেরা তাদের সততা, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই এই হকারির পেশায় পথে নেমেছেন। অথচ, আজ রাতারাতি সরকারে রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যের নতুন শাসক অতীতের সরকারি ব্যবস্থার যাবতীয় ব্যর্থতার দায় ঝাড়তে তৎপর হয়েছে ঐ হকার উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে! তাই এই আর্থসামাজিক সংকটের নিরিখে এমন বেহিসেবি, অবৈধ এবং অনৈতিক। উচ্ছেদ অভিযান সামাজিক ন্যায় এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী। কথায় আছে ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, অথচ কিল মারার গোঁসাই’। আজ রাজ্যে শাসকের হকার উচ্ছেদের যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখে এমনটাই মনে করছে রাজ্যের বহু মানুষ। আজ ভুললে চলবে না যে রাজ্যে লক্ষ-লক্ষ এই হকারেরা এদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নয়। বরং তারা এদেশের নাগরিক, যাঁদের ভোটেই রাজ্যে এই সরকার তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হলেই, সংখ্যার জোরে প্রশাসনের যা ইচ্ছে করার অধিকার বর্তায় না দেশের নাগরিকদের প্রতি। একুশে আইন— হকার উচ্ছেদ এদেশের কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী হকারের পেশা এদেশের আইন স্বীকৃত পেশা। কার্যত এদেশে হকারদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের আমলে পাশ করা ‘প্রথম স্ট্রিট ভেন্ডিং অ্যাক্ট-২০১৪’ আইন লাগু হয়েছে মোদী সাহেবের প্রথম ইনিংস থেকেই। সেই আইন বলে রাজপথের হকারদের শ্রেণীবিন্যাস করার কথা স্থানীয় পৌরসভা কিংবা সরকারের। ফলে শহরের কোন কোন স্থানে, কত সংখ্যায় হকারেরা কি কি ধরনের পণ্য কেনাবেচা হবে, কিংবা কোন কোন অঞ্চলে বেচা কেনার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে— হকারদের সেগুলি খতিয়ে দেখার কথা রাজ্যের সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট পৌরসভার তত্ত্বাবধানে শহরের ভেন্দিং কমিটির। কিন্তু বারো বছর আগে এমন আইন পাশ হওয়ার পরও এদেশে সরকার সেই আইন বাস্তবায়নের পথে না হাঁটায় অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে রাজপথে বসা হকারেরা। এই রাজ্যেও প্রাক্তন ঘাসফুল সরকার শহরের হকারদের সামগ্রিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের লাইসেন্স প্রদানের কাজ শেষ করেনি। সেই আইনে উল্লেখ রয়েছে শহরের কোন অংশে হকারদের তুলে দিতে হলে তাদের বিকল্প পুনর্বাসন ব্যবস্থা করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। অথচ সেসবের কোন তোয়াক্কা না করেই নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে হকার উচ্ছেদের পথে নেমেছে, শহর সাফাই অভিযানে। ফলে কেন্দ্রের আইনের হকারদের জীবন জীবন-জীবিকার সুরক্ষা মূল ভাবনাটাই আজ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে রাজ্যে ‘ডবল-ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই। ফলে দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও চালু হতে চলেছে রাজ্যে নতুন শাসকের একুশে আইন। আগের জমানায় বসে যাওয়া কিংবা বসিয়ে দেওয়া হকারদের কোন দায়িত্ব বর্তমান সরকার নেবে না এমন মনোভাব সরকার পরিচালনার ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে বেমানান। অতীতের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার ‘ব্ল্যাক-বক্স’ সঙ্গে নিয়েই বর্তমান সরকারকে এগিয়ে চলতে হয় উন্নত ভবিষ্যতের লক্ষ্যে। এর অন্যথা আধুনিক গনতন্ত্রে প্রশাসনিক রীতিনীতির পরিপন্থী। অমৃত ভারতে হকার সম্প্রতি রাজ্য সফরে এসে কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী রাজ্যের শতাধিক রেলস্টেশনে ‘অমৃত ভারত প্রকল্পের’ কাজ শুরু করার ডাক দিয়েছেন। ফলে সেই ডাক থেকে স্পষ্ট যে ‘পিপিপি’ বাণিজ্যিক মডেলে রেলস্টেশন জুড়ে রেলের জমি ব্যবসায়িক কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রূপায়ন করতেই ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার রাজ্যের বড় জনবহুল স্টেশনগুলিকে হকারমুক্ত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ফলে এমন উচ্ছেদে কর্পোরেট গোষ্ঠীর পৌষ মাস এলেও হকারের সর্বনাশ হচ্ছে। এদেশে আর্থিক বৃদ্ধির ভরকেন্দ্র এখন শহর হয়ে ওঠায় নগরায়নের যুগে গ্রাম কিংবা শহরতলী থেকে শহরমুখী মানুষের ভিড় বাড়ছে সড়ক কিংবা ট্রেন পথে। সেই কারণেই খুচরো ছোট ব্যবসায়ী হিসাবে হকারদের পণ্য-পরিষেবা বেচাকেনার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে রেলস্টেশন কিংবা বাসস্ট্যান্ড অথবা বড় প্রতিষ্ঠিত বাজারের ধারপাশ বরাবর উন্মুক্ত পরিসর। এদেশের মেগাসিটিতে বাস করা মানুষজনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নিম্নবিত্ত, যাদের জীবনের প্রাত্যহিক বেচাকেনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হকারের দোকান। যেমন যাদবপুরের সন্ধ্যাবাজারের মতো বাজারে পণ্যের দাম কলকাতা শহরের যেকোনো কর্পোরেশন বাজারের সবজি অথবা মাছের দামের চেয়ে অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ কম। হকারের অর্থনীতিতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা এবং লাভের লক্ষ্যমাত্রা তুলনায় কম বলেই সস্তায় নগরজীবনের বহু পণ্য সামগ্রী সুলভ মূল্যে মেলে এই হকারদের থেকেই। ফলে রাতারাতি এমন হকার উচ্ছেদ অভিযান কেবল হকারদের জীবনকে সংকটে ফেলছে না বরং তার সঙ্গে শহরের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সিংহভাগ মানুষকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এই দুর্মূল্যের বাজারে। নতুন বোতলে পুরনো মদ আজ সরকারের এই বুলডোজার অভিযানে স্থানচ্যুত হকারেরা আবারও পেটের দায়ে শহরের মধ্যে অন্য কোন প্রান্তে ছুটবে জীবন-জীবিকার তাগিদে। ফলে উচ্ছেদের আগে তাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রস্তুত না হলে ঐ হাজার হাজার অসহায় মানুষেরা আবারও অন্যত্র হকারি করতে গিয়ে ‘জিজিয়া করের’ মুখে পড়বেন যেমনটা পড়তো ঘাসফুল আমলে। ফলে সরকারি স্তরে তাঁদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা না থাকলে শহরের প্রান্তে প্রান্তে সিন্ডিকেটের কায়দায় তাঁদের পুনর্বাসনের নতুন পথ উন্মুক্ত হবে কাটমানির বিনিময়ে। সেই সঙ্গেই তারা আবার চিহ্নিত হবে অবৈধ হকার হিসেবে। এভাবেই সাম্প্রতিক অতীতে বহু হকারদের এমন অবৈধ লেনদেনের খপ্পরে পড়তে হয়েছে তাঁদের কষ্টার্জিত ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। ফলে নতুন সরকারের আমলে পুনর্বাসন ছাড়া লাগাতার এমন উচ্ছেদ চলতে থাকলে আখেরে সেই ‘নতুন বোতলে পুরনো মদের মতোই ‘সিন্ডিকেট ও কাটমানি কালচার তৈরি হবে নতুন করে রাজ্যে। ফলে দুর্নীতির ক্ষেত্রে আপোষহীন মনোভাব নিয়ে চলতে গেলে সরকারকেই এই অপরিকল্পিত হকার উচ্ছেদ অভিযান অবিলম্বে বন্ধ রাখা উচিত বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থেই। এমনকি পুলিশ দিয়ে স্টেশন কিংবা বাসস্ট্যান্ড হকার মুক্ত করা গেলেও সেই পেশাচ্যুত মানুষেরা পেটের দায়ে বিপথে চালিত হলে তার দায় কে নেবে? এটাও সরকারকে ভাবতে হবে বৃহত্তর জনস্বার্থে। গরীব খেদিয়ে স্মার্ট শহর সাম্প্রতিক অতীতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরে আমেদাবাদের ‘সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল’ বিমানবন্দর থেকে ‘মোতেরা’ স্টেডিয়াম পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তার দুপাশে অবস্থিত বস্তির দৃশ্য লুকিয়ে রাখতে রাস্তার দুধারে লম্বা উঁচু পাঁচিল তুলে দিয়েছিল গুজরাটের প্রশাসন। ভাবখানা ছিল বিদেশি অতিথির যাত্রাপথে বস্তি ঢেকে রাখতে পারলে যেন দেশের দারিদ্র ঢাকা পড়ে যাবে। আজ ঠিক একই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটছে রাজ্যের রেলস্টেশনগুলিতে হকার উচ্ছেদ অভিযান ঘিরেও। শহরকে স্মার্ট করে তুলতে নাকি রেলস্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড সর্বত্র হকার মুক্ত করতে হবে। এই ধারনায় মশগুল হয়েই ছুটছে গেরুয়া শাসকের দল এদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে সিন্দুকে তুলে রেখে। কিন্তু স্মার্ট শহর গড়ে তুলতে গেলে প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন আয়ের মানুষের একই শহরে সহাবস্থানের পরিকল্পনা প্রযুক্তি নির্ভর উপায়ে। শহর থেকে গরীব খেদিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। ইতিমধ্যে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কলকাতাকে লন্ডন বানানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও আখেরে সেই কলকাতা লন্ডভন্ড হয়েছে। এবার সেই লন্ডভন্ড শহরকে স্মার্ট করে তোলার জন্য নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় ঢুকেছে হকার উচ্ছেদের ভাবনা। স্মার্ট শহর হিসেবে হাতের কাছে রয়েছে সিঙ্গাপুর যেটা বিশ্বের নিরিখে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর । কিন্তু সেই সিঙ্গাপুরের রাস্তাতেও হকার রয়েছে আইন স্বীকৃত উপায়ে। ট্রিপল-ইঞ্জিন সরকার পরিশেষে সরকারে আসার অব্যবহিত পরেই কেন এমন অভিযান এনিয়ে জনমানসে চর্চা শুরু হয়েছে। সন্দেহ নেই দেশ তথা রাজ্যের গেরুয়া শাসক রাজনীতির ক্ষেত্রে হিন্দুত্ব এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গিতে চলে। ফলে শহরের উন্নয়ন তথা সৌন্দর্যায়নের অর্থ শহরের ‘অসুন্দর’ দরিদ্র মানুষকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা, শহর জুড়ে প্রসাধনী পরিবর্তনের আবহে। ফলে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকারে এসেই উচ্ছেদের মতো অপ্রিয় কাজ কর্পোরেট সংস্কারের স্বার্থে শাসক করতে চাইছে ‘লোহা গরম থাকতে থাকতেই’ দুর্বল মানুষগুলোর মেরুদণ্ড ঘা মেরে বেঁকিয়ে দিতে। আর সরকারের এমন জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে যে প্রধান বিরোধীদের রাস্তায় প্রতিবাদে প্রতিরোধে নামার কথা তাঁরা আজ শাসকের ‘গৃহে পালিত’ বিরোধীতে পরিণত হয়েছে। জেল যাত্রা কিংবা পচা ডিমের আক্রমন ঠেকাতে তৎপর গোটা ঘাসফুল দলটা আঙুলের ভোটের কালি মোছার আগেই রাজ্য রাজনীতিতে মুছে যেতে চলেছে। ফলে কেন্দ্র কিংবা রাজ্যের শাসকের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল হিসাবে ঘাসফুল ভোটের পর নিদ্রা যাওয়ায় রাজ্যে ‘ট্রিপল ইঞ্জিনের’ সরকার চলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে ‘দূরবীক্ষণ’ দিয়েও দেখতে না পাওয়া বামপন্থী মানুষেরাই আজ হকারদের অধিকার রক্ষার লড়াইতে সবচেয়ে কাছের মানুষে পরিণত হয়েছে। এটাও এক গুনগত পরিবর্তন, ভোট পরবর্তী রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। প্রকাশের তারিখ: ১২-জুন-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |