|
বিদ্বেষের বিষআসিফ ইকবাল |
বিজেপি-সহ আরএসএস-এর অভ্যন্তরে থাকা সমস্ত শাখা সংগঠনের নেতাদেরকেই দেখা যায় উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখতে। এই সমস্ত বক্তব্যগুলির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। রিপোর্টে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুসারে, ১১৬৫ টি ঘটনার মধ্যে শুধুমাত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধেই সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪৭ টি ঘটনা, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৯৮ শতাংশ। দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখেও এই উস্কানিমূলক বক্তব্য শোনা যায়। তিনি মুসলিমদেরকে সরাসরি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দাগিয়ে দেন। |
‘নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান কবি অতুলপ্রসাদ সেন এভাবেই দেখেছিলেন ভারতকে। বিভিন্ন জাতি, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতির মানুষের বাস এই দেশে। আর এই বিভেদের মাঝেই কবি গেঁথেছিলেন মিলনের সুর। আমরা অন্তত ছোটবেলা থেকেই এই মিলনের সুরের মাঝেই বেড়ে উঠেছি। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখনীতে, মান্নাদের কণ্ঠে বিখ্যাত গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডা টা’, আর সেখানেই ফুটে উঠেছিল সাতটা চরিত্র। এই গানও আমাদের মাঝে মিলনের সুর গেঁথেছিল। ডিসুজা, মইদুল, রমা রায়, সুজাতাদের এক টেবিলের আড্ডা আমাদের সামনে এক সম্প্রীতির কথাই তুলে ধরেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে আমাদের দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে মূল চালিকাশক্তির আসনে বসে আরএসএস-এর রাজনৈতিক শাখা বিজেপি। তখন থেকেই আশঙ্কা ছিল আগামী দিনে এক সাম্প্রদায়িক অশান্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে দেশের মানুষকে। সেই আশঙ্কাকে সত্যি করেছে বিজেপির এই ১০ বছরের শাসনকাল। ২০১৫ সালের কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্যই বলছে, দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিমান এক বছরেই বেড়েছে ১৭ শতাংশ। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই দাঙ্গার কারণেই প্রায় একশ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন[১]। ![]() চিত্র ১ঃ গোটা দেশে ঘৃণাভাষণের চিত্র ঘৃণাভাষণ কি ও কাকে বলে? ![]() চিত্র ২- টারগেটেড সম্প্রদায় ও ঘৃণাভাষণের পরিসংখ্যান সারা বছর ধরে এ ধরনের নানা রকম টুকটাক উসকানিমূলক বক্তব্যের মধ্যে কিছু ঘটনাকে আই এইচ এল ল্যাব ‘ডেঞ্জারেশ স্পিচ’ হিসেবে নথি ভুক্ত করেছে। এই সমস্ত বক্তব্যগুলো ভায়োলেন্স বা অশান্তি তৈরি করার ক্ষমতা অনেক বেশি। দেশের সাধারণ নির্বাচনের সময় এই বিপদজনক ভাষণের সংখ্যা অনেকটাই বাড়ে। বিজেপি-সহ আরএসএস-এর অভ্যন্তরে থাকা সমস্ত শাখা সংগঠনের নেতাদেরকেই দেখা যায় উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখতে। এই সমস্ত বক্তব্যগুলির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। রিপোর্টে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুসারে, ১১৬৫ টি ঘটনার মধ্যে শুধুমাত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধেই সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪৭ টি ঘটনা, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৯৮ শতাংশ। দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখেও এই উস্কানিমূলক বক্তব্য শোনা যায়। তিনি মুসলিমদেরকে সরাসরি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দাগিয়ে দেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষদেরও বাদ রাখা হয়নি, যেখানে প্রয়োজন হয়েছে সেখানে তাদের বিরুদ্ধেও উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখতে শোনা গেছে বিজেপিসহ হিন্দু মহাসভার নেতাদেরকে। দেশের সাধারণ নির্বাচনে জিততে মরিয়া বিজেপি যখন লক্ষ্য করে, দেশের মানুষের জীবনের দৈনন্দিন দুর্দশা কাটাতে তারা ব্যর্থ, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি-সহ একাধিক জ্বলন্ত ইস্যুতে বামপন্থী ও তাদের সহযোগী দলগুলো একত্রিত হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে, যখন সামনে চলে এসেছে ইলেকটরাল বন্ডের মতো দুর্নীতি, ঠিক তখনই বিজেপি তাদের সেই পুরনো কৌশল অর্থাৎ ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি নেয়। মোদী, যোগী, শাহ সহ একঝাক তাবড় তাবড় নেতারা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ায়। কোথাও তাদের বক্তব্যে উঠে আসে লাভ জিহাদের মতো প্রসঙ্গ, তো কোথাও ল্যান্ড জিহাদ থেকে শুরু করে ভোট জিহাদ ইত্যাদি সব জিহাদ-নির্ভর প্রসঙ্গ। সব ক্ষেত্রেই তাদের মূল টার্গেট ছিল সংখ্যালঘুরা বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনার ক্ষেত্রে প্রতি দশজনের মধ্যে ৬ জন ছিলেন বিজেপির কোন মন্ত্রী কিংবা নেতা। এ ক্ষেত্রে সব থেকে অগ্রণী ভুমিকা নিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তার ৮৬টি বক্তব্য ছিল ঘৃণায় ভরা এবং বিদ্বেষমুলক। এরপর ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ।
শুধুমাত্র ঘৃণাভাষণ কিংবা উস্কানিমূলক বক্তব্য নয়। ২০২৪ সালে এর ফলে গোটা দেশে ৫৯ টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পাশাপাশি ১৩টি মব লিঞ্চিং বা উন্মত্ত একদল জনতার হাতে মৃত্যুর মতো ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এবং সেই ঘটনাগুলির প্রেক্ষিতে ১১ জন মানুষ প্রাণ হারান। তার মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সংখ্যা নয়। ১৩ টি মব লিঞ্চিং ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে কোথাও অতি উৎসাহী বিজেপি সদস্যরা গো-মাংস সংরক্ষণ কিংবা গো-মাংস বিক্রি অথবা গো-মাংস খাওয়ার অপরাধে অন্য ধর্মের (মুলত মুসলিম) মানুষকে পিটিয়ে মারছে। লাভ জিহাদের নামে পিটিয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে এর সাথে [৪]। সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা চিত্র ৫- সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ঘৃণাভাষণের পরিসংখ্যান নরেন্দ্র মোদী (৬৭ টি), যোগী আদিত্যনাথ (৮৬ টি) এবং অমিত শাহ (৫৮ টি) সহ বিজেপি নেতারা তাদের লক্ষাধিক সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ারদের মধ্যে উস্কানিমূলক ঘৃণাভাষণ ছড়িয়ে দিতে ফেসবুক, ইউটিউব-এর লাইভ স্ট্রিমকে ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ আমরা মনে করতে পারি, রাজস্থানের বানসওয়ারা ঘটনার কথা— যেখানে নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে অভিহিত করেন ও বেশ কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখেন। ভিডিওটি ফেসবুকে মোদীর নিজস্ব পেজ-সহ একাধিক বিজেপি ও আরএসএস-এর শাখা সংগঠনের পেজের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। এই বক্তব্যের মধ্যে উস্কানিমূলক প্ররোচণা থাকলেও এবং মেটার কমিউনিটি গাইডলাইনস ভায়োলেশন করলেও এখনও ভিডিওটি রাখা হয়েছে। এবং বর্তমানে সেটির ভিউস এক মিলিয়নেরও অনেক বেশি। ঘৃণাভাষণের বিরুদ্ধে মেটার নিজস্ব বেশ কিছু পলিসি থাকা সত্ত্বেও ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলি এই সমস্ত ভিডিওর ক্ষেত্রে সেই পলিসি অনুসরণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলত ১৮৩ টি ভিডিওকে রিপোর্ট করা হলেও মাত্র তিনটি ভিডিওকে সরাতে সক্ষম হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মগুলি। এমনকি টি রাজা, যাকে ফেসবুক নিজেই ব্যান করেছিল কমিউনিটি পলিসি ভায়লেন্স করার জন্য, তার নামের অসংখ্য ফ্যান পেজ ও প্রক্সি অ্যাকাউন্ট থেকে ক্রমাগত উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ঘৃণাভাষণ ছড়ানো হয়। এবং এ ক্ষেত্রেও মেটা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি, যা খানিক উসকে দেয় মেটা-র সাথে বিজেপির সখ্যতার প্রশ্নকে। এখানে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি নিজেদের মুনাফার জন্য ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার থেকে কর্পোরেট এজেন্ডাসহ বিজেপির প্রপাগান্ডাকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং সে ভাবেই নিজের আল্গরিদমকে তৈরি করে যাতে বহু সংখ্যক মানুষের মধ্যে ঘৃণার সঞ্চার করা যায়? যদিও এ বিষয়ে কোন আশঙ্কাই থাকা উচিত নয় যে, ফেসবুক, ইউটিউবসহ এক গুচ্ছ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো হল নয়া উদারবাদের ফসল এবং যার কাজ হল, বিশ্ব পুঁজির স্বার্থে কাজ করা। ২০২৪ এর নির্বাচনের সময় বিজেপি নেতারা যেভাবে ফেসবুক-সহ একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের উস্কানিমূলক বক্তব্য পেশ করেন, তা খানিক স্পষ্ট করে দেশের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভুমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে মেটাসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলির অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট ও পেজ ব্যবহার করে যেভাবে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ ছড়ানো হয়, তা আরও খানিকটা প্রমাণ করে বিজেপির সাথে কর্পোরেট প্রেম ও কর্পোরেটদের বিজেপি প্রীতি। তথ্যসূত্র প্রকাশের তারিখ: ২৫-মার্চ-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |