জন্মশতবর্ষে সুকান্ত

টিম মার্কসবাদী পথ
কারণ সেখানে কিছু বিপজ্জনক শব্দ ও শব্দবন্ধ রয়েছে। কী শব্দ? ‘শ্রেণি-সংগ্রাম’, ‘পথে নামুন’ ইত্যাদি আর রয়েছে নয়া-উদারবাদের সমালোচনা করে কিছু কথা। আরও আশ্চর্য, এই ভিডিওটির শিরোনাম ছিল রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার নামে – ‘ওরা কাজ করে’। আমরা নিশ্চিত বেঁচে থাকলে এই বিধি-নিষেধ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়াই জানাতেন বুদ্ধদেব বসু— ব্যক্তি-স্বাধীনতা কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে রেখে সমালোচনায় বিদ্ধ করতেন সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকলাপকে। সুকান্তের কবিতা বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু অভিমতের সাথে নয়া-উদারবাদী সোশ্যাল মিডিয়ার নিদানের যোগসূত্র রচনা আমরা করতে চাইছি না, বরং বিনীতভাবে বলতে চাইছি খবর-কাগজে, কবিতায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী লেখা-বলা সহি নাগরিকের কর্তব্য তা ঠিক করে দেওয়াটাও এক অর্থে কোনও মতবাদের দাসত্ব-ই।

অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-৪৭) একটি পোস্ট কার্ড পাঠিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুকে; নিজের কবিতার দু-লাইন তুলে জানতে চেয়েছিলেন ছন্দ ঠিক আছে কি না? কারণ এই যে, তাঁর বন্ধুরা ছন্দ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। উত্তরে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন ছন্দে কোনও ভুল নেই। শুধু বুদ্ধদেব কেন? সুভাষ মুখোপাধ্যায়-ও চোদ্দ বছরের বালকের ছন্দে মুগ্ধ ছিলেন। চিঠির উত্তরে কেবল এখানেই থেমে থাকেননি বুদ্ধদেব, সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন সতর্কবাণী— ‘রাজনৈতিক পদ্য লিখে শক্তির অপচয় করছো তুমি; তোমার জন্য দুঃখ হয়।’ এবং সামগ্রিকভাবে এটাই সুকান্তের কবিতা সম্পর্কে তাঁর অভিমতও বটে। শুধু সুকান্ত কেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একসময়ের কবিতা সম্পর্কে প্রায় একই অভিযোগ ছিল বুদ্ধদেবের। কোনও আদর্শের প্রচার করা আদতে কবির ধর্ম নয়; তা আসলে দাসত্বের নামান্তর— এমনটাই তাঁর মত। এগুলো যেন কবিতা নয়, যতই ছন্দ ও শব্দে দখল থাক না কেন, আসলে চিৎকৃত ছন্দময় শব্দগুচ্ছ মাত্র, বড় জোর খবর-কাগজের প্যারাগ্রাফ মাত্র। তাহলে কবিতা কেমন কিংবা ঠিক/আদর্শ কবিতা কাকে বলা চলে? কবিতার কি কোনও মান্য ধরন আছে? বুদ্ধদেবের এই মন্তব্য সূত্রে নানান তর্ক জারিয়ে উঠতে পারে। ওঠা স্বাভাবিক। যা বুদ্ধদেবের কাছে সাহিত্যের ধরন তা কি রবীন্দ্রনাথের কাছে সাহিত্য বলে গৃহীত হয়েছিল? তারপরেও বুদ্ধদেব সুকান্তের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন বড় কবির সম্ভাবনা, আর ছিল তাঁর সহজাত কবিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা।



সম্প্রতি নজরে এল একটি খবর। শ্রমজীবী মানুষদের দুঃসহ জীবন-সংগ্রাম সম্বলিত একটি ভিডিও ইউটিউব ও ফেসবুক আপলোড করতে দিতে নারাজ। কারণ সেখানে কিছু বিপজ্জনক শব্দ ও শব্দবন্ধ রয়েছে। কী শব্দ? ‘শ্রেণি-সংগ্রাম’, ‘পথে নামুন’ ইত্যাদি আর রয়েছে নয়া-উদারবাদের সমালোচনা করে কিছু কথা। আরও আশ্চর্য, এই ভিডিওটির শিরোনাম ছিল রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার নামে – ‘ওরা কাজ করে’। আমরা নিশ্চিত বেঁচে থাকলে এই বিধি-নিষেধ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়াই জানাতেন বুদ্ধদেব বসু— ব্যক্তি-স্বাধীনতা কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে রেখে সমালোচনায় বিদ্ধ করতেন সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকলাপকে। সুকান্তের কবিতা বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু অভিমতের সাথে নয়া-উদারবাদী সোশ্যাল মিডিয়ার নিদানের যোগসূত্র রচনা আমরা করতে চাইছি না, বরং বিনীতভাবে বলতে চাইছি খবর-কাগজে, কবিতায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী লেখা-বলা সহি নাগরিকের কর্তব্য তা ঠিক করে দেওয়াটাও এক অর্থে কোনও মতবাদের দাসত্ব-ই।



সুকান্তের সময় থেকে আজ আমরা অনেক দূরে। বাংলা কবিতাও নানান ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু যে ‘পুরনো ধাঁধা’-টার সমাধান আজও হয়নি— কেন ‘বড়লোকের ঢাক তৈরি’ হবে ‘গরীব লোকের চামড়ায়’? কেউ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খাবে, আরেক দল আধপেট খেয়ে ঘুমতে যাবে কেন? কেনই-বা কর্পোরেটের কর ছাড়ের বোঝা বইতে হবে শোষিত-পীড়িত দেশবাসীকে? কেন একদল মানুষ উদায়স্ত খেটেও পরিবারের মুখে ভাত জোটাতে পারবে না আর ‘কুঁড়েঘরেই মাছির মতো’ মরবে? একুশ বছরের স্বল্প জীবনে সুকান্ত নাই-বা পারল বনস্পতি হতে, কিন্তু সে বহুজনকে আন্দোলিত করতে পেরেছিল পীড়িতের স্বার্থে, তথাকথিত স্লোগান-মুখর শব্দবন্ধ, আবেগ ও সারল্যের মাধ্যমে। যে-প্রসঙ্গ/তর্ক দিয়ে এ লেখার শুরুয়াৎ তার একরকম উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন অমিতাভ দাশগুপ্ত। বুদ্ধদেব বসুর লেখার পাশাপাশি সে লেখাটি প্রকাশিত হবে ওয়েবসাইটে। অমিতাভ লিখেছেন— আজ অব্দি কোনও চাষির কুঠী ও শ্রমিক মহল্লার প্রতিবেশী হতে পারেনি আমাদের কবিতা, হতে পারেনি হরতাল লড়াইয়ের অনিবার্য সাথী; যেমনটা পেরেছিল সুকান্তের কবিতা। কবিতা বড় অর্থে শিল্প-সাহিত্যের একটেরে ধারণারটির প্রতিবাদই হয়তো সুকান্তের কাব্য জীবন। যাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের তৈরি দাসত্ব, শোষণের কাঠামো ভেঙে সভ্যতাকে আরেকটু মানবিক করে তোলা।  

সুকান্তের জন্মশতবর্ষের প্রাক্‌কালে মার্কসবাদী পথের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে পুরোনো ও নতুন কিছু লেখা ও ভিডিও। চলবে ১ থেকে ১৬ আগস্ট, প্রতিদিন।


এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল 


প্রকাশের তারিখ: ৩১-জুলাই-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org