বিস্ময়কর সুকান্ত

বিষ্ণু দে
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে জানালুম সুকান্তের অসুখের কথা, অর্থাভাবে তার চিকিৎসা হচ্ছে না শুনে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মর্মাহত হয়ে টাকা তোলার কথা বললেন। যামিনী রায় মহাশয় বললেন ডাক্তার রাম অধিকারীকে তিনি নিয়ে যাবেন, তিনি দিলেন টাকা এবং তাঁর ছেলে অমিয় নিঃশব্দে এনে দিলে এক টিন ওভালটিন।

সুকান্তর কবিতা চার-পাঁচ বছর আগে হাতে আসে, হাতে-লেখা তিনটি কবিতা, পরিষ্কার পরিণত হাতের লেখা। আশ্চর্য হয়েছিলুম, সুকান্তর কবি প্রতিভা প্রকাশিত হলো প্রতিশ্রুতিতে নয়, একেবারে পরিণতিতে; তারপর থেকে মাঝে মাঝে তার কবিতা পড়েছি। অক্লান্ত কর্মীর আত্মত্যাগের অবসরহীন মানস কিন্তু সুলিখিত কবিতা। একাধারে তার এই পরিণত কবিত্ব এবং মার্কসিস্ট তত্ত্বের জনগাম্ভীর্য বার বার বিস্মিত করেছে—ভেবেছি এ ছেলেটি প্রৌঢ়ত্বে আর কি লিখবে, এর বিস্ময়কর প্রতিভার কি বিকাশ সম্ভব? সেই ফরাসী কবির অলৌকিক প্রতিভার মতো এও কি উনিশ বছরে সাহিত্য জগৎ থেকে বিদায় নেবে? নাকি কর্মক্ষেত্রে তার কমিউনিস্ট পার্টি সফল হলে তার যৌবনে হবে আবার নূতন সূচনা? র‍্যাবো সে তো নয়, যে কবিতার অধ্যায় মুড়ে মরুভূমিতে চলে যাবে সোনা খুঁজতে। আর একটি ছত্রও লিখবে না। 

তখন ভাবিনি কীটসের সঙ্গে তুলনা। 

আমাদের বর্তমান সমাজ জীবনের প্রতীক এই নবজাতকের অকাল- মৃত্যুর সম্ভাবনা তখন কি মানতে পেরেছি? 

এই সেদিন তো তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে জানালুম সুকান্তের অসুখের কথা, অর্থাভাবে তার চিকিৎসা হচ্ছে না শুনে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মর্মাহত হয়ে টাকা তোলার কথা বললেন। যামিনী রায় মহাশয় বললেন ডাক্তার রাম অধিকারীকে তিনি নিয়ে যাবেন, তিনি দিলেন টাকা এবং তাঁর ছেলে অমিয় নিঃশব্দে এনে দিলে এক টিন ওভালটিন। 

সুকান্তর কথা বলতে বলতে যামিনীদা বলে উঠলেন, ওর মতো ছেলেরা সব বাংলাদেশে মরে যাবে, তবে যদি দেশের লোকের যন্ত্রণা কাজে পরিণত হয়। আমাদের উচিত ওকে বাঁচানো, কিন্তু ওরা সব মারা গিয়ে যদি দেশকে বাঁচায়। 

সেদিন না হলেও আজকে তাই সুকান্তর মৃত্যুই মেনে নিই, এই অসামান্য কবির, কর্মীর, লাজুক শোভন স্বভাব আমাদের তারুণ্যের প্রতীক সুকান্তর অকালমৃত্যুই। সে যে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও অপ্রচুর খাদ্যাভাবে উনিশ বছরে মারা গেল, সে তার দান, কিন্তু আমাদের অক্ষমতার দায়িত্ব। সেই যন্ত্রণা আমাদের জড়তাকে অস্থির করুক। 

তার শেষের কবিতা ক'টির তীব্রতা এবং গভীর সারল্য আমার বন্ধুতাকে যেমন মর্মাহত করেছে, তেমনি লেখক হিসাবে আমাকে আনন্দিত ও নতুন করে শ্রদ্ধান্বিত করেছে। না-ই হলো সে বনস্পতি মৃত্যুর আকস্মিকতায়, তবু সে মিশে গেছে বৃহতের দলে, তার নচিকেত কবি স্বভাবের স্বচ্ছ আগুনে৷ 

স্বাধীনতা। ১৮ই মে ১৯৪৭


প্রকাশের তারিখ: ১৩-আগস্ট-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org