|
জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের অসন্তোষের জন্যে বিজেপি সরকারের নীতিই দায়ীমহম্মদ ইউসুফ তারিগামী |
দিল্লির সরাসরি শাসন শান্তি ও প্রগতি নিয়ে আসবে ভেবে যে মোহ সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ৩৭০ ধারা বিলুপ্তি ও রাজ্যের বিভাজনের পরবর্তী বছরগুলির অভিজ্ঞতায় উবে গেছে। প্রকৃত সত্যটি হল, সন্ত্রাসবাদেরও অবসান হয়নি এবং অসন্তোষ, মোহভঙ্গ এবং বিচ্ছিন্নতাবোধও চলে যায়নি। বরং নির্মম শক্তিপ্রয়োগ ও নির্বিচার গ্রেফতারের ঘটনার ফলে বিচ্ছিন্নতাবোধের আরও অবনতি ঘটে কাশ্মীরের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। |
পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা, বিধানসভা স্থাপন এবং ষষ্ঠ তপশিলের দাবিতে লেহ-র বিশাল প্রতিবাদী সমাবেশকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষের মৃত্যু, অসংখ্য মানুষের আহত হওয়া এবং সুপরিচিত পরিবেশবিদ সোনাম ওয়াংচুক সহ বহু মানুষের গ্রেফতারের মত ঘটনা ঘটলো। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের পুনর্গঠনকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘ঐক্য সংহত করা, সন্ত্রাসবাদ দূরীকরণ ও উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত’ করার পদক্ষেপ হিসেবে। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, কাশ্মীর থেকে যে অসন্তোষের শুরু হয়, সেটা জম্মু অবধি প্রসারিত হয়ে এখন লাদাখে বিস্তৃত হওয়ার পর নতুন দিল্লির নেওয়া গোড়ার ওই পদক্ষেপটি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এই পরিবর্তন স্থিতিশীলতা তো আনেইনি, বরং বৈচিত্র্য ও ঐক্যের যে বৈশিষ্ট্যের জন্যে এই অঞ্চল একদা পরিচিত ছিল সেটাকেই বিনষ্ট করে দিয়েছে। বিভাজনের আগে, নানা বিষয়ে মতপার্থক্য সত্ত্বেও, জম্মু ও কাশ্মীর ছিল ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বহুস্তরীয় বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যসূত্রে গাঁথা একটি সুরম্য ভূমি। জম্মুর বহুত্বের চরিত্র নির্দিষ্ট হয়েছে হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের নিত্যদিনের প্রতিবেশীসুলভ জীবনের আন্তঃসম্পর্কের মধ্য দিয়ে। কাশ্মীরেও মুসলিম, পণ্ডিত, শিখ, শিয়া, সুন্নি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অভিন্ন ইতিহাসের একই বর্ণালী প্রতিফলিত হয়েছে। বৌদ্ধ, মুসলিম ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে লাদাখ ভিন্নভাবে এই বৈচিত্র্যের আরেকটি সুতো গেঁথেছে। সাদৃশ্যের তুলনায় বরং বৈচিত্র্যই আগেকার জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের ঐক্যকে সংহত করেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কিছু কিছু শক্তির তরফে জম্মু ও কাশ্মীরের ভারতভুক্তির যে বিরোধিতা হয়েছিল সেটা শুধু সীমান্ত প্রশ্নে ছিল না, ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্র্যকে রোখার প্রচেষ্টা। এর একটি প্রান্তে ছিল ইসলামিক গোষ্ঠীগুলি, যারা বিরোধিতা করেছিল সহাবস্থানের; অন্য প্রান্তে ছিল আরএসএস, হিন্দু মহাসভার মত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা, যারা অভিন্ন ধর্মীয়তার সমাজ চেয়ে হাত মিলিয়েছিল দ্বি-জাতি তত্ত্বের সমর্থকদের সাথে। এর মধ্যিখানে ছিল সাধারণ মানুষেরা, যারা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করেও এই অঞ্চলের বহুত্ববাদী চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে পাশাপাশি বাস করে এসেছে। আর এটাই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখের আন্তঃসম্পর্কের ঐতিহাসিক বন্ধন যার মধ্য দিযে তারা কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও জমির উপর নিজেদের অধিকার সুনিশ্চয়তার একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য প্রতিশ্রুত হয়েছিল। ৩৭০ ধারা ও স্বায়ত্তশাসনের ক্রমাগত ক্ষয়সাধনের মধ্য দিয়ে দিল্লির একের পর এক সরকার এই গণতান্ত্রিক চেতনাকে বিনষ্ট করেছে। যে ব্যবস্থাকে বলা হয়েছিল বিশেষ মর্যাদা, তা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে হতে কতগুলো অন্তঃসারশূন্য কাঠামোয় অবশিষ্ট হয়ে মূল বিষয়গুলির বদলে প্রতীকী বাক্যবন্ধে এসে দাঁড়ালো। সিপিআইএম সহ অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি দীর্ঘদিন থেকেই ৩৭০ ধারাকে গোড়ার অবস্থায় ফিরিয়ে এনে রাজ্যের হাতে সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করার দাবি জানাচ্ছে। একইসঙ্গে দাবি জানিয়েছে কাশ্মীর, জম্মু ও লাদাখের তিনটি অঞ্চলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের যাতে আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় ও পরিচিতিসত্তা রক্ষার প্রশ্নে এই অঞ্চলের জনগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। দিল্লির সরাসরি শাসন শান্তি ও প্রগতি নিয়ে আসবে ভেবে যে মোহ সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ৩৭০ ধারা বিলুপ্তি ও রাজ্যের বিভাজনের পরবর্তী বছরগুলির অভিজ্ঞতায় উবে গেছে। প্রকৃত সত্যটি হল, সন্ত্রাসবাদেরও অবসান হয়নি এবং অসন্তোষ, মোহভঙ্গ এবং বিচ্ছিন্নতাবোধও চলে যায়নি। বরং নির্মম শক্তিপ্রয়োগ ও নির্বিচার গ্রেফতারের ঘটনার ফলে বিচ্ছিন্নতাবোধের আরও অবনতি ঘটে কাশ্মীরের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। জম্মুকে আপাত শান্ত মনে হলেও শিক্ষিত বেকার, সংকটগ্রস্ত কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী ও অন্যান্য অংশের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজেপির হাতে একমাত্র অস্ত্রটি হচ্ছে হিন্দুত্বের বিষাক্ত প্রচারের মাধ্যমে সমাজে মেরুকরণ ঘটানো। জম্মু ও কাশ্মীরের তুলনায় লাদাখ এই দু’টি অংশের মিলিত আয়তনের প্রায় আড়াইগুণ একটি অঞ্চল এবং জাতিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত, সেটিও দুর্ভাগ্যবশত সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকেছে। সেখানকার লেহ ও কারগিলে দুটি পৃথক জেলা পরিষদ ছিল। তবু লাদাখের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূরণ হয়নি। ফলে বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু লেহ অঞ্চলে কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে পরিবর্তিত হওয়ার দাবি জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে এবং এই কারণেই প্রাথমিকভাবে ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ার পর জনগণের কিছু কিছু অংশ একে স্বাগত জানিয়েছিল। কারগিলের জনগণ এই দাবির বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের সময় বা আরও অন্য সভাসমিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে লেহ ও কারগিলকে ষষ্ঠ তপশিলের আওতায় আনা অর্থাৎ জমি ও কর্মসংস্থান রক্ষা, পৃথক রাজ্য ও পৃথক সরকারি নিযুক্তি আয়োগ গঠনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়ার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। লাদাখ ও কারগিলের পাবর্ত্য উন্নয়ন পর্ষদের প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ আলোচনার সময়ে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হলেও, কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিনিয়ত নানা অজুহাত দেখিয়ে গড়িমসি করতে থাকে। যখন আলোচনা থেকে সুনির্দিষ্ট কোনও ফলাফল পাওয়া গেল না, তখন রাজনৈতিক বিভাজনকে তুচ্ছ করে ব্যাপক আকারে মোহভঙ্গ ও অসন্তোষ জন্মাতে থাকে। এই আন্দোলনের মুখ্যস্বর সোনাম ওয়াংচুককে কুখ্যাত জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে বন্দী করা হল। এই নৃশংস আচরণের ফলে গোটা লেহ অঞ্চলের পরিস্থিতিতে ঘৃতাহুতি পড়ল। নির্লজ্জের মত কেন্দ্রীয় সরকার বাকি নেতাদের আলোচনার জন্যে আমন্ত্রণ জানালো। লেহ ও কারগিল উন্নয়ন পর্ষদ সঙ্গত কারণেই সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেছে। আলোচনার প্রস্তাব বিবেচনার পূর্বশর্ত হিসেবে সমস্ত বন্দী আন্দোলনকারীদের মুক্তি এবং সব বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তারা। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই জনগণের উপলব্ধি হচ্ছে যে, এই সরকার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিই দেয়। ফলে জনসাধারণের কোনও ধরনেরই উপকারের জন্যে এদেরকে বিশ্বাস করা যায় না। পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সমস্ত অঞ্চলের মানুষ এটা বুঝতে পারছে যে, শান্তিপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই একমাত্র বিজেপি সরকারকে জনগণের কন্ঠস্বর শুনতে বাধ্য করা যাবে। আমরা আশা করি, ভারতের বাকি অংশের জনগণও এটা উপলব্ধি করবে যে, জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখ অঞ্চলেই ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন অগ্নিপরীক্ষাটি হয়েছিল। সময় এসেছে জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখের জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের সপক্ষে দেশের সমস্ত ধারার ধর্মনিরপেক্ষ জনগণের কন্ঠস্বরকে সোচ্চারে ব্যক্ত করার। কুখ্যাত জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইন প্রত্যাহার ও আগস্ট ২০১৯-এর আগেকার পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি প্রকাশের তারিখ: ০৪-অক্টোবর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |