[সিপিআই(এম) সর্বভারতীয় সম্মেলন তথা পার্টি কংগ্রেসের সংক্ষিপ্ত সালতামামি তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। পার্টি কংগ্রেস বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যাবলিকে একত্রিত করার লক্ষ্যে।]
প্রথম পর্বের পর...
১১তম পার্টি কংগ্রেস
জনতা সরকারের পতন ও কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষিতে ১৯৮২ সালের ২৬-৩১ জানুয়ারি বিজয়ওয়াড়াতে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ পার্টি কংগ্রেস। সেই কংগ্রেস থেকে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়; তার মধ্যে উল্লেখ্য পশ্চিমবাংলার ২১৪ জন, কেরালার ৭২ জন, ত্রিপুরার ৪১ জন, বিহারে ৩১ জন, অন্ধ্রপ্রদেশের ৬১ জন। এই কংগ্রেসে সবচেয়ে বেশি বয়সের প্রতিনিধি ছিলেন বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, যিনি ২৯ বছর জেলেই কাটান। এই সময়ে পার্টি সদস্য ছিল ২৭১৫০০ জন। প্রতিনিধির সংখ্যা ছিল ৫৮৪ জন। ৪২ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ৯ জনের পলিট ব্যুরো। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একাদশ কংগ্রেস দেশের ঐক্য এবং সংহতির সামনে ক্রমবর্ধমান বিপদের বিরুদ্ধে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।
১২তম পার্টি কংগ্রেস
১৯৮৫ সালের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়ে পার্টির সদস্য ছিল ৩৬৭৮২৮ জন কংগ্রেসে প্রতিনিধি ছিলেন ৬৪৬। ৭০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১০ জনের পলিট ব্যুরো। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দেশব্যাপী বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির উত্থান, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মানুষের ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানায় এই পার্টি কংগ্রেস। এই সময়ে দেশের সংহতি ও অখণ্ডতা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। পার্টি-প্রস্তাবে জানানো হয়েছিল- এই জাতীয় ঐক্যের পক্ষে, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র বাম গণতান্ত্রিক শক্তিই লড়াই করতে পারে।
১৩তম পার্টি কংগ্রেস।
১৯৮৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিরুবনন্তপুরমে ত্রয়োদশতম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ১,৬১,০০০ আর ১৯৮৮ সালে তা বেড়ে হয় ৪৬৫০০০। পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধি হয়েছিলেন ৬৯১ জন। কংগ্রেসে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জেল-জীবন ছিল নৃপেন চক্রবর্তীর, সারা জীবনে তিনি ২০ বছর জেল খেটেছিলেন। ৭০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১২ জনের পলিট ব্যুরো। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। রাজীব গান্ধী সরকারের হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদ তোষণ রাজনীতি ও জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের আহ্বান জানানো হয় এই কংগ্রেস থেকে।
১৪তম পার্টি কংগ্রেস
১৯৯২ সালের ৩-৯ জানুয়ারি মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্দশতম পার্টি কংগ্রেস। কংগ্রেসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৯৬৭ জন প্রতিনিধি যোগ দেন। বিগত পার্টি কংগ্রেসের পর বেশ কয়েকটি দেশের সমাজতন্ত্রের পতন ঘটে, ফলে একমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার সূচনা হয় এবং দেশে হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান ঘটে। নেহেরুর অর্থনৈতিক মডেল ছেড়ে ভারত নয়া-উদারনীতির পথ ধরে। আন্তর্জাতিক স্তরে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সিপিআই(এম) মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সপক্ষে বলিষ্ঠ এবং দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে, সাম্রাজ্যবাদী প্রচারমাধ্যমের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি কর্তৃক উপস্থাপিত 'কয়েকটি মতাদর্শগত প্রশ্নে’ পার্টি দলিলে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের অপরিহার্যতার পক্ষে সওয়াল করা হয়। এই দলিল চতুর্দশতম পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত হয়। পার্টি কংগ্রেসে ৬৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৭ জন সদস্য দিয়ে গঠিত হয় পলিট ব্যুরো। হরকিষাণ সিং সুরজিত সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৫তম পার্টি কংগ্রেস
১৯৯৫ সালের ৩-৮ এপ্রিল চণ্ডিগড়ে অনুষ্ঠিত হয় পার্টির পঞ্চদশতম পার্টি কংগ্রেস। পঞ্চদশ পাটি কংগ্রেসের সময়ে পার্টি সদস্য সংখ্যা ছিল ৬৩১১৭১ জন। কংগ্রেসে ৭১২ জন প্রতিনিধি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যোগ দেন পার্টি কংগ্রেসে। সোভিয়েত রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্র পতনের কারণ অনুসন্ধান করে পার্টি কংগ্রেস জানায় যে, পতনের কারণ এই নয় যে মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্রের ধারণা আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বরং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ থেকে বিচ্যুতি-ই সমাজতন্ত্রের পতনের প্রধান কারণ। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পতাকা তুলে ধরার জন্য মার্কসের ১৭৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৯৯৩ সালের ৫-৭ মে কলকাতায় পার্টির উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ৩০টি দেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও ওয়ার্কার্স পার্টি অংশ নেয়। এসময়ে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নির্দেশিত উদার অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করে জনগনের উপর অর্থনৈতিক বোঝা নামিয়ে আনে। অন্যদিকে বিজেপি হিন্দুত্বের স্লোগান দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে জনমানসের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। এমতাবস্থা পার্টি অ-কংগ্রেস, অ-বিজেপি, বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে সংহত করে তৃতীয় বিকল্প গঠনের আহ্বান জানায় এবং সংগঠনের ক্ষেত্রে ত্রুটি বিচ্যুতি মুক্ত করার জন্য শুদ্ধিকরণ অভিযানের ডাক দেয়। এই কংগ্রেস থেকে ৭১ জন সদস্য নিয়ে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৬ জনের পলিট ব্যুরো গঠিত হয়। হরকিষাণ সিং সুরজিত পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৬তম পার্টি কংগ্রেস
১৯৯৮ সালের ৫-১১ অক্টেবর কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় পার্টির ষোড়শতম কংগ্রেস। অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন জ্যোতি বসু। দেশে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৬৮০ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে যোগ দেন। সবচেয়ে বয়স্ক প্রতিনিধি ছিলেন পশ্চিমবাংলার নরেন সেন (৮৯) এবং সর্বকনিষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন তামিলনাড়ুর এস কন্নান (২৮)। ১৯৯৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, বিজেপি অন্যান্য আঞ্চলিক দল নিয়ে সরকার গঠন করে। ১৩ দিনের মাথায় সেই সরকারের পতন ঘটে। পরে এইচডি দেবগৌড়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় সংযুক্ত মোর্চা সরকার। সংযুক্ত মোর্চার সরকার বেশ কয়েকটা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারীকরণের জনবিরোধী নীতিই গ্রহণ করে। অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এই সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে আইকে গুজরালের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠাতা পেয়ে সরকার গঠন করে। প্রশাসনের সর্বত্র আরএসএস-এর প্রভাব তৈরি, সাম্প্রদায়িকতাকে মদত দেওয়া, সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন বিষয়ে পার্টি উদ্বেগ প্রকাশ করে। দেশের ঐক্য, সংহতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিজেপিকে পার্টি কংগ্রেস প্রধান বিপদ বলে চিহ্নিত করে। অন্যদিকে বিকল্প বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে এবং এর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। পার্টি কংগ্রেস থেকে ৭৫ জনকে নিয়ে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৩ জনকে নিয়ে পলিট ব্যুরো গঠিত হয়। হরকিষাণ সিং সুরজিৎ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন। কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সমর মুখার্জি।
বিশেষ সম্মেলন
২০০০ সালের ২০-২৩ অক্টোবর কেরালার তিরুবনন্তপুরমে পার্টি কর্মসূচি সময়োপযোগী করতে সিপিআই(এম)-এর বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্দশতম পার্টি কংগ্রেসে (মাদ্রাজ, ১৯৯২) কর্মসূচি সময়োপযোগী করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতেই এই বিশেষ সম্মেলনের আহ্বান করা হয়। ১৯৬৪ সালে সপ্তম কংগ্রেসে পার্টি কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। বিগত ৩৬ বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানান গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সমাজতান্ত্রিক ব্লকের পতন ঘটায় ও দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের কারণে জরুরি ছিল কর্মসূচির বদল।
১৭তম পাটি কংগ্রেস
২০০২ সালের ১৯-২৪ মার্চ হায়দরাবাদে পার্টির সপ্তদশতম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। তেলেঙ্গানার বরিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতা এল গঙ্গাধর রাও রক্ত-পতাকা উত্তোলন করেন। উদ্বোধনী ভাষণ দেন হরকিষাণ সিং সুরজিৎ। রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন প্রকাশ কারাত। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারে জনবিরোধী অর্থনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক নীতি বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার এবং এনডিএ সরকারকে পরাস্ত করার আহ্বান জানায় এই পার্টি কংগ্রেস। একই সাথে বিশ্বায়নের নামে তৃতীয় বিশ্বের উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক, অর্থনৈতিক আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার আহ্বান জানায়। এই পার্টি কংগ্রেস থেকে ৭৭ জনের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৭ জন সদস্য নিয়ে পলিট ব্যুরো গঠিত হয়। হরকিষাণ সিং সুরজিৎ পুনরায় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
ঋণ- ১। প্রদোষকুমার বাগচী, ‘পার্টি কংগ্রেস প্রথম থেকে আজ’, নন্দন। ২। ললিত দেবনাথ, ‘পার্টি কংগ্রেসের দিনলিপি’, দেশের কথা।
প্রকাশের তারিখ: ১০-মার্চ-২০২৫ |