বোম্বাই থেকে মাদুরাই - প্রথম পর্ব

শংকর মণ্ডল
১৯৬৪ সালের ১৪ এপ্রিল দিল্লিতে জাতীয় পরিষদের বৈঠক থেকে ৩২ জন সদস্য বেরিয়ে আসেন এবং জুলাই মাসে অন্ধ্রপ্রদেশের তেনালীতে অনুষ্ঠিত পার্টির সর্বভারতীয় জাতীয় কনভেনশনে পার্টিকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদের নীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী পার্টি গঠন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম কংগ্রেস আহ্বানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সেই অনুসারে ১৯৬৪ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর কলকাতার ত্যাগরাজ হলে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম কংগ্রেস। ১০৪৪২১ জন পার্টি সভ্যের পক্ষ থেকে ৪২২ জন প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে যোগ দেন।

[সিপিআই(এম) সর্বভারতীয় সম্মেলন তথা পার্টি কংগ্রেসের সংক্ষিপ্ত সালতামামি তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। পার্টি কংগ্রেস বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যাবলিকে একত্রিত করার লক্ষ্যে।]

১ম পার্টি কংগ্রেস

২৩ মে থেকে ১ জুন, ১৯৪৩-এ বোম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত হয় পার্টির প্রথম কংগ্রেস। এই দশক নানান কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় কংগ্রেস ও লীগের ঐক্যের উপর কতটা গুরুত্ব আরোপ করেছিল তার প্রমাণ মঞ্চ-সজ্জা। জনযুদ্ধ–র রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে তেরাঙা পতাকার মধ্যে জওহরলাল নেহেরু, লীগের পতাকার মধ্যে জিন্না এবং মাঝে ছিল লাল পতাকা। প্রথম কংগ্রেসে সম্পাদক র্নিবাচিত হন পিসি যোশী। সারা দেশ থেকে ১৩৯ জন প্রতিনিধি যোগ দেন। তার মধ্যে অবিভক্ত বাংলা থেকে ৩০ জন প্রতিনিধি গিয়েছিলেন। পার্টি কংগ্রেস থেকে ১৭ জনের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ৩ জনের পলিট ব্যুরো গঠিত হয়।

২য় পার্টি কংগ্রেস

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ, ১৯৪৮ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস। তখন পার্টি সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার। নির্বাচিত ৯১৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ৬৩২ জন প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে যোগ দেন। ৩১ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি, সাধারণ সম্পাদক নির্বচিত হন বি টি রনদিভেকিন্তু দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পরে পার্টি এবং পার্টি সংগঠনের বিতর্কের সূত্রপাত হয়, বিঘ্নিত হয় আভ্যন্তরীণ সংহতি। কংগ্রেসের কিছুদিন পরে নিষিদ্ধ হয় পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টির আভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়এবং ১৯৫০ সালের জুন মাসে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি পুর্নগঠিত হয় এবং সি. রাজশ্বর রাও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।

৩য় কংগ্রেস

পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় মাদুরাইতে, চলে ১৯৫৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৪ সালের ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। তখন পার্টি সভ্যের সংখ্যা প্রায় ৫০,০০০কংগ্রেস থেকে ৩৯ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ৯ জন সদস্য নিয়ে পলিট ব্যুরো, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অজয় ঘোষ।

৪র্থ কংগ্রেস

কেরালার পালঘাটে ১৯৫৬ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ কংগ্রসসে-সময় পূর্ণ সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৫০০০, এর মধ্যে ৩০৭ জন প্রতিনিধি চতুর্থ কংগ্রেসে যোগ দেন। প্রতিনিধিদের জেলজীবন ছিলো মোট ১৩৪৪ বছর, গড়ে তিন বছরের বেশিআত্মগোপন কাল ছিল মোট ১০২১ বছর, গড়ে আড়াই বছর। ৩৯ সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ৯ জনের পলিট ব্যুরোপুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অজয় ঘোষ।

৫ম কংগ্রেস

কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে পঞ্চম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৮ সালেরা ৬-১৩ এপ্রিল অমৃতসরেকংগ্রেস থেকে ১০১ জন নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় পরিষদ, ২৫ জনের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি এবং ৮ জনের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীপুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অজয় ঘোষ। 

৬ষ্ঠ কংগ্রেস

পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় বিজয়ওয়াদাতে ১৯৬১ সালের ৭-১৬ এপ্রিল। প্রতিনিধির সংখ্যা ছিল ৪০৬ জন। সে-সময় পার্টি সদস্য সংখ্যা ছিল ১৭৭৫০১ জন। সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের কারাবাসের সময় ছিল মোট ১৪১৪ বছর এবং আত্মগোপনের বছর ৯৯৮ বছর। ষষ্ঠ কংগ্রেস থেকে ১১০ জনের জাতীয় পরিষদ, ২৪ জনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি এবং ৫ জনের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলী গঠিত হয়পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অজয় ঘোষ। কিন্তু ১৯৬২ সালে অজয় ঘোষের মৃত্যুর পর ডাঙ্গে চেয়ারম্যান এবং নাম্বুদিরিপাদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সম্মেলন যখন অনুষ্ঠিত হয় তখন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতাদর্শগত বিতর্কের সূত্রপাত হয়। যা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকেও প্রভাবিত করে। এই সম্মেলনে পার্টি কর্মসূচি ও রাজনৈতিক লাইন নিয়ে দুটি খসড়া পেশ করা হয়। তীব্র বিতর্কের মধ্যে কোনও খসড়া গৃহীত না-হলেও পার্টির ভাঙ্গন এড়ানো গিয়েছিল।  

৭ম কংগ্রেস

১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় কংগ্রেস থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ৪টি পার্টি কংগ্রেসেই পার্টির অভ্যন্তরে মতাদর্শগত বিতর্ক চলছিলআন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যেও এই সময় দেখা দিয়েছিল সংশোধনবাদী ঝোঁক। স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্র, বিপ্লবের পথ ও স্তর ইত্যাদি নানা প্রশ্নে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত লড়াইয়ের অনিবার্য পরিণতিতে পার্টি ভাগ হয়তিনটি মতাদর্শগত রাজনৈতিক ফারাক ছিল— কংগ্রেস ও তার সরকারের প্রতি কমিউনিস্টদের মনোভাব কী হবে? ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ সম্পর্কে কমিউনিসস্টদের অবস্থান কী? এবং সোভিয়েত ও চীনের পার্টির বিরোধ বিষয়ে কী অবস্থান নেবে এ-দেশের কমিউনিস্ট পার্টি? 

১৯৬৪ সালের ১৪ এপ্রিল দিল্লিতে জাতীয় পরিষদের বৈঠক থেকে ৩২ জন সদস্য বেরিয়ে আসেন এবং জুলাই মাসে অন্ধ্রপ্রদেশের তেনালীতে অনুষ্ঠিত পার্টির সর্বভারতীয় জাতীয় কনভেনশনে পার্টিকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদের নীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী পার্টি গঠন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম কংগ্রেস আহ্বানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। সেই অনুসারে ১৯৬৪ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর কলকাতার ত্যাগরাজ হলে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম কংগ্রেস১০৪৪২১ জন পার্টি সভ্যের পক্ষ থেকে ৪২২ জন প্রতিনিধি এই কংগ্রেসে যোগ দেন। সপ্তম পার্টি কংগ্রেসে পার্টি কর্মসূচি ও আশু কর্তব্য বিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ৯ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় পলিট ব্যুরো এবং ৪১ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রিয় কমিটি। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন পি সুন্দরাইয়া। 

৮ম কংগ্রেস

১৯৬৮ সালের ২৩ থেকে ২৯ ডিসেম্বর কেরালার কোচিতে পার্টির অষ্টম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তম কংগ্রেসে গৃহীত পার্টি কর্মসূচি এবং পার্টি লাইন বিষয়ে আলোচনা করা হয় সাথে গণ-সংগঠন, পার্টির সংসদীয় ফ্রন্ট এবং সাংগঠনিক অবস্থার মূল্যায়ন করা হয়। পশ্চিমবাংলা ও কেরালায় যুক্তফন্ট সরকারে পার্টির অংশগ্রহণ ও সংসদীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতার মধ্যে জনগণের স্বার্থে কাজ করার বিষয়টি অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিলঅষ্টম কংগ্রেসে ২৮ জন সদস্য নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিট ব্যুরো গঠিত হয় ৯ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। কমরেড পি সুন্দরাইয়া সম্পাদক পুনর্নিবাচিত হন।

৯ম কংগ্রেস 

১৯৭২ সালের ২৭ জুন থেকে ২ জুলাই মাদুরাইতে অনুষ্ঠিত হয় পার্টির নবম কংগ্রেস। এই সময়ে বামপন্থীদের উপর, বিশেষ করে সিপিআই(এম)-এর উপর ব্যাপক আক্রমণ নামিয়ে আনে শাসক শিবির ও রাষ্ট্রনবম কংগ্রেস দেশে স্বৈরতান্ত্রিক একদলীয় শাসনের সম্ভাবনা তুলে ধরে। তার বিরুদ্ধে সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানায় এই কংগ্রেস। পার্টির মূল্যায়ন এবং আহ্বান যে ঠিক ছিল তার প্রমাণ ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থা। ৯৫৬ জন শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় নবম কংগ্রেসনবম কংগ্রেসের সময়ে পার্টির সদস্য সংখ্যা ছিল ১০৭১৩৪কংগ্রেসে ৩১ জন সদস্য নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ৯ জনের পলিট ব্যুরো গঠন করা হয়। সম্পাদক নির্বাচিত হন পি সুন্দরাইয়া। 

১০ম কংগ্রেস

১৯৭৮ সালের ২-৮ এপ্রিল জলন্ধরে অনুষ্ঠিত হয় দশম কংগ্রেস। ৬ষ্ঠ সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস পরাজিত হয়। বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-ও হয় এবং পশ্চিমবাংলায় সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে বামপন্থী সরকার গঠিত হয়। পরে ত্রিপুরায় বামপন্থীরা সরকার গঠন করে। এই প্রেক্ষিতেই দশম পার্টি কংগ্রেস। কংগ্রেসে রক্ত পতাকা উত্তোলন করেন নৃপেন চক্রবর্তী। নবম কংগ্রেসের পর থেকে সারা দেশে স্বৈরাচারী সন্ত্রাস চলছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। এই সময়ে সিপিআই(এম)-এর উপর ব্যাপক আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়। পশ্চিমবাংলায় ১১০০ পার্ট কর্মী খুন, ১০ হাজারেরও বেশি পার্টি নেতাকে বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়। কয়েক হাজার পার্টি কর্মীকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটতে হয়। এ- অবস্থায় পার্টি কংগ্রেস সারা দেশে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান রাখে এবং পার্টির সাংগঠনিক দূর্বলতা কাটানোর জন্য একটি সাংগঠনিক প্লেনাম করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৭৮ সালের ২৭ থেকে ২৯ ডিসেম্বরয়ে হাওড়ার শালকিয়ায় এই প্লেনাম অনুষ্ঠিত হয়। পার্টি কংগ্রেসে ৫৭২ জন প্রতিনিধি যোগ দেন, ৪৪ জনের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ১১ জনের পলিট ব্যুরো গঠিত হয়। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। 

ঋণ-
১। প্রদোষকুমার বাগচী, ‘পার্টি কংগ্রেস প্রথম থেকে আজ’,নন্দন।
২। ললিত দেবনাথ, ‘পার্টি কংগ্রেসের দিনলিপি’, দেশের কথা।


প্রকাশের তারিখ: ০৯-মার্চ-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org