উগ্র দক্ষিণপন্থাকে রুখে দিল ব্রাজিল

টিম মার্কসবাদী পথ
ফল ঘোষণার পর লুলা বলেছেন, গণতন্ত্র সুরক্ষিত রয়েছে। এই নির্বাচনে নেতিবাচকতা ও মিথ্যার পরাজয় হয়েছে। দেশ পরিচালনায় তিনি সকলের সঙ্গে সহমতে পৌছনোর চেষ্টা করবেন। ওয়াশিংটনকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ব্রাজিল কারও খিড়কির উঠোন নয়। 

উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানকে রুখে দিল ব্রাজিল। আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া, পেরুর মতো দেশগুলি ট্রাম্পের মদতে কট্টর রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়লেও, সেই ঢেউকে প্রতিহত করল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি। চতুর্থবারের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন লুলা। ৩ শতাংশের বেশি ভোটে পরাস্ত করেছেন উগ্র দক্ষিণপন্থী প্রার্থী ফ্লাবিও বোলসোনারোকে। লুলার পক্ষে সমর্থনের হার ৫১.৭৯ শতাংশ। বোলসোনারোর ৪৮.২১ শতাংশ। ভোটের নিরিখে ব্যবধান ৪৪,৩০,১৯১। প্রথম রাউন্ডের তুলনায় ১ কোটির বেশি সমর্থন বাড়িয়েছেন লুলা। ঐতিহাসিক এই জয়ে স্বস্তির বাতাস গোটা লাতিন আমেরিকায়। ট্রাম্পের প্রার্থীকে হারিয়ে এই জয় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
 
আল জাজিরায় শিরোনাম: লুলার জয় লাতিন আমেরিকার জন‍্য হতে পারে পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণ। এদিকে, ব্রাজিলে প‍্যালেস্তাইনপন্থী লুলার জয়ের পাশাপাশি সার্বিয়ায় পরাস্ত হয়েছেন নেতানিয়াহুর মিত্র আলেকজান্ডার ভুচিস।
 
লুলাকে হারাতে গোড়া থেকেই তৎপর ছিল ওয়াশিংটন। শুরু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কো রুবিও। ব্যবহার করেন হস্তক্ষেপের পুরনো রাজনৈতিক অস্ত্র— শুল্কবৃদ্ধির হুমকি। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেইর বোলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। পরে অবশ্য খানিকটা সুর নরম করেন। চলতি বছরে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ব্যবসা করার অভিযোগ তুলে ফের শুল্ক আরোপ করে আমেরিকা। ট্রাম্প, রুবিওর সঙ্গে মাঠে নামেন মার্কিন রাষ্ট্রপতির বিশ্বস্ত মিত্র মার্ক জুকেরবার্গ, তাঁর বহুজাতিক সংস্থা মেটা। লুলা ও তাঁর ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি)-র প্রচারকে রুখতে তারা ব্যবহার করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের অ্যালগরিদমকে। জয়ের পর লুলা বলেছেন, ‘আমরা পরাস্ত করেছি বিদেশী হস্তক্ষেপকে’। 



লুলার জয় এক দুর্দান্ত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। অক্টোবরের পাঁচ তারিখ প্রথম দফার ভোটে বোলসোনারোর কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন লুলা। ৩ কোটি ৩৪ লক্ষ ভোটার, মোট ভোটারের প্রায় ২১.০৮ শতাংশ ভোটদানে বিরত ছিলেন— যা ছিল ১৯৯৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে সর্বোচ্চ। এতে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পড়ে যায় প্রশ্নের মুখে। চূড়ান্ত দফায় এই হার কমে আসে ১৯.২১ শতাংশে। উগ্র দক্ষিণপন্থাকে পরাস্ত করতে একজোট হন বামপন্থীরা-সহ প্রগতিশীলরা। লুলার পক্ষে ওঠে প্রচারের ঝড়। ‘লুলাস আর্মি’ হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলের ফলোয়ার্স সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এবছরের এপ্রিলে ফলোয়ার্স সংখ্যা যেখানে ছিল সাকুল্যে ৫৩ হাজার, ছ’মাসে তা এক কোটি পেরিয়ে যায়। শেষ তিন-সপ্তাহে দেখা যায় রীতিমতো উল্লম্ফন। ১৩ লক্ষ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১,০৮,১৭,০০০। এই তিন-সপ্তাহে লুলার বিদায়ী সরকার শ্রমদিবস সপ্তাহে ছ’দিন থেকে কমিয়ে করে পাঁচদিন। চূড়ান্ত পর্বের নির্বাচনে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় নির্ণায়ক ভূমিকা। শেষে হেরে থেকে বড় জয়। বাইশ লক্ষ ভোটে পিছিয়ে থেকে ৪৪ লক্ষ ভোটে জয়। আটের দশকে গণতন্ত্র ফিরে আসার পরে এমন কখনও হয়নি— প্রথম দফায় দ্বিতীয় হওয়া কোনও প্রার্থী এর আগে চূড়ান্ত দফায় জিততে পারেননি।
 
লুলার এই জয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেইর বোলসোনারোর জন্য একটি দুঃসংবাদ। অভ্যুত্থানে ষড়যন্ত্রের দায়ে তিনি এখন সাতাশ বছরের কারাদণ্ডে। আশা করেছিলেন ছেলে জিতলে তিনি হয়তো মুক্তি পাবেন। সরকারের কোনও পদ পাবেন। ট্রাম্প মনে করেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় তাঁর সমর্থক রাষ্ট্রপ্রধানদের তালিকায় বোলসোনারো যুক্ত হবেন। এই জনাদেশ মার্কিন রাষ্ট্রপতির কাছে এক বড় ধাক্কা।


 
তিন-সপ্তাহ আগে সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেট ও নিম্নকক্ষের নির্বাচনে দক্ষিণপন্থীরা তাদের ‌আধিপত্য নিশ্চিত করেছে। সংসদের অনুমতি নিতে হয় এমন বহু বিষয়ে নতুন সরকারকে কঠিন দর-কষাকষির মুখোমুখি হতে হবে। এমন একটি দেশে লুলা বামপন্থী রাষ্ট্রপতি হবেন, যেখানে রাজনীতির মূল ঝুঁকেছে দক্ষিণপন্থার দিকে। মেরুকরণ প্রকট। তাছাড়া, লুলার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতি।
 
লুলার জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন কিউবার রাষ্ট্রপতি দিয়াজ ক‍্যানেল থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
 
ফল ঘোষণার পর লুলা বলেছেন, গণতন্ত্র সুরক্ষিত রয়েছে। এই নির্বাচনে নেতিবাচকতা ও মিথ্যার পরাজয় হয়েছে। দেশ পরিচালনায় তিনি সকলের সঙ্গে সহমতে পৌছনোর চেষ্টা করবেন। ওয়াশিংটনকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ব্রাজিল কারও খিড়কির উঠোন নয়। 

ব্রাজিলের জনাদেশ দেখিয়েছে লাতিন আমেরিকায় উগ্র দক্ষিণপন্থার জয় অনিবার্য নয়।
প্রকাশের তারিখ: ২৬-অক্টোবর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org