|
ব্রাজিলের চোখে আর্জেন্টিনাএমির সাদের |
তবে ফুটবলে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখনও শক্তিশালী ছিল। সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে-পেলে, মারাদোনা নাকি মেসি -তা নিয়ে আলোচনা চলছে জোরালো ও জোরদার। তবে তিনি কে তা নিয়ে, উভয় পক্ষেরই কারও কোনও সন্দেহ নেই। |
আর্জেন্টিনাকে দেখো ঘৃণার চোখে— এই বিদ্বেষের বিষ নিয়েই একদিন আমরা বড় হয়েছি। ওরা ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। তার ওপর ফুটবলের দুনিয়ায় এমন একটি দেশ, যাকে সবাই চিনত তাদের ফুটবল টিমকে দিয়ে। আমাদের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সঙ্গে কোনও সংঘাত ছিল না। (ঐক্যবদ্ধ) লাতিন আমেরিকার কোনও অস্তিত্ব ছিল না আমাদের স্কুলে (মার্কেজ যেমন বলেছেন, শতাব্দীর নিঃসঙ্গতা), এমন কিছু ছিল না যা ন্যায্যতা দিতে পারে পড়শী দেশের সঙ্গে আমাদের এই বৈরিতাকে। বুয়েনস আয়ার্সকে নিয়ে আমাদের মধ্যে ছিল একটা অন্য ধরনের আকর্ষণ। এমন এক অমোঘ আকর্ষণ, এমন এক ঈর্ষা, যা ছিল ইউরোপের শহরের প্রতি— এত আধুনিক, এত সুশ্রী-মার্জিত হতে পারে একটা শহর! এটি ছিল ব্রাজিলের বাইরে এক দুর্দান্ত পর্যটন গন্তব্য, যেখানে ব্রাজিলিয়রা গিয়ে এমন আচরণ করতেন যেন তাঁরা নিজের দেশেরই এক অন্য রাজ্যে গিয়েছেন! আর্জেন্টিনার শহর ফ্লোরিডার রাস্তা দিয়ে হাঁটা, চামড়ার জ্যাকেট কেনা, ট্যাঙ্গো হাউসে যাওয়া ছিল সবচেয়ে বেশি কাঙ্খিত। যা ছিল ফুটবল নিয়ে শত্রুতার একেবারেই পরস্পরবিরোধী। সাংস্কৃতিক দূরত্ব ধরা পড়ত কেবল সেই আর্জেন্টিনীয়দের মধ্যে যারা শ্বেতাঙ্গ, লম্বা, বলিষ্ঠ, তাঁদের সঙ্গে। ছিল না একজন কৃষ্ণাঙ্গ-ও, যেখানে আমরা ছিলাম বেঁটেখাটো, রোগাটে এবং পুরোদস্তুর কৃষ্ণাঙ্গ। আমাদের মনের কোথাও একটা প্রতিহিংসা ছিল। আমাদের মনে ছিল, আমরা মানে পেলের ব্রাজিল! তিন-তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন! একটু বেশিই ছিল আমাদের আত্মসম্মান। আমরা বিশ্বের সেরা, বাকি সব পার্থক্য যেন নিতান্তই গৌণ। এরই মাঝে ব্রাজিলে স্বৈরতন্ত্র এবং ভেকধারী ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ ব্রাজিলিয়দের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ডিজনিতে ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে বেশি উৎসাহিত করছিল। বুয়েনস আয়ার্সে বেড়াতে যাওয়া ইতিমধ্যেই গৌণ বলে মনে হচ্ছিল। স্বাভাবিক। এর একটা বড় কারণ ছিল পর্যটনের বেশিরভাগই জুড়ে থাকত কেনাকাটা। আর বেড়াতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উপহার আনার ব্যাপারে পাল্লা দেওয়ার মতো আর কেউ ছিল না। ব্রাজিল ইতিমধ্যেই আর্জেন্টিনার দিকে কম তাকাতে শুরু করেছে। নজর তখন উপরের দিকে। উওর আমেরিকার আধিপত্য তখন বাড়ছে। কাস্টমস থেকে ভোগপণ্য কেনাকাটায় এবং ভ্রমণে। ব্রাজিল তখন নিজেকে লাতিন আমেরিকার দেশ বলে কমই মনে করছে। আর মহাদেশ থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। পেরোনবাদ ছিল আরেকটি বিরল ঘটনা। (ব্রাজিলের গেতুলিও) ভার্গাস এবং (আর্জেন্টিনার হুয়ান) পেরনের মধ্যে তুলনা করা সত্যিই কঠিন। ভার্গাস তার মৃত্যুর সাথে সাথে কার্যত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। লিওনেল ব্রিজোলা পরে আর ভার্গাসের মিথকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। যদিও, আর্জেন্টিনায়, পেরোনবাদ কখনোই মুছে যায়নি। ব্রাজিলিয় সঙ্গীতের তুলনায় ট্যাঙ্গো ছিল অনেক দূরের। অসাধারণ আর্জেন্টিনার সাহিত্যও পৌঁছেছে হাতেগোনা কয়েকজনের কাছে। অনেকটা আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্রের মতো। আর্জেন্টিনার কার্লোস আলবার্তো তেভেজ যেদিন ব্রাজিলে খেলতে এসেছিলেন, সেদিন তা ছিল এক সন্ধিক্ষণ। তেভেজ (আর্জেন্টিনার ক্লাব বোকা জুনিয়র্স থেকে) যোগ দিলেন সাও পাওলোর সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাব, করিন্থিয়ানসে (সময়টা ২০০৫-০৬)। এবং কী আশ্চর্য, করিন্থিয়ানসের আইডল তখন একজন আর্জেন্টিনিয়! আর্জেন্টিনিয়দের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সময় যিনি গুলিয়ে ফেলেন তাঁর অনুভূতি, দৃশ্যতই দিশেহারা। ২০০৩, নিস্টর কির্চনার যখন (আর্জেন্টিনার) রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন, তখন তাঁর শপথ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলা। পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন। সে ছিল এক উষ্ণ আলিঙ্গন, যার বার্তা ছিল স্পষ্ট: ব্রাজিল ঝুঁকছে আর্জেন্টিনার দিকে, ব্রাজিল ঝুঁকছে লাতিন আমেরিকার দিকে। সেখান থেকে তাঁরা গিয়েছিলেন (উরুগুয়ের বামপন্থী রাষ্ট্রপতি) তাবারে ভাজকুয়েজের শপথ অনুষ্ঠানে। লাতিন আমেরিকাকে এক সুরে বাঁধতে একীকরণ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা এবং সম্প্রসারণের মাধ্যমে মহাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময় শুরু হয়েছিল সেদিন— যেখানে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ছিল মূল অক্ষ। তবে ফুটবলে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখনও শক্তিশালী ছিল। সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে— পেলে, মারাদোনা নাকি মেসি— তা নিয়ে আলোচনা চলছে জোরালো ও জোরদার। তবে তিনি কে তা নিয়ে, উভয় পক্ষেরই কারও কোনও সন্দেহ নেই। ব্রাজিলে ২০১৪’র বিশ্বকাপের ফাইনাল আমি একাই দেখতে গিয়েছিলাম। জার্মানির বিপক্ষে সমর্থন করেছিলাম আর্জেন্টিনাকে। যে গোলটি জার্মানিকে বিশ্বসেরার শিরোপা এনে দেয়, আহা, তা যদি ব্রাজিলের গোল হতো! এখন অন্য সময়। ব্রাজিলে বামদিক থেকে কে আছেন, তার চিহ্ন হলো তিনি আর্জেন্টিনার সঙ্গেই আছেন। লুলা সবসময়ের জন্যই আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভ্রাতৃত্বকে তুলে ধরেছেন। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও গভীর। কারণ আমি বুয়েনস আয়ার্সে দু’বার ছিলাম। চিলিতে অভ্যুত্থানের পরেই। এবং যখন আমি ক্লাকসো পরিচালনা করেছি। ক্লাকসো হলো রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অসরকারি সংগঠন লাতিন আমেরিকান কাউন্সিল অব সোস্যাল সায়েন্সস (সিএলএসিএসও), যার সদরদপ্তর বুয়েনস আয়ার্স। আমার সঙ্গে আর্জেন্টিনার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। আমি ভালোবাসি বুয়েনস আয়ার্সকে। (যদিও আমার কোনও সন্দেহ নেই যে পেলে সর্বকালের সেরা।) তবে, এখন আমরা সবাই আর্জেন্টাইন। বা, অন্তত, আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি। (ব্রাজিল এবং ইতালি ছাড়া ফ্রান্সকে পরপর বিশ্বকাপ জয়ী হওয়া থেকে বিরত রাখা সহ।) এর কারণ হলো আমরা ফুটবলকে ভালোবাসি। আমাদের মানতেই হবে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের চেয়ে ভালো ফুটবল খেলেছে। আর সর্বোপরি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড়টি রয়েছে আর্জেন্টিনায়। চলো যাই, সমর্থন করি আর্জেন্টিনাকে! জয়ী হোক আর্জেন্টিনা! *মূল স্প্যানিশ লেখা থেকে ভাবানুবাদ — এমির সাদের: সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। লাতিন আমেরিকান কাউন্সিল অব সোস্যাল সায়েন্সসের অধিকর্তা। দ্য নিউ মোল— পাথস অব দি লাতিন আমেরিকান লেফট-সহ বহু গ্রন্থের লেখক। নিয়মিত কলাম লেখক। এই লেখাটি একইসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনায়। প্রকাশের তারিখ: ১৮-ডিসেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |