|
ব্রিকস সম্প্রসারণ ও বিশ্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনবিজয় প্রসাদ |
ব্রিকস সম্প্রসারণে যারা সমর্থন করেছে, সেই সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে নানান বৈচিত্রসম্পন্ন শক্তি। সাম্রাজ্যবাদ যে তার রাজনৈতিক আধিপত্য ক্রমশ বেশি বেশি পরিমাণে হারাচ্ছে, ব্রিকসে নানা ধরনের শক্তির সমাবেশে তারই ইঙ্গিত রয়েছে। |
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) আরও ৬টি নতুন সদস্যকে স্বাগত জানিয়েছে। এরা হল আর্জেন্টিনা, ইজিপ্ট, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও ইউনাইটেড আরব এমিরেটস বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। এখন ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৭.৩ শতাংশ। (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি অনুযায়ী) সম্মিলিতভাবে এই দেশগুলির জিডিপি বিশ্বের মোট জিডিপির ৩৬.৪ শতাংশ। তুলনায়, যদিও জি৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির (কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ, (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি অনুযায়ী) বিশ্বের মোট জিডিপিতে তাদের অংশ ৩০.৪ শতাংশ। ২০২১ সালে বিশ্বের মোট শিল্পোৎপাদনে, সম্প্রতি সম্প্রসারিত ব্রিকস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির অবদান ছিল ৩৮.৩ শতাংশ। সেখানে বিশ্বের মোট শিল্পোৎপাদনে জি৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির অংশ ছিল ৩০.৫ শতাংশ। হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন সব ধরনের সূচক অনুযায়ী এটা দেখা যাচ্ছে যে, শস্য উৎপাদন এবং ধাতু উৎপাদনের মোট পরিমাণসহ, নতুন এই ব্রিকস গোষ্ঠী এখন বিপুল ক্ষমতাধর। ব্রাজিল সরকারের পরামর্শদাতা সেলসো অ্যামোরিন ব্রিকস–এর অন্যতম রূপকার। এর আগে ব্রাজিলের বিদেশমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি নতুন একটা বিষয়ের কথা বলেছিলেন, এবং সেটি হল ‘এখন আর পৃথিবীকে তাদের নির্দেশমতো চালতে বাধ্য করতে পারবে না জি৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি।’ নিশ্চিতভাবেই ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি, তাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষমতাগোষ্ঠীর স্তরবিভাজন ও নিজস্ব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, এখন জি৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির তুলনায় বিশ্বের মোট জিডিপির বৃহত্তর অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ জি৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি এখনও নিজেদের বিশ্বের এগজিকিউটিভ কর্তা বলে মনে করে চলেছে। ৪০টিরও বেশি দেশ ব্রিকস–এ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষ সম্মেলনের আগে ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল মাত্র ২৩টি দেশ (এর মধ্যে ছিল অর্গানাইজেসন অফ পেট্রোলিয়াম প্রোডিউসিং কান্ট্রিজ বা ওপেক –এর ১৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ৭টি দেশ)। (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি অনুযায়ী) জিডিপির বিচারে ইন্দোনেশিয়া হল বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। একেবারে শেষ মুহুর্তে ইন্দোনেশিয়া তাদের ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য আবেদন প্রত্যাহার করে নেয়। তবে তারা জানিয়েছে ব্রিকস–এ যোগ দেওয়ার বিষয়টি তারা পরে বিবেচনা করবে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের মনোভাব সঠিকভাবে ধরা পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোর কথায়: ‘বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈষম্য আমাদের অবশ্যই খারিজ করতে হবে। ডাউনস্ট্রিমে শিল্পের বিকাশে কোনওভাবেই বাধা দেওয়া যাবে না। আমাদের সবাইকে সমানাধিকার ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকতে হবে। পশ্চিমের বজ্রমুষ্ঠির বাইরে একাধিক মঞ্চ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই অনেকগুলি নতুন আঞ্চলিক বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। ব্রিকস সেগুলি থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করে না। নতুন আঞ্চলিক জোট বা বোঝাপড়গুলির মধ্যে রয়েছে দ্য কমিউনিটি অফ লাতিন আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস (সিইএলএসি) এবং দ্য শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)। বরং, যেসব দেশ ইতিমধ্যেই এই ধরনের আঞ্চলিক জোটের মধ্যে রয়েছে, ব্রিকস–এর সদস্য হলে তাদেরও আঞ্চলিকতাবাদকে জোরদার করার শক্তি বাড়বে। এই দু ধরনের আন্তঃ–আঞ্চলিক সংস্থা ক্রমে একটা ঐতিহাসিক জোয়ারের স্রোতের দিকে ঢলে পড়ছে, এবং সেই জোয়ারের স্রোতের সমর্থনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা বা তথ্য। সেই সব তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রাইকন্টিনেন্টাল:ইনস্টিটিউট ফর সোশাল রিসার্চ সংস্থা। বিশ্লেষণের জন্য এই সংস্থা ব্যবহার করে সর্বত্র পাওয়া যায় এবং নির্ভরযোগ্য এমন একগুচ্ছ গ্লোবাল ডেটাবেস। তথ্যগুলিও খুব স্পষ্ট: বিশ্বের জিডিপিতে গ্লোবাল নর্থের অংশ ১৯৯৩ সালে ছিল ৫৭.৩ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটা কমে হয়েছে ৪০.৬ শতাংশ। এর মধ্যে বিশ্বের জিডিপিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতাংশ ওই একই সময়পর্বে ১৯.৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৫.৬ শতাংশ (পিপিপি অনুযায়ী)। মনে রাখতে হবে এটা ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একচেটিয়ার সুবিধা ভোগ করা সত্ত্বেও। অথচ ২০২২ সালে, চীনকে বাদ দিয়েই, বিশ্বের জিডিপিতে গ্লোবাল সাউথের শতাংশ ছিল গ্লোবাল নর্থের চেয়ে বেশি। সম্ভবত খুব দ্রুত অর্থনীতির আপেক্ষিক ক্ষয়ের কারণে পশ্চিমী দুনিয়া তার আধিপত্য কায়েম রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীনের মতো বিকাশশীল দেশের বিরুদ্ধে নতুন ঠাণ্ডা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে। পশ্চিমী শক্তিগুলির জাতিগত, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি সেরা প্রমাণকে সম্ভবত খুব সংক্ষেপে প্রকাশ করা যায় নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেসন (ন্যাটো) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ)র একটি সাম্প্রতিক বিবৃতির মাধ্যমে। বিবৃতিটি এরকম — ‘আন্তর্জাতিক স্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা কায়েম রাখতে ন্যাটো ও ইইউ পরস্পরের পরিপূরক ভূমিকা পালন করে। এই দুই সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও এখানে পরস্পরের কাজ হল একে অপরকে শক্তি জোগানো। আমাদের অধীনে যেসব হাতিয়ার আছে, তা সে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক যাই হোক না কেন, ভবিষ্যতে সেগুলিকে আমরা আরও বেশি ব্যবহার করব আমাদের সাধারণ লক্ষ্যপূরণের স্বার্থে, যা আমাদের ১০০ কোটি নাগরিকের সুবিধা নিশ্চিত করবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হল, নানা দিক থেকে সাদৃশ্যবিহীন সব দেশকে, যার মধ্যে রয়েছে দুটি রাজতন্ত্রও, সদস্য হিসাবে কেন স্বাগত জানাচ্ছে ব্রিকস। এবার যারা পুরোদমে ব্রিকসের সদস্য হল সেই সব রাষ্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে ব্রিকসের ভাবনা বিষয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেন, ‘কোন্ ব্যক্তি শাসন করছেন আমাদের কাছে সেটা বিচার্য নয়, বিচার্য হল দেশটির গুরুত্ব। ইরান সহ অন্য যেসব দেশ ব্রিকসে যোগ দেবে তাদের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আমরা অস্বীকার করতে পারি না।’ এই মাপকাঠিতেই ব্রিকস প্রতিষ্ঠাকারী দেশগুলি তাদের মিত্র শক্তিকে আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ব্রিকস এর শক্তি আরও বাড়ার একেবারে মূলে রয়েছে অন্তত তিনটি বিষয়: ১) জ্বালানি সরবরাহ এবং সেই সরবরাহের পথগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ, ২) বিশ্ব পরিসরে সক্রিয় ফিনান্স ও উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ৩) শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ। আরও বৃহত্তর ব্রিকস গোষ্ঠী এখন গড়ে তুলেছে আরও শক্তিশালী এনার্জি গোষ্ঠী। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ওপেকের সদস্য। এদের সঙ্গে রাশিয়াকে ধরলে দাঁড়ায় ওপেক প্লাস গোষ্ঠী। ওপেক প্লাস গোষ্ঠী এখন দৈনিক ২৬.৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিষ্কাশন করে, যা বিশ্বের মোট দৈনিক জ্বালানি তেল নিষ্কাশনের ৩০ শতাংশ থেকে সামান্যই কম। ইজিপ্ট ওপেকের সদস্য নয়। তবে এই দেশ আফ্রিকার বৃহত্তম জ্বালানি তেল উৎপাদক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। ইজিপ্টের দৈনিক তেল নিষ্কাশনের পরিমাণ ৫৬৭,৬৫০ ব্যারেল। এপ্রিলে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি করে ফেলেছে চীন। এর জেরে জ্বালানি তেল উৎপাদক দুটি দেশই এখন ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। এখানে তেলের উৎপাদনটা ইস্যু নয়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের নতুন রাস্তা তৈরি করাটাই আসল। চীনের নেতৃত্বে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ইতিমধ্যেই গ্লোবাল সাউথজুড়ে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্ল্যাটফর্মের একটা ছড়ানো জাল তৈরি করে ফেলেছে। এই সম্প্রসারণে জুড়ে নেওয়া হয়েছে খলিফা বন্দরকে এবং ইউএই–র ফুজাইরা এবং রুওয়েসের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংরক্ষণ ভাণ্ডারকে। এর পাশাপাশি রয়েছে সৌদি আরবের ভিসন ২০৩০ কর্মসূচি। এটা খুবই প্রত্যাশিত যে, সম্প্রসারিত ব্রিকস তাদের এনার্জি পরিকাঠামোর সঙ্গে ওপেক প্লাস ভুক্ত গোষ্ঠীর এনার্জি পরিকাঠামোর সমন্বয় গড়ে তোলার কাজ শুরু করবে। এই সমন্বয়ের মধ্যে পড়বে ভূগর্ভ থেকে কত পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করা হবে, সেই বিষয়টিও। দৈনিক কতটা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন করা হবে সেনিয়ে এবছরে রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার ওপর পশ্চিমী দেশগুলি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করার কারণে রাশিয়া যে ক্ষতির মুখে পড়েছে তা পুষিয়ে নিতেই রাশিয়া নিজেদের তেল উত্তোলনের কোটা বাড়িয়ে নেয়। এই বিষয়টিই দুদেশের মধ্যে উত্তেজনার কারণ। এখন ওপেক প্লাস মঞ্চের বাইরে আরও একটা মঞ্চ পেয়ে যাচ্ছে এই দুই দেশ, আর তার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে থাকছে চীন। এর ফলে এনার্জি বিষয়ে তিন দেশের একটা সাধারণ অ্যাজেন্ডা গড়ে তুলতে সুবিধা হবে। ডলার নয়, সৌদি আরব রেনমিনবি–র (আরএমবি) বিনিময়ে চীনকে জ্বালানি তেল বিক্রির পরিকল্পনা করছে। এতে পেট্রোডলার ব্যবস্থার গুরুত্ব কমবে। (চীনকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আরও দুটি প্রধান যে দুটি দেশ– ইরাক ও রাশিয়া, তারা এখনই তেলের দাম নেয়ে রেনমিনবিতে)। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা এবং সম্মেলনের চূড়ান্ত বিবৃতিতে জোর দেওয়া হয়েছে গোটা বিশ্বের জন্য একটা আর্থিক ও উন্নয়নমূলক স্থাপত্যকে (আর্কিটেকচার) শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর। এই আর্থিক ও উন্নয়নমূলক স্থাপত্য ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড, ওয়াল স্ট্রিট এবং মার্কিন ডলার নামক ত্রিশক্তির দ্বারা পরিচালিত হবে না। যদিও বিশ্ব বাণিজ্য ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলিকে, যেমন ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেসন (ডব্লিউটিও), ওয়ার্লড ব্যাঙ্ক এবং আইএমএফ–কে ব্রিকস এড়িয়ে চলতে চায় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘নির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা যার মূলে রয়েছে ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেসন’ তার গুরুত্বকে পুরোপুরি স্বীকার করেছে ব্রিকস। এবং একইসঙ্গে আহ্বান জানিয়েছে ‘একটা শক্তিশালী, বিশ্বায়িত আর্থিক সেফটি নেট বা নিরাপত্তা জাল গড়ে তোলার জন্য যার কেন্দ্রে থাকবে কোটাভিত্তিক এবং যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদসমৃদ্ধ (আইএমএফ)’। ব্রিকস যে সব প্রস্তাব রেখেছে তার লক্ষ্য আইএমএফ বা ডব্লিউটিও থেকে মৌলিকভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া নয়। বরং ব্রিকস সামনে এনেছে এগিয়ে চলার দুটি রাস্তা: প্রথমত, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি যেসব সংস্থার সদস্য সেই সংস্থাগুলি যেহেতু পশ্চিমী শক্তির অ্যাজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে, তাই সেই সব সংস্থাগুলির ওপর ব্রিকস আরও বেশি করে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করবে ও তাদের নির্দেশিকা দেবে। দ্বিতীয়ত, ব্রিকসভুক্ত রাষ্ট্রগুলি তাদের নিজস্ব সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাও বাস্তবায়িত করবে ( যেমন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক বা এনডিবি)। সৌদি আরবের বিনিয়োগযোগ্য বিপুল অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার, সেটাই আংশিক ভাবে এনডিবির সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। ব্রিকসের অ্যাজেন্ডা হল ‘বিশ্বজোড়া আর্থিক স্থাপত্যের স্থায়িত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ন্যায্যতাকে আরও উন্নত করা’ যা মূলত কার্যকর করা হবে ‘স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার করে, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা চালু করে এবং বিকল্প পেমেন্টের ব্যবস্থা চালু করে’। ‘স্থানীয় মুদ্রা’র ধারণা বলতে বোঝায় বিভিন্ন রাষ্ট্র সীমাপার বাণিজ্যের কাজে, ডলারের ওপর নির্ভর করার বদলে, আরও বেশি বেশি করে তাদের নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করবে। এখন বিশ্বে আইনত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বৈধ মুদ্রার সংখ্যা আনুমানিক ১৫০, তবুও সীমাপার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় সবসময়ই নির্ভর করা হয় ডলারের ওপর (২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী সুইফট বা সোসাইটি ফর ওয়ার্লডওয়াইড ইন্টারব্যাঙ্ক ফিনান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনস –এর মাধ্যমে যত লেনদেন হয় তার ৪০ শতাংশই হয় ডলারে)। বাকি মুদ্রাগুলির ভূমিকা খুবই সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে সীমাপার পেমেন্টের ক্ষেত্রে চীনের আরএমবি–র অংশ মাত্র ২.৫ শতাংশ। তবে এখন বিশ্বের সর্বত্র নতুন নতুন মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠছে — যেমন চীনের ক্রসবর্ডার পেমেন্ট ইন্টারব্যাঙ্ক সিস্টেম, ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস, এবং রাশিয়ার ফিনান্সিয়াল মেসেজিং সিস্টেম (এসপিএফএস) — এছাড়াও গড়ে উঠছে আঞ্চলিক স্তরে ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবস্থা যা বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। খুব অল্প সময়ের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সির সম্পদও নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থার সামনে সম্ভাব্য বিকল্প রাস্তা খুলে দিয়েছিল। সম্পদ হিসাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল্য কমে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এটা চলছিল। সম্প্রসারিত ব্রিকস সম্প্রতি সম্মতি দিয়েছে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করার জন্য যারা ব্রিকস রেফারেন্স মুদ্রার বিষয়ে পর্যালোচনা করবে। ব্রিকস সম্প্রসারণের পর এনডিবি জানিয়েছে তারাও নতুন সদস্য নেবে এবং এনডিবির ২০২২–২০২৬ এর নোটে বলা হয়েছে সাধারণ নীতির অঙ্গ হিসাবে ব্যাঙ্ক যতগুলি প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করবে তার ৩০ শতাংশই করা হবে স্থানীয় মুদ্রায়। এনডিবির প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ জানিয়েছেন, নতুন উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোর অংশ হিসাবে এনডিবি আইএমএফের নীতি অনুসরণ করবে না। আইএমএফ–এর নীতি হল, ঋণগ্রহণকারী দেশগুলির ওপর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া। রুসেফ বলেন, ‘আমরা যে কোনও ধরণের শর্ত চাপানোর বিষয়টিকে খারিজ করছি। প্রায়ই এই শর্তে ঋণ দেওয়া হয় যে, ঋণ নিলে নির্দিষ্ট কতগুলি নীতি কার্যকর করতে হবে। আমরা সেটা করি না। আমরা প্রতিটি দেশের নিজ নিজ নীতিকে সম্মান করি।’ তাদের ঘোষণাপত্রে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি ‘নিরাপত্তা পরিষদ সহ রাষ্ট্রসঙ্ঘের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের’ কথা উল্লেখ করেছে। এখন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫। এদের মধ্যে স্থায়ী সদস্য ৫টি দেশ (চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কোনও দেশ এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারতও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য নয়। এই অসাম্য দূর করতে ব্রিকস ‘আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিকাশমান ও উন্নয়নশীল দেশগুলির বৈধ আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে। ব্রিকস চায় ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও বড় ভূমিকা পালন করুক।’ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই দেশগুলিকে স্থায়ী আসন দিতে অস্বীকার করছে পশ্চিমী শক্তি। এর পরিণামে ব্রিকসের প্রক্রিয়ায় এই সব দেশের অঙ্গীকার আরও বেড়েছে এবং জি২০ গোষ্ঠীতে তাদের ভূমিকা আরও প্রসারিত হয়েছে। ব্রিকসে ইরান ও ইথিওপিয়ার অন্তর্ভুক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে দক্ষিণ গোলার্ধের বড় রাষ্ট্রগুলি, ব্রিকসের দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাশিয়া ও চীন সহ এক ডজন দেশের বিরুদ্ধে জারি করা পশ্চিমের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জবাব দিচ্ছে। ইতিওপিয়ার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য চলছে বহুদিন। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা শহরেই আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দপ্তর। ইথিওপিয়াকে টেনে আনার জন্য ব্রিকস এই বিষয়টা নিশ্চিত করেছে যাতে, এই বিশাল দেশটি (এই দেশটির জনসংখ্যা যথেষ্ট বেশি এবং এই দেশের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি জমি) ফের যেন পশ্চিমী শক্তির খপ্পরে গিয়ে না পড়ে। দ্য গ্রুপ অফ ফ্রেন্ডস ইন ডিফেন্স অফ দ্য ইউ এন চার্টার — ২০১৯ সাল থেকে এই উদ্যোগটি নিয়েছে ভেনেজুয়েলা। এই মঞ্চে জোট বেঁধেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ২০টি সদস্য দেশ। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে আলজিরিয়া থেকে জিম্বাবোয়ে পর্যন্ত। এদেরই বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা এবং সেই নিষেধাজ্ঞার দাম মিটিয়ে যেতে হচ্ছে এই দেশগুলিকে। এই সব দেশগুলির অনেকেই আমন্ত্রিত হিসাবে যোগ দিয়েছে ব্রিকস সম্মেলনে এবং এরা সম্প্রসারিত ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য হতে খুবই আগ্রহী। আমরা বিপ্লবের যুগে বাস করছি না। সোশালিস্টরা সবসময়েই চায় গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। ইতিহাসে যেমন প্রায়ই ঘটে থাকে, মরনাপন্ন সাম্রাজ্যের কাজকর্মের জেরে তৈরি হয় একটা সাধারণ ক্ষেত্র, যে জমিতে দাঁড়িয়ে ওই সাম্রাজ্যের যারা শিকার তারা নতুন এক বিকল্পের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে পারে, তা সেই বিকল্প যতই ভ্রণাকারে থাকুক না কেন, কিংবা যতই দ্বন্দ্বে ভরা হোক না কেন। ব্রিকস সম্প্রসারণে যে সমর্থন দেখা গেল, সেই সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে নানান বৈচিত্রের শক্তি। সাম্রাজ্যবাদ যে তার রাজনৈতিক আধিপত্য ক্রমশ বেশি বেশি পরিমাণে হারাচ্ছে, ব্রিকসে নানা ধরনের শক্তির সমাবেশে তারই ইঙ্গিত রয়েছে। পিপলস ডেমোক্রেসি, সেপ্টেম্বর ৪–১০, ২০২৩ অনুবাদঃ সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ১৬-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |