ব্রিকস: দ্বন্দ্ব ও আকাঙ্ক্ষার সমাহার

এম এ বেবি

ব্রিকস কোনও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ফ্রন্ট নয়। এটা এমন একটা ফোরাম যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে একমেরু বিশ্ব গড়ে তুলতে চায় তার বিরুদ্ধে গিয়ে বহুমেরু বিশ্বকে শক্তিশালী করতে। এই পার্থক্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গোষ্ঠীর মধ্যে এমন সব দেশ রয়েছে যাদের সামাজিক ব্যবস্থা পরস্পরের থেকে পুরোপুরি আলাদা। চীনের অর্থনীতি সমাজতন্ত্র অভিমুখী, রাশিয়া অলিগার্কিক পুঁজিবাদীর অর্থনীতির দেশ। ভারত বড় বুর্জোয়ার নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র এবং এখন এদেশে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক, হিন্দুত্বের শক্তিগুলি। আবার যখন আমরা অন্য দেশগুলির দিকে তাকাই তখন বৈচিত্র আরও বেড়ে ওঠে। সুতরাং, এই দেশগুলি পুঁজিবাদ-বিরোধী সাধারণ সংগ্রামে একে অপরের মিত্র নয়। এগুলো সকলে মিলে এমন রাষ্ট্রগুচ্ছ যারা অগণতান্ত্রিক, ডলারের আধিপত্যে থাকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের একটা পরিসর তৈরি করে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

২০২৬ সালের ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিকে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিকসের অষ্টাদশতম শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলন থেকে ১৪০ পয়েন্টের ঘোষণা জারি করা হয়েছে। এই ঘোষণা একদিকে গ্লোবাল সাউথের আকাঙ্ক্ষার অভিব্যক্তি। এবং অন্যদিকে এই ঘোষণা এই গোষ্ঠীর নিজস্ব দ্বন্দ্বেরও প্রতিচ্ছবি। বামপন্থীদের এই ঘোষণাকে তারিফ বা খারিজ কোনটাই করার দরকার নেই। বরং তাদের উচিত হবে এই নথি খুঁটিয়ে পড়া। যেখানে এই দলিলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্ব গড়ার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এবং দেখা উচিত এ কাজে ব্রিকসের ঘাটতি কোথায়। এবং কোথায় ভারত সরকারের নিজস্ব আচরণ এই ঘোষণার মর্মবস্তুর সঙ্গে বিশ্বাসঘতকতা করেছে। 

ব্রিকস সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ফোরাম নয়

ব্রিকস কোনও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ফ্রন্ট নয়। এটা এমন একটা ফোরাম যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে একমেরু বিশ্ব গড়ে তুলতে চায় তার বিরুদ্ধে গিয়ে বহুমেরু বিশ্বকে শক্তিশালী করতে। এই পার্থক্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গোষ্ঠীর মধ্যে এমন সব দেশ রয়েছে যাদের সামাজিক ব্যবস্থা পরস্পরের থেকে পুরোপুরি আলাদা। চীনের অর্থনীতি সমাজতন্ত্র অভিমুখী, রাশিয়া অলিগার্কিক পুঁজিবাদীর অর্থনীতির দেশ। ভারত বড় বুর্জোয়ার নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র এবং এখন এদেশে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক, হিন্দুত্বের শক্তিগুলি। আবার যখন আমরা অন্য দেশগুলির দিকে তাকাই তখন বৈচিত্র আরও বেড়ে ওঠে। সুতরাং, এই দেশগুলি পুঁজিবাদ-বিরোধী সাধারণ সংগ্রামে একে অপরের মিত্র নয়। এগুলো সকলে মিলে এমন রাষ্ট্রগুচ্ছ যারা অগণতান্ত্রিক, ডলারের আধিপত্যে থাকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজেদের একটা পরিসর তৈরি করে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই সীমাবদ্ধতা সহজাত। ব্রিকসের ঘোষণায় ‘একতরফা জবরদস্তির ব্যবস্থা’র নিন্দা করা হয়েছে। অথচ সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। আবার ঘোষণায় পশ্চিম এশিয়ায় ‘সর্বোচ্চ সংযত’ থাকার কথা বলা হয়েছে অথচ ইজরায়েলকে আগ্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়নি। ব্রিকস এটা করেনি তাদের সীমাবদ্ধতা থেকেই। তবে এই নীরবতা কোনও দুর্ঘটনা নয়। বিভিন্ন রকম জোটে সামিল থাকা এবং ভিন্ন শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করে চলা এই দেশগুলির মধ্যে যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হয়েছে, ঘোষণার নীরবতা সেই ঐকমত্য বজায় রাখার চেষ্টারই দাম। 

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যতিরেকে অর্থনৈতিক ভার

ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। এই দেশগুলির জিডিপি বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় এক তৃতীয়াংশ। ফলে তাদের অর্থনৈতিক ভার অনেক বেশি। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিতে তাদের এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব নেই।  এই অসঙ্গতি দূর করার কথা বলা হয়েছে ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে।

ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিকসের তরফে স্থায়ী সদস্য দুই দেশ, চীন ও রাশিয়া। এই ঘোষণার প্রশংসা করা উচিত এই কারণে যে, ব্রিকস এ কথা উল্লেখ করেছে যে ‘এখনও পর্যন্ত কোনও মহিলা রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল হননি।’ খুব শিগগিরই নতুন একজন সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হবেন। তখন এই ইস্যুর সমাধান করা উচিত। এবং নিশ্চিতভাবেই তেমন একজন মহিলাকেই নির্বাচিত করতে হবে যিনি গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলির স্বার্থের পক্ষে দাঁড়াবেন। এই প্রসঙ্গ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখনও পর্যন্ত লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান থেকে একজন করে এবং এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে দুজন করে এই পদে বসেছেন। 

ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে যাতে বিকাশমান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলির বদলে যাওয়া গুরুত্ব সেখানে আরও ভালভাবে প্রতিফলিত হয়। ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভোটিং ও কোটায় বিকাশমান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলির আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে এবং নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতর হতে হবে। ডব্লিউটিও সংস্কারে সমর্থন জানানো হয়েছে ব্রিকসের ঘোষণায় এবং সমর্থন করা হয়েছে প্রকাশ্য, অনুমানযোগ্য, নিয়ম মেনে চলা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে। ক্রমশ বেড়ে চলা শুল্ক, শুল্ক নয় এমন বাধা এবং সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর  উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এই ঘোষণা। আন্তর্জাতিক আইনকে অগ্রাহ্য করে একতরফাভাবে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের নিন্দা করা হয়েছে ঘোষণাপত্রে এবং বলা‌ হয়েছে যে, এই পদক্ষেপগুলি  অনেক বেশি পরিমাণে গরিব ও দুর্বলদেরই ক্ষতি করছে। কিউবায় একতরফা অবরোধ আরও জোরদার করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে  ব্রিকস এবং এই অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিতে জোর দেওয়া হয়েছে। 

এই অবস্থানগুলো স্বাগত। তবে এগুলি সবই বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামো সংস্কারের গণ্ডীতে আবদ্ধ রয়েছে, কাঠামোর গণ্ডীগুলিকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। রিজার্ভ কারেন্সি হিসাবে ডলারের যে অবস্থান, ঘোষণাপত্রে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি আইএমএফের কাঠামোগত ভাবে মানিয়ে নেওয়ার শর্তগুলিকে, অথবা চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি ঋণের কাঠামোকেও যে কাঠামো গ্লোবাল সাউথকে সর্বদাই দাসত্বে বেঁধে রাখে। দ্য ব্রিকস কনটিনজেন্ট রিজার্ভ অ্যারেঞ্জমেন্ট  এবং/ অথবা দ্য ব্রিকস মাল্টিলেটারাল গ্যারান্টিজ উদ্যোগগুলি আর্থিক স্থিতিস্থাপকতার দিকে পদক্ষেপ হলেও, এগুলি খুবই পরিমিত পদক্ষেপ। প্রস্তাবিত ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ এবং দ্য অ্যাগ্রেরিয়ান নেটওয়ার্কের লক্ষ্য খাদ্য নিরাপত্তা। তবে কর্পোরেট একচেটিয়া কৃষি ব্যবসা, যা বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থায় আধিপত্য  প্রতিষ্ঠা করেছে, তার সঙ্গে সংঘাতে যায়নি ব্রিকস। 

গ্লোবাল সাউথের সামনে চ্যালেঞ্জ

গ্লোবাল সাউথের সামনে চ্যালেঞ্জ হল দারিদ্র, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বেকারত্ব, ঋণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সম্ভবত চীন ছাড়া ব্রিকসভুক্ত অন্য সব দেশগুলি এই সব সমস্যার মধ্যে রয়েছে। চীন লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র থেকে টেনে তুলেছে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ব্রিকসের ঘোষণায় এই সব চ্যালেঞ্জগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে: ২০৩০ অ্যাজেন্ডার (সুস্থিত উন্নয়নের লক্ষ্য) প্রতি ব্রিকস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বেশির ভাগ চ্যালেঞ্জের মূলে রয়েছে অসাম্য, ব্রিকস এরও স্বীকৃতি দিয়েছে। এবং অসাম্যের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্যানেল গঠনের প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ আই গভর্নেন্স, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, হেলথ কর্পোরেশন, টিবি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েছে। 

কিন্তু স্বীকৃতি মানেই সমাধান নয়। এই চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করা যেতে পারে একমাত্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। এবং এখনকার বিশ্বব্যবস্থা, যার লক্ষ্যই হল পেরিফেরি থেকে উদ্বৃত্ত নিংড়ে নিয়ে সেই উদ্বৃত্ত কেন্দ্রে সংহত করা, সেই ব্যবস্থাকে মেনে নিতে অস্বীকার করেই এই সব সমস্যার মোকাবিলা করা যেতে পারে। এ আই সম্পদ যাতে আরও বেশি করে সকলের কাজে লাগানো যায় এবং গ্লোবাল সাউথের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা যায়, ব্রিকসের ঘোষণায় সে কথা বলা হয়েছে। তবে যদি এ আইয়ের পিছনে থাকা মেধা সম্পদ মার্কিন কর্পোরেশনগুলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সেই নিয়ন্ত্রণ যদি  যদি অটুট থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি হয়ে দাঁড়াবে অর্থহীন। ব্রিকস সর্বজনীন স্বাস্থ্যরক্ষার নীতিকে সমর্থন করেছে। তবে এই সমর্থন শূন্যগর্ভ হয়ে দাঁড়ায় যদি না বড় ওষুধ কোম্পানিগুলির একচেটিয়া দাম নির্ধারণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা না যায়। যে খাদ্য নিরাপত্তার কথা ব্রিকস বলছে তা যথেষ্ট হবে না যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষি ভরতুকি বিশ্বের খাদ্য বাজারে সমস্যা সৃষ্টি করে চলতেই থাকে। 

জলবায়ু পরিবর্তন: অর্থ দিতে হবে উন্নত দেশগুলিকেই

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ব্রিকস বড়সড় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নেপালের সাম্প্রতিক যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং আমাদের দেশে এল নিনোর প্রভাব, একদিকে অসময়ে বৃষ্টি এবং ব্যাপক বন্যা এবং অন্যদিকে খরা— এভাবেই আমাদের দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুবই আশার কথা যে, ব্রিকসের ঘোষণায় বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানোর আরও জোরালো ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। আরও আশার কথা যে, ব্রিকস এই স্বীকৃতি দিয়েছে যে, জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে গুরুতর আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলি। নতুন পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেওয়ার কাজেও অর্থের বড় রকমের অভাব রয়েছে। কিন্তু এখানেও ঘোষণায় নাম উল্লেখ করে বলা হয়নি এ সবের জন্য দায়ী কারা। 

জলবায়ু সঙ্কটের জন্য সকলের দায় নেই। এ হল উন্নত দেশগুলির তরফে টানা দুই শতাব্দীব্যাপী লাগামছাড়া কার্বন নিঃসরণের ফল। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে যৌথ কিন্তু পৃথকীকৃত যে দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে, সেটাকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে উন্নত দেশগুলিকে, গ্লোবাল সাউথকে নয়। তারা যে সব দেশকে উপনিবেশে পরিণত করে শোষণ করেছিল, সেই সব দেশের প্রতি তাদের জলবায়ু ঋণ রয়েছে। এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর, সুবিধাজনক শর্তে আর্থিক ঋণ এবং নিজেদের দেশে কার্বন নিঃসরণ কার্যকরীভাবে বন্ধ করা— এ সবের মধ্যে দিয়ে তাদের দায় মেটাতে হবে। জলবায়ুর ক্ষতি করার জন্য ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির উচিত ক্ষতিপূরণ দাবি করা। স্রেফ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অর্থ দাবি করলেই হবে না। 

ভারত: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ছোট শরিক

দিল্লি শীর্ষ সম্মেলনে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দ্বন্দ্ব হল ভারত সরকারের আচরণ। বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এমন বিদেশ নীতি গ্রহণ করেছে যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলে এবং তাদের ছোট শরিক হিসাবে কাজ করে। এই অবস্থান বহপাক্ষিকতার বিরুদ্ধে যায়। 

কোয়াড, এইউকেইউএস, চীনকে ঠেকানোর লক্ষ্যে সামরিক ও বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ গভীরতর করেছে ভারত সরকার। যদিও ব্রিকসের  ঘোষণায় বলা হয়েছে যে পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী মেনে ১৯৬৭ সালের সীমান্তের মধ্যে প্যালেস্তিনীয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দিতে হবে, তবুও ইজরায়েলের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে দিল্লির সরকার। ইরান, ভেনেজুয়েলা ও কিউবায় মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে মুখ খোলেনি তারা। গাজায় ইজরায়েলি গণহত্যার নিন্দা করতে ভারত সরকার সরাসরি অস্বীকার করেছে। 

যে দেশ বহুপাক্ষিক বিশ্বের পক্ষে তাদের আচরণ এমন হতে পারে না। এটা এমন একটা দেশের আচরণ যারা ব্রিকসের সদস্যপদের সুবিধা নিতে চায় মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরোধিতার মূল্য না দিয়েই। মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গ্লোবাল সাউথের টেবিলে একাসনে বসতে চায়। অথচ একই সঙ্গে এই সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বাঁশির সুরে নেচে চলে। 

এই সরকারকে তাদের বিদেশনীতি নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে এবং প্যালেস্তাইন, ইরান, কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিশানা করা দেশগুলির পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ— দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ানোটা শিখতে হবে। আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ পশ্চিম এশিয়ার ১৫টি দেশে যে গবেষণা চালিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, উত্তরদাতাদের ৪৪ শতাংশ ইজরায়েলকে এবং ২১ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করেছে যারা আরবের নিরপত্তার পক্ষে বিপদের উৎস। মাত্র ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন নিরাপত্তার জন্য বিপদের উৎস ইরান। এটা কোনও নতুন প্রবণতা নয়। ইজরায়েল সবসময়ই থেকেছে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক দেশ হিসাবে। এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিক ভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। প্রায় ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে ইজরায়েলের গৃহীত নীতি আরব অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতাবস্থাকে বিপন্ন করে তুলছে। অন্যদিকে মার্কিন নীতি সম্পর্কে একই কথা বলেছেন ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা। সাধারণ ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের মতামত কী, এ প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হয়েছে ৫৬ শতাংশের মতামতে, যা শতাংশের হিসাবে এক দশক আগের চেয়ে বেশি। এমনটা শুধু আরব বিশ্বের মনোভাবই নয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের স্প্রিং ২০২৬ গ্লোবাল অ্যাটিটিউড সার্ভে করা হয়েছিল ৩৬টি দেশকে নিয়ে। তাতে দেখা গেছে বেশির ভাগ দেশের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মত ইজরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক। চোখ খুলে এই বাস্তবতাকে দেখতে হবে ভারত সরকারকে এবং নিজেদের ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করতে হবে।

বাস্তবতার অন্য দিকটি হল দেশের ভিতরে। সরকার দারিদ্র লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে শীর্ষ সম্মেলনের আগে বস্তিগুলোকে ঢেকে দিয়ে এবং শহরের কেন্দ্র থেকে গৃহহীনদের তাড়িয়ে দিয়ে। দারিদ্র, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং গৃহহীনতা কার্পেটের তলায় ঢেকে রাখা যায় না কিংবা অর্থনীতি সংক্রান্ত অঙ্কের কারসাজি অথবা প্রচারের ঝড় দিয়ে এগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। 

যেতে হবে যে পথে

দিল্লির ব্রিকস ঘোষণা গ্লোবাল সাউথের অভিযোগগুলিকে সোচ্চারে উচ্চারণ করেছে। একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এই বিবৃতি, সমর্থন করেছে প্যালেস্তিনীদের অধিকারকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ডাক দিয়েছে। কিন্তু শুধু ঘোষণা দিয়ে জনগণকে মুক্ত করা যায় না। জনগণকে মুক্ত করে সংগ্রাম। 

ভাষণ ও বাস্তবতার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক তার স্বরূপ উন্মোচন করতে হবে বামেদের। সরকারের জবাবদিহি চাইতে হবে এবং আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যা সত্যিকারের পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ব্রিকস সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ফোরাম নয়। তবে এই মঞ্চকে ত্যাগ করাটা কোনও কাজ নয়। আসল কাজ হল একে রূপান্তরিত করা এবং বহুপাক্ষিকতার গণ্ডীর বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেলা। 

প্যালেস্তাইন, ইরান, কিউবা এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের দরকার ঘোষণার চেয়ে আরও বেশি কিছু। তাদের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। সেই পদক্ষেপ আসবে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি, কৃষক, যুবক সহ তেমন সকল মানুষের পক্ষ থেকে যারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ চালিত বিশ্বকে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। এই সংগ্রাম চলবে। 

ঋণ: পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ২১-সেপ্টেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org