রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প, ব্যাঙ্ক-বীমার কর্মীরা কেন যাবেন ব্রিগেডে

দেবাঞ্জন চক্রবর্তী
যদিও, ২৪৯টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ২.৬৪ লক্ষ কোটি টাকা। প্রায় প্রতি বছর কেন্দ্রীয় সরকারকে ডিভিডেন্ট দেয় ১.১৫ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে অনেকগুলি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ৫ লক্ষ কোটি টাকা লাভ করেছে। তা সত্ত্বেও জলের দরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার যে যে সম্পত্তি বিক্রি করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে,

১৯৫১ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কেন্দ্রের সরকার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।

প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কালে ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা স্থাপিত হয়েছিল ২৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে।

সেই থেকে পথ চলা শুরু। কিন্তু ৩০-বছর বাদে প্রথম ধাক্কা শুরু হল– ১৯৮১ সালে, যখন (০৯.১১.১৯৮১) দেশের সরকার আইএমএফ থেকে ৬০০০ কোটি টাকা ধার নিলো দেশের সংসদকে অবহিত না করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার স্বার্থ বিরোধী শর্তে।

এরপর আক্রমণ এলো ড. অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটির রিপোর্টের মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে।

আমাদের দেশে উদার অর্থনীতির খোলা হাওয়া বইতে শুরু করে ১৯৯১ সাল থেকে।

কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি শুরু হল সরকারী কোষাগারে অর্থ আনার জন্য। সেই থেকে এখনো চলেছে।


আর্থিক বছর

লক্ষ্যমাত্রা (কোটি টাকায়)

পূরণ(কোটি টাকায়)

কত শতাংশ পূরণ হলো

১৯৯১ – ৯২

২,৫০০

৩,০৩৮

১২১.৫১%

২০০০ – ০১

১৫,০০০

১৫,৫৪৭

১০৪.২২%

২০১৭ – ১৮

৭২,৫০০

১,০০,৬৪২

১৩৮.৮২%

২০২১ – ২২

১,৭৫,০০০

৯,২৯১

৫.৩১%

২০২৫ – ২৬

১০,০০,০০০ (ধরা হয়েছে)

   

যদিও, ২৪৯টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ২.৬৪ লক্ষ কোটি টাকা। প্রায় প্রতি বছর কেন্দ্রীয় সরকারকে ডিভিডেন্ট দেয় ১.১৫ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে অনেকগুলি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ৫ লক্ষ কোটি টাকা লাভ করেছে। তা সত্ত্বেও জলের দরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি অব্যাহত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকার যে যে সম্পত্তি বিক্রি করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে, যেমন–

সম্পদ

পরিমাণ

কোটি টাকায়

প্রকৃত মূল্য

(১) জাতীয় সড়ক

২৬৭০০ কি.মি.

১,৬০,০০০

৮ লক্ষ কোটি

(২) রেল স্টেশন
১৪০০ কি. মি (১টি পুরো রুট)
৯০টি প্যাসেঞ্জার ট্রেন,
৭৪১ কি.মি. কঙ্কণ রেলওয়ে
১৫টি রেল স্টেডিয়াম

 

১,৫২,৪৯৬

প্রায় দ্বিগুণ

(৩) বিদ্যুৎ পরিবহণ

২৮,৬০৮ সার্কিট কি.মি.

৪৫,২০০

৬০,৬৯৪ কোটি টাকা

(৪) প্রাকৃতিক গ্যাস

৮,১৫৪ কি.মি জাতীয় গ্রিড

২৪,৪৬২

৪০,০০০ কোটি টাকা

(‘ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপ লাইন’ নীতি অনুযায়ী এই ভাবে সরকারি সম্পদ বিক্রি করা শুরু হয়েছে) 

আমাদের রাজ্যে নয়া উদারনীতির ফলে কতগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বন্ধ হয়েছে

১৯৯১ পরবর্তী সময়ে

বর্ধমান জেলা–
(১) এমএএমসি (২) বিওজিএল (৩) এইচএফসিএল (৪) বার্ণ রিফ্র্যাক্টরি (৫) বার্ণ স্ট্যান্ডার্ড লিঃ (ওয়াগন) (৬) জেশপ (৭) আরআইসি (৮) বালকো বিধানবাগ, (৯) সাইকেল কর্পোরেশন (১০) হিন্দুস্থান কেবল (১১) হিন্দুস্থান রাইস মিল (এফসিআই অধীনস্থ), (১২) ইসিএল-এর অধীনে অনেকগুলি কয়লা খনি (১৩) এফএসএনএল  

কলকাতা
(১) ভারত ব্রেকস এন্ড ভাল্বস (২) টায়ার কর্পোরেশন (ট্যাংরা ইউনিট) (৩) স্মিথ স্টেইন স্ট্রিট (৪) বিকো লড়ি (৫) সিআইডব্লুটিসি (একটি বিভাগ), (৬) অ্যান্ড্রু ইউল (দু’টি ইউনিট) (৭) হুগলী প্রিন্টিং প্রেস (৮) ন্যাশনাল ইন্সট্রুমেন্ট (৯) ফারটিলাইজার কর্পোরেশন (প্রমোশনাল কাউন্সিল) (১০) মর্ডান ব্রেড, (১১) এনজেএমসি (১২) এনটিসি মিল (১টি মিল এবং হেড অফিস) 

উত্তর ২৪ পরগণা জেলা
(১) রেরোল বার্ণ (২) ওয়েবার্ড ইন্ডিয়া (৩) ভারত প্রসেস এন্ড মেকানিক্যাল (৪) এনটিসি মিল (চারটে), (৫) ভারত ওয়াগন (৬) বার্ণজুট এন্ড এক্সপোর্ট (৭) বেঙ্গল ইমিউনিটি (৮) ত্রিবেণী স্ট্রাকচারাল

হাওড়া জেলা
(১) হুগলী ডক (২) বার্ণ স্ট্যান্ডার্ড (৩) সাঁতরাগাছি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রেস (৪) পোর্ট ইঞ্জিনিয়ার্স

পূর্ব মেদিনীপুর
(১) হলদিয়া ফার্টিলাইজার

নদীয়া জেলা
(১) সাইকেল কর্পোরেশন

এর মধ্যেও লড়াই আছে। আছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। দুর্গাপুর ইস্পাত, অ্যালয় স্টিল কারখানা বিক্রি করার পরিকল্পনা কর্মীরা রুখে দিয়েছেন। চিত্তরঞ্জন লোকোমটিভ কারখানাকে কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে গলা টিপে হত্যা করতে চাইছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা লড়াই করেই এই চক্রান্ত ব্যার্থ করে চলেছেন।

কয়লা শিল্পে খনিগুলি বেসরকারি হাতে দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে সরকার। ইউনিয়ন বিরোধিতা করছে। স্থায়ী শ্রমিক কমছে, আর ঠিকা শ্রমিক বাড়ছে।

রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্পের শ্রমিক কর্মচারীরা ব্যাপক প্রচারে রয়েছেব্রিগেড ময়দানের সমাবেশে সপরিবারে যোগদানের জন্য। রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে এখনও পর্যন্ত যা অবশিষ্ট আছে, তা ধরে রাখার জন্যই ব্রিগেড জমায়েত থেকে লক্ষ কন্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে।  


 

২০২২

২০২৩

২০২৪

সরকারি ব্যাঙ্কে জমা

কত (কোটি টাকায়)

১০৭,১৭,৩৬২

১১৭,০৯,৫৮১

১২৮,৯৬,৭৬৬

বেসরকারি ব্যাঙ্কে জমা

কত (কোটি টাকায়)

৫৪,৬৪,২৪২

৬২,৯৯,৩১৮

৭৫,৬১,৫০২

তথ্য সূত্র: আইবিএ

একদিকে ডিপোজিট বাড়ছে। অপর দিকে কর্মী সংখ্যা কমছে –                                                         

 

২০১৮-১৯

২০২৩-২৪

সরকারি ব্যাঙ্ক

৮,০৮,৪০০

৭,৪৬,৬৭৯

বেসরকারি ব্যাঙ্ক

৪,৭৬,৩৯০

৮,৪৬,৫৩০

তথ্য সূত্র: আরবিআই      

উপরের দু’টি তথ্যই প্রমাণ করে কেন্দ্রীয় সরকার চায় না, সরকারি ব্যাঙ্ক থাকুক। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডটাই ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বর্তমানে সরকারি ব্যাঙ্কের মোট আমানত ৯১ লক্ষ কোটি টাকা। মোট ঋণের পরিমাণ ৬১ লক্ষ কোটি টাকা। মোট গ্রাহক ১৩৫ কোটি।  

মোট ঋণের মধ্যে থেকে ১৬ লক্ষ কোটি টাকা বড়লোকদের (পুঁজিপতিদের) ছাড় দেওয়া হলো। তাদের আর এই টাকা শোধ দিতে হবে না। কিভাবে জনগণের টাকা লুট হচ্ছে, এই পদক্ষেপ তার একটা জ্বলন্ত প্রমাণ।

ব্যাঙ্কে কর্মরত স্থায়ী ও ঠিকা কর্মীরা ব্রিগেড সমাবেশে যাবেন তাদের অধিকার রক্ষার জন্য আওয়াজ তুলতে। দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব যাতে বজায় থাকে, তার জন্য আওয়াজ তুলতে।  

বীমা
জীবন বীমার মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩০ কোটি। মোট সম্পদ ৫৪ লক্ষ কোটি টাকা। সরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে ৩০ লক্ষ কোটি টাকা।
চারটি সাধারণ বীমা কোম্পানিতে ১৯৭২ সালে মোট বিনিয়োগ ছিল ১৯.৫ কোটি। ২০২৪ সালে তা হয়েছে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ সালে এই চারটি বীমা কোম্পানী প্রিমিয়াম আদায় করতে সামর্থ হয়েছে ৯০,২৫২কোটি টাকা।
এই বীমা ক্ষেত্রে বিদেশী পুঁজিকে কিভাবে স্বাগত জানানো হলো, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে– 
২০০০ সালে ২৬ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৪৯ শতাংশ, ২০২১ সালে ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১০০ শতাংশ।

আরএসএস পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার, সরকারি বীমা ক্ষেত্রকে ধ্বংস করতে উদ্যত। কর্মচারীরা বিরোধিতা করে চলেছে, প্রতিরোধের পথে। তারই বার্তা দিতে সবাই আসবেন ব্রিগেডে।                                                                                                                                                                               


প্রকাশের তারিখ: ১৫-এপ্রিল-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org