|
বাজেট ২০২৪: তিনটি ভ্রান্ত পূর্বানুমান প্রসঙ্গেসাত্যকি রায় |
পুঁজিপতি শ্রমিক নিয়োগ করে তখনই যখন শ্রমিকের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করে লাভ করা সম্ভব হয়। শ্রমিককে নিয়োগ করাটা লাভ করার একটি মাধ্যম, যা জিনিস বিক্রির উপর নির্ভরশীল। পুঁজিপতির কাছে শ্রমিক নিয়োগটা লক্ষ্য নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, শ্রমিক শোষণের মাধ্যমে সৃষ্ট উদ্বৃত্তমূল্য মুনাফায় পরিণত হয় তখনই যখন উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হয়। যদি বাজারে বিক্রি করে মুনাফার হার পুঁজিপতির কাছে গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে শ্রমিকের মজুরিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে এ ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। বরং এই স্কিমগুলির মধ্যে দিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সরকারি কোষাগার থেকে মজুরি সংক্রান্ত ব্যয়ে কিছু ভর্তুকি পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। |
এবারের বাজেটের তিনটি প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপরে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এক, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় ও আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে বেকারি যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, অন্তত নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর, এন ডি এ সরকার সেটা স্বীকার করছে, এবং সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির কিছু প্রকল্প ও অনুদানের কথা বাজেটে বলা হয়েছে। দুই, গত তিন বছর ধরে বাজেটে মূলধনী খাতে ব্যয় বৃদ্ধির যে হার ছিল এবারের বাজেটে তা কমে এসেছে। সরকার এতদিন মনে করেছিল যে সড়ক ও রেল পরিকাঠামোয়ে সরকারি বিনিয়োগের বৃদ্ধি ঘটাতে পারলেই তা ব্যক্তিগত পুঁজিপতিদের বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করবে। কিন্তু দেশে মোট বিনিয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা মূলত সরকারি বিনিয়োগের ফলেই ঘটেছে। উৎপাদন খাতে কর্পোরেট বিনিয়োগ এখনও পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক নয়। তিন, সরকারের কর বাবদ আয় বৃদ্ধি পেলেও, আর্থিক ঘাটতি কমানোর প্রয়োজনীয়তার কারণে জিডিপির সাপেক্ষে দেশের মোট খরচের পরিমাণ গত বেশ কয়েক বছর ধরেই কমে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রথমত, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপায় হিসেবে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থায় নতুন নিয়োগ সুনিশ্চিত করার জন্য কয়েকটি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত যোজনা (এমপ্লয়মেন্ট লিংকড স্কিম) প্রস্তাবিত হয়েছে। নানাভাবে এগুলির সারমর্ম হল, নতুন লোক নিয়োগের খরচ যদি সরকার কিছুটা বহন করে, তাহলে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত সংস্থাগুলি কাজে লোক নিয়োগ করবে। এখন দেখা যাক, এর অন্তর্নিহিত পূর্বানুমানটি কি? যুক্তিটা হল কর্পোরেট সংস্থাগুলির নতুন ব্যক্তিকে কাজে নিয়োগ করছে না তার কারণ নিয়োগের খরচ বেশি। সরকার যদি এই খরচের একটা অংশ বহন করে তাহলে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এর মানে দাঁড়ায় যে, উৎপাদন খরচ কমার ফলে যদি পুঁজিপতিদের মুনাফা বৃদ্ধি পায়, তাহলে তারা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। পুঁজিবাদী সমাজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা পুঁজিপতির লক্ষ্য নয়, বরং উৎপাদনের মধ্যে দিয়ে মুনাফা করাটাই তার লক্ষ্য। ভারতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলির গত বছরের শেষ তিন মাসে আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১ শতাংশ অথচ মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল ১২.৬ শতাংশ। এর অর্থ হল একক পিছু মুনাফার মার্জিন এই ধরনের সংস্থাগুলি এই সময়কালে ব্যাপকভাবে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। সঙ্গে আরেকটি তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ - গত এক দশক ধরে দেশের কর্পোরেট সংস্থাগুলির উৎপাদন ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ১৪.৩৫ শতাংশ অথচ ওই একই সময় এই সংস্থাগুলির আর্থিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধির হার ছিল ১৯.৪ শতাংশ। এখন, উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার তুলনায় যদি আর্থিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফার পরিমাণ বেশি হয় তবে উৎপাদন ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ কম হবে এবং সে কারণেই মুনাফা বৃদ্ধি পেলেও তা উৎপাদনের জন্য নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে - এই অনুমান ঠিক নয়। অতএব শ্রম বাবদ খরচ বেশি ছিল সেই কারণে কর্মসংস্থান হচ্ছিল না, এই ধারণা ভুল। সে কারণে সরকার নতুন কর্মসংস্থান বাবদ খরচের একটি অংশ বহন করলেই কর্মসংস্থান তৈরি হবে, এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়। পুঁজিপতি শ্রমিক নিয়োগ করে তখনই যখন শ্রমিকের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করে লাভ করা সম্ভব হয়। শ্রমিককে নিয়োগ করাটা লাভ করার একটি মাধ্যম, যা জিনিস বিক্রির উপর নির্ভরশীল। পুঁজিপতির কাছে শ্রমিক নিয়োগটা লক্ষ্য নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, শ্রমিক শোষণের মাধ্যমে সৃষ্ট উদ্বৃত্তমূল্য মুনাফায় পরিণত হয় তখনই যখন উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হয়। যদি বাজারে বিক্রি করে মুনাফার হার পুঁজিপতির কাছে গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে শ্রমিকের মজুরিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে এ ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। বরং এই স্কিমগুলির মধ্যে দিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সরকারি কোষাগার থেকে মজুরি সংক্রান্ত ব্যয়ে কিছু ভর্তুকি পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। একইভাবে এই সরকারের গত তিন বছরে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তিগত সংস্থার বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পূর্বানূমানটি যে ভুল ছিল তা প্রমাণিত হয়। আমাদের দেশে কর্পোরেট সংস্থাগুলির বিনিয়োগ হার ২০০৮-০৯ এর আর্থিক সংকটের পর থেকে প্রায় দেড় দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে নিম্নগামী। লক্ষণীয় ব্যাপার হল যে, অতিমারী-পরবর্তী তিন বছরে আমাদের দেশের কর্পোরেট সংস্থাগুলির আয় বৃদ্ধি হয়েছে বার্ষিক ১৫.১ শতাংশ হারে, অথচ মোট স্থায়ী পুঁজি গঠন বৃদ্ধির হার ওই একই সময়কালে ছিল বার্ষিক ৭.৭ শতাংশ আর যদি নেট স্থায়ী পুঁজি গঠন ধরা হয়, তার বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এটা ঠিক যে ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে জিডিপির মোট বৃদ্ধির হার যে ৮.২ শতাংশ ছিল তা মূলত স্থায়ী পুঁজি গঠনের বৃদ্ধির হার ওই আর্থিক বছরে ৯ শতাংশ হওয়ার কারণে। এর বেশিরভাগ অংশটাই ছিল সরকার সৃষ্ট মূলধনী খাতে ব্যয় যা গত তিন বছরে বার্ষিক ৩০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্পোরেট পুঁজির ক্ষেত্রে অন্যতম আশু সমস্যা ছিল অতিমারীর আগে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে পুঁজিভূত ঋণ পরিশোধ করা। ফলে পরবর্তী সময়ে তারা কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও পূর্ববর্তী ঋণের বোঝা পূরণ করতে সেই টাকা খরচা হতে থাকে। নতুন বিনিয়োগের সুযোগ এর কারণে সংকুচিত হয়ে এসেছে। অন্যদিকে কাঠামোগত সমস্যা হল আমাদের দেশে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির হার বার্ষিক মাত্র ৪ শতাংশ। এবং একই সাথে উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহারের হার ৭৩-৭৪ শতাংশ। এর মানে হল, বাজারে চাহিদার সংকট তীব্র। অর্থাৎ উৎপাদন ক্ষমতার একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এমত অবস্থায় যেখানে মানুষের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির হার যথেষ্ট কম সেখানে পুঁজিপতিরা নতুন বিনিয়োগে একেবারেই উৎসাহিত হচ্ছে না। সরকার সড়ক ও রেলপথের পরিকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করায় এই সময়কালে নির্মাণ ক্ষেত্রে কিছু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও সামগ্রিকভাবে শিল্পক্ষেত্রে কর্পোরেট সংস্থার বিনিয়োগ বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক নয়। তৃতীয় প্রসঙ্গটি হল দেশের আর্থিক ঘাটতি গত বছরে জিডিপির ৫.৬ শতাংশ থেকে জাতীয় আয়ের ৪.৯ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে এবারের বাজেটে জিডিপির সাপেক্ষে মোট ব্যয় কমিয়ে আনার রাস্তা গ্রহণ করা হল। প্রথমত আর্থিক ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যটি চাহিদার সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে খুব একটা কার্যকরী হয় না। সামগ্রিক চাহিদার বৃদ্ধি ঘটাতে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি করার দরকার ছিল। কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হচ্ছে , সেটি সরাসরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে কিনা ইত্যাদি বিচার করে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব ছিল। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি হলে তা নতুন চাহিদার সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করতে পারলে সামগ্রিক আয় বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের কর আদায়ও বাড়তে থাকে। কিন্তু যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় জিডিপির সাপেক্ষে আর্থিক ঘাটতি কমানোটা অত্যন্ত জরুরি তাহলে তার অন্য রাস্তাও খোলা ছিল। ওয়ার্ল্ড ইনিকুয়ালিটি ল্যাবের গবেষণা দেখিয়েছে, আমাদের দেশের মোট জাতীয় আয়ের ২৫ শতাংশ মাত্র ১৬২ জন অতি ধনীদের অধিকারে রয়েছে। অথচ দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের অধিকারে রয়েছে জাতীয় আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ। দেশের ০.০৪ শতাংশ অতি ধনীদের ১০ কোটির সম্পত্তির উপরে মাত্র ২ শতাংশ ও ১০০ কোটির সম্পত্তির উপরে ৪ শতাংশ কর চাপালে এবং দশ কোটি এবং একশ কোটি টাকার সম্পত্তি হস্তান্তরের সময়ে যথাক্রমে এককালীন ৩৩ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স চাপালে জিডিপির ৪.৬ শতাংশ অতিরিক্ত কর আদায় হবে যা বর্তমান আর্থিক ঘাটতিকে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটতে নারাজ। আমাদের দেশে সম্পত্তি কর ও কোন ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ইনহেরিটেন্স ট্যাক্সের হার ৪০ শতাংশ, জাপানে ৫৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ শতাংশ। অথচ আমাদের দেশের সরকার দেশের অতি ধনীদের উপরেও কর চাপাতে নারাজ। দেশের ৯৯.৯৬ শতাংশ লোক এই ধরনের করের আওতার বাইরে থাকলেও সরকার ০.০৪ শতাংশ বড় লোকেদের আয় ও সম্পত্তিতে হাত দিতে ইচ্ছুক নয়। অতএব আর্থিক ঘাটতি কমানোর কথা বলে এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দগুলি কমানো হল, কিন্তু ধনীদের আরও ধনী হওয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখা হল। প্রকাশের তারিখ: ২৯-জুলাই-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |