মোদীর রামরাজ্যে বুলডোজার-রাজ

টিম মার্কসবাদী পথ
সেদিন গোটা দেশের শুভেচ্ছাবার্তায় ভেসেছিলেন হাসানরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আবেগঘন বার্তা পোস্ট করেছিলেন এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডলে। ‘উত্তরকাশীতে আমাদের শ্রমিক ভাইদের উদ্ধার অভিযানের সাফল্য সবাইকে আবেগাপ্লুত করছে।’ একদিনের জন্য ‘ন্যাশনাল হিরো’ ছিলেন হাসানরা।

ভাকিল হাসান। তিনমাস-ও হয়নি। আবারও সংবাদের শিরোনামে। 

এই হাসানের নেতৃত্বেই বারোজনের একটি দল উত্তরকাশীতে ইঁদুরের মতো গর্ত করে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ৪১ জন শ্রমিককে এই সেদিন উদ্ধার করেছে। আর বুধবার সকালে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ডিডিএ) বুলডোজার তাঁর মাথার ছাদটাই গুড়িয়ে দিয়েছে। আগাম কোনও নোটিশ ছাড়াই। ডিডিএ কাজ করে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। স্ত্রী, তিনসন্তানকে নিয়ে বারো বছর ধরে এই বাড়িতে থাকতেন হাসান। সেই আশ্রয়ই মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে ডিডিএ-র আগ্রাসী বুলডোজার। রাতারাতি খোলা আকাশের নিচে হাসানের পরিবার। 

যাগ-যজ্ঞ, হোম-প্রার্থনা নয়। জয় শ্রীরাম বা ‘মোদী মোদী’ ধ্বনিও নয়। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের চরম ব্যস্ততার মধ্যে লোক দেখানো খোঁজ নেওয়াও নয়। বিশ্বগুরুর ডিজিটাল ইন্ডিয়া-র যাবতীয় কেরামতি যখন মুখ থুবড়ে পড়েছে, আমেরিকার মেশিন যখন বিকল হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে অথৈ জলে, তখন অদম্য সাহস আর জেদে মৃত্যুভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে জীবনযুদ্ধে সহযোদ্ধা শ্রমিকদের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকরাই। 

সতেরো-দিনের উৎকণ্ঠার শেষ। হাসি ফুটিয়েছেন একচল্লিশ জন বিপন্ন শ্রমিক, তাঁদের স্বজন এবং সর্বোপরি ভারতবাসীর মুখে। দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকের প্রকৃত বন্ধু শ্রমিকরাই। বারোজনের দলে সাতজন মুসলিম, পাঁচজন হিন্দু। ধর্ম-জাতপাতের ঊর্ধ্বে চলে আসে শ্রেণি। শ্রেণি-ঐক্য, শ্রেণি সংহতি। দেখিয়ে দিয়েছেন অসাধ্য, অজেয় বলে কিছু নেই। শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই। জয় করার জন্য আছে গোটা দুনিয়া। এ ওয়ার্ল্ড টু উইন। 

দিল্লির বাসিন্দা ভাকিল। রাজধানী শহরেই ম্যানুয়াল জ্যাক পুশিং-এর কাজ করেন। মাটির তলায় জলের লাইন, কেবল লাইন বসানোর কাজ। ঠিকাদারি সংস্থায়। সিআইটিইউ অনুমোদিত রাজধানী ভবন নির্মাণ কামগর ইউনিয়নের সদস্য। ভাকিল একা নন। বারোজনের দলে ছ’জনই সিআইটিইউ-র সদস্য। 

সেদিন গোটা দেশের শুভেচ্ছাবার্তায় ভেসেছিলেন হাসানরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও আবেগঘন বার্তা পোস্ট করেছিলেন এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডলে। ‘উত্তরকাশীতে আমাদের শ্রমিক ভাইদের উদ্ধার অভিযানের সাফল্য সবাইকে আবেগাপ্লুত করছে।’ একদিনের জন্য ‘ন্যাশনাল হিরো’ ছিলেন হাসানরা। 

আর এখন ভোটের মরসুমে তা হতে চাইছেন মোদী। তিনি সর্বত্র, সর্বব্যাপী। পত্রিকার প্রচ্ছদে, বিলবোর্ডে, চ্যানেলে। বিমানবন্দর থেকে রেল স্টেশনের থ্রি-ডি সেলফি বুথে। তিনি সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ। তিনি বাস্তব, পরাবাস্তব। আবার অবাস্তবও বটে। কে কীভাবে দেখছেন, নির্ভর করছে তাঁর ওপর। তবে তাঁকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই। এদেশে থাকলে তাঁর হাত থেকে নিস্তার নেই। 

নিজেকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছেন বিগ্রহের পর্যায়ে। তিনি এখন একইসঙ্গে ঈশ্বর এবং জনগণের বেছে নেওয়া একজন প্রতিনিধি। যিনি রাম, তিনিই প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা এবং রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় যেমন বলেছেন, ‘মোদী নিজেই বিষ্ণুর একাদশতম অবতার!’ আর মোদী নিজে বলেছেন, ‘ঈশ্বর আমাকে এই অনুষ্ঠানে ভারতের সমস্ত জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে বলেছেন।’ যেন ঈশ্বরের প্রেরিত দূত! হিন্দুত্বের ধাঁচে এটিই হলো শাসন করার ঐশ্বরিক অধিকার! রামরাজ্যে সবার ঊর্ধ্বে ‘বিষ্ণুর একাদশতম অবতার!’ অধিকাংশ মিডিয়া তাতেই মন্ত্রমুগ্ধ। ভয়ে অথবা ভক্তিতে। বিশ্বগুরু’র প্রচারের তুফানে কে বলবে ডিমোলিশন ম্যান থেকে বুলডোজার ম্যান। 

মোদী সরকারের সময় অর্থনৈতিক কাঠামোগত পুর্ননির্মাণের পাশাপাশি কাজের সম্পর্কেরও পুনর্নির্মাণ ঘটানো হচ্ছে মুখ্যত তিনটি পদ্ধতিতে। প্রথমত, মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক তুলে দিয়ে ফর্মাল সেক্টরকে পরিণত করা হচ্ছে পুরো দস্তুর ইনফর্মাল সেক্টরে। দ্বিতীয়ত, ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে অটোমেশন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যপক প্রয়োগ। এবং তৃতীয়ত, স্থায়ী কাজের ধারণা তুলে দিয়ে ঢালাও ঠিকাকরণ, চুক্তিকরণ ও গিগ-করণ।

ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিকাঠামো এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের সর্বত্র চলছে ভয়াবহ ঠিকাকরণ। ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে স্থায়ী শ্রমিক ছাঁটাই করে সর্বত্র চলছে চুক্তিভিত্তিক ঠিকাকরণের কাজ। রাষ্ট্রায়ত্ত ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে চুক্তিভিত্তিক ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা ইতিমধ্যে মোট শ্রমিকের ৬০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। পাওয়ারগ্রিড, এনটিপিসি, এনএইচপিসি’র মত সংস্থায় ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ। স্থায়ী শ্রমিকের বদলে চালু হয়েছে অস্থায়ী ক্ষণস্থায়ী কাজের সম্পর্কের শ্রমিক বাড়ানোর নিত্যনতুন প্রক্রিয়া। অন জব ট্রেনি, লং টার্ম ট্রেনি এমপ্লয়িজ, আর্ন হোয়াইল ইউ লার্ন, জুনিয়র একজিকিউটিভ, ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়িজ-র মতো নানা পরিভাষায়। সর্বত্র অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়োগ চলছে স্বল্প মেয়াদে। স্বল্প মজুরিতে।

অন্যদিকে চলছে কাজের বাজারের গিগ-করণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পদ্ধতির সাধারণ চরিত্র হচ্ছে: কাজের সময় বৃদ্ধি, কাজের দিন বৃদ্ধি, কম মজুরি, শ্রম আইনের অনুপস্থিতি এবং শ্রম পদ্ধতির উপর পুঁজির পরোক্ষ দখলদারি। স্থায়ী কাজের বদলে ক্রমশ বাড়ছে আউটসোর্সিং, সাময়িক চুক্তিভিত্তিক কাজ। যা কাজের সময় এমনকী নিয়োগ সম্পর্ককেও অনিশ্চিত, ভঙ্গুর এবং অনিয়মিত চেহারা দিচ্ছে। শ্রমিকদের এক অংশ আছেন, যাঁদের কাজ পুরোটাই অস্থায়ী চরিত্রের। যেমন গিগ অর্থনীতিতে যাঁরা কাজ করেন, যাঁরা ওলা, উবের, অ্যামাজন-এর মতো সংস্থার কর্মী। শ্রম আইন সংস্কারের নামে কার্যত শ্রমিকদের মধ্যযুগীয় ক্রীতদাস বানাতে চাইছে। শ্রম কোড আইন এই লক্ষ্যেই সংসদে পাশ করানো হয়েছে গায়ের জোরে।

মোদীর কর্পোরেট-হিন্দুত্বের রাজে শ্রমিকের কোনও মূল্য নেই। মেহনতির কোনও মূল্য নেই। কর্পোরেট স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রা‍‌ধিকার। দেশের যাবতীয় সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে কর্পোরেটের ঘরে। মানুষের উপর বাড়ছে শোষণের বহর। বাড়ছে সম্পদ ও আয় বৈষম্য। মানুষের দুর্দশা আর অসহায়তা। অক্সফামের রিপোর্টে অসহায় আর্তনাদ। ধনীশ্রেষ্ঠ ১ শতাংশের হাতে দেশের ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ, যেখানে আয়ের দিক থেকে নিচের দিকে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ৩ শতাংশ! 

সেইসঙ্গেই বাড়ছে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব। 


প্রকাশের তারিখ: ০১-মার্চ-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org