কাবো ভার্দে, ফিদেল এবং চে

শমীক মণ্ডল
একই সময়ে, কিউবা গোপনে কাবো ভার্দের ছত্রিশ জনের একটি দলকে স্বাগত জানায়। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন পেদ্রো পিরেজ— যিনি স্বাধীনতার পর কাবো ভার্দের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। প্রায় দু’বছর ধরে কিউবা তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়। লক্ষ্য ছিল— প্রশিক্ষণ শেষে— কাবো ভার্দের কোনও একটি দ্বীপে (সান্তো আন্তাও অথবা সান্তিয়াগো— উভয়ই পাহাড়ি এলাকা) পিএআইজিসি-র গেরিলা যোদ্ধারা নৌ-পথে অবতরণ করবে। এবং দলের স্থানীয় গোপন সংগঠনের সহায়তায় পুরো দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে সশস্ত্র সংগ্রামকে ছড়িয়ে দেবে। তবে ১৯৬৭-র শেষের দিকে, কাবরাল এবং পিএআইজিসি-র নেতৃত্ব এই অবতরণ পরিকল্পনাটি বাতিল না করে কেবল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও, পর্তুগিজ ফ্যাসিবাদী ও ঔপনিবেশিক স্বৈরতন্ত্রের দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও, তারা দলের নৌ-বাহিনী গড়ে তোলার এবং দ্বীপগুলোতে গোপন নেটওয়ার্ক বিস্তারের কার্যক্রম জারি রাখে। 
আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে গিনি-বিসাউ এবং কেপ ভার্দে— এই দু’টি দেশই একসময় ছিল পর্তুগিজ উপনিবেশ। দুইয়ের দূরত্ব ৯৩০ কিলোমিটার। অতলান্তিকের নীল জলরাশির বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা কেপ ভার্দের নাম এখন কাবো ভার্দে, সবুজ অন্তরীপ। সাড়ে পাঁচ লক্ষের দেশ। বিশ্বকাপ খেলছে এই প্রথম বার। প্রথম বারেই নক আউটে। আর্জেন্টিনার মতো দলকে পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে ১২০ মিনিট! দু’বার এগিয়ে গিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি গত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা। শেষে হেরে গিয়েও বিশ্বের হৃদয় জিতে নিয়েছে ক’দিন আগেও প্রায় অজানা এই একরত্তি দ্বীপরাষ্ট্রটি। 

আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে এই বিশ্বকাপে হারেনি একটিও ম্যাচ। টুর্নামেন্টের প্রথম দিন থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এই অনামী দেশটির প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের কথা। যদিও তা ছিল মাঠের ভিতরের লড়াই। কিন্তু দেশটির মাঠের বাইরের ইতিহাস বা স্বাধীনতার লড়াইয়ের কথা খুব একটা আলোচনায় আসেনি। কাবো ভার্দের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন ছিল এক সুতোয় বাঁধা। গোটা আফ্রিকাকে নিয়েই যে স্বপ্ন বুনেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রোরা। 

বিশ শতকের মাঝামাঝি আফ্রিকাজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ উঠলে, গিনি-বিসাউ এবং কাবো ভার্দে— এই দু’টি দেশেও জোরালো হয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। স্বাধীনতার জন্য দু’দেশের এক মরণপণ সংগ্রাম। ছিল এক যৌথ লড়াই। এই অভিন্ন ইতিহাস ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ দু’টির মধ্যে গড়ে ওঠে এক গভীর সম্পর্ক। আমিলকার কাবরালের নেতৃত্বে আফ্রিকান পার্টি ফর দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ গিনি অ্যান্ড কেপ ভার্দে (পিএআইজিসি) নামে একটিই বিপ্লবী আন্দোলন ছিল দুই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বে।
 
পাশে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, সমাজতান্ত্রিক কিউবা। 


আমিলকার কাবরাল।

১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিসাউ শহরে কাবরাল ও তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধা মিলে গঠন করেন পিএআইজিসি। কাবরাল ছিলেন গিনি বিসাউ ও কাবো ভার্দের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা। ফিদেল ঘনিষ্ঠ আফ্রিকান নেতাদের মধ্যে অন্যতম। দুই দেশকে এক করে একটি অবিভক্ত সমাজতান্ত্রিক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ১৯৬৩-তে তাদের স্বশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার আগে পিএআইজিসি-কে লড়তে হয়েছিল বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক লড়াই। পর্তুগিজদের তৈরি উপজাতীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে যেমন লড়তে হয়েছে— তেমনই গ্রামীণ জনগণের সমর্থন আদায় থেকে ক্লিনিক, মিলিশিয়া, কাউন্সিল গঠন, মেয়েদের নেতৃত্বে তুলে আনার মতো জরুরি কাজও করতে হয়েছে পিএআইজিসি-কে। 


ভিক্টর দ্রেকের সঙ্গে কাবরাল, ১৯৬৭।

১৯৬৭-৬৮, কিউবার এই আন্তর্জাতিকতাবাদী সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফিদেলের বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর একজন তরুণ অথচ অভিজ্ঞ কমান্ডার— ভিক্টর দ্রেকে। এই দ্রেকেই ছিলেন কিউবা বিপ্লবের লড়াইয়ে সান্তা ক্লারার নির্ণায়ক সংগ্রামের চে গুয়েভারার সহযোদ্ধা। কঙ্গোয় বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণে চে’র সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। এই দ্রেকেই ছিলেন ফিদেল ও কাবরালের মধ্যেকার সাঁকো। ১৯৬৭-৬৮-তে তিনিই ছিলেন গিনি বিসাউতে কিউবার আন্তর্জাতিক সামরিক মিশনের প্রধান। কিউবান বিপ্লবীরা সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়ার চেয়ে প্রশিক্ষক ও ‘স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসাবেই কাজ করা শুরু করেন। তারা গোপনে পর্তুগিজদের চোখ এড়িয়ে গিনি বিসাউ সীমান্তবর্তী দেশ গিনিতে এসে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বিসাউয়ের গভীর জঙ্গলে পিএআইজিসি-র গেরিলা ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন। ভারী অস্ত্র প্রশিক্ষণ থেকে গেরিলা রণকৌশল তো ছিলোই। পিএআইজিসি কিউবা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল কিউবার চিকিৎসা সহায়তা পেয়ে। কিউবার চিকিৎসকদের মানবিক মিশন শুধুমাত্র গেরিলা বিপ্লবীদের কাজে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুক্তাঞ্চলগুলির সাধারণ নাগরিকদের শুশুস্রার কাজেও তারা কার্যকরী ভূমিকা নেয়। কিউবার সঙ্গে পিএআইজিসি-র ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পর্তুগিজ সেনার বোমাবর্ষণ রোধের ক্ষেত্রে সোভিয়েত ক্ষেপনাস্ত্র সহায়তা পেয়েছিল গিনি বিসাউ ও কাবো ভার্দে। শুধু সামরিক বা চিকিৎসা সহায়তা নয়, কিউবা এই দেশ দুটির তরুণদের দিয়েছিল স্কলারশিপ, এনেছিল হাভানাতে।  


ফিদেলের সঙ্গে কাবরাল। ১৯৬৬, হাভানায়।

পিএআইজিসি-র যোদ্ধারা পাঁচশ বছরের পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও আধিপত্যের অবসানের লক্ষ্যে লড়াই চালান। সেই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিনির জনগণের বিজয় আফ্রিকায় সর্বশেষ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা ঘটায়। এর ফলে ১৯৭৪ সালে কেবল গিনি-বিসাউ-ই নয়, বরং তার পরের বছর কেপ ভার্দে, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক এবং সাও তোমে ও প্রিন্সিপেও স্বাধীনতা অর্জন করে।

কিউবার সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ ও পিএআইজিসি-র আপসহীন সংগ্রামের ফলে ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে গিনি বিসাউ ও কাবো ভার্দে স্বাধীনতা পেলেও, তা দেখে যেতে পারেননি কাবরাল। ফ্যাসিবাদী পর্তুগিজ শাসনও উৎখাত হয় সেবছর। ১৯৭৩, মার্কিন মদতে পর্তুগিজ এজেন্টদের ষড়যন্ত্রে শহীদ হন কাবরাল। তাঁর মৃত্যুর পরেও কিউবা সহায়তা চালিয়ে যায়। কিউবা বিপ্লব কাবরালকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর চিন্তাভাবনা ও প্রয়োগে তা স্পষ্ট দেখা যায়। প্রায় ৪০০ জন কিউবার আন্তর্জাতিকতাবাদী স্বেচ্ছাসেবক গিনি বিসাউ ও কাবো ভার্দের মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। 


চে-র সঙ্গে দ্র্রেকে।

১৯৬৫ সালের গোড়ায় চে গুয়েভারা যখন আফ্রিকা জুড়ে এক দীর্ঘ সফরে বের হন, তখন গিনি সাধারণতন্ত্রের কোনাক্রিতে কাবরালের সঙ্গে তাঁর প্রথম কথা হয়। সেই বৈঠকের পর থেকেই পিএআইজিসি ও কিউবার মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হয়। পরের বছর ১৯৬৬-র জানুয়ারিতে কাবরাল এবং তাঁর দলের একটি প্রতিনিধিদল আসে হাভানায়। ‘আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার জনগণের সাথে সংহতি বিষয়ক প্রথম সম্মেলন’-এ অংশগ্রহণ করে। ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলনে তাঁর বিখ্যাত ভাষণ ‘দ্য ওয়েপন অব থিওরি’ শুনে মুগ্ধ হন ফিদেল। এই ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলনের পর থেকেই দুই নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পিএআইজিসি-র স্বশস্ত্র সংগ্রামে কিউবার পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষণা করা হয়। হাভানায় ফিদেলের সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ আলোচনা করেন কাবরাল। কমানদান্তের সঙ্গে দ্বীপটি ঘুরে দেখেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সহায়তা করার লক্ষ্যে গিনি-বিসাউয়ের মুক্তাঞ্চলগুলিতে চিকিৎসক ও সামরিক উপদেষ্টাদের পাঠায় কিউবা।

একই সময়ে, কিউবা গোপনে কাবো ভার্দের ছত্রিশ জনের একটি দলকে স্বাগত জানায়। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন পেদ্রো পিরেজ— যিনি স্বাধীনতার পর কাবো ভার্দের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। প্রায় দু’বছর ধরে কিউবা তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়। লক্ষ্য ছিল— প্রশিক্ষণ শেষে— কাবো ভার্দের কোনও একটি দ্বীপে (সান্তো আন্তাও অথবা সান্তিয়াগো— উভয়ই পাহাড়ি এলাকা) পিএআইজিসি-র গেরিলা যোদ্ধারা নৌ-পথে অবতরণ করবে। এবং দলের স্থানীয় গোপন সংগঠনের সহায়তায় পুরো দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে সশস্ত্র সংগ্রামকে ছড়িয়ে দেবে। তবে ১৯৬৭-র শেষের দিকে, কাবরাল এবং পিএআইজিসি-র নেতৃত্ব এই অবতরণ পরিকল্পনাটি বাতিল না করে কেবল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও, পর্তুগিজ ফ্যাসিবাদী ও ঔপনিবেশিক স্বৈরতন্ত্রের দমন-পীড়ন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও, তারা দলের নৌ-বাহিনী গড়ে তোলার এবং দ্বীপগুলোতে গোপন নেটওয়ার্ক বিস্তারের কার্যক্রম জারি রাখে। 


ফিদেলের সঙ্গে পেদ্রো পিরেজ।
 
কিউবায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাবো ভার্দের দেশপ্রেমিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী যোদ্ধারা গিনি-বিসাউয়ের গেরিলা আন্দোলনে যোগ দেন। এবং সেখানে অর্জিত বিজয়ে অনন‍্য অবদান রাখেন। পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন রণাঙ্গনে (অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, গিনি-বিসাউ, কাবো ভার্দে এবং সাও তোমে ও প্রিন্সিপি) অভিন্ন শত্রু— পর্তুগিজ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে পরিচালিত রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে গভীর পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি আরও সুদৃঢ় করেন।

‘মানবতার কাছে ঋণ শোধ’— যে কথা প্রায়শই বলতেন ফিদেল। আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামে কিউবার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল সেই রাজনৈতিক দায়িত্বেরই অংশ। কিউবা বিপ্লবের আদর্শ শুধুমাত্র তাদের নিজেদের মুক্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের কথাই বলে না। সমস্ত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রতি দায়বদ্ধতা, বিশেষত আফ্রিকার দেশগুলির প্রতি তাদের আপসহীন সংহতি প্রদর্শন ছিল কিউবা বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলজিরিয়া থেকে অ্যাঙ্গোলা— কঙ্গো থেকে গিনি-বিসাউ ও কাবো ভার্দে পর্যন্ত এই সংহতি কিউবার শ্রমজীবী মানুষকে যেমন রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী করেছিল— তেমনই আফ্রিকার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেও সমাজতন্ত্রের বীজ বপণ করেছিল।

প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org