গৃহশ্রম ও মহিলাদের লড়াই

সেলমা জেমস
একজন মহিলা বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই দেখে যে এবার তাকে বেশ কিছু বাড়তি দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এ হল সেইসব দায়িত্ব যা কিছু পালন করার শিক্ষা তাকে ছোটো থেকেই দেওয়া হয়েছে। ঘর যে আসলে তারই কাজের জায়গা এই উপলব্ধি আসে বিবাহের পরেই। স্বামী বাইরে চলে যান এবং সন্তান প্রতিপালন থেকে শুরু করে বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা, খাবার রান্না করা, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার সবই আসলে তারই কাজ— এমনটাই বুঝে নিতে হয় তাকে। যদিও কিছুদিন পরেই সিনেমার মতো সুন্দর ছবির মতো সংসারের আসল রুপটি তার চোখে ফুটে ওঠে। গৃহস্থালি সামলানোর দায় এমনই এক অন্তহীন কাজ যা একঘেয়ে লাগতে বাধ্য। ফলে কিছুদিন বাদেই ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে তাকে এমন সব কাজ করতে হচ্ছে যেগুলি তার ইচ্ছা হোক বা না-হোক তারই কাজ বলে নির্ধারিত।

গৃহশ্রম ও মহিলাদের কাজ

আজকাল পত্র-পত্রিকায় মহিলাদের নিয়ে লেখার ছড়াছড়ি। এইসব লেখায় দু-রকম বিষয় থাকে, হয় সমাজের উপরতলার আবাসিকদের বিবাহ-সমাচার কিংবা বেড়ে চলা বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। কোথাও যদিও বা মহিলাদের কাজকর্ম নিয়ে কিছু লেখা হল, তারা লিখবেন শিল্প-কারাখানা থেকে সর্বত্র কত বেশি মহিলারা যুক্ত হচ্ছেন না-হলে লিখবেন কীভাবে বাড়ির কাজের চাপে তারা দম ফেলার সময়টুকু পায় না। এই সময়টুকু না-পাওয়ার অর্থ যে কী সেকথা তারা ব্যাখ্যা করেন না। আসলে এরা সবাই দেখাতে চান মহিলারা কত ভালো আছেন।  

এত কথা লিখে কলাম লেখকরা (এমনকি লেখিকারাও) যা আড়াল করতে চান তা হল কোটি কোটি মহিলার রোজকার জীবনসংগ্রাম, তারা চেপে রাখতে চান এই সত্য যে শ্রমজীবী হিসাবেই বেশির ভাগ মহিলাদের বেঁচে থাকতে হয়। কারণ ‘ক্যারিয়ার’ রয়েছে এমন জীবনের বাইরে অসংখ্য মহিলাকে নিজেদের জীবনে, পরিবারের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়— কেউই চায় না সেই পরিশ্রম স্বীকৃতি পাক। তাতে গুটিকয়েকের বদলে এক বিরাট অংশের মানুষ উজ্জীবিত হওয়ার, সমাজ বদলের সম্ভাবনা বাড়ে যে! 

রোজগেরে মেয়েদের প্রসঙ্গে 

বিয়ে করার আগে রোজগারে যুক্ত থাকার বিষয়টি এখনকার মেয়েদের জন্য আর নতুন কোনও বিষয় না। আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও এমন ঘটনা লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। রোজগেরে মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের বিবাহ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, এবং তারা বলে ‘আমাদের মায়েরা যেভাবে চার-দেওয়ালের মধ্যে নিজেদের জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন আমরা তেমনটা করতে আগ্রহী নই’। একথার উত্তরে কোনও হিতাকাঙ্ক্ষী যদি বলেন ‘তুমি তোমার মায়ের মতো হওনি!’- তখন তার উত্তরে শুনতে হয় ‘তারা নিজেদের মতো করে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার চাইতে বেশি কিছুর প্রত্যাশা করেননি, আমরা ভিন্ন মানুষ— নিজেদের জীবন সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব প্রত্যাশা রয়েছে’। 

এইসব মেয়েরা ভবিষ্যতে নিজেদের পরিবারে একটিমাত্র আয়ের উপরে নির্ভরশীল থাকতে চায় না। তাই তারা বিয়ের পরেও কাজে যুক্ত থাকতেই চায়। মূল সমস্যাটি তৈরি হয় ঠিক এখানেই— এক দীর্ঘ সময় জুড়ে তারা যে-সমস্ত মূল্যবোধ শিখে বড়ো হয়েছে সেগুলি বয়ে বেড়ালে যে আর সামনে চলা যায় না অচিরেই তারা সেই সত্য উপলব্ধি করে ফেলে। নতুন জগতে (কাজের দুনিয়ায় শ্রমজীবী হিসাবে) টিকে থাকতে তাদের উপযুক্ত মূল্যবোধের প্রয়োজন হয়, তারা নিজেরাই সেই বোধে সঞ্জাত হয়। বিয়ের আগে নিজের পছন্দের সঙ্গীটির (সেলমা জেমস পুরুষ বলেই উল্লেখ করেছিলেন, আমরা সঙ্গী শব্দটি বেছে নিয়েছি) সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াও এখন আর এক কথায় খারাপ কাজ বলা হয় না। নিজের পছন্দের সঙ্গী বেছে নেওয়ার প্রসঙ্গে মেয়েদের অধিকার কিছুটা অন্তত এগিয়েছে বলা চলে। 

‘আরে! আপনি তো আমায় ভয় দেখিয়ে দিলেন!’

একজন অবিবাহিত মহিলা বিয়েতে রাজি হওয়া এবং নিজস্ব স্বাধীনতাটুকু জলাঞ্জলি দেওয়ার বিষয়ে অন্তত দু-বার চিন্তা করে। এতদিন নিজের খেয়াল খুশি মতো চলাফেরাটুকু তার ছিল। যদিও পুরুষদের মতো স্বাধীনতা তার কখনোই ছিল না তবু এটুকু তো বলাই যায় যে সে নিজের সিদ্ধান্তটুকু নিজেই নিতে পারত। বছর কুড়ি বয়সের এক তরুণী আমার সহকর্মী ছিল, কথায় কথায় সে আমায় বলে যে ইতিমধ্যেই দু-বার সে বিয়ে করতে চলেছিল, যদিও সে এখন খুশি যে দু-বারই ব্যাপারটা শেষ অবধি গড়ায়নি। সে আরও বলে ‘অন্যান্য মেয়েদের (বিবাহিত) কথাবার্তা শুনে বুঝি আমি কতটা ভালো আছি’। সে তাদের কথার উত্তরে বলে, ‘আরে! আপনি তো আমায় ভয় দেখিয়ে দিলেন! এতো যা বলছেন দেখছি, সেই ছোটোবেলায় বাড়িতে কাজ করা পরিচারিকাদের মতোই আপনার অভিজ্ঞতা।’ 

ভুলে যাওয়া অনুচিত, সব মেয়েই চায় নিজের পরিবার, নিজের সংসার। বিবাহ সম্পর্কে তাদের আজকের অবস্থান আদৌ বিবাহের বিরুদ্ধে নয়, বিবাহের যে চেহারাটি আজও সমাজে বিদ্যমান রয়েছে— সেটুকুই তারা নাকচ করতে চাইছে। 

বিবাহের পর যা ঘটে

একজন মহিলা বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই দেখে যে এবার তাকে বেশ কিছু বাড়তি দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এ হল সেইসব দায়িত্ব যা কিছু পালন করার শিক্ষা তাকে ছোটো থেকেই দেওয়া হয়েছে। ঘর যে আসলে তারই কাজের জায়গা এই উপলব্ধি আসে বিবাহের পরেই। স্বামী বাইরে চলে যান এবং সন্তান প্রতিপালন থেকে শুরু করে বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা, খাবার রান্না করা, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার সবই আসলে তারই কাজ— এমনটাই বুঝে নিতে হয় তাকে। যদিও কিছুদিন পরেই সিনেমার মতো সুন্দর ছবির মতো সংসারের আসল রুপটি তার চোখে ফুটে ওঠে। গৃহস্থালি সামলানোর দায় এমনই এক অন্তহীন কাজ যা একঘেয়ে লাগতে বাধ্য। ফলে কিছুদিন বাদেই ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে তাকে এমন সব কাজ করতে হচ্ছে যেগুলি তার ইচ্ছা হোক বা না-হোক তারই কাজ বলে নির্ধারিত। 

সন্তান প্রতিপালন

কিছু দম্পতি অবশ্য শুরুর দিকে বাড়ির কাজে এই চিরায়ত বিভাজন থেকে সরে আসার চেষ্টা করেন। একজন মহিলা (সন্তান হওয়ার আগে) বাড়িতে কাজ করছেন, পুরুষটি বাড়িতে ফিরে সেই কাজ ভাগ করে নেন। সন্তান হওয়ার আগে অনেক স্বামী-ই স্ত্রীর চাইতে ঘরের কাজ কম করেন না। কিন্তু কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়ার ধারণাটাই স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যায় যখন দুজনের মাঝে একটি শিশু চলে আসে। মা হওয়ার পরে সন্তান, ঘর-সংসার সবকিছুর ভার গিয়ে পড়ে মহিলাদের উপরে। সন্তান ধারণের জন্য একজন মহিলা নিজের কাজ ছেড়ে দেন, কিন্তু একজন পুরুষ মনে করেন না যে তাকেও কিছু বাড়তি সাহায্য করতে হবে। বিয়ে করার পরবর্তীকালে তাদের দাম্পত্য জীবনে যে শ্রমবিভাজন ছিল তা বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়। বাচ্চারা বাবা-মাকে একত্রিত করার পরিবর্তে তাদের ভাগ করে ফেলে। সন্তান হওয়ায় মহিলাটি ঘরে আটকে পড়েন, অথচ পুরুষটি তার কাজে যথাবিহিত ব্যস্তই থাকেন। সন্তানের আগমন বাড়ির বাইরে কাজ করাকে প্রায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিণত করে। খুব কম পুরুষই শিশুর যত্ন নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হন। তারা মনে করেন শিশুদের ডায়পার বদল করা কিংবা স্নান করানোর কাজটি কখনই তাদের কাজ নয়। স্ত্রী-সন্তানদের সাথে বাড়িতে থাকতে হলেও তাদের সাথে বাড়ির দায়িত্ব নেওয়ার কোন কারণ নেই। তারা ইচ্ছামতো বাইরে যেতে পারেন, ইচ্ছামত কাজ করতে পারেন কারণ সন্তানদের প্রতিনিয়ত বাড়িতে সময় দিতে স্ত্রীরা তো আটকে আছেই। বন্ধুবান্ধব সহ আলাপ-আলোচনাই হোক কিংবা বাইরে বেড়িয়ে এসে নিজেকে হাল্কা রাখার ব্যাপার যাই হোক না কেন— এসবই আসলে পুরুষদেরই সুবিধা। মহিলারা ওই একই সময়ে আসলে কাজেই ব্যস্ত থাকছেন। এমন পরিস্থিতিতেই মহিলাদের মেজাজ খারাপ হয়, সিনেমার মতো সাজানো-গোছানো সংসারে অশান্তির আবহ বাজতে থাকে। সন্তানের দায় দুজনেরই, কিন্তু দায়িত্ব একজনের। পুরুষরা এমনভাবে জীবন চালিয়ে যায় যেন কিছুই হয়নি। এমন পরিস্থিতির সহজ সমাধান অবশ্যই রয়েছে— মহিলারা বাড়ির কাজে আটকে থাকলে স্বামীরাও বাড়ির কাজ ভাগ করে নিতে পারেন। 

জীবনযুদ্ধে অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা

স্বামীর বেতন বাড়ে আর স্ত্রী প্রতিবার নিজেকে বলে, এবার আমার অবস্থা ফিরবে। যদিও কিছুদিন বাদেই সে বুঝতে পারে যে বেতনবৃদ্ধির হার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির হারের চাইতে সবসময়ই কম! যেটুকু অতিরিক্ত কিছু অর্থে তার অবস্থা বদলের স্বপ্ন ছিল, তার ইচ্ছা ছিল ঘরদোর কিংবা পরিবার কিংবা নিছকই নিজের অবস্থার কিছু জরুরি পরিবর্তন ঘটবে সবটাই ঝুটা প্রমাণিত হয়। যতদিনে তার স্বামীর বেতন কিংবা মজুরি যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ে ততদিনে হয় তিনি আগেকার সামর্থ্য হারিয়েছেন, না-হলে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অর্থাৎ যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানেই আবার ফিরে এসেছেন৷ শ্রমিক পরিবারগুলি কার্যত দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থায় টিকে থাকে৷ আপদ-বিপদের অবস্থার জন্য সরিয়ে রাখা অর্থ তাদের নেই বললেই চলে। একটি মাসের বেতন বা মজুরি না-জুটলেই তাদের রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর অবস্থা তৈরি হয়। অথচ অবস্থা যাই হোক না কেন এই সমস্ত সময়ের মধ্যে গৃহিণীকে কোনও না কোনওভাবে গৃহ পরিচালনা চালিয়ে যেতে হবে। শ্রমিকরা ধর্মঘটে সামিল হলেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন কি পরিবারগুলি একসাথে সকলে ভেসে যায়? না, কারণ গৃহিণী সঞ্চয়ে কিছু না কিছু থাকেই, সেই দিয়েই অসময়ের দিনগুলি কোনমতে কাটিয়ে দেওয়া হয়। এই যে সঞ্চয়, যথেষ্ট রোজগার না-থাকা সত্বেও মরে না-গিয়ে কোনও মতে বেঁচে থাকার যে লড়াই— এই অভিজ্ঞতা অনেক যুদ্ধের ফসল। সারাজীবন মহিলারা সেই যুদ্ধই লড়েন। 

কেউ বলবেন আপদে বিপদে পারিবারিক বন্ধু, হিতাকাঙ্ক্ষী কিংবা আত্মীয়রা পাশে এসে দাঁড়ান। মনে রাখতে হবে, একটি শ্রমিক পরিবারে বন্ধু, আত্মীয় কেউই খুব একটা বড়ো কিছু হন না, হতে পারেন না। বিপদের সময় বন্ধুর সাহায্য জুটলে তারা তাকে আশীর্বাদ মনে করে, ঠিক এই কারণেই অসময়ে গৃহিণীদের ভূমিকাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। 


মূল রচনা: ১৯৫৩ সালে লেখা, উইমেনস প্লেস থেকে নেওয়া একটি অংশ।
ভাষান্তর: সৌভিক ঘোষ 


প্রকাশের তারিখ: ০৭-মার্চ-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org