|
জাতিভেদ প্রথা, দলিত ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (শেষ পর্ব)সাবিত্রী রাভা |
হিন্দুত্বের রাজনীতিতে দলিতদের এই স্বকীয় সক্রিয়তার পিছনে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচিতি যথেষ্ট বড় ভুমিকা পালন করে। ভারতে দলিত এবং মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থায় সাদৃশ্য থাকলেও সাংস্কৃতিক-সামাজিক সাদৃশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেই। সামাজিক বন্ধনের অভাবে এই দুই ধর্মের পার্থক্যকে বিভেদে রূপান্তরিত করা আরএসএস এর পক্ষে সহজ হয়েছে। কিন্তু একথাও ঠিক যে শূদ্ররা জাতিভেদ প্রথার সমস্ত বিভাজন স্বত্ত্বেও নিজেদেরকে হিন্দু হিসাবেই ভাবে। আরএসএস হিন্দু সত্তার নির্মাণ নয় বরং তাকে জাগ্রত করে, তাকে আরও হিংসাশ্রয়ী, আরও ভয়াবহ এবং আগ্রাসী করে তুলেছে তাদের সামাজিক প্রকৌশলের (সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং) মাধ্যমে। |
প্রথম পর্বের পর... মনুস্মৃতির কোডগুলি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে তা পুরোপুরি ভাবে নারী ও দলিতদের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার জন্য যে অধিকার প্রয়োজন তার বিপক্ষে কথা বলে। জাতি বিভাজন ব্যবস্থায় শ্রমের বিভাজনকে স্বীকৃতি দিয়ে বলা আছে যে শূদ্রদের একমাত্র কাজ হচ্ছে বাকি তিনটি জাতি গোষ্ঠীর সেবা করা। এবং যেহেতু জাতি পরিচিতি জন্মের ওপর নির্ভরশীল এবং অপরিবর্তনীয় তাই শূদ্রদের কোনওদিনই অন্য কোনও কাজ করার কোনও অধিকার থাকবে না। এই কঠোর শোষণমূলক নির্দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পাপস্খলনের তত্ত্বও হাজির করা হয়েছে। এখানে একজন শূদ্রের জন্মকে পূর্বজন্মের পাপের কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে এই পাপস্খলনের একমাত্র উপায় হল বাকি জাতিগোষ্ঠী, বিশেষত ব্রাহ্মণদের সেবা করা। এই কাজ ছাড়া অন্য যে কোনও কাজ তার পক্ষে ফলদায়ক হবে না (যদিও এখানে উল্লেখ করা নেই যে কত প্রজন্ম অবধি একজন শূদ্রকে সেবা করে যেতে হবে)। এখানে যেহেতু সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা মনুর মাধ্যমে এই কথা জানাচ্ছে তাই একে অগ্রাহ্য করা বা প্রশ্ন করা মহাপাপ হিসাবে ধার্য করা হবে। জাতি বিভাজন ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল জাতি পরিচিতির নিত্য সনাক্তকরণ। নাম দেখে যাতে কে কোন জাতের বোঝা যায় তাই মনুস্মৃতিতে বলা আছে যে কোনও ব্রাহ্মণের নামের দ্বিতীয়াংশ শুভ কোনও কিছুকে ইঙ্গিত করবে। একইরকমভাবে ক্ষত্রিয়দের ক্ষেত্রে নামের দ্বিতীয় ভাগের মানে হবে রক্ষা করা, বৈশ্যদের ক্ষেত্রে তা হবে সমৃদ্ধি এবং শূদ্রদের ক্ষেত্রে নামের প্রথম ভাগের মানে হবে এমন কিছু যা অবজ্ঞাজনক এবং দ্বিতীয় ভাগ হবে এমনকিছু যা সেবা করাকে বোঝায়। অর্থাৎ একজন মানুষের অস্তিত্বকে তার জাতি পরিচিতি গ্রাস করে ফেলবে এবং কোনওভাবেই সে জাতে কোনওদিন এই পরিচিতির বোঝা থেকে বেরোতে না পারে তার ব্যবস্থা করা হবে। মনুস্মৃতি জাতি বিভাজন ব্যবস্থার সাথে মর্যাদার বিন্যাসকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে ব্রাহ্মণ পরিচিতির সাথে সম্মন এবং শূদ্র পরিচিতির সাথে অবমাননা চিরকালের মতো ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে যায়। মনুস্মৃতির প্রায় প্রতিটি পাতায় শূদ্রদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণকে দৈব স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা আছে যে সম্মানের নির্ণায়ক হিসাবে মানুষের ব্যবহার, চরিত্র এমনকি বয়স নয় বরং তার জাতিপরিচতিকে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু যে কোনও বয়সের ব্রাহ্মণ বাকি যে কোনও জাতিগোষ্ঠির থেকে সম্মান পাবে শুধুমাত্র সে ব্রাহ্মণ বলে। এটা তূলনামূলক ভাবে কম ক্ষতিকারক মনে হলেও প্রতিদিনের জীবনে এই ধারণার অনুশীলন শূদ্রদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অপমানজনক কারণ এখানেও তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে সে বাকিদের থেকে মানুষ হিসাবে নীচু। জাতিবিভাজন ব্যবস্থা যে শুধুমাত্র নীচতা এবং ঘৃণার জন্ম দেয় তা মনুস্মৃতির বিভিন্ন অংশে পরিষ্ফুট। এখানে বলা আছে যে যদি কোনও শুদ্র কোনো উঁচু জাতের মানুষকে অপমান করে তাহলে তার জিভ কেটে নেওয়া হবে। কোনও শূদ্র যদি উঁচু জাতের কোনও উঁচু জাতের মানুষকে তার কাজ সম্পর্কে অবহিত করতে যায় বা অভব্য আচরণ করে তাহলে তার মুখে এবং কানে গরম তেল ঢেলে দেওয়া হবে। কোনও শূদ্র যদি নিজেকে উঁচু জাতের সমান ভাবে এবং সেরকম আচরণ করতে চায় তাহলে তাকে গভীরভাবে বিদ্ধ করা হবে এবং রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হবে। যে সময় মনুস্মৃতি লেখা হয়েছে সেইসময় ভারতবর্ষে রাজতন্ত্র চালু ছিল। সেই সময় বিভিন্ন ধরনের অমানবিক এবং বর্বর শাস্তির (এখন আমরা যাকে ‘মধ্যযুগীয়’ অত্যাচার বলে থাকি, যদিও ‘আধুনিক’ ভারতবর্ষে দলিতরা এই ধরনের এবং এর থেকেও ভয়ানক অত্যাচারের সম্মুখীন) প্রচলন ছিল। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় যে শাস্তির ক্ষেত্রেও জাতিমূলক বৈষম্য কতটা প্রকট। যেহেতু ব্রাহ্মণ এর অস্তিত্বই পবিত্র তাই সে যা-ই করুক না কেন তা অপরাধ হিসাবে গ্রাহ্য হবে না। কিন্তু যে সমাজে শূদ্রদের অস্তিত্বকেই অবমাননামূলক মনে করা হয় এবং যেখানে তাদের কোনও অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতা নেই সেখানে তাদের যে কোনও আচরণ অপরাধ বলে গ্রাহ্য হবে। ঐতিহাসিকভাবে সমাজে শূদ্রদের যে স্থান ছিল তাতে এই উপসংহারে আসাই যায় যে অপমান বা অভব্য আচরণের সংজ্ঞা উঁচু জাতের লোকেরাই ঠিক করত এবং যেহেতু কোনও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা সেইসময় ছিল না তাই রাজা অবশ্যম্ভাবীভাবে উঁচু জাতের ‘মর্যাদাসম্পন্ন’ লোকেদের পক্ষেই রায় দিত। এই ধরনের শাস্তির (অত্যাচার) নিদান আসলে ভয় ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। যে কোনও ধরনের দমনমূলক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণি তার সাবজেক্ট-দের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। এক্ষেত্রে সেই সময়ের রাজনৈতিক এবং সামাজিক শাসক অর্থাৎ উঁচু জাতের প্রয়োজন ছিল শূদ্রদের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার; যাতে তাদের আধিপত্য বজায় থাকে এবং সমস্ত রকমের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে কুক্ষিগত থাকে। শূদ্রদের যাতে নিজেদের কোনও স্বাধীন সত্তা তৈরি না হয় এবং তারা যেন উঁচু জাতের ওপর সর্বদা নির্ভরশীল হয়ে থাকে তাই মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে যে কোনও শূদ্র কোনওদিনই কোনওরকম সম্পদ তৈরি করতে পারবে না। কারণ তা ব্রাহ্মণের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ব্রাহ্মণ তার বদলে শূদ্রকে তার বেচে যাওয়া খাবার, তার পুরানো জামা ইত্যাদি ‘দান’ করবে। অর্থাৎ একপ্রকার দয়াপরায়ণতার মোড়কে জাতি বিভাজন ব্যবস্থার স্তরায়ণকে বজায় রেখে দেওয়া হচ্ছে। এবং শূদ্রদের অবস্থান ও পরিষ্কার করে দেওয়া হচ্ছে যে তাদের সবসময়ই ব্রাহ্মণদের দয়াপরবশ হয়ে থাকতে হবে। শূদ্রদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা মেটানোর মাধ্যমে এই বিভাজনের ব্যবস্থাকে কৌশলগতভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া থেকে মনুস্মৃতি রক্ষা করেছে। এত ধরণের নিয়মের পরেও কোনওভাবে যদি শূদ্ররা শক্তিশালী হয়ে ওঠে তাহলে তা নিদান ও মনুস্মৃতি দিয়েছে। বলা হচ্ছে যে শূদ্ররা যে সমাজে শক্তিশালী সেই সমাজে/দেশে ব্রাহ্মণের থাকা উচিত নয়। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে যে যেখানে শূদ্রদের মতো নীচু এবং অন্যায়কারী মানুষেরা ক্ষমতায় থাকবে সেখানে থাকলে হিন্দু ধর্মের যে পবিত্র আইন তার অবমাননা হবে এবং সেক্ষেত্রে ব্রাহ্মণরাও শূদ্রদের সাথে অসংবৃত বা নরকে প্রবেশ করবে। পবিত্র আইন বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট ভাবে বলা না থাকলেও,বুঝতে অসুবিধা হয়না যে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব, আধিপত্য এবং তার সাথে জাতিভেদ প্রথার ন্যায্যতাকে বোঝানো হয়েছে। আরএসএস ভারতের লিখিত সংবিধান যা সাম্য, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গনতন্ত্রের আদর্শে উদবুদ্ধ, তার বদলে মনুস্মৃতি; যার মূল বৈশিষ্ট হচ্ছে ঘৃণা, তা লাগু করার কথা বলেছিল (নুরানি ২০১৯)। আরএসএস-এর মুখপত্র অর্গানাইজার-এ লেখা হয়েছিল যে এই সংবিধানে ভারতীয় বলে কিছু নেই। ভারতের যে প্রাচীন সনাতন নিয়ম কানুন মনুস্মৃতিতে লেখা আছে তার কোনও বৈধতা নতুন ভারতে না থাকা মানে ভারতীয়ত্বকে অস্বীকার করা। অর্থাৎ মনুস্মৃতিতে যা লেখা আছে তা ভারতীয়ত্বের প্রমাণ। সেই যুক্তি অনুযায়ী জাতিভেদ প্রথা ভারতীয়ত্বের অন্যতম নিদর্শন এবং যৌক্তিক নিদর্শন। নতুন ভারতে স্বাধীন ভারতে যে আইনি সুরক্ষা দলিতদের দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান ভারতবর্ষে আরএসএস ও দলিত: বর্তমানে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের প্রশ্রয়ে আরএসএস সরকারি মদতপুষ্ট হয়ে আরও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। একইসাথে ভারতে দলিতদের ওপর আক্রমণ আগের থেকে আরো বেড়েছে। কিন্তু একইসাথে ভারতে দলিতসহ হিন্দুদের মদ্যে হিন্দুত্বের প্রভাবও আরও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হিন্দুত্বের আগ্রাসী চেহারা হিসাবে সামনে দলিতদেরকেই দেখা গেছে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস বা ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গা, ভারতে সাম্প্রয়ায়িক হিংসার দুই অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে যে যারা সরাসরি হিংসায় জড়িত ছিল তাদের বেশিরভাগই দলিত। শুধু এই দুই ঘটনায় নয়, বেশিরভাগ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় দেখা যায় যে হিংসার মুখ হিসাবে সামনের সারিতে দলিতরা থাকে। এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে অনেকেই বলেছেন যে আসলে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব দলিতদের ‘ফুট সোলজার’ হিসাবে ব্যবহার করে। এই ধরনের সাম্প্রদায়িক হিংসার মাধ্যমে হিন্দুত্বের ভাষ্যকে আরও পাকাপোক্তভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করানোর পিছনে ‘মস্তিষ্ক’ হিসাবে কাজ করে ব্রাহ্মণরা এবং দলিতরা সেই ‘বডি’ হিসাবে কাজ করে যারা হিংসার অনুশীলন করে (পাণ্ডে ১৯৯১)। অর্থাৎ এখানেও জাতিভেদ প্রথার যে স্তরায়ন তা কাজ করে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে আরএসএস এর প্রচারকরা সবাই হিন্দু ধর্মের বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রাসী ছিলেন আবার একইসাথে হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করা নিয়ে মিথ্যা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। তাদের কাছে হিন্দু ধর্মের রক্ষার মূল চাবিকাঠি ছিল ধর্মীয় একতা। এই ঐক্যের একমাত্র উৎস জাতিপ্রথা। কারণ এই প্রথা না থাকলে বা এই প্রথা থেকে শূদ্ররা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে হিন্দু ধর্মের স্থিতিশীলতা চলে যাবে। দলিত সহ বাকি অব্রাহ্মণ জনসংখ্যাকে ব্রাহ্মণদের প্রয়োজন হিন্দু ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সমগ্র হিন্দু স্বার্থ নয় ব্রাহ্মণ্যবাদী স্বার্থ। তবে আমাদের এই বিশ্লেষণ করার সময় মাথায় রাখা দরকার যে, নতুন আঙ্গিকে চর্চা করতে গিয়ে আমরা আবার ব্রাহ্মন্যবাদী চর্চা, যা সর্বদা ব্রাহ্মণকে উচ্চ জায়গায় রাখে, তাকেই সামনে এনে ফেলছি কিনা। একথা ঠিকই যে হিন্দুত্বের শূদ্রদের প্রয়োজন এবং একথাও ঠিক যে তাদের জনবলকেই প্রয়োজন। কিন্তু এটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে যে শূদ্র বা দলিতরা এই হিন্দুত্বের তত্ত্ব থেকে কী অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। হিন্দুত্বের রাজনীতিতে দলিতদের এই স্বকীয় সক্রিয়তার পিছনে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচিতি যথেষ্ট বড় ভুমিকা পালন করে। ভারতে দলিত এবং মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থায় সাদৃশ্য থাকলেও সাংস্কৃতিক-সামাজিক সাদৃশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেই। সামাজিক বন্ধনের অভাবে এই দুই ধর্মের পার্থক্যকে বিভেদে রূপান্তরিত করা আরএসএস এর পক্ষে সহজ হয়েছে। কিন্তু একথাও ঠিক যে শূদ্ররা জাতিভেদ প্রথার সমস্ত বিভাজন স্বত্ত্বেও নিজেদেরকে হিন্দু হিসাবেই ভাবে। আরএসএস হিন্দু সত্তার নির্মাণ নয় বরং তাকে জাগ্রত করে, তাকে আরও হিংসাশ্রয়ী, আরও ভয়াবহ এবং আগ্রাসী করে তুলেছে তাদের সামাজিক প্রকৌশলের (সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং) মাধ্যমে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে আরএসএস মুসলমানদের কাল্পনিক শত্রু হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে এবং অনেকাংশে সফলও হয়েছে। ‘হিন্দু খ্যতরে মে হ্যায়’ ধরনের অন্তসারশূন্য ভাবনা (এম্পটি সিগনিফায়ার) (এই শব্দবন্ধটি আর্নেস্তো লাকলাও-এর অন পপুলিস্ট রিজন বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে), যার সাথে বাস্তবের তথ্য পরিসংখ্যান মেলে না তা ‘হিন্দু কল্পনাশক্তি’-কে গ্রাস করে ফেলেছে। হিন্দু কারা? তারা কেন বিপদে? কীসের বিপদ? কীভাবে বিপদ আসছে? এ সবকিছুর উত্তর ছাড়াই হিন্দুরা এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে এই বিপদের মূলে আছে মুসলমানরা। ভারতের সিংহভাগ সম্পদ উচ্চশ্রেণির ব্রাহ্মণ বা অন্যান্য ‘উঁচু জাতের’ হাতে আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দুত্বের স্বার্থে মুসলমানদের সমস্ত সমস্যার মূলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ভাষ্য নির্মাণের কাজে ভারতের রাজনৈতিক শাসকবর্গ সম্পূর্ণ ভাবে সফল হয়েছে। দলিতদের অর্থনৈতিক অবস্থা এখানে তাদের আরও বেশি করে তাদের এই ধারনায় নিমজ্জিত হতে সাহায্য করেছে। আরএসএস মুসলমানদের বহিরাগত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। সুতরাং বহিরাগতরা ভারতের সমস্ত ধরনের সম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যবহার করছে এবং সেই কারণে অর্থনৈতিক ভাবে হিন্দুরা পিছিয়ে পড়ছে এই ধারনা বিশ্বাস করা খুব কঠিন না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ জুড়ে অভিবাসীদের এই একইভাবে শত্রু হিসাবে অভিক্ষেপন শাসক শ্রেণির খুবই প্রচলিত কৌশল। সারা পৃথিবী জুড়েই দক্ষিণপন্থী সরকারগুলি কাল্পনিক শত্রুর নির্মাণ করে যাতে তাদের শোষণ বজায় থাকে এবং ঘৃণা মানুষের মননে বজায় থাকে। ভারতের ক্ষেত্রে এই কাল্পনিক শত্রু হচ্ছে মুসলমানেরা। এবং এই কাল্পনিক শত্রুর প্রতি বিদ্বেষ শুধুমাত্র দলিতদের আছে তা নয়, সমস্ত জাতির হিন্দুদের, বিশেষুত উঁচু জাতের হিন্দুদেরও আছে। তারা সরাসরি হিংসায় লিপ্ত হয় না বলে আমাদের চোখে পড়েনা, এই যা। উদ্বেগের জায়গা হল যে দ্বেষের রোষে অন্ধ হয়ে দলিতরা যে আরসএস এবং হিন্দুত্বকে নিজেদের ত্রাতা ভাবছে সেই আরএসএস যদি সর্বত ভাবে এই দেশে ক্ষমতায় চলে আসে তাহলে সবার আগে তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী আদর্শের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে সংবিধান পালটে মনুস্মৃতি চালু করে দেবে এবং তাহলে আমরা সত্যিই হাজার বছর পিছনে এমন এক সমাজে চলে যাব যা শাসিত হবে জাতিভেদ প্রথার অমানবিক, অবমাননাকর এবং অসম্ভব বৈষম্যমূলক নিয়মকানুন দিয়ে। এখানে আমাদের আবার ডঃ বি আর আম্বেদকারের মন্তব্য মনে এবং মননে রাখতে হবে “ভারতবর্ষে হিন্দু রাজ যদি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে তা এই দেশের পক্ষে নিঃসন্দেহে সবথেকে বড় বিপর্যয় হবে। যেভাবেই হোক হিন্দুরাজকে প্রতিরোধ করতে হবে”। (পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশান অফ ইন্ডিয়া, ১৯৪৬) তথ্যসুত্র ১. সাভারকার ভি. ডি, Hindutva: Who is a Hindu, ১৯২৩
প্রকাশের তারিখ: ১৩-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |