|
জাতিভেদ প্রথা, দলিত ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (পর্ব ১)সাবিত্রী রাভা |
|
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ- এর (আরএসএস) রাজনৈতিক এবং সামাজিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাত্ত্বিকভাবে অনেক আলোচনা হয়েছে। আরএসএস আদর্শগতভাবে হিন্দুত্বের ধারণার প্রতি দায়বদ্ধ এই বিষয়েও সকলেই অবগত। ভি ডি সাভারকারের হিন্দুত্বের আদর্শের মূলে তাত্বিকভাবে রয়েছে ‘স্ব’ (self) এবং ‘অপর’ (other) এর ধারণা। হিন্দুত্ব এক ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে হিন্দু ‘স্ব’ গঠনের কথা বলে। এই হিন্দু ‘স্ব’-এর গঠন মুসলিম ‘অপর’-এর গঠনের ওপর নির্ভরশীল। সাভারকারের বক্তব্য অনুযায়ী প্রথমত, একজন হিন্দু সে যে ভারতকে তার পিতৃভুমি এবং পূণ্যভুমি মনে করে। অর্থাৎ এই সংজ্ঞা অনুযায়ী যেই ভারতে জন্ম গ্রহণ করেছে সেই হিন্দু। দ্বিতীয়ত, একজন হিন্দু যে ভারতকে তার পূন্যভুমি মনে করে ( সাভারকার ১৯৪৫, পৃ:২) । এই পূণ্যভূমির ধারণা অনেকাংশেই ধর্মীয়। সাভারকার লিখেছেন যে যাদের ধর্মের জন্ম এই ভারতের ভৌগোলিক অঞ্চলে তাদের এই অঞ্চলের প্রতি স্বাভাবিক আনুগত্য থাকবে। অর্থাৎ তারা তাদের ধর্মের কারণে এই দেশের প্রতি মানসিকভাবে দায়বদ্ধ থাকবে এবং তাদের এই দেশের প্রতি একাত্মতার অনুভূতি কাজ করবে। এই যুক্তি অনুযায়ী হিন্দু সহ আরও অনেক ধর্ম যেমন শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মাবলম্বীরা ‘হিন্দু’ কারণ তাদের ধর্মের জন্ম এই দেশে ফলত তারা এই দেশকে তাদের পূণ্যভুমি মনে করে (সাভারকার ১৯৪৫)। এই একই যুক্তি অনুযায়ী এই দেশে জন্ম গ্রহণ করা স্বত্ত্বেও মুসলিমরা এই দেশকে তাদের পূণ্যভুমি মনে করে না কারণ তাদের ধর্মের জন্ম এই দেশে নয়। যেহেতু তারা এই দেশকে তাদের পূণ্যভুমি মনে করে না সেহেতু তারা এই দেশের প্রতি কোনও একাত্মতা অনুভব করতে পারে না বলে সাভারকার দাবি করেছেন। হিন্দুত্বের এই বহিষ্কারক ধারণা এই দেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান ভারতবর্ষে আগ্রাসী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার সেই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক হিংসায়ন করছে এবং এই সরকারের মদতে আরএসএস সামাজিক হিংসায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হল আরএসএস যদি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হয় এবং এর মূল উদ্দেশ্য যদি এই দেশে ‘হিন্দু’ স্বার্থকে রক্ষা করা হয় তাহলে আরএসএস এবং দলিতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? এবং হিন্দু স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে দলিতদের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? সাধারণভাবে আমরা জানি যে দলিতরা হিন্দু সমাজেরই অংশ, তারা হিন্দু। তাহলে কি আরএসএস সমগ্র ‘হিন্দু জাতি’র স্বার্থরক্ষা করছে না? এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পুর্বে ড. বি আর আম্বেদকারের একটি মন্তব্য আমাদের মনে রাখা দরকার— “হিন্দু সচেতনতা বলে কিছু নেই। প্রত্যেক হিন্দুর মধ্যে যে সচেতনতা বর্তমান তা হল তার জাতি পরিচিতির সচেতনতা। সেই কারণেই হিন্দুরা কোনওদিনই একটা সমগ্র জাতি বা সমাজ ছিল না এবং কোনওদিন হবেও না” (Annihilation of Caste, ১৯৩৬ থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে)। অর্থাৎ জাতিস্বত্তাকে হিন্দু ধর্মের মূল অংশ হিসাবে তিনি তুলে ধরেছেন। জাতি পরিচিতির সচেতনতা যদি এতই প্রকট হয় তাহলে প্রত্যেক হিন্দুর মনে এবং মননে জাতিভেদ প্রথার সচেতনতাও বর্তমান। বস্তুত জাতিভেদ প্রথা এবং তার সাথে সংযুক্ত সামাজিক স্তরায়ন ও বর্তমান। এই স্তরায়নের মূল বৈশিষ্ট্যই হল ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্য যার ছাপ হিন্দু সমাজের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সর্বত্র ক্ষেত্রে সর্বদা বর্তমান। এমতাবস্থায় এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে হিন্দু স্বার্থ বলতে আসলে আরএসএস কী বোঝাতে চেয়েছে। আরএসএস-এর ইতিহাস এবং মতাদর্শ নির্মাতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলেই এর ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতি আদর্শগত দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আরএসএস ইতিহাস এবং দলিত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয়তাবাদের ধারার বৈচিত্র্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দু জাতীয়তাবাদ তাদের মধ্যে অন্যতম। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হিন্দু ঐতিহাসিক ভাবধারা বা দয়ানন্দ সরস্বতীর হিন্দু সংস্কারকমূলক আন্দোলন ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এরপরে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা লালা লাজপত রায় হিন্দুদের আলাদা একটি জাতি বলে অভিহিত করেন এবং ভারতের হৃত গৌরব পুনরূদ্ধারের জন্য হিন্দু নবজাগরনের কথা বলেন (নুরানি ২০১৯)। মদনমোহন মালব্যের নেতৃত্বে ১৯১৫ সালে হিন্দু মহাসভা তৈরি হয় যা হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক জমি তৈরি করতে সাহায্য করে। ধর্মান্তরকরণ আটকানো এই হিন্দু সংস্কারমূলক আন্দোলনগুলির অন্যতম মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ১৯২০-এর দশক থেকে হিন্দু মহাসভা শুদ্ধি আন্দোলনে মনোনিবেশ করে। তবে এই ভাবধারার ছত্রে ছত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রোথিত ছিল। হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রবক্তারা এটা ভালোই বুঝতে পারেন যে হিন্দু ধর্মের অসম্ভব কঠোর জাতিভেদ প্রথা ধর্মান্তকরণের একটি অন্যতম কারণ ছিল। ফলত তারা হিন্দু ধর্মের জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে নিজস্ব বিভেদ ভুলে হিন্দু ধর্মের মহানতাকে স্বীকার করে সব হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ করার ডাক দেন। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ (হিন্দু সংগঠন আন্দোলনের প্রবক্তা) সব জাতের হিন্দুদের একসাথে খেতে বসার ও আহ্বান করেন। কিন্তু একই বাসন থেকে নয়, শূদ্ররা পরিবেশন করবে আলাদা পাত্রে এবং বাকিরা খাবে। অর্থাৎ জাতিভেদ প্রথার যে অস্পৃশ্যতা তা বজায় থাকবে। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় ভি ডি সাভারকারের Hindutva, who is a Hindu গ্রন্থটি। হিন্দুত্বের ধারণাকে বেশির ভাগ সময়ই একটি মুসলিম বিরোধী তত্ত্ব হিসাবে দেখা হয়, যা অনেকাংশেই সঠিক। কিন্তু ধর্মীয় ভাষ্যতে মনোনিবেশ করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় এরসাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত জাতিভেদ প্রথার কথা ভুলে যাই। সাভারকারের এই বইতে যথেষ্ট আগ্রাসীভাবে চতুর্বণ প্রথাকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। তিনি লিখছেন যে জাতিভেদ প্রথা হিন্দু জাতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি এ ও বলেন যে যে দেশে চারটি বর্ণের অস্তিত্ব নেই তা আসলে ম্লেচ্ছদের দেশ’। হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা বজায় রাখার পিছনে চতুর্বর্ণ প্রথাকে দেখেছেন। আবার এই সাভারকার অস্পৃশ্যতার বিরূদ্ধে কর্মসূচীও আয়োজন করেছেন। এর পিছনে অবশ্য কোন সাম্যের ধারণা কাজ করেনি। তিনি মনে করতেন যে শূদ্রদের অস্পৃশ্য হিসাবে দেখার জন্য তাদের এক বিশাল অংশ মুসলিম বা খীস্টান ধর্ম গ্রহণ করে এবং হিন্দু ধর্ম সঙ্খ্যার দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলত শূদ্র জনসংখ্যাকে হিন্দু ধর্মের ঐক্য এবং গৌরব রক্ষার জন্য। ঐতিহাসিকভাবে এই সব কিছুই আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। ১৯২৫ সালে বিজয়া দশমীর দিনে কেশব হেডগেওয়ারের নেতৃত্বে বি এস মুনজে, বাবারাও সাভারকার, এল ভি পারাঞ্জপে এবং বি বি ঠাক্কারের ( এঁরা সবাই সেই সময় হিন্দু মহাসভার কর্মী ছিলেন) উপস্থিতিতে হেডগেওয়ারের বাড়িতে আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠা হয়। আরএসএস হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে আরও আগ্রাসী এবং সামরিক রূপ দেয়। হেডগেওয়ার হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শপথ নেন এবং একইসাথে জাতি-গোষ্ঠী বিহীন হিন্দু জাতীয়তাবাদ গঠনের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ যে আরএসএস-এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে তা বিভিন্ন দৃষ্টান্তে স্পষ্ট। আরএসএস-এর দলিলে এর প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারের সক্ষম নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তার ব্রাহ্মণ পরিচতির উল্লেখ আছে। তার সক্ষমতার সাথে তার জাতি পরিচিতিকে পরিপূরক হিসাবে দেখানো হয়েছে। হেডগেওয়ারের ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সংগঠনের নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট ছিল। হেডগেওয়ার সবসময় ‘উঁচু’ জাত এবং গ্রাজুয়েট পুরুষদের নিয়োগ করতেন (নুরানি ২০১৯)। আরএসএস-এর পরবর্তী সঙ্ঘপ্রচারক সদাশিব গোলওয়ালকার হিন্দুত্বের ধারণাকে আরও আগ্রাসী করে তুলেছিলেন। জাতিভেদপ্রথাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন মুসলিম ধর্মকে ভয়াবহ দেখানোর জন্য। তার মতে ভারতের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে যেখানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটেছিল এবং তার ফলস্বরূপ জাতিপ্রথার বিলুপ্তি ঘটেছিল সেখানে মুসলিম শাসকরা অনেকবেশি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। অন্যদিকে ভারতে যেখানে জাতিপ্রথা খুব শক্তিশালী সেখানে মুসলিম শাসকেরা তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। সুতরাং হিন্দু ধর্মের রক্ষার্থে জাতি প্রথা প্রয়োজন। এরপরে দীন দয়াল উপাধ্যায় ও তার পূর্বসুরিদের পদাঙ্ক অনুসরণে জাতিভেদ প্রথাকে স্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যদিও ‘Intergral humanism’-এর কথা বলেছেন যার সারবত্তা হল যে হিন্দু ধর্মের সমস্ত অংশ মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ কিন্তু তার তত্ত্ব অনুযায়ী এই একত্রীকরণ জাতিভেদ প্রথার সমস্ত নিয়ম মেনে হতে হবে। তিনি বলছেন যে উচু নীচুর ধারণা সব ভুল। কারণ হিন্দু ধর্মে সবাইকে সবার সামর্থ অনুযায়ী কাজ বণ্টন করা হয়েছে। যাকে যা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হিন্দু ধর্মে তা দৈব বাণী অনুযায়ী হয়েছে সুতরাং তাকে প্রশ্ন করা মানে সৃষ্টিকর্তা কে প্রশ্ন করা। এবং সৃষ্টিকর্তার এই নিয়ম বৈজ্ঞানিক কারণ এই বিভাজন আসলে হিন্দু সমাজে স্থিতিশীলতা প্রদান করে যার ফলে হিন্দু ধর্ম অনেক বেশি সংগঠিত থাকে (উপাধ্যায় ১৯৬৫)। আরএসএস-এর দলিলপত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এই সঙ্ঘ প্রথম থেকেই মনুস্মৃতি-র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। যে মনুস্মৃতি বি আর আম্বেদকার পুড়িয়ে দিয়েছিলেন শূদ্র এবং মহিলাদের প্রতি অত্যন্ত অবমাননাকর নিয়মকানুন লাগু করার বিরূদ্ধে। ১৯৪৯ সালে যখন ভারতবর্ষের সংবিধান গৃহীত হচ্ছে তার ঠিক কিছুদিনের মধ্যেই, আরএসএস এর মুখপত্র অর্গানাইজার একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে যেখানে ভারতবর্ষের সংবিধানের বদলে মনুস্মৃতি-কে আসল সংবিধান হিসাবে ধার্য করা হয়। ভারতবর্ষে হিন্দুত্বের ধারণার কাণ্ডারী ভি ডি সাভারকারও মনুস্মৃতি-র ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন— “আমাদের হিন্দু জাতির জন্য বেদের পরেই মনুস্মৃতি হল সেই পূজনীয় শাস্ত্র যা প্রাচীন যুগ থেকে আমাদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। কয়েক শতাব্দী ধরে এই বইটি আমাদের জাতির আধ্যাত্মিক এবং দৈবিক মননের মূল উৎস। এখনও হিন্দু ধর্মাবলম্ববীরা যে নিয়ম মেনে চলেন তার আধার মনুস্মৃতি। আজকের দিনে মনুস্মৃতি হচ্ছে হিন্দু আইন। এবং তা মৌলিক” ( সাভারকার সমাগার, সাভারকারের হিন্দি লেখাপত্রর সংগ্রহ থেকে সরাসরি অনুবাদ করা হয়েছে)। আরএসএস-এর প্রচারক হেডগেওয়ার বা গোলওয়ালকর ও বিভিন্ন সময় মনুস্মৃতি-কে আদর্শ আইন হিসাবে তুলে ধরেছেন (নুরানি ২০১৯)। পরবর্তী পর্ব আগামীকাল
প্রকাশের তারিখ: ১২-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |