|
শতবর্ষে নওজোয়ান ভারত সভা, ইনকিলাব যাত্রাঅয়নাংশু সরকার |
আজকেও এক কঠিন সময়ে যখন সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ বাড়ছে, সাম্রাজ্যবাদ যখন ঐক্য বিনষ্টকারী শক্তিগুলিকে মদত জোগাচ্ছে, স্থায়ী কাজের জায়গা যখন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, শিক্ষার উপর যখন আক্রমণ চলছে তখন ডিওয়াইএফআই-এর কর্মী সংগঠকরা রাস্তায় থেকে আপসহীন সংগ্রাম করে চলেছে। আমরা ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন, আমরাই নওজোয়ান ভারত সভার উত্তরাধিকার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিতে কাঁপন ধরানো ভগৎ সিং, বটুকেশ্বর দত্তদের সেই প্রিয় স্লোগান ইনকিলাব জিন্দাবাদ আজও শাসকের বুকে কাঁপন ধরায়। |
ডিসেম্বর, ১৯২০। জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশন। ইংরেজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত। দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু দু’বছরের মাথায় গান্ধীজী এককভাবেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। ১৯২২ সালে গোরখপুরের চৌরিচৌরা গ্রামের জনসাধারণ খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি ও প্রকাশ্যে মদ বিক্রির প্রতিবাদে জমায়েত করে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। প্রতিবাদী জনতার ওপর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশের এই অত্যাচারের প্রতিবাদে প্রায় আড়াই হাজার গ্রামবাসী মিছিল করে এগিয়ে যায় থানার দিকে, আশঙ্কিত হয়ে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে এবং তিনজন গ্রামবাসী প্রাণ হারান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামবাসীরা থানা ঘেরাও করে অগ্নিসংযোগ করে এবং ২২ জন পুলিশ কর্মী প্রাণ হারান। এই ঘটনার পরই গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। অসহযোগ আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল স্বাভাবিকভাবেই তা ব্যাপকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ঠিক এই পরিস্থিতি কিছু বিপ্লবী সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। রাসবিহারী বসুর ঘনিষ্ঠ শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রামপ্রসাদ বিসমিল একটি বিপ্লবী দল গড়ে তোলেন যার নাম হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (মতান্তরে আর্মি)। সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে অন্যতমরা হলেন ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, সুকদেব, রাজগুরু, বটুকেশ্বর দত্ত, যতীন দাস, আশফাক উল্লা খান, শিব বর্মা, রোশন সিং, রাজেন্দ্র লাহিড়ি প্রমুখ । ইতোমধ্যেই ১৯২১ সালে কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে মৌলানা হসরত মোহানি ও স্বামী কুমারানন্দ ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’র দাবি তোলেন। হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন এর সদস্যরাও পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যেই বিপ্লবী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ১৯২০ সাল পরবর্তী সময়ে গান্ধীজীর সঙ্গে এইচআরএ-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শচীন্দ্রনাথ সান্যালের কথা হয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয় নিয়ে। কিন্তু দু’জনের পথ এক হয়নি। স্বাধীনতার পথ নিয়ে মতাদর্শগত বিরোধ বাধে গান্ধীজী ও শচীন্দ্রনাথ সান্যালের এর মধ্যে। সেই সময় এই ঘটনা ইয়ং ইন্ডিয়াতে প্রকাশিতও হয়। ১৯২৩ সালে ভগৎ সিং কানপুরে আসেন এবং গণেশ শংকর বিদ্যার্থীর ছাপাখানায় কাজ নেন। গনেশ শংকর বিদ্যার্থী ছিলেন কংগ্রেস নেতা। তার বাড়ি ছিল রাজনৈতিক কর্মীদের মিলনস্থল। কানপুরে শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জী, বিজয় কুমার সিনহা, বটুকেশ্বর দত্ত, চন্দ্রশেখর আজাদ, রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাক উল্লাহ খান– একে অপরের সাথে পরিচিত হলেন। শুরু হল একসাথে পথ চলা। শচীন্দ্রনাথ সান্যাল তার আত্মজীবনী বন্দি জীবন বইতে লিখেছেন, ১৯২৩ সালে কংগ্রেসের দিল্লি অধিবেশনের পরই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম আমার সংগঠনের নাম ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ এবং সংগঠনের সম্পূর্ণ নিয়মাবলীও প্রস্তুত করতে শুরু করে দিয়েছিলাম। ১৯১৭ সালে সোভিয়েতের বিপ্লবের সাফল্য ও এই বিপ্লবে জনগণের জয় তরুণ বিপ্লবীদের মনে অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল। হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশনের সদস্যদের মধ্যেও সোভিয়েতের বিপ্লবের প্রভাব ছিল। ১৯২৫ সালে এইচআরএ এক ইস্তেহারে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ভারতের রাজ্যসমূহের এক সংযুক্ত সাধারণতন্ত্র গঠনের দাবি ঘোষণা করে। রুশ বিপ্লবের সুস্পষ্ট প্রভাবেই তারা জনপরিষেবামূলক যাবতীয় জাতীয় সম্পত্তি— ইস্পাত শিল্প, নৌ বাণিজ্য শিল্প, খনিজ সম্পদ ইত্যাদি সমস্ত কিছুই জাতীয়করণের দাবি জানাতে শুরু করে। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের দিকে এগিয়ে চলার এই ছিল প্রথম পদক্ষেপ। হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মাবলির মধ্যে লেখা হয়েছিল ‘এই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্দেশ্য হবে সংগঠিত ও সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফিডারেটেড প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা’। শচীন্দ্রনাথ সান্যালের উদ্যোগে দ্য রিভলিউশনারি নামে একটি ইশতেহার ও প্রকাশ করে এইচআরএ। এই ইশতেহারে স্বাধীন ভারত গড়ার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ডাক দেওয়া হয়। কিন্তু বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গেলে অর্থের প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান এইচআরএ-এর কাছে ছিল না। তাঁদের কার্যক্রম চালানো এবং অস্ত্রশস্ত্র কেনার উদ্দেশ্যে বিপ্লবীরা ৮ আগস্ট, ১৯২৫ তারিখে শাহজাহানপুরে একটি সভায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয় যে তারা সরণপুর লখনউ চলাচলকারী ৮-ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেন বহনকারী সরকারি কোষাগার লুট করবেন। ৯ আগস্ট ১৯২৫ তারিখে কাকোরীতে আসফাকউল্লা খান, রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ি, রোশন সিং, শচীন্দ্রনাথ বক্সী, চন্দ্রশেখর আজাদরা ট্রেন লুট করেন। ট্রেনের মধ্যে উপস্থিত রাজেন্দ্র লাহিড়ি ট্রেন থামানোর জন্য আপদকালীন চেন টানেন। ট্রেন থামতেই রামপ্রসাদ বিসমিলরা ট্রেনের প্রহরীদের আটক করেন ও কেবিনে রাখা টাকা ভর্তি তিনটি ব্যাগ লুট করেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি– প্রথমত, ব্রিটিশ সরকারদের থেকে লুট করা টাকার মাধ্যমে এইচআরএ-র কর্মকাণ্ড পরিচালনার অর্থ সংকুলান করা। দ্বিতীয়ত, দেশের মানুষের মধ্যে হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন ও তাদের ভাবধারা সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার করা। এই ঘটনায় হতচকিত ব্রিটিশ সরকার স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডকে তদন্তে নামায়। ২৬ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন রামপ্রসাদ বিসমিল, ১৯২৬ সালের ১৭ জুলাই দিল্লি থেকে গ্রেপ্তার হন আশফাক উল্লাহ খান। সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৪০ জন বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বেশ কিছু বিপ্লবী ছাড়া পেয়ে যান। ১৯২৬ সালের ১ মে স্পেশাল সেশন আদালতে বিচারপতি এন্ড্রু হ্যামিলটনের অধীনে শুরু হয় কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯২৭ সালের ৬ এপ্রিল চূড়ান্ত রায়ে রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাক উল্লাহ খান, রাজেন্দ্র লাহিড়ি, রোশান সিং-কে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয় ও শচীন্দ্রনাথ সান্যালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বাকি বিপ্লবীদের কাউকে ১০ বছর কাউকে ১৪ বছর কাউকে ৭ বছরের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় এইচআরএ-এর বেশিরভাগ বিপ্লবী যখন জেলবন্দি তখন আরও প্রতিকূল অবস্থায় সংগঠন পরিচালনার ভার এসে পড়ল ভগৎ সিং, সুকদেব, রাজগুরু, বটুকেশ্বর দত্ত, ভগবতী চরণ ভোরা, রামকৃষণ, যশপাল, শিব বর্মা প্রমুখের উপর। মার্চ, ১৯২৬: ভগৎ সিংয়ের নেতৃত্বে লাহোরে তৈরি হয় একটি বিপ্লবী যুব সংগঠন ‘নওজোয়ান ভারত সভা’। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হলেন ভগৎ সিং, সভাপতি রামকৃষন। এছাড়াও সুকদেব, ভগবতী চরণ ভোরা, সাইফুদ্দিন কিচলু, মীর আব্দুল মজিদ, শারদুল সিং প্রমুখরা ছিলেন সংগঠনের সদস্য। এটি ছিল কার্যত গুপ্ত বিপ্লবী আন্দোলনের প্রকাশ্য মঞ্চ। ছোটো ছোটো সভা, বক্তৃতা, ইশতেহার বিলির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও বিপ্লববাদের প্রচার শুরু করলেন বিপ্লবীরা। নওজোয়ান ভারত সভার সদস্যরা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে বিপ্লবী শহীদদের জীবনী ম্যাজিক লণ্ঠনের সাহায্যে দেখাতেন গ্রামের মানুষের চেতনা বৃদ্ধির জন্য। কেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে সে সম্পর্কে সচেতন করার কাজ করতেন। দ্রুত দিল্লি এবং অন্যান্য রাজ্যে প্রসার লাভ করে নওজোয়ান ভারত সভা। আরও অনেক সাধারণ যুবদের সংগঠনে যুক্ত করার কাজ করতে থাকেন বিপ্লবীরা। ভগবতী চরণ ভোরা, ভগৎ সিং, মীর আব্দুল মজিদ কীর্তি কিষান পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কীর্তি কিষান পার্টির প্রতিষ্ঠায় জড়িত ছিলেন গদর পার্টির প্রতিনিধি বাবা ভাগ সিং কানাডিয়ান (যিনি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন), গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি ফিলিপ স্প্রাট (যিনি পরবর্তী কালে মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ছিলেন), মোহন সিং জোশ প্রমুখ। এই পার্টির মুখপাত্র কীর্তি পত্রিকার উর্দু সংস্করণ প্রকাশে কিছুকাল কাজ করেছিলেন ভগৎ সিং। এই যোগাযোগই আসলে তার প্রাথমিক চেতনা গড়ে ওঠায় সহায়ক হয়েছিল। ওই সময়ই ভগৎ সিং লিখছেন, ‘কমিউনিজমের জন্মদাতা কার্ল মার্কসের কিছু লেখা এবং প্রচুর পরিমাণে লেনিন ও ট্রটস্কির লেখা পড়ে ফেললাম’। তিনি আরও লেখেন ‘১৯২৬ সাল শেষ হবার আগেই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে জগতের স্রষ্টা, দাতা ও নিয়ামক এক সর্বশক্তিমান পরম শ্রদ্ধার অস্তিত্বের ধারণা ভিত্তিহীন’। বাড়ি ছেড়ে কানপুরে এসে গণেশ শংকর বিদ্যার্থীর ছাপাখানায় কাজ করতে শুরু করার পর থেকেই ভগৎ সিং-এর চিন্তাভাবনায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিশ্ব সাহিত্যের বিভিন্ন লেখকের বই-সহ তিনি গভীর আগ্রহে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিনের রচনা পড়তে শুরু করেন। সোভিয়েতের বিপ্লব ভগৎ সিং-সহ নওজোয়ান ভারত সভার তরুণ বিপ্লবীদের মনে রেখাপাত করেছিল। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। হিংসাশ্রয়ী সম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভাবনার দিকে বিপ্লবীদের মনোভাব তৈরি হচ্ছিল। যুক্তিবোধ ও গভীর অধ্যয়ন এর মাধ্যমে ভগৎ সিং নিজেকে বদলাচ্ছিলেন ও তার কমরেডদের মধ্যেও বদল আনার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেও বদল ঘটছিল। স্বাধীনতা, দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে দেশের সব কটি বিপ্লবী গোষ্ঠীকে এক মঞ্চে নিয়ে আসার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন ভগৎ সিংরা। দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলাতে ১৯২৮ সালের ৮-৯ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দুদিন সভা পরিচালিত হয়। সভাতে নির্দিষ্ট হয় হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের নামের সঙ্গে সোশ্যালিস্ট শব্দটি যুক্ত হয়ে হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (এইচএসআরএ) হবে। সভার দ্বিতীয় দিন সাত সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। সেই সাতজন হলেন ভগত সিং, সুখদেব, বিজয় কুমার সিনহা, শিব বর্মা, ফণিন্দ্রনাথ ঘোষ, কুন্দনলাল, চন্দ্রশেখর আজাদ (চন্দ্রশেখর আজাদ অনুপস্থিত ছিলেন, কারণ সেই সময় তিনি কাকরী ষড়যন্ত্র মামলায় ফেরার আসামী)। সম্মেলন থেকে সাইমন কমিশনকে বয়কট করার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবার সিদ্ধান্ত হয়। দেশজুড়ে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ শুরু হয়। লাহোরের মাটিতে নেমেছিল প্রতিরোধের মিছিল। বিনা প্ররোচনায় স্কটের নেতৃত্বে মিছিলের উপর শুরু হয় লাঠিচার্জ। নির্মম লাঠির আঘাতে ১৯২৮ সালের ১৭ নভেম্বর শহীদের মৃত্যুবরণ করেন লালা লাজপত রায়। বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেয় লালা লাজপত রায়ের হত্যার প্রতিশোধ নেবার। ১৯২৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর স্কটকে হত্যার পরিকল্পনা ভুল বশত জেপি স্যানডার্সকে গুলি করে হত্যা করেন বিপ্লবীরা। সকল বিপ্লবীরাই আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে ধারাবাহিক পরিচালনা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ১৯২১ সালে দু’টি জনবিরোধী বিল যথা পাবলিক সেফটি বিল ও ট্রেড ডিসপিউট বিল-কে আইনে পরিণত করবার উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেয় আইনসভায় তারা বোমা নিক্ষেপ করবে ও তাদের ইশতেহার বিলি করবে। ১৯২১ সালের ৮ এপ্রিল দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে যখন দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভার এই দু’টি জনবিরোধী বিল আইনে পরিণত হতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় সভার মধ্যে ফাটে তাজা বোমা। মুহূর্তের মধ্যে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় ভরা আইনসভায় আওয়াজ ভেসে এলো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক), ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’। ইনকিলাব জিন্দাবাদ ধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এইচএসআরএ-র ইশতেহার। বোমা নিক্ষেপিত হওয়ার সাথে সাথেই সভার সদস্যরা ভীত হয়ে পড়েন। ঠিক তখনই ধোঁয়ার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে দুই বিপ্লবী ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। বোমা নিক্ষেপ করে তারা পালিয়ে যাননি। বোমা ফাটিয়ে ব্যক্তি হত্যা করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। স্বেচ্ছায় তারা ধরা দিয়েছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা। লক্ষ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের আলোকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই আর বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের শাস্তি হলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পরবর্তীতে বিচার চলার সময় ভগৎ সিংকে জেপি স্যান্ডার্স হত্যা মামলায় জড়িয়ে শুরু হয়েছিল বিচার। বাকি বিপ্লবীরাও পরবর্তী সময়ে ধরা পড়েন। তদন্তে শুকদেব, রাজগুরু, শিব বর্মা, কিশোরী লাল, জয়দেব কাপুর, মহাবীর সিংহ সহ ২৭ জন বিপ্লবীকে আসামী করে শুরু হয় ইতিহাসের কুখ্যাত লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। বিচারের শেষে ভগৎ সিং, রাজগুরু, শুকদেবের ফাঁসির হুকুম হয়। সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুর আঘাতে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন বিপ্লবীরা। হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন বা নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে সুগভীর সহানুভূতি, জাতীয় সংহতি এবং সুদৃঢ় একাত্মবোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। দেশের সব অংশের মানুষ একযোগে এই বিপ্লবীদের বীরত্বপূর্ণ আচরণের সমর্থনে ব্রিটিশ আদালতের সামনে হাজির থেকে তাদের অভিনন্দিত করেছিলেন। শুধুমাত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে দেশ থেকে তাড়ানো নয় তার সাথে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলেছিল হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের বিপ্লবীরা। দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা বি টি রণদিভে উল্লেখ করেছিলেন ‘দিল্লির লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপকালে বিপ্লবীরা তার বিপ্লবকে প্রতিফলিত করেছিলেন যে স্লোগানের মাধ্যমে তা হল ইনকিলাব জিন্দাবাদ। সে যুগের পক্ষে এই স্লোগান ছিল যেমন অজানা, তেমনি অভাবিত ও তেমনি অভিনব। তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে এর সামান্য কিছুদিন আগেই কমিউনিস্ট নেতৃত্বের তরফ থেকে অনুরূপ স্লোগান দেওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু যদিও তা তেমন করে তখনও বৃহত্তর জনসমাজের কাছে পৌঁছয়নি। জনমানসের কাছে এই স্লোগানকে পৌঁছে দিয়েছিলেন ভগৎ সিংরাই। যে সময় তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে প্রবলভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছিলেন। সেই সময় কার্যত বৃহত্তর জনসাধারণের সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরুই হয়নি। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে তারা আদালতকে ব্যবহার করেছিলেন তাদের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের আলোকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, বৈপ্লবিক চিন্তা চেতনা ও বৈপ্লবিক তথ্য প্রচারের মঞ্চ হিসাবে। বিপ্লবীদের বলা হয়েছিল তারা যেন আদালতে স্লোগান না-দেন। কিন্তু তারা ইনকিলাব জিন্দাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক প্রভৃতি স্লোগানে আদালতের ঘরকে মুখরিত করে তুলতেন। আদালতের মধ্যেই তাদের উপর লাঠি চার্জ শুরু হয়ে যেত। জেলের ভেতর নিয়ে গিয়ে বরফের উপর শুয়ে লাঠিচার্জ হত। প্রবল রক্তপাত আর যন্ত্রণায় বিপ্লবী অজ্ঞান হয়ে পড়ত। ১৯৩০ সালের ২১ জানুয়ারি লেনিনের মৃত্যুবার্ষিকী দিন লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত বিপ্লবীরা লেনিন দিবস পালন করেন। ভগৎ সিং-সহ নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা ঘোষণা করেছিলেন ‘আমরা সমাজতন্ত্র চাই’। উত্তর ভারতে যখন নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা ইনকিলাব জিন্দাবাদের স্লোগান তুলে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে লড়াই করছেন, ঠিক সেই সময়েই ১৯৩০ সালে অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে রিপাবলিকান আর্মি গঠিত হয়েছিল। রিপাবলিকান আর্মির যুবক যুবতীদের সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ঘৃণা ও ক্রোধ ছিল যার ফলশ্রুতিতেই এই অসম সাহসী বিপ্লবী যুবক যুবতীরা ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান তুলে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হতে পেরেছিলেন। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি এ কথা ঠিক কিন্তু যে দৃঢ়তা, নির্ভীকতা ও আপোষহীন সংগ্রামের নজির স্থাপন করেছিলেন বিপ্লবীরা তা অনন্য সাধারণ। নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা যেমন অনেকেই পরবর্তী সময়ে এদেশের বামপন্থী আন্দোলন গড়ে তোলা ও নেতৃত্বদানে ভূমিকা পালন করেছিলেন ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহে মাস্টারদা সহযোগীরাও এদেশের বামপন্থী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৩১ সালের মার্চ মাসে ফাঁসি হয়ে যায় ভগৎ সিং, সুকদেব, রাজগুরুর। আর ওই বছরই মে মাসে বর্ধমান শহরে বর্ধমান বিভাগের ৬টি জেলার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সরোজ মুখার্জি, বিনয় চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পূর্ণ স্বাধীনতার লড়াই, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন, শ্রমিক কৃষক শোষিত জনগণের পাশে দাঁড়ানো প্রভৃতি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ১৯৩৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তরুণ মার্কসবাদী অধ্যাপক হীরেন মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে আলবার্ট হলে একটি সারা বাংলা ছাত্র সম্মেলন হয় যেখানে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্রলীগ তৈরি হয়। ১৯৩৬ সালের ১২-১৩ আগস্ট লখনউতে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়, সারা ভারত ছাত্র ফেডারেশন। ওই বছরই ১২ অক্টোবর শ্রদ্ধানন্দ পার্কে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এর বঙ্গীয় শাখা হিসেবে গড়ে উঠল বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন। চলতে থাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর যুব আন্দোলনকে শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনের শক্তিশালী সংগঠনের পরিণত করার জন্য ১৯৪৫-এর ২৯ শে অক্টোবর থেকে ১০ই নভেম্বর লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে তৈরি হয় ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ডেমোক্রেটিক ইউথ । ১৯৪৮ সালে বামপন্থী আন্দোলনের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পেলে যুব আন্দোলনকেও চরম সমস্যা সংকুল পথ অতিক্রম করতে হয়। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে রাজস্থানের উদয়পুরে এআইএসএফ-এর সম্মেলনে জাতীয় স্তরে একটি যুব সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাব মতোই সর্বভারতীয় যুব সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮ এপ্রিল কনস্টিটিউশন ক্লাব হলে নিখিল ভারত যুব ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন উদ্বোধন করেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী অরুনা আসফ আলী। সম্মেলনের যুব সমাজ ও জাতীয় পরিস্থিতি শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। এআইওয়াইএফ, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ ডেমোক্রেটিক ইউথির অনুমোদন প্রাপ্ত হয়। এআইওয়াইএফ-এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন বলরাজ সাহানি, সম্পাদক নির্বাচিত হন সারদা মিত্র। পঞ্চাশ ষাটের দশকে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এআইওয়াইএফ-এর পথ নির্ধারণ নিয়ে তীব্র মতাদর্শ গত বিতর্ক বাঁধে সংগঠনের অভ্যন্তরে। দেশের যুব সমাজ যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল দেখা যায় পরবর্তীকালে তা তো পূরণ হচ্ছেই না, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সংকট তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুবদের সমস্যা নিয়ে লড়াই আন্দোলনের পাশাপাশি বৃহত্তর গণআন্দোলনের ধারার সাথে যুব আন্দোলনকে যুক্ত করার দাবি উত্থাপিত হয়। এতদসত্ত্বেও সংগঠনের অভ্যন্তরের একটা বড়ো অংশ— নেহেরু সরকার ‘সমাজতান্ত্রিক ধাঁজের সমাজ ব্যবস্থা’ গড়ার ঘোষণা করেছে এই যুক্তি দিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে না-যাওয়ার মত পোষণ করে। এই সময়েই দেশের গণআন্দোলন তীব্র হতে থাকে একই সাথে গণআন্দোলনের উপর নেমে আসে শাসক শ্রেণির দমনপীড়ন। চীন ভারত সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে উগ্র জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তুলে তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধিতা চলতে থাকে। দেশ জুড়ে বিনা বিচারে গ্রেপ্তার চলতে থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে, রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে, খাদ্যের দাবিতে, মজুরির দাবিতে, শিক্ষার দাবিতে দেশের প্রান্তে প্রান্তে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র ইত্যাদি বিভিন্ন অংশের গণআন্দোলন আরও দুর্বার হয়ে ওঠে। যুবসমাজ এই সমস্ত গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। অথচ এআইওয়াইএফ বা যুব সংঘের আপসকামী নেতৃত্ব এই সমস্ত আন্দোলনকে এড়িয়ে চলে। ১৯৬৫ সালে কলকাতার রঞ্জি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রাজ্য যুব উৎসবের প্রাঙ্গনে মতাদর্শগত বিভেদ বিষ্ফোরক আকার ধারণ করে। যুব সংঘের সংশোধনবাদীরা এই উৎসবকে অরাজনৈতিক আকার দিয়ে পরোক্ষে শাসকের স্বার্থসিদ্ধি করছি। যুব উৎসবকে গণআন্দোলনের স্বার্থে ব্যবহার করবার জন্য বিপ্লবী যুব সংগঠকরা দাবি জানান। এআইওয়াইএফ-এর দক্ষিণপন্থী নেতৃবৃন্দ উৎসবকে শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল করে যুবক যুবতীরা আসে সেই উৎসব প্রাঙ্গনে। সেই মিছিলগুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিতে ফেস্টুন নিয়ে এবং স্লোগান দিতে দিতে তারা আসেন। দাবি গুলি ছিল রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, ভারত রক্ষা আইন বাতিল কর, বেকারি বাড়ছে কেন কংগ্রেস সরকার জবাব দাও, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনাম থেকে হাত ওঠাও ইত্যাদি। কিন্তু এআইওয়াইএফ-এর আত্মসমর্পণকারী নেতৃত্ব এতে বাধা দেয় ও আপত্তি তোলে ফলে তৈরি হয় বচসা। তীব্র বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়। আন্দোলন করার পক্ষে যারা ছিলেন, যারা মিছিল করে এসেছিলেন তারা সকলেই উৎসব প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। আদর্শগত বিরোধ চরম আকার ধারণ করে এবং স্বাভাবিকভাবেই সংশোধনবাদী-আত্মসমর্থনকারী-সুবিধাবাদীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আলাদা সংগঠন হিসেবে ডিওয়অইএফ গড়ে ওঠে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে পৃথক যুব সংগঠন করার জন্য একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হয়। প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক হন দীনেশ মজুমদার। প্রস্তুতি কমিটিতে দীনেশ মজুমদার ছাড়াও ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, হরপ্রসাদ চ্যাটার্জী, সুবিনয় ঘোষ প্রমুখরা। সেখানে নতুন যুব সংগঠনের নামকরণ ঠিক হয় গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। তাদের উদ্যোগে ১৯৬৭ সালে কলকাতা জেলা সম্মেলন হয় ২-৩ অক্টোবর উত্তর কলকাতার বিনানি হলে। ১৯৬৮ সালের ৪ জুন প্রেস ক্লাব আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ্য সম্মেলনের আহ্বায়ক দীনেশ মজুমদার নতুন যুব সংগঠন গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন বেকারি, অর্থনৈতিক সংকট ও গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুব স্বাভাবিকভাবে শ্রমিক কৃষক ও সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষ লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে যুব সমাজ দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারেনা । শ্রমিক কৃষকের সহযোগী হিসেবে লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া যুব সমাজের কর্তব্য। সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রই একমাত্র পথ এই কথা ঘোষণা করেন দীনেশ মজুমদার। ১৯৬৮ সালের ৭ থেকে ৯ জুন ১১৯৬ জন প্রতিনিধি এবং ৯৮২ জন দর্শকদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় প্রথম রাজ্য সম্মেলন। সম্মেলন উদ্বোধন করেন কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙার। এই সময় সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৫৩৬ জন। সম্মেলন থেকে সভাপতি নির্বাচিত হন কমরেড দীনেশ মজুমদার, সম্পাদক নির্বাচিত হন কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য । খেত-খামার, কলে-কারখানায়, অফিস, শিক্ষায়তনে যখন ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে গণআন্দোলন, শাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যখন ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন জনসাধারণ, ঠিক তখনই দার্জিলিং জেলার নকশাল বাড়িতে বামপন্থী হঠকারিতা, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, ব্যক্তি হত্যার রাজনীতি প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতকেই শক্তিশালী করে তুলল। নকশালরা বাংলার যুবসমাজের কাছে দিকভ্রান্ত করা উদাহরণ তৈরি করল। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নৃশংসভাবে দমন করার জন্য শাসক শ্রেণির হাতে জুতসই অস্ত্র তুলে দিল নকশালবাদীরা। গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনকে একদিকে সংশোধনবাদ আর অন্যদিকে হঠকারিতা ও সংকীর্ণতাবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হল। সংগঠন বিকশিত হতে থাকল সন্ত্রাসকে মোকাবিলা করেই। এই সময়েই বাড়তে থাকে অর্থনৈতিক সংকট, কৃষি ক্ষেত্রে সমস্যা, ঘনীভূত হতে থাকে বেকার সমস্যা। তৎকালীন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের তীব্র জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি সনদ পেশ করা হয়। চলতে থাকে ধারাবাহিক লড়াই আন্দোলন। আধা ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসকে মোকাবিলা করে চলতে থাকে যুবদের আন্দোলন। কঠিন পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যেও প্রচারিত হতে থাকে সংগঠনের মুখপত্র যুবশক্তি পত্রিকা। ১৯৭৩ সালে ২৮ মার্চ সমাজের সব অংশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে মুখরিত হয় কলকাতা। বেকারি বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে যা সেই সময়ে জনমানসে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নিরক্ষরতা দূরীকরণে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করে ডিওয়াইএফ। প্রগতিশীল সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিক কর্মীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যের সাথে নানা স্থানে পরিবেশিত হয় জুলিয়াস ফুচিকের নাটক। সত্তরের দশকের ভয়ংকর সন্ত্রাসের দিনে যখন সংগঠনের কাজকর্ম সংকুচিত তখনও নিরক্ষরতা দূরীকরণ কেন্দ্র পরিচালনা করছেন যুব কর্মীরা। ভিয়েতনামের সংগ্রামের পক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আয়োজিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরিবেশিত হচ্ছে গণসংগীত। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ৫০তম জন্মবর্ষে রাজ্য জুড়ে পালিত হয় সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, যুবশক্তি পত্রিকার পাতায় পরিবেশিত হয় সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা। ভিয়েতনামে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে পথে নামে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। আবার চিলিতে প্রতি বিপ্লবী অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রচার দপ্তরের সামনে হাজার হাজার ছাত্র যুবর উপস্থিতিতে প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিবাদ সভা। ১৯৭৪ সালের নজিরবিহীন কুড়ি দিনব্যাপী রেল ধর্মঘট সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রচারকের ভূমিকা পালন করেছেন গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের কর্মীরা। ঐক্যবদ্ধ লড়াই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও বহু কমরেডের আত্মত্যাগের পথেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। রাজ্যে প্রসারিত হয় গণতান্ত্রিক অধিকার দক্ষিণপন্থী শক্তি দুর্বল হতে শুরু করে। এই নতুন পরিস্থিতিতে প্রচার আন্দোলনকে সময়োপযোগী করে তুলে নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। ১৯৮০ সালে ডিওয়াইএফের মতো ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যের বিপ্লবী যুব সংগঠনগুলি একত্রিত হয়ে পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় সম্মেলনে মিলিত হয়। এই সম্মেলন থেকে সর্বভারতীয় স্তরে সংগঠন গড়ে উঠল ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। সম্মেলন উদ্বোধন করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রমেন্দ্রকুমার পোদ্দার। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নওজোয়ান ভারত সভায় ভগৎ সিং-এর সহযোগী কমরেড কিশোরী লাল। প্রথম সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন ইপি জয়রাজন, সম্পাদক নির্বাচিত হলেন কমরেড হান্নান মোল্লা। সকলের জন্য শিক্ষা ও কাজের দাবিকে সামনে রেখে দেশ জুড়ে চলতে থাকে বিভিন্ন প্রচার, কর্মসূচি। চলতে থাকে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্ববিন্যাসের দাবিতে লড়াই, কৃষকের ফসল রক্ষার লড়াইয়েও শামিল হয় যুবসমাজ। ১৫ সেপ্টেম্বর সকলের জন্য কাজ ও শিক্ষার দাবি দিবসে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্ববিন্যাসের দাবি জানায় ডিওয়াইএফআই। এ রাজ্যে বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস গড়ে তোলায় ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ডিওয়াইএফআই। একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই অন্যদিকে কর্মসংস্থানের পক্ষে লড়াই চলতে থাকে। আজকেও এক কঠিন সময়ে যখন সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ বাড়ছে, সাম্রাজ্যবাদ যখন ঐক্য বিনষ্টকারী শক্তিগুলিকে মদত জোগাচ্ছে, স্থায়ী কাজের জায়গা যখন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, শিক্ষার উপর যখন আক্রমণ চলছে তখন ডিওয়াইএফআই-এর কর্মী সংগঠকরা রাস্তায় থেকে আপসহীন সংগ্রাম করে চলেছে। আমরা ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন, আমরাই নওজোয়ান ভারত সভার উত্তরাধিকার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিতে কাঁপন ধরানো ভগৎ সিং, বটুকেশ্বর দত্তদের সেই প্রিয় স্লোগান ইনকিলাব জিন্দাবাদ আজও শাসকের বুকে কাঁপন ধরায়। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময় ভগৎ সিং বলেছিলেন ‘আমরা সমাজতন্ত্র চাই’, এই দেশের মাটিতে ডিওয়াইএফআই-এর কর্মীরা স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের স্লোগানকে আরও দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করে। রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাক উল্লাহ খান ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্প্রীতির ঐতিহ্যের যে নজির গড়ে গেছেন সেই ঐতিহ্যের উপর যারা আঘাত আনতে চায় তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে ডিওয়াইএফআই। ভগত সিং জেলে বসে ভারতের মানুষের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিপ্লবী কর্মসূচির খসড়াতে জমির জাতীয়করণ, বসবাসের জন্য আবাসনের গ্যারান্টি, কৃষকের ঋণ মুকুবের কথা বলেছিলেন তার সাথেই শ্রমিকের কাজ ও কাজের সময় সম্পর্কে, কারখানা জাতীয়করণ ও সর্বজনীন শিক্ষার কথা বলেছিলেন। ভগৎ সিং এবং তার কমরেডরা স্পষ্টভাবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন ‘আমরা পরিবর্তন চাই’। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমস্ত ক্ষেত্রে। বর্তমানে যে ব্যবস্থা চলছে তাকে আমূল বদলে ফেলে এমন এক নবীন সমাজ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই যেখানে মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণের সম্ভাবনা থাকবে না এবং সর্বক্ষেত্রে মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাবে। আমরা মনে করি, গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে বদলে ফেলে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যদি না-যায়, তবে মানব সভ্যতার পরিণতি বড়ো ভয়ানক। শত প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আজ থেকে একশ বছর আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বাদ এনে দেবার জন্য যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা ছিল অনবদ্য। শিক্ষানীতি সম্পর্কে, কাজ সম্পর্কে, সম্পদের জাতীয়করণ সম্পর্কে ভগৎ সিংদের বক্তব্য অনেকাংশেই আজও প্রাসঙ্গিক। আজও ভারতবর্ষের মাটিতে ডিওয়াইএফআই বেকারের কাজের দাবিতে, সকলের শিক্ষার দাবিতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদকে বিক্রির বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে, সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। এই লড়াই সংগ্রামের পথেই বিদ্যুৎ, মইদুল, মনসুর, রাজিবুলরা শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন । যে চরম সংকট চলছে আমাদের দেশে, সেই সংকট থেকে মুক্তির জন্য মানুষ যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে না-পারে তার জন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়গত জাতিগত বিভাজনের অপচেষ্টা প্রতিদিন চলছে। ভগত সিং, রামকৃষন, সাইফুদ্দিন কিচ্লু, আব্দুল মজিদ, ভগবতী চরণ ভোরা, সুখদেব সহ নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন তার থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ভগৎ সিংরা চেয়েছিলেন সাম্রাজ্যবাদের শিকড় ও ডালপালা সমেত সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদকেই নির্মূল করতে, আজকের ভারতবর্ষে যে উগ্র সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এর কথা বলা হচ্ছে ভগত সিংরা কখনোই সে ধরনের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এর প্রবক্তা ছিলেন না। ইনকিলাব জিন্দাবাদ-এর ধ্বনি তুলে সমাজতন্ত্রের মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে কাজ নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা করেছিলেন, আজকের ভারতবর্ষে সেই মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ডিওয়াইএফআইয়ের। ১-৩ নভেম্বর , ১৯৮০ সংগঠনের প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলনে ভগৎ সিংয়ের সহযোগী বিপ্লবী কিশোরীলাল উপস্থিত থেকে যে দায়িত্ব আমাদের হাতে দিয়ে গেছেন, তা পালনে আরও যোগ্য হয়ে উঠতে হবে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের আলোকে। ‘তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি’ রচনায় ভগৎ সিং বলেছিলেন ‘প্রয়োজন শুধু ক্রমাগত লড়াই, কষ্ট ভোগ এবং আত্মত্যাগী পূর্ণ জীবনের। প্রথমে নিজের ব্যক্তি স্বতন্ত্রবোধকে চুরমার করো। ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দের স্বপ্নকে ঝেড়ে ফেলো। তারপর কাজ শুরু কর। এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে এগোতে হবে। সাহস দরকার, লেগে থাকা দরকার, দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি দরকার। কোনও কষ্ট, কোনও ব্যথা তোমাদের হতাশ করবে না। কোনও বিফলতা বা বেইমানিতে তোমরা ভেঙে পড়বে না।... কষ্ট ভোগ আর আত্মহত্যাগের পরীক্ষা পেরিয়ে তোমরা বিজয়ী হবে। আর এই আলাদা আলাদা জয়লাভ হবে বিপ্লবের মূল্যবান মূলধন।’ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে নওজোয়ান ভারত সভার বিপ্লবীরা যে মশাল জ্বেলেছিলেন, সেই মশালের আগুনকে আরও দৃপ্ত করতে হবে ডিওয়াইএফআই এর কমরেডদের। দায়িত্ব অনেক, মতাদর্শে বলিয়ান হয়ে পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, ধান্দার ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে, উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সকলের শিক্ষা ও কাজের লড়াইকে আন্দোলনকে জোরদার করতে আরও তৎপর হতে হবে। অনেক পথ এগোতে হবে, ভগৎ সিং-এর মতাদর্শের উত্তরাধিকারীরা সেই পথ পেরোবেই পথ পেরতে গিয়ে ক্লান্তি আসলে চলবে না— লক্ষ্য সমাজতন্ত্র, তাই এখন ক্লান্ত হওয়ার সময় নয়, এখন আকাশ ছোঁয়ার দিনকাল। প্রকাশের তারিখ: ১১-অক্টোবর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |