চে : নতুন মানুষ

দেবরাজ দেবনাথ

“His ideas,..., will continue to play a part with the Latin American Left.” 
১৯৬৮ সালের জুনে চে'র মৃত্যুর পরে চে'র চেতনার ক্ষতিকর দিক নিয়ে পিটার শেঙ্খেলের লেখা সিআইএ নথিতে পাওয়া যায় উপরের লাইনটা। পিটারের আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করেছিলেন চে। তবে শুধু লাতিন আমেরিকা না, গোটা দুনিয়ার কাছে হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা। এইখানেই মতাদর্শের জোর। সেই মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। এই নিয়ে চে কখনও রাখডাক করেননি। সিআইএ সেই কথা স্বীকারও করেছিল নিজস্ব রিপোর্টে। তার সঙ্গে আরও কিছু দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে সিআইএ। 

(১)

বুকে হাতে চে গুয়েভারার ট্যাটু আছে এমন ব্যক্তি আজ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিধায়ক। রিপাবলিক টিভির চিফ এডিটর তথা আরএসএস-বিজেপি’র ফেক নিউজ ফ্যাক্টরির অন্যতম হোতা ও বিশিষ্ট হিন্দুত্ববাদী সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর ছেলের নাম বিপ্লবী চে গুয়েভারার অনুপ্রেরণায় চে গোস্বামী। কেরালার বিজেপি নেতা পদ্মনাভন ২০১৭ সালে যুবসমাজকে চে গুয়েভারার বলিভিয়া ডায়েরি পড়বার নিদান দিয়ে আরএসএস’এর কাছে খুবই গালমন্দ খেয়েছিলেন। এমনকি তার কিছু বছরের মধ্যে আরএসএস চে গুয়েভারাকে নিয়ে বিশেষ কলাম লিখে দেখাতে চায় কীভাবে ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার মধ্যে দূরত্ব ছিল। চে কীভাবে প্রাশাসনিক পদের লোভে পড়েন! চে গুয়েভারাকে কীভাবে ভারতের কমিউনিস্টরা দীর্ঘদিন উদাসীনতা দেখান! কীভাবে চে কমিউনিজমের থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন! ইত্যাদি ইত্যাদি। 

ঘটনা হল আরএসএস’এর পক্ষে চে গুয়েভারাকে মুছে ফেলা কিম্বা পাত্তা না দেওয়াটা সম্ভব না। কারণ চে’র মতাদর্শ। ঠিক যেই কারণে চে গুয়েভারার মৃত্যুর পরেও ত্রস্ত ছিল আমেরিকা। সিআইএ’র গোপন প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। 

মারা যাবার সময় বন্দুকধারী সেনাদের সামনে দাঁড়িয়ে চে বলেছিলেন, “তোমরা শুধুই একজন মানুষকে মারছ।” লোকমুখে এই কথা শুনেছি আমরা বহু। চে বলতে চেয়েছিলেন, ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়।’ থেকে যায় মতাদর্শ। আমরা এই ব্যাখ্যা করি। অনুপ্রেরণা পাই চে'র জীবন থেকে। চে'র মৃত্যু থেকে পাই শিক্ষা। 

“His ideas,..., will continue to play a part with the Latin American Left.” 

১৯৬৮ সালের জুনে চে'র মৃত্যুর পরে চে'র চেতনার ক্ষতিকর দিক নিয়ে পিটার শেঙ্খেলের লেখা সিআইএ নথিতে পাওয়া যায় উপরের লাইনটা। পিটারের আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করেছিলেন চে। তবে শুধু লাতিন আমেরিকা না, গোটা দুনিয়ার কাছে হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা। এইখানেই মতাদর্শের জোর। সেই মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। এই নিয়ে চে কখনও রাখডাক করেননি। সিআইএ সেই কথা স্বীকারও করেছিল নিজস্ব রিপোর্টে। তার সঙ্গে আরও কিছু দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে সিআইএ। 

সিআইএ চে গুয়েভারাকে দেখেছে একজন রক্তভুক, যুদ্ধপিপাসু মানুষ হিসাবে, যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিরুদ্ধে। লাতিন ঐক্যের নামে চে যেন গেরিলা যুদ্ধকৌশল রপ্তানি করতে চায় সর্বত্র। চে গুয়েভারার মতাদর্শ তাদের কাছে বিপজ্জনক কারণ তা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মৃত্যু চায়। চে'র সাবেক কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বনিবনা হয় না, এমনটাই দেখাতে চায় তারা। তারই সঙ্গে চে যে মহত্তর আত্মত্যাগ করতেও সদাপ্রস্তুত, এ উপলব্ধিও তারা করেছিল। তাদের উপলব্ধি এ-ও ছিল, চে মরে গিয়েছে বলেই চে'র মতাদর্শ মুছে যায়নি। চে গেরিলা যোদ্ধা হিসাবে খ্যাত হলেও, তার মূল গুরুত্ব ছিল তার মতাদর্শে। 

সিআইএ’র প্লেবুক থেকে সোজা টুকেছে আরএসএস। চে’র জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করতে মাঝেমধ্যে চেষ্টা করে না যে আরএসএস তা না। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার এক ফাঁদও আছে। চে গুয়েভারার মতাদর্শকে কব্জা করতে, বলা ভালো জব্দ করতে চে’কে আত্মীকৃত করতে, সহজ কথায় গিলে নিতে সচেষ্ট থেকেছে আমেরিকা। চে হয়ে উঠেছে পণ্য। 

কমিউনিস্ট চে'র থেকে মুক্তমনা, লিবেরাল, নিছক মানবতাবাদী চে কম বিপজ্জনক। এই বেশেই চে কফি মাগ থেকে বুটজুতোতে মুখে জ্বলন্ত সিগারসহ ছবি হয়েছে কেবল। হয়েছে মার্কিন ‘লোন উলফ’, যৌবনসুলভ অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের সোলো ম্যাসকট, পপ আইকন। জেমস বন্ড মার্কা ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ womanizer অর্থাৎ নারীসঙ্গপিপাসু হিসাবে বিজ্ঞাপিত হয়েছে চে। 

“নাইনটিন সিক্সটিটু

আমি কিউবায় থিতু

চে গুয়েভারা বলিভিয়া গেল দিন পচ্চিশ

আমি বললাম ভাই চে,

এত মেয়ে জলে নাইছে,

প্রেমটাকে কেন বিপ্লবে ডিসপ্লেস কচ্চিস!”

চন্দ্রবিন্দুর এই গানকে ভুলে যাই কীকরে! চে : বিপ্লব করা যার নেশা! অথচ ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ মার্কা ব্যাপার আর কী! চে'র শাহাদত যত না ক্রুদ্ধ করে, তার চেয়ে বেশি করে ফেলে করুণ। Tragic Fallen Hero! আহা রে! সে একেলা লড়তে গেছিল। কিন্তু পেরে ওঠেনি। ঠিক এমনভাবেই চে হয়ে উঠেছে মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলির পোস্টারবয়। প্রতিবাদও যারা পণ্য করতে শিখেছে শেষ আধাশতকে। 

রলাঁ বার্ত লিখেছিলেন : “মিথ মানে ঠিক মিথ্যে না, পূর্ববর্তী তাৎপর্যের বিকৃতি হিসাবেই মিথের জন্ম, নতুন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভিন্ন নতুন মানে তুলে ধরে মিথ।” চে’কে কেন্দ্র করে বহুবিধ মিথের জন্ম হয়েছে, যেখানে ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছে চে’র সমাজতন্ত্রের পক্ষের লড়াই, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইতে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়া, সেই লড়াইতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, তা সে কঙ্গোতে হোক বা নিকারাগুয়ায়, প্যালেস্টাইনে হোক বা ভিয়েতনামে। শুধু সিনেমা-সাহিত্য-পোশাকের চমকেই চে’কে কেবল গিমিক হিসাবেই বেঁধে রাখতে উদগ্রীব পুঁজিবাদ।

(২)

অথচ চে'র ঐতিহ্য কি তাই? চে তো চাইতেন লাতিন আমেরিকা হয়ে উঠুক সেই স্থান যেইখান থেকে  “The Final victory over imperialism”-এর জয়ধ্বনি উঠবে। 

“As the Second Declaration of Havana states:

No nation in Latin America is weak — because each forms part of a family of 200 million brothers, who suffer the same miseries, who harbor the same sentiments, who have the same enemy, who dream about the same better future, and who count upon the solidarity of all honest men and women throughout the world…”

এই ভরসাতেই কার্যত সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ঐক্য গড়তে চে ছিলেন একবগগা। ১৯৬৪’র জেনিভায় বিশ্ব বাণিজ্যোন্নয়ন সম্মেলন, ১৯৬৪’র ডিসেম্বরে রাষ্ট্রসংঘে, ১৯৬৫’র গোড়ার মাসগুলোতে কঙ্গোসহ আফ্রিকা-এশিয়ার দেশগুলিতে চে'র অবস্থানে চে'র প্রাণপাত চেষ্টা ছিল তারই নিদর্শন। লাতিন আমেরিকান সংহতি সংগঠন (ওলাস) ১৯৬৬তে পথচলা শুরু করলেও, মূল অনুপ্রেরণা ছিল নিঃসন্দেহে চে নিজে। 

“Che Guevara considered the anti-imperialist struggle for liberation in Africa, Asia & Latin America to be historically justified and necessary.” 

সিআইএ’র তো অন্তত এই বোঝাপড়ায় কোনো সমস্যা হয়নি। ফিদেল নিজেও বিশ্লেষণে ভুল করেননি।

“He was imbued with a deep spirit of hatred and contempt for imperialism, not only because his political background had already acquired a considerable degree of development, but because he had only recently had the opportunity to witness in Guatemala the criminal imperialist intervention through the mercenary soldiers who ruined the revolution in that country.” ১৯৬৭ সালে চে’র মৃত্যুর পরে ফিদেল কাস্ত্রো চে গুয়েভারাকে স্মরণ করে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন এই কথা। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শুধু বইয়ের পাতায় পড়া ঘৃণা ছিল না চে'র। হাতেগরমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরীক্ষাগার হতে দেখেছেন লাতিন আমেরিকাকে, দেখেছেন মানুষকে নিঃস্ব হতে, গরিব হতে, দুর্দশাগ্রস্ত হতে। তাই সাম্রাজ্যবাদ বিশ্ব মানবতার ভেক ধরলেও চে কখনওই তার বিরোধিতার tone down করেননি। 

প্রসঙ্গত স্মরণে রাখব ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রসংঘে কিউবার প্রতিনিধি চে গুয়েভারার বক্তব্য।

“But imperialism, particularly U.S. imperialism, has attempted to make the world believe that peaceful coexistence is the exclusive right of the earth's great powers.”

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পরমাণু যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে অনুন্নত দেশগুলিকে বাঁদরনাচ করাবে তা চলতে পারে না। তাই চে ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, কঙ্গো, পোর্তো রিকো সকলের প্রতি সংহতি জানান এই বক্তব্যে : “To all peoples in conflict with imperialism and colonialism. We reaffirm our support to them.” 

আরএসএস ও সিআইএ'র অপপ্রচারের পর্দাফাঁস করতে পরের অংশটা যথেষ্ট। 

“We want to build socialism. We have declared that we are supporters of those who strive for peace. We have declared ourselves to be within the group of Nonaligned countries, although we are Marxist-Leninists, because the Nonaligned countries, like ourselves, fight imperialism. We want peace. We want to build a better life for our people. That is why we avoid, insofar as possible, falling into the provocations manufactured by the Yankees. But we know the mentality of those who govern them. They want to make us pay a very high price for that peace. We reply that the price cannot go beyond the bounds of dignity.

And Cuba reaffirms once again the right to maintain on its territory the weapons it deems appropriate, and its refusal to recognize the right of any power on earth — no matter how powerful — to violate our soil, our territorial waters, or our airspace.”

চে গুয়েভারা ব্যক্তিমানুষ ও কিউবার প্রতিনিধি হিসাবে স্পষ্টত ঘোষণা করে যে তারা শান্তির পক্ষে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে। এই শান্তি অর্জনে সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্ধিত দায়িত্ব পালন করবে তা তারা বিশ্বাস করে। তাদের বিশ্বাস দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষায় মৃত্যুর চেয়ে বড় গৌরবের কিছু নেই। কিউবা ত্যাগের আগে ফিদেলকে লেখা শেষ চিঠিতে উনি উল্লেখও করেন “Later we knew it was true, that in a revolution one wins or dies (if it is a real one). Many comrades fell along the way to victory.”

(৩)

কেউ কেউ গেরিলা যুদ্ধকৌশলের নায়ক হিসাবেই সীমায়িত রাখতে চান চে গুয়েভারাকে। কেউ কেউ চে'কে দেবতুল্য বলতে চান। অথচ চে ছিলেন ঠিকভুলে ভরা এক মানুষ। নি:সন্দেহে নতুনতর উন্নত সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় ঋদ্ধ মানুষ ছিলেন চে। তিনি কেবল গেরিলা যুদ্ধের অসাধারণ নায়ক হিসাবে স্মর্তব্য থাকবেন? অথচ তা হলে বলিভিয়াতে সংকীর্ণতাবাদী স্বার্থান্বেষীদের চিনতে ভুল করলেন কী করে? নাকি এটি এই জীবনের ‘necessary risk’? 

রায়া দুনায়েভেস্কা ১৯৬৭ সালে লিখছেন : 

“This is what the guerrilla fighter forgets when he becomes impatient and wishes to substitute himself for the masses. At those moments, Guevara argued against the statement of Lenin: “Without a revolutionary theory, there is no revolutionary movement.” Instead he held that "even if theory is not known, the revolution can succeed if historic reality is interpreted correctly and if the forces involved in it are utilized correctly.”

অথচ বিপ্লব উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না ইচ্ছে মত। মাটি উর্বর না হলে ফলন হয় না ঠিকমতো। চে গুয়েভারা তার মার্কসবাদ অধ্যয়নের কালে এই কথা যে জানতেন না, তা নয়। তবে তত্ত্ব জানা থাকলেও প্রয়োগে ভুল হতে পারে। এই সতর্কবাণী চে তার জীবন দিয়েই আমাদের শুনিয়ে যান। 

(৪)

রিমা হাসান একজন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাংসদ। ঘটনাচক্রে বামপন্থী। জন্মসূত্রে প্যালেস্টাইনীয়। ফ্রান্সের নাগরিক। ইজরায়েলি সৈন্যের হাতে জেলে বন্দি। অপরাধ? ইজরায়েলি সেনা যেভাবে প্যালেস্টাইন অবরোধ করেছে, সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে, শিশুদের মুখে খাবারটুকু তুলে দিচ্ছে না, আন্তর্জাতিক ত্রাণকার্য চালাতে বাধা দিচ্ছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আরও কয়েকজন সমমনস্ক সহযোদ্ধার সঙ্গে জাহাজে চেপে সাগরপথে প্যালেস্টাইনে পৌঁছাতে চান, জাহাজভর্তি খাবার ও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে। 

ইজরায়েল বাধা দেয়৷ আটক করে। রাইফেল না, কামান না, পরমাণু মিসাইল না। খাবার-ই সবচেয়ে খতরনাক অস্ত্র। রিমা হাসানদের খাবারভর্তি জাহাজ আটক করে ইজরায়েল প্রমাণ করল তা। 

চে গুয়েভারা খুন হয়েছে প্রায় ৫৮ বছর আগে। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার অনড় চেতনা তীব্র হয়ে বেঁচে আছে। 


প্রকাশের তারিখ: ১৪-জুন-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org