নো পাসারনের যোদ্ধা

রণেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ক্রিস্টোফার কডওয়েলের আজ জন্মদিন। ছিলেন ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ১৯৩৭, স্পেনে ফ্র্যাঙ্কোর বিরুদ্ধে ফ্যাসি-বিরোধী লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে যোগ দিয়ে যখন শহীদ হয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯। তাঁর বিখ্যাত বই স্টাডিজ ইন এ ডাইং কালচার- এর অনুবাদ করেন রণেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুবাদকের ভূমিকাটি এখানে প্রকাশ করা হল।

বিশের দশকের রমরমা তেজী বাজারে হঠাৎ মন্দা দেখা দিল। পৃথিবীর তখনকার সবথেকে অগ্রসর পুঁজিপতি দেশ ইংল্যান্ড। সেখানেও বেকারের লাইন লম্বা হতে থাকে; ছাত্র এবং মধ্যবিত্ত কর্মচারীরাও এই প্রথম দেখতে পেলেন যে তাঁদের অবস্থাও শিল্পশ্রমিকের মতই অসহায়। শিল্পসমৃদ্ধি ঘটেছে অভাবনীয় অথচ সাধারণ মানুষের দারিদ্র দুর্দশা বেড়েছে বহুগুণ। জাঁদরেল ভবিষ্যৎবক্তা পণ্ডিতদের যেসব উপদেশ পরামর্শ আগে অনেকে বেদবাক্যের মত অমোঘ মনে করতেন, তাঁদের সেসব কথায় আর কাজ হচ্ছে না। অবস্থার উন্নতির জন্য দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখতে সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে খাদ্য ও শিল্পে ব্যবহৃত কৃষিজ সম্পদ ধ্বংস করা হতে থাকল। অতি উৎপাদনের কুফল এড়ানোর জন্য কোন কোন পণ্ডিত গুরুত্ব দিয়েই বললেন শিল্প-উৎপাদনে উন্নত যন্ত্রের ব্যবহার এখন কিছুদিন বন্ধ থাক, সেটাই একমাত্র দাওয়াই। কেউ বললেন কায়িক শ্রম বাঁচানোর জন্য নতুন যন্ত্রের প্রয়োগ তো বন্ধ করতেই হবে, এমন কি যন্ত্রের সাহায্যে যেসব কাজও বরং কায়িক শ্রমের সাহায্যেই হোক। বেকার সমস্যার সমাধান হবে! শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ কিন্তু বুঝলেন অন্যরকম। পৃথিবীর অন্যতম পুঁজিবাদী দেশ বৃটেনের ইতিহাসের সব থেকে বড় সাধারণ ধর্মঘট হল ১৯২৬ সালে এবং সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক জীবনকে তা পঙ্গু করে দিল। বৃটেনের জনসাধারণ এক সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু ‘জেনারেল কাউন্সিল অব দ্য ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস’-এর দুর্নীতি গ্রস্থ নেতৃত্ব সংগ্রাম প্রত্যাহার করে নিয়ে বিপ্লবী সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে যে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কোনওদিন মার্ক্সের অস্তিত্বকে স্বীকার করেনি, একটা শিক্ষকতার চাকরি দিতেও ইংল্যান্ড প্রবাসী মার্ক্সকে রাজি হয়নি, যে ইংল্যান্ডের শ্রমজীবী মানুষের ছোট ছোট অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চাঁদা তুলে কোন মতে চিকাগোর কার কোম্পানি থেকে মার্কসের রচনাবলী কিনে আনত সেই মার্ক্সের পথনির্দেশের মধ্যে এখন বুদ্ধিজীবী সমাজ বাঁচার পথের দিশারী আলোর সন্ধান পেতে থাকল।

ক্রিস্টোফার কডওয়েলের আসল নাম ক্রিস্টোফার সেন্ট জন ম্প্রিগ। জন্ম ইংলণ্ডের পাটনি শহরে ১৯০৭ সালের ২০ অক্টোবর। লেখাপড়া শেখেন ইলিঙের সেন্ট বেনেট রোমান ক্যাথলিক কলেজে। অল্প বয়সেই কাব্য ও বিজ্ঞানের দিকে আগ্রহ দেখা যায়। সতের বছর বয়সে স্কুলের পড়া শেষ করে রিপোর্টার হিসাবে ইয়র্কশায়ার অবজার্ভার কাগজে তিন বছর কাজ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন এই পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক। তারপর লণ্ডনে দিয়ে বৃটিশ মালয় পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং ভাইয়ের সঙ্গে একটি বিমান বিষয় পুস্তক প্রকাশন সংস্থা গড়ে তোলেন। পঁচিশ বছর বয়সের আগেই বেশ কিছু ছোট গল্প, কবিতা, ডিটেকটিভ উপন্যাস ও বিমানবিদ্যার উপর পুস্তক রচনা করেন। ১৯৩৪-এর শেষ দিকে মার্কসবাদ সম্বন্ধে পড়াশুনা শুরু করেন। ১৯৩৫-এর মে মাসে কডওয়েল ছদ্মনামে একটি গুরুগম্ভীর মনস্তাত্বিক উপন্যাস লেখেন। নাম দিস মাই হ্যান্ড। কর্ণওয়ালে কিছুদিন কাটিয়ে লন্ডনে ফিরে এসে ইলিউশ্যন অ্যান্ড রিঅ্যালিটি-র খসড়া করেন। ডিসেম্বরে লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে পপলারে বাসা নেন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন । এর কয়েকমাস পরে প্যারিসে যান ‘পপুলার ফ্রন্ট’ আন্দোলন সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা লাভের উদ্দেশ্যে। ইতোমধ্যে জুলাই মাসে স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেখানকার পপুলার ফ্রন্ট সরকারকে সাহায্য করার জন্য নভেম্বর মাসের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির পপুলার শাখা কিছু অর্থ সংগ্রহ করে একটি অ্যাম্বুলেন্স কেনে। ফ্রান্স পার হয়ে স্পেন সরকারের হাতে সেটি তুলে দেওয়ার জন্য কডওয়েলকে নির্বাচিত করা হয়। সেই দায়িত্ব পালনের পর সেখানকার আন্তর্জাতিক বাহিনীর বৃটিশ বিভাগে তিনি যোগ দেন। তারিখটা ছিল ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৬।

নভেম্বর বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণির সফল সংগ্রাম সেখানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম দিল। এই দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য সমস্ত দেশের নিপীড়িত ও শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুনিশ্চিত করে তোলে। ১৯২৯-এর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশায় পুজিপতিদের মরীয়া চেষ্টা চলত থাকে আর সেই সঙ্গে নিজেদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। রাষ্ট্রশক্তি হিসাবে ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ও জার্মানীতে নাৎসিবাদ কায়েম হয়। তিরিশের দশকে এই বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্বের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে উঠল স্পেন। সেখানে আগ্রাসী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছিল।

১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ স্পেনের সাধারণ নির্বাচনে সোস্যলিস্ট কমিউনিস্ট অ্যানার্কিস্ট ও বিভিন্ন রিপাবলিকপন্থী পার্টি জয়লাভ করে পপুলার ফ্রন্ট সরকার গঠন করে। নির্বাচনের পরের দিনই দুপুরে নেতা সোস্যলিস্ট কাবালেরো ও আলভারেজ ভাইরো যান অস্থায়ী কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রী পোর্তোলো ভালাদারেসের সঙ্গে দেখা করতে। ভালাদারেস তাদের জয়লাভে অভিনন্দন জানান। সেই সঙ্গে এটাও জানান যে সেইদিনই সকাল চারটায় জিল রোবলস ও কালভো সতেলো তাঁর সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে গেছেন যে নির্বাচনে পরাজিত সমস্ত দলগুলি তাকে সমর্থন করতে প্রস্তুত যদি তিনি একনায়কত্বের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সেইদিনই সন্ধ্যা সাতটায় ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোও তাকে একই প্রস্তাব করেন। রোবলস ছিলেন ভূতপূর্ব লেরুকস মন্ত্রীসভার যুদ্ধমন্ত্রী। কালভো সতেলো ছিলেন তথাকথিত ‘ন্যাশানাল ব্লক’-এর প্রতিষ্ঠাতা। নির্বাচনে এঁর দল মোট পাঁচশ সাতটি আসনের মধ্যে পেয়েছিল তেরটি। মরক্কোর সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন ফ্রাঙ্কো। নির্বাচনের পর মানুয়েল আজানিয়াই দিয়াস প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মন্ত্রীসভা গঠন করার আগেই তাড়াহুড়ো করে ভালাদারেস অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী শক্তি দ্রুত আগ্রাসী রূপ নিতে থাকে। ৫ মার্চ হিটলার গায়ের জোরে রাইনল্যান্ড পুনরাধিকার করে। ফ্যাসিবাদের নখ দেখে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে স্পেনের পপুলার ফ্রন্টের নির্বাচনী সাফল্য বেশি করে মনে দাগ কাটল ফ্রান্স ও ইংলন্ডে বিশেষ করে তার প্রভাব দেখা গেল। ফ্রান্সে এপ্রিল-মে মাসে সোশ্যালিস্ট ও কমিউনিস্টরা প্রাধান্য পেতে থাকে। ৫ই মে মুসোলিনি আবিসিনিয়ার রাজধানী দখল করে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সরকার পূর্ণ নিস্ক্রিয়তার পথ নিল। ইউরোপের মানুষের অন্তত বুঝতে দেরি হল না এইসব সরকারের আসল উদ্দেশ্য কী। ৪ জুলাই ১৯৩৪ ফরাসী রিপাবলিকের প্রথম পপুলার ফ্রন্ট সরকার গড়লেন লিঁয় ব্লুম। সেই বসন্তে ইউরোপে এই দুমুখী হাওয়া বইলেও সর্বসাধারণ তখনও বামশক্তিগুলির একান্ত ঐক্যের গুরুত্ব সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেনি।

মে মাসে আজানিয়া স্পেন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হলে কিরোগা প্রধানমন্ত্রী হলেন। ফ্রান্সে, গদেদ, কাবানেল্লো, নানো, আরন্দা, মোলা দলবেঁধে এসে প্রথমেই তাদের আনুগত্য ঘোষণা করল। ১৭ জুলাই বিকেল পাঁচটায় আফ্রিকান বাহিনী বিদ্রোহ করে মেলিলায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ঘোষণা করে। বিদ্রোহ দ্রুত গোটা মরক্কোয় ছড়িয়ে পড়ে। কাদিজ, করদোভা, গ্রানাদা, সেভিল, মালাগা এককথায় পামপ্লোনা থেকে করুন্না পর্যন্ত গোটা উত্তর এলাকা বিদ্রোহীদের হাতে চলে যায়। আজানিয়া প্রেসিডেন্ট হলে যাঁরা সবথেকে আগে এসে তাঁর প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিল তারাই হল এই বিদ্রোহের নেতা। ১১ জুলাই সকালে আজানিয়া মার্তিনেজ বারিওকে সরকার গঠন করতে বললে আন্দালুসিয়ার বৃহৎ জমিদারদের বন্ধু বারিও ‘ন্যাশানাল রিপাবলিকান পার্টি’র নেতা রোমানের সঙ্গে পরামর্শ করে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে। মাদ্রিদের জনগণ তীব্র ঘৃণায় চিৎকার করে ওঠে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘অস্ত্র নাও, অস্ত্র নাও’। বিকেল চারটের মাতিনেক বারিও পদত্যাগ করে। স্পেনের জনগণের উপর ফ্যাসিবাদের যুদ্ধ ঘোষণার মোকাবিলা করার মত দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত এমন এক নতুন সরকার গড়ার আশ্বাসও ঘোষণা করা হয়। জোসে জিরাল সেই সরকারের নেতা হবেন। দুজন রিপাবলিকান পার্টির অফিসার জেনারেল কাস্তেলো এবং জেনারেল সেবাস্তিয়ান পোখার উপর যুদ্ধ ও প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হল। অর্থাৎ এবারেও শ্রমিক ও বামপন্থী প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে পুরোপুরি রিপাবলিকান পার্টির সরকার গড়তে দিলেন আজানিয়া। ফলে এই সরকারও অচিরে অকেজো হয়ে পড়ল; শেষ অবধি ডাকা হল সোশ্যালিষ্ট নেতা লার্গো কাবালেরোকে। ৪ সেপ্টেম্বর স্পেনের প্রথম সোশ্যালিস্ট প্রধানমন্ত্রী ও যুদ্ধমন্ত্রী হিসাবে নতুন সরকার গড়লেন কাবালেরো। স্পেনের মানচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে ইতিমধ্যে দেশটি কার্যত: দুভাগে দুই পক্ষের দখলে চলে গেছে। একদিকে শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা যেখানে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলি বর্তমান এবং তা রয়েছে সংগঠিত শ্রমিকদের প্রভাবাধীনে। অপরদিকে রয়েছে পশ্চাৎপদ অঞ্চল। সেখানে সামন্ততান্ত্রিক কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বর্তমান; হতভাগ্য কৃষক ও গ্রামবাসীরা যেখানে বৃহৎ জমিদার, লাতিফুন্দিস্ত ও গির্জার দ্বারা পুরোপুরি প্রভাবিত।

অগাস্টে মেরিদা ও বাদাহথের পতন ঘটল। ফ্যাসিবাদী দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ সম্পন্ন। নভেম্বরের মধ্যেই বিদ্রোহী রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতা গ্রহণ করে ফ্রাঙ্কো। রাজধানী মাদ্রিদ দখল করার সে হুমকি দিল, জানিয়ে দিল যে ৭ নভেম্বর সেখানে সমবেত প্রার্থনাসভায় সে যোগ দেবে। অর্থাৎ নভেম্বর বিপ্লবের স্মরণীয় দিনটিকে কুড়ি বছরের ভেতর সে পৃথিবীর লোককে ভুলিয়ে দেবে, ডুবিয়ে দেবে সেই স্মৃতি ফ্যাসিবাদের হিংস্র তাণ্ডবে। ৬ নভেম্বর কাবালেরো সরকার গোপনে মাদ্রিদ ত্যাগ করে ভ্যালেন্সিয়ায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু পঞ্চম রেজিমেন্টের স্পর্ধিত আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনসাধারণ অস্ত্র তুলে নিলেন হাতে। মাদ্রিদের পথে পথে রক্তক্ষয়ী দিন ইতিহাস গড়ে তুলল। অলৌকিক সে ইতিহাস, স্পর্ধিত সে ইতিহাস, যে ইতিহাসের সূত্রপাত ঘটেছিল রাজধানী মাদ্রিদের বেতারকেন্দ্র থেকে ১৮ জুলাই তারিখেই ঘোষিত নারীকণ্ঠের দৃপ্ত আহ্বানে। দোলোরেস ইবারুরি (লা পাসিওনারিয়া নামে যিনি খ্যাত) জানিয়েছিলেন প্রতিরোধের আহ্বান— No Passaran ‘ওদের জিততে দেব না।’ ‘হাটু গেড়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মরাও ভালো।

এই প্রতিরোধকে কেউ বলেছেন গৃহযুদ্ধ, কেউ বলেছেন অসমাপ্ত বিপ্লব, কেউ বলেছেন প্রতিবিপ্লবের ড্রেস রিহার্সাল বা পূর্ণাঙ্গ মহলা। স্পেনের সেই প্রতিরোধ সংগ্রামে পপুলার ফ্রন্ট সরকারকে অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করতে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই রাজি ছিল না। জার্মানী ও ইতালির কথাই ওঠে না। সেখানে তখন ফ্যাসিবাদ কায়েম। তাদেরই আগ্রাসী ‘স্বেচ্ছাসেবকরা স্পেনের উপর হামলা চালাচ্ছে। হস্তক্ষেপ না করার’ নীতির মুখোশ খুলে দিয়ে সোভিয়েত পাঠায় তার সাহায্য। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বিশ্বের যাবতীয় ফ্যাসিবিরোধী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ডাক দেয়: নিজ নিজ দেশে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলে স্বাধীনতার সপক্ষে লড়াইয়ের জন্য তাদের স্পেনে পাঠাও। ২০ নভেম্বর রলাঁ এক মর্মস্পর্শী আবেদন জানান: ‘মনুষ্যত্ব! মনুষ্যত্ব! আজ তোমার দ্বারে আমি ভিখারি। এসো, স্পেনকে সাহায্য কর! আমাদের সাহায্য কর! তোমাদের সাহায্য কর! কেন না তুমি আমি সকলেই আজ বিপন্ন...!’

স্পেনের সেই দুর্দিনে পপুলার ফ্রন্টের হয়ে লড়াই করতে পৃথিবীর চুয়ান্নটি বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছিলেন প্রায় চল্লিশ হাজার স্বেচ্ছাসেবক। অবশ্য এঁরা সকলেই একই সঙ্গে একই সময়ে যে এসেছিলেন, তা নয়। বিশ্বস্ত  সূত্র থেকে বলা হয়েছে যে এককালে সতের হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক কখনই স্পেনে ছিলেন না এবং কোনও একক সংঘর্ষে ছ’হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক কখনও অংশগ্রহণ করেননি। এঁদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক ব্রিগেড। মোট পাঁচটি। এগারো থেকে পনের নম্বর।

জার্মান স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গড়া এগারো নম্বর ব্রিগেডের নাম ছিল থেলমান ব্রিগেড। জার্মানীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কমিউনিস্ট নেতা আর্নেস্ট থেলমান ৩ মার্চ ১৯৩৩ বার্লিনের সার্লটেনবুর্গ অঞ্চলে নাৎসিদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর হিটলারের বন্দীশিবিরে দীর্ঘকাল অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করেন। অবশেষে ১৮ অগাস্ট ১৯৪৪ ওরা তাঁকে গোপনে হত্যা করে কুখ্যাত বুখেনভাল বন্দীশিবিরে মাটিচাপা দেয়। জার্মান স্বেচ্ছাসেবকদের বেশির ভাগেরই ছিল সামরিক প্রশিক্ষণ, না-হয়তো ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা। এঁরা সকলেই ছিলেন নাৎসি বিরোধী। মুয়েলা দা তেরুয়েলার যুদ্ধে (১৮ ডিসেম্বর ১৯৩৭—২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮) এঁদের শেষ স্বেচ্ছাসেবকের মৃত্যু হয়। মাদ্রিদ রক্ষার সংগ্রামে জন্ম নিয়েছিল যে ‘থেলমানের গান’ (স্পেনের আকাশে ঝলমল করে তারা... ইত্যাদি) তা এই বীর বাহিনীরই সৃষ্টি। তাহলে, হান বেইমলার, হেনরিখ রাউ, গুন্তাফ ৎসিত্তা, হাইনৎস হফমান, লুই সুষ্টার, লুডভিগ রেন, হান্‌স কাহ্‌ লে ছিলেন এই ব্রিগেডে।

বার নম্বর ব্রিগেডটি প্রথমে তৈরি হয়েছিল জার্মান, ইতালীয় ও ফারাসী ফ্যাসিবিরোধীদের নিয়ে। ইতালির স্বাধীনতা ও ঐক্যের পক্ষে প্রথম যোদ্ধা বীর গ্যারিবল্ডির নামে এটির নামকরণ হয়। মুসোলিনির ব্ল্যাক আরো এবং লিতোরিও বাহিনী নাকি অজেয়। গুয়াদালহারার সমতলভূমিতে বৃহুয়েগার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে, আর আইবারা প্রাসাদ দূর্গের প্রতিটি পাথরে সেই ফ্যাসিস্ত বাহিনীর দর্প চূর্ণ করে দিয়েছিল এই গ্যারিবল্ডি বাহিনী। ইতালি থেকে যেসব পোড় খাওয়া ফ্যাসিবিরোধী সহযোদ্ধারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা লুইজি লঙ্গো সোশ্যালিস্ট নেতা পিয়েত্রো নেন্নি, দ্য ভিত্তোরিও, নিনো নানেত্তি, ভিত্তোরিও ভিদালি, পাকিয়ার্দি, রোসেল্লি।

পোল, চেক ও পূর্ব ইউরোপের স্লাভ ভাষাভাষী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গড়া তেরো নম্বর ব্রিগেডের নামকরণ হয়েছিল পোল বীর দমব্রাউস্কির নামে। জারের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে পোল্যান্ডের সংগ্রামে অমর এই বীরের নাম পোলরা আজও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন ।

চোদ্দ নম্বরটি গড়া হয়েছিল ফরাসী ও বেলজিয়ান স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে। এটির নাম ছিল ফ্রাঙ্কো-বেলজি ব্রিগেড। এতে ছিলেন দুমঁ, আঁদ্রে মার্তি, ফাবিয়েন, ডা.-রকে, আঁদ্রে মালরো, রল তাঙ্গির মত জগৎ বিখ্যাত সব বীর। ফরাসী বিপ্লব, প্যারি কমিউন, এবং আরও আধুনিককালের ফরাসী ও বেলজিয়ান সর্বহারা শ্ৰেণির গৌরবময় জয়গাথায় একদিন মুখর হয়ে উঠেছিল স্পেনের বাতাস এঁদের কণ্ঠে। সেই বছর শীতের শেষে মাদ্রিদে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের বীর সৈনিকদের সমাধিপ্রাঙ্গনে তাঁদের স্মৃতিফলকের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হত এ’যেন প্যারিরই কোনও রাস্তা।

পনেরো নম্বর ব্রিগেডে ছিলেন ইংরেজিভাষীরা। ১৯৩৬-এর নভেম্বরের শুরুর দিকে এবং মাদ্রিদ রক্ষার লড়াইয়ের সময়ের কথা বাদ দিলে, স্পেনের যাবতীয় বিখ্যাত রণাঙ্গনে বাতাসে হিল্লোলিত হয়েছে এঁদের পতাকা, মাটি ভিজেছে এঁদের রক্তে। অন্যান্য ব্রিগেডের মতো এটিতেও প্রথমে ছিলেন নানা ভাষাভাষী, যেমন স্নাভ দিমিত্রভ ব্যাটেলিয়ন এবং ফরাসী ‘৬ ফেব্রুয়ারি’ ব্যাটেলিয়ন। বুলগার জনগণের বীর বিপ্লবী নেতা জর্জি দিমিত্রভ ছিলেন বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ডের পরে ৯ মার্চ ১৯৩৩ নাৎসি শান্ত্রীদের হাতে বন্দী হন। কিছুদিন আটক রাখার পর লাইপৎসিগে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘রাইখস্টাগ বিচার’ (২০.০৯. ১৯৩৩)। মিথ্যা অভিযোগের মামলা থেকে মুক্তিলাভের পর তাঁকে হত্যার জন্য ফ্যাসিস্তরা চক্রান্ত করে। কিন্তু সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করে সোভিয়েত বিমান তাঁকে সোভিয়েত দেশে নিয়ে যায় এবং সেই দেশের নাগরিকত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। সমস্ত বলকান রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধি, ক্রোট, বুলগার, রুমানীয়, সার্ব ও প্যারির যুগোস্লাভ ছাত্রদের নিয়ে গড়া হয় এই দিমিত্রভ ব্যাটেলিয়ন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য এই ব্রিগেডে থাকে চারটি ব্যাটেলিয়ন ও তার সাহায্যকারীরা। এর মধ্যে তিনটি ইংরেজিভাষী ও চতুর্থটি স্প্যানিশ। প্রথমটি ইংল্যান্ডের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গড়া শাকলাতওয়ালা ব্যাটেলিয়ন। শালাতওয়ালা ছিলেন বৃটিশ পার্লামেন্টের লন্ডন জেলা থেকে নির্বাচিত ভারতীয় সদস্য। এই ব্যাটেলিয়নে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে খ্যাতনামা মহিলা শিল্পী ফেলিসিয়া ব্রাউন, র‍্যালফ ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল। জন কন ‘ফোর্ড, ক্লাইড ব্রানসন (ভারতে জন্ম, বৃটিশ নাগরিক) ভারতীয় কৃষক নেতা গোপাল মুকুন্দ হুদ্দার ও মুলক রাজ আনন্দের নাম সুপরিচিত। দ্বিতীয়টি কানাডাবাসীদের নিয়ে পড়া ম্যাকেঞ্জি পাপিনো ব্যাটেলিয়ন। ১৮৩৭ সালে এই ইংরেজ কলোনির দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনৈতিক নেতা ও ফাটকাবাজদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ম্যাকেঞ্জি ও পাপিনো একত্রে এক বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। তৃতীয়টি কিউবা, মেক্সিকো, পুয়ের্তো রিকো এবং অন্যান্য দক্ষিণ আমেরিকাবাসী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গড়া ২৪ নম্বর মেতান্তরে ৫৯ নং) স্প্যানিশ ব্যাটেলিয়ন। চতুর্থটি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গড়া আব্রাহাম লিঙ্কন ব্যাটেলিয়ন।

নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত অনেক মানুষ এই সব ব্যাটেলিয়নে যোগ দিয়েছিলেন। তারা কেউ স্পেনের যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ দিয়েছে। কেউ পরে অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও সম্মান অর্জন করেছেন। যাঁরা এই যুদ্ধের পরেও বেঁচেছিলেন তাঁরা অনেকেই পরে বিশ্বযুদ্ধের কালেও আলৌকিক বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন অথবা পরবর্তীকালের ইতিহাসে বৈশিষ্টপূর্ণ স্বাক্ষর রেখেছেন। পোল্যান্ডের বীর জেনারেল স্বোয়াইয়ের জিউস্কি স্পেনে জেনারেল 'ওয়াল্টার' নামে সুপরিচিত ছিলেন। রিপাবলিকান আর্মির ৩৭ নম্বর ডিভিশনের সেনাপতি হয়েছিলেন। পরে হিটলারের সেনাবাহিনীর হাত থেকে যে পোল বাহিনী ওয়ারশকে মুক্ত করে, তিনি তার সেনাপতি হন। প্যারিকেও একইভাবে মুক্ত করে যে স্বাধীন ফরাসী বাহিনী তার সেনাপতি হয়েছিলেন ১৪ নম্বর ব্রিগেডের ভূতপূর্ব কমিশার কর্নেল রল তাঙ্গি। গ্যারিবল্ডি ব্রিগেডের রন্দল্‌ফ পাকিয়ার্দি বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রথম ইতালীয় সরকারের (গ্যাসপেরি) মন্ত্রী হয়েছিলেন। লুইজি লঙ্গ পরে উত্তর ইতালিতে জার্মানদের বিরুদ্ধে পার্টিজান আন্দোলন পরিচালনা করেন, যেমন করেন নিজ নিজ দেশে বুলগেরিয়ার পার্টিজান বীর সাবি দিমিত্রফ বা যুগোস্লোভিয়া মার্শাল টিটো। ঔপন্যাসিক আঁদ্রে মালরো স্পেনে আন্তর্জাতিক বিমান বাহিনীর প্রথম স্কোয়াড্রনের সংগঠক। ইতালীয় ও জার্মান কন্ডর লেজিয়নের বাছাই করা বিমান বহরের বিরুদ্ধে আকাশযুদ্ধে নামে এই স্কোয়াড্রনটি, রুশ বিমান তখনও এসে পৌঁছায়নি। হিটলার-অধিকৃত ফ্রান্সে গোপন এফ.এফ.আই সংগঠনেরও তিনি ক্যাপ্টেন ছিলেন এবং পরে ফরাসী মন্ত্রীসভাতেও যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আর্নেস্ট হেমিংওয়ে উপন্যাসের ক্ষেত্রে আলোড়ন এনেছেন। সেই দেশেরই আর্থার এঢ ল্যান্দিস পনেরো নম্বর ব্রিগেডের ইতিহাস লিখেছেন, লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Spain! The Unfinished Revolution! ল্যান্ডিস ছিলেন ম্যাকেঞ্চি-পাপিনো ব্যাটেলিয়নের স্বেচ্ছাসৈনিক। কানাডার নরম্যান বেথুন স্পেনে ব্লাডব্যাঙ্ক ব্যবস্থার জনক। ইনি পরে চীনা অষ্টম রুট বাহিনীর সঙ্গে আহতদের চিকিৎসার কাজে জীবন দান করেন।

আলবাথিটে প্রথম আস্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া চলছিল এবং আশা করা গিয়েছিল যে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিভিসনের রূপ দেওয়া যাবে। কিন্তু তার আগেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটায় মাদ্রিদ রক্ষার প্রয়োজনে ৫ ও ৬ নভেম্বর তাদের রাজধানী রক্ষার উদ্দেশে রওনা হতে হল। মাদ্রিজ রক্ষার প্রথম আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সেনাপতি হয়ে এসেছিলেন হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট নেতা এমিল ক্লেবা। ৭ নভেম্বর ১৯৩৬ মাদ্রিদের রাজপথ শিহরিত হল স্বেচ্ছাবাহিনীর প্রথম পদসঞ্চারে, মুখ তাদের কঠোর মাথা উঁচু, কাঁধে রাইফেল, রোদে ঝলসে ওঠা কিরিচ। ‘লা পাসিওনারিয়া’ নামে খ্যাত খনি-শ্রমিকের কন্যা দোলোরেস ইবারুরি ছিলেন ফ্যাসিস্ত প্রতিবিপ্লবের ও গণপ্রতিরোধের রক্তঝরা দিনে স্পেনের প্রতিরোধ সংগ্রামের উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি। তাঁর জগবিখ্যাত আত্মজীবনীতে সেদিনের উচ্চকিত আতঙ্কির মাদ্রিদের বর্ণনায় আছে: “জানালার পিছনে গণবাহিনীর যোদ্ধাদের হাত বন্দুকের ট্রিগারে বোমা তৈরি। উদ্বিগ্ন চোখে ওরা তাকিয়ে রয়েছে এই অভিযাত্রী সেনাদলের দিকে। মেয়েরা হতাশায় ছেলেদের কাঁধ ঝাঁকি দিয়ে বলছে: ‘ওরা ঢুকে পড়েছে! আমরা কেন অপেক্ষা করছি ?

“এমন সময় রাস্তা থেকে বিদেশী ভাষার তীক্ষ্ণ স্বরে নির্দেশ শোনা গেল বাতাসে যেন চাবুকের শিষ। তারপরেই অজানা একাধিক বিদেশী ভাষার, অভিযাত্রীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হল আমাদের অতি পরিচিত, অতি প্রিয় সেই গানের কলি: ‘জাগো জাগো, জাগো সর্বহারা...’। আকাশ বাতাস ভরে গেল গানের সেই বজ্রনিনাদে। মাদ্রিদের জনতার স্বায়ুতে শিহরণ খেলে গেল। মেয়েরা আনন্দে কেঁদে ফেলল: ‘আমরা কি স্বপ্ন দেখছি? মাদ্রিদের রাজপথ পদভারে কাঁপিয়ে অভিযাত্রীরা তখন 'ইন্টারন্যাশনাল' গাইছে ফরাসী ও ইতালীর, জার্মান ও পোলিশ, রুমানীয় ও হাঙ্গেরীর ভাষায়। এরা ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেডের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের দেশে, আমাদেরই পাশে দাঁড়িয়ে লড়তে এবং হায়তো মরতে এসেছে।” ‘অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলি’। অনুবাদ: গৌতম চট্টোপাধ্যায়, পৃ-২৫, পরিচয়, ফ্যাসিস্টবিরোধী সংখ্যা, ১৯৭৫।

স্পেনের জনগণ ও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকদের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের শেষ দিকে এল চরম লজ্জা ও গ্লানির পর্যায়। ঘৃণ্যতম সেই বিশ্বাসঘাতকার পূর্ব মুহূর্তে ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ লীগ অব নেশনসের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে স্পেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পুয়ান নেগ্রিন সমস্ত রণাঙ্গন থেকে বিদেশী স্বেচ্ছাসেবকদের (আন্তর্জাতিক ব্রিগেডগুলিকে) সরিয়ে নেওয়ার এবং তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। ফ্রাঙ্কোর পক্ষ থেকে অবশ্য কোনও অপসারণ ঘোষণা করা হল না, বরং ডিভিসনের পর ডিভিসন ফ্যাসিস্ট স্বেচ্ছাবাহিনী আসতেই থাকল। এই পরিস্থিতিতে বার্সিলোনায় আন্তর্জাতিক ব্রিগেডগুলিকে রিপাবলিকের তরফ থেকে বিদায় সম্বর্ধনা দেওয়া হল ২৯ অগাস্ট ১৯৩৮, বিকেল সাড়ে চারটায়। পরিদর্শন মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নেগ্রিন ও তাঁর সমর-পরিষদ। শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় মাথার উপর টহল দিচ্ছে রিপাবলিকের প্রতিরক্ষা বিমান। রাস্তার দুধারে হাজার হাজার মানুষ। গর্বে আনন্দে অশ্রুতে সিক্ত সেই বিদায়সম্বর্ধনা। সমস্ত বিদেশী সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। Vincent Sheehan তাঁর Not peace, but a sword পুস্তকে লিখেছেন (2267): Malreaux told me about it a day or so later. "C'etait toute la Revolution qui s'en allait', he said. Perhaps that was why the people wept. These boys-all these Lardner’s, their average age was about twenty-three-had come to Spain to help save the Republic. The impulse which had sent all these Lardner’s to Spain had been a reflex of the conscience of the world.”

বিশ্বের বিবেক সেদিন স্পেন থেকে বিদায় নিল, বিদায় নিল বিপ্লব!

কডওয়েল, শাকলাতওয়ালা ব্যাটেলিয়নে যোগ দেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৬। ডিসেম্বরে মিয়াজা জুন্টার নেতৃত্বে মাদ্রিদ রক্ষা পেল। সামনাসামনি আক্রমণ করে ফ্যাসিস্তদের মাদ্রিদ দখলের স্বপ্ন মিলিয়ে গেল। জানুয়ারি ১৯৩৭ দক্ষিণ উপকূলের মালাগা শহরের উপর ফ্যাসিস্তরা যেমন আক্রমণ শুরু করল, তেমনি পূর্ব উপকূলের ভ্যালেন্সিয়া শহরের সঙ্গে স্থলপথে যোগাযোগ বন্ধ করার জন্য জারামা নদী বরাবর আক্রমণও শুরু হয়। রাজধানী থেকে মাইল পঞ্চাশেক উত্তর-পূর্বে গুয়াদালহারা শহরের দিকে ইতালীয় ফ্যাসিস্তরা যাতে আক্রমণ করতে পারে সেই ছিল উদ্দেশ্য। মাদ্রিদের দক্ষিণে পুবমুখো বিরাট পার্শ্ব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল ফ্রাঙ্কোর সেনাপতি ভারেলা আর অরগাজ। ভালদেমোরো, পিন্টো, সেসেনা আর গেতাফে শহর পড়ল এই আক্রমণ-লাইনের উপর। কুড়ি কিলোমিটার জুড়ে ফ্রন্ট। জারামা আর তাজুনিয়া নদী ঘেরা ত্রিভুজের মধ্যে আরগান্দা শহর হল তাদের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্য। তারপর জারামা-হেনারেস নদীকে বাঁদিকে রেখে উত্তরপূর্বে আলকালাদা হেনারেসের দিকে হবে তাদের আক্রমণের লক্ষ্য। তাহলেই মাদ্রিদ কার্যত: সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

জারামা পরিসীমার উপর চল্লিশ হাজার সৈন্য নিয়ে ফ্রাঙ্কো বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭। আটচল্লিশ ঘণ্টায় তারা প্রায় আট কিলোমিটার এগিয়ে গেল। লা মারনোজা পাহাড় মাদ্রিদ থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বিদ্রোহীরা সেটা দখল করে। তার দক্ষিণ-পূর্বে জারামা নদীর উপর পিন্দোক সেতু। ফরাসী আঁদ্রে মাতি ব্যাটেলিয়ন সেটি রক্ষা করে ১০ তারিখ পর্যন্ত। পরের দিন দুপুরে ফ্রাঙ্কো-বাহিনী জারামা পার হয়ে পিনগারন পাহাড় দখল করে।

১২ ফেব্রুয়ারি অবিরাম সৈন্য-সংস্থাপন ও লড়াই চলে। ভাসিয়া-মাদ্রিদের কাছে বিদ্রোহীরা মানথানারেস নদী পার হলেও আরগান্দা শহরের সামনে এলে তাদের রুখে দেওয়া হয়। মোরাতা দ্য তাজুনিয়ার দিকে বিদ্রোহীরা এগিয়ে যেতে থাকে। বেলা দশটার সময় রিপাবলিকান বাহিনীর গোলন্দাজ বিভাগের প্রথম সাড়া পাওয়া যায়। বত্রিশটি রুশ ট্রাঙ্ক এগিয়ে আসে। পিন্দোক সেতু পুনরুদ্ধার হয়। রিপাবলিকান পক্ষের স্পেনীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাটেলিয়নের ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ বাহিনীর প্রবল তেজের মুখে দাড়িয়ে ফ্যাসিস্ট সেনাপত্তি ভারেলা বিমান থেকে আক্রমণের চাপ বাড়িয়ে দেয়। এই সময় রিপাবলিকান পক্ষের প্রায় চল্লিশটি জঙ্গী বিমান সেতুর উপর দেখা দিতে বিদ্রোহীদের বিমানগুলি সরে পড়ে। জারামা নদীর উত্তর দিক অনেকটা সুরক্ষিত হল। ভারেলা তখন মোরাতা দ্য তাজুনিয়ার দিকে আক্রমণের মুখ ঘুরিয়ে দেয়। একটি রাস্তা সান মাতিন দ্যলা ভেগার সঙ্গে এই শহরটিকে যুক্ত করেছে। তাজুনিয়া নদীর উপত্যকা থেকে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে এই রাস্তাটি গেছে জারামা উপত্যকার দিকে। পনেরো নম্বর আন্তর্জাতিক ব্রিগ্রেড (লিঙ্কন) আর এগারো নম্বর থেলমান ব্রিগেড নিয়ে কর্নেল গাল মোরাতার সামনে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে আছেন।

১২ই সকালে পনেরো নম্বর ব্রিগেডের বৃটিশ ব্যাটেলিয়ন বিদ্রোহীদের মুখোমুখি দাঁড়ায়। সান মার্তিনের দিকের রাস্তার দক্ষিণ ধারে একটা টিলার উপর তারা ঘাঁটি করে। দিনের প্রথম সাত ঘণ্টা ধরে এই ঘাঁটি রক্ষা করা দেখে রিপাবলিকান পক্ষের দুর্বলতা চাপা পড়ে যায় এবং বৃটিশ ঘাঁটির দক্ষিণে তিন মাইল জুড়ে পুরোপুরি অরক্ষিত একটা জায়গা যে রয়েছে বিদ্রোহীরা তা বুঝতে পারে না। মরক্কোবাহিনী বারবার আক্রমণ করে। বৃটিশ সৈন্যরা অটল। উত্তর দিকে লাইন বরাবর ‘৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাটেলিয়ন’ লড়ছিল। তার ডান দিকে আরও উত্তরে দিমিত্রভ ব্যাটেলিয়নের আটশো সৈন্য। দুপুরের মধ্যে ‘৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাটেলিয়ন’-এর দুটি কোম্পানি কামানের গোলা আর মেশিনগানের সামনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পুরাতন কোল্ট বন্দুক কাজে লাগে না। ফলে টিলার উপর বৃটিশ সৈন্যদের সাহায্য করতে কেউ রইল না। কয়েকটি ট্যাঙ্ক এগিয়ে গেল, আর ফরাসীরা। কিন্তু ট্যাঙ্ক হঠে আসতে বাধ্য হল। ফলে বৃটিশ ফরাসী ও দিমিত্রভ ব্যাটেলিয়নের স্নাভরা ফ্যাসিস্ত ট্যাঙ্ক, গোলন্দাজ আর মেশিনগান বাহিনীর সামনে যতদূর সম্ভব আত্মরক্ষা করতে থাকল। বোল্ট-টানা রাইফেল ছাড়া তাদের হাতে আর কিছুই বিশেষ ছিল না। গোটা ব্রিগেডে একটা হাতবোমাও ছিল না। বৃটিশ ও ফরাসী সৈন্যদের চাপে বিদ্রোহীরা হঠে যেতে বাধ্য হয়। দিমিত্রভ ব্যাটেলিয়নের উপর তারা আক্রমণ করে। কিন্তু বেয়নেটের মুখে ফ্যাসিস্তরা পাঁচবার পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলেও প্রত্যেকবারেই তারা এগিয়ে আসে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালেও এইরকম ঘটনা অল্প কয়েকবারই মাত্র ঘটে। এই দিনের যুদ্ধে কডওয়েল যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের সম্মান অর্জন করেন। তখন তার বয়স উনত্রিশ। তাকে শেষ দেখা যায় সহযোদ্ধা সঙ্গীরা যাতে নিরাপদে পিছনের দিকে সরে যেতে পারে সেই উদ্দেশে টিলার উপর মেশিনগান হাতে লড়াই চালাচ্ছেন। আক্রমণকারী মূররা তখন মাত্র ত্রিশ গজ দূরে।

কডওয়েলের মৃত্যুর পর তার ইল্যুশন অ্যান্ড রিয়ালিটি (১৯৩৭), স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার (১৯৩৮), ক্রাইসিস ইন ফিজিক্স (১৯৩৯) এবং ফারদার স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার (১৯৪৯) প্রকাশিত হয়। কডওয়েল যখন স্পেন রওনা হন তখন 'ইলিউশন' যন্ত্রস্থ। বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিজীবী মহলে সাড়া পড়ে যায়। আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ক্রমে ক্রমে পরবর্তী পুস্তকগুলিও প্রকাশিত হতে থাকে। মার্ক্সবাদ যে সমসাময়িক কালের আর্থ-রাজনৈতিক সংস্থাগুলির গোলবর্ষণের মধ্যে সমাধানের পথের সুনিশ্চিত ঠিকানা হাজির করেছিল এটা যেমন কডওয়েলের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সেরকম নিজের ব্যাপক পড়াশুনাকেও সুবিন্যাস্ত করে মূল পথের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন চিন্তার ক্ষেত্রে। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের নিরিখে বর্তমান কালের মুমূর্ষু সংস্কৃতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন সমাজের সাধারণ চলনের মধ্যকার প্রকৃত চরিত্রটিকে বুঝলেন এই যন্ত্রণা মৃত্যু আশঙ্কার নয়, এ হল নতুন যুগের জন্ম-যন্ত্রণা।

এই পুস্তকের ভূমিকায় জন স্ট্রেচি কডওয়েলের রচনা সম্পর্কে যা লিখেছেন তার থেকে ভালো করে কিছু লেখার স্পর্ধা অনুবাদকের নেই। আমাদের কালের থেকে মাত্র বছর পঞ্চাশেকের ব্যবধানে হলেও কডওয়েলের কাল সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাঠক সাধারণের কাছে অবান্তর মনে হবে না এই বিশ্বাসে সামান্য দু-একটি কথা বলার চেষ্টা করা গেল। ভুল ত্রুটি কিছু থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত।

এমন এক কালে আমরা আজ বেঁচে আছি যখন মুমূর্ষু সংস্কৃতির ভাঙন ক্রমেই আরও বেশি বেশি করে তার নগ্নরূপ নিয়ে আমাদের চোখের সামনে স্পষ্টতর হচ্ছে, যেন এক ‘জলহীন, ফলহীন আতঙ্ক-পাণ্ডুর মরুক্ষেত্রে পরিকীর্ণ পশুকঙ্কালের মধ্যে মরীচিকার প্রেতনৃত্য। চেতনার এই দানবীয় মূঢ় অপব্যয়ের মধ্য থেকেই জন্ম নিচ্ছে যে-নতুন চেতনা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন যুগের সম্ভাবনা তাকে জানার সাগ্রহ প্রয়াসে পাঠকসাধারণের উৎসাহকে সামান্য পরিমাণেও স্পর্শ করা যদি সম্ভব হয় সেটাই হবে এই অনুবাদের সার্থকতা।

এই উপলক্ষ্যে অনুবাদটি প্রকাশের ব্যাপারে অনেকের কাছে আমি ঋণী। প্রকাশক সংস্থার সক্রিয় সহৃদয়তার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। প্রতিশব্দ ও পরিচিতির ব্যাপারে বন্ধু ড: ডালিম কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনির্মল মৈত্র ও অরুণ দে’র কাছেও কৃতজ্ঞতা জানাই ।

 

ভট্টাচার্যপাড়া

গোবরডাঙ্গা

৬ই এপ্রিল, ১৯৮৫।                                                             

র. না. ব.

 

  • স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার-এর অনুবাদকের ভূমিকাটি আপলোড করা হল। সূত্র— ক্রিস্টোফার কডওয়েল, স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার, রণেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (অনুবাদক), কলকাতা: পপুলার লাইব্রেরী,এপ্রিল ১৯৬০।
  • ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শিরোনাম মার্কসবাদী পথের

প্রকাশের তারিখ: ২০-অক্টোবর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org