সিনেমা ছিল তাঁর ধমনীতে

আদুর গোপালকৃষ্ণন

আমরা যারা সত্যজিৎ ও ঋত্বিককে পরস্পর প্রতিপক্ষ ভাবতাম, এটা তাদের কাছে ছিল একটি অজানা সত্যের আবিষ্কার। কণামাত্র সত্যতা তো দূরঅস্ত, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের গভীর গুণগ্রাহী। এই তথ্যটি গোপনই রয়ে গিয়েছে যে, ঋত্বিককে পুণে ইনস্টিটিউটে নিয়োগের জন্য সত্যজিৎই মূলত তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সুপারিশ করেছিলেন। 

বাংলা চলচ্চিত্রের বিখ্যাত ত্রয়ীদের মধ্যে ঋত্বিক কনিষ্ঠতম। অন্য দু’জন, সত্যজিৎ ও মৃণাল। খুবই অবিন্যস্তও এবং স্বল্পায়ুর জীবনে ঋত্বিক যা রেখে গিয়েছেন তা এক অত্যাশ্চর্য। চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর দায় এবং দরদ ছিল তাঁর রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতার মতই সুতীব্র। ঘনিষ্ঠ কমরেডরাও পারতেন না সামলাতে। তাঁর এই অতিরিক্ত বিপ্লবী ভাবনা তাঁকে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখত। ফলে তাঁর এই ভাবনা নিয়ে একার শক্তিতেই তাঁকে চলতে হয়েছে।

ঋত্বিক জন্মগতভাবেই ছিলেন প্রথাবিরুদ্ধ। ফলে ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক দামাল শিশু-র পরিচয়ে তিনি পরিচিতি হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবন ও কাজের মধ্যে ছিল এক দুরন্ত তালমিল। তুলনামূলকভাবে কম বয়সেই, মাত্র ৫০ বছরেই মৃত্যু হয়। তাঁর জীবন এবং কাজ দুইই ছিল অনন্য। তাঁর সমগোত্রীয় কেউই ছিলেন না। ছিল না কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকী ছিল না কোনও অনুকরণকারীও।

বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র সাক্ষ্য বহন করেছে আপোষহীন চেতনা ও বিরামহীন সংগ্রামের। ১৯৬৩ সালে পুণের ভারতীয় ফিল্ম ইনস্টিটিউটে আমাদের দ্বিতীয় বর্ষ চলার সময়ে ভাইস-প্রিন্সিপাল ও চলচ্চিত্র নির্দেশনা বিভাগের অধ্যাপক পদে যোগ দেন তিনি। আমরা তাঁর অবিস্মরণীয় দুঃসাহস (চলচ্চিত্র ও নাটকে) ও পারদর্শিতার কথা শুনেছিলাম। তার জন্য আমাদের ছিল এক সশ্রদ্ধ বিস্ময়। কাজেই আমরা অধীরভাবে প্রতীক্ষা করছিলাম তাঁর চলচ্চিত্র দেখা ও তাঁর কথা শোনার মুহূর্তটির জন্যে। যখন সেই মুহূর্তটি এলো আমরা হয়ে পড়লাম তুমুলভাবে রোমাঞ্চিত। উত্তেজিত এবং উৎসাহিত।

নিজের ছবি নিয়ে কথা বলতে তাঁর কোনও কুণ্ঠা ছিল না। আমাদের বলতেন, একটি কাল্পনিক রেখা ভেবে নিয়ে অভিনেতাদের দৃষ্টিপথকে সঠিক রাখতে সাহায্য করার নিয়মকে কেন তিনি ভঙ্গ করেছিলেন। একটি বিশেষ দৃশ্যের প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধিতে আবহ কতটা ভূমিকা রাখে এবং দর্শকের অনুভবে কীভাবে নতুন মাত্রা যোগ করে সেটা আমরা তাঁর কাছেই শিখেছি। চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর হার-না-মানা আবেগঋদ্ধ মনোভাব যা তাঁর দীর্ঘ এবং সুগভীর কথনের মধ্যে ধরা দিত, সেটাই ছিল ছাত্রদের প্রতি শিক্ষক হিসেবে তাঁর শ্রেষ্ট দান।

সত্যজিতের সঙ্গে সম্পর্ক

স্পেনীয় মূলের ম্যাক্সিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা লুই বুনুয়েল ছিলেন ঋত্বিকের প্রিয়। তাঁর অত্যন্ত ভালোলাগার চলচ্চিত্র ছিল ১৯৫৯ সালে তৈরি বুনুয়েলের নাজারিন। তুলনায় সুইডিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ইংমার বার্গম্যানকে তাঁর পছন্দ হত না। তাঁর ধার্মিকতাকে তিনি একেবারেই মানতে পারতেন না।

একবার শ্রেণিকক্ষে সত্যজিতের অপরাজিত প্রদর্শন করার সময়ে তিনি কিছু কিছু দৃশ্য দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই, একেই বলে মহৎ চলচ্চিত্র’। আমরা যারা সত্যজিৎ ও ঋত্বিককে পরস্পর প্রতিপক্ষ ভাবতাম, এটা তাদের কাছে ছিল একটি অজানা সত্যের আবিষ্কার। কণামাত্র সত্যতা তো দূরঅস্ত, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের গভীর গুণগ্রাহী। এই তথ্যটি গোপনই রয়ে গিয়েছে যে, ঋত্বিককে পুণে ইনস্টিটিউটে নিযুক্তির জন্য সত্যজিৎই মূলত তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সুপারিশ করেছিলেন। সাধারণভাবে যেভাবে প্রচার বা বিশ্বাস করা হয় তার সম্পূর্ণ বিপরীতে ঋত্বিকেরও উচ্চ প্রশংসক ছিলেন সত্যজিৎ। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ঋত্বিক একজন এমন মানুষ যার ধমনীতে বইছে সিনেমা’।  অন্যায়ভাবে যাঁকে তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, তাঁর মুখের এই কথাটি শুধু একটি নিছক প্রশংসাবাক‍্য নয়।

এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ

এই প্রসঙ্গেই আমার মনে পড়ছে একটি বেদনাদায়ক ঘটনার কথা যা সত্যজিৎ আমাকে বলেছিলেন। হাসপাতালে ঋত্বিকের মৃত্যুর খবর পেয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ। ঋত্বিকের মরদেহ শায়িত ওয়ার্ড থেকে যখন তিনি বেরিয়ে আসেন, বারান্দায় দাঁড়ানো একদল তরুণ তখন সত্যজিতের দিকে আঙুল তুলে গলা উঁচিয়ে বলে, ‘আপনি ওঁকে খুন করেছেন’।

অতিনাটকীয়তার শিল্প

ভারতীয় সংস্কৃতি, পরম্পরা ও বেদসাহিত্য সম্পর্কে ঋত্বিকের জ্ঞান আমাদের অনেককেই তাঁর গুণমুগ্ধ করেছিল। বাংলাভাগ এবং তার থেকে জন্ম নেওয়া মানবিক বিপর্যয় তাঁর চলচ্চিত্রে সুগভীর ঘোরে পুনরাবৃত্ত হয়েছে বারবার। সাধারণ মানুষ সবসময়ই তাঁকে দেখেছে মদ্যপ হিসেবে। কিন্তু আমাদের শ্রেণিকক্ষে তিনি মদ্যপ বা অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় এসেছেন— এমন একটি দৃষ্টান্তও নেই। বরং তাঁর হাতে থাকা নতুন নতুন বইগুলি আমাদেরকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। ঋত্বিকের চলচ্চিত্র সাধনার অসাধারণত্ব ছিল অস্থিরচিত্ততার সৌন্দর্য্য, তাঁর ভাবনার স্বকীয়তা, সৃষ্টিশীলতার অদম্য শক্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ‘মাতৃপ্রতিমা’-র প্রতি সর্বগ্রাসী তন্ময়তা তাঁকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে।

                                                             পুণে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে

অতিনাটকীয়তাকে শিল্পের উচ্চতম স্তরে উন্নীত করতে পারার জাদুকরী প্রতিভাও ঋত্বিকের অনন্য বৈশিষ্ট্য। দৃশ্য ও ধ্বনি ব্যবহারের তাঁর রীতিটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। প্রকৃতপক্ষে তিনি নাটক থেকেও কতগুলি শৈলী সরাসরি নিয়ে এসেছিলেন (ঐতিহ্যবাহী সংগঠন গণনাট্যে তাঁর সক্রিয়তার পর্বের কথা সুবিদিত)। চলচ্চিত্রে যা ছিল এতকাল ব্রাত্য, তাকে তিনি প্রয়োগ করলেন। একটি দৃশ্য বা দৃশ্যান্তরের চিত্রগ্রহণ হয় একটি চিত্রনাট্যকে কঠোরভাবে মান্য করে এবং এভাবেই একটি ধারণা বিকশিত হয় বিশ্বাসযোগ্যভাবে। ওই একই দৃশ্য বা দৃশ্যান্তরকে ঋত্বিক ধারণ করতেন এতদিনের অভ্যেসের সম্পূর্ণ উল্টোপথে। অসচরাচর ক্যামেরার অবস্থান, লেন্স, আলো, বিন্যাস এবং সর্বোপরি জাম্পকাটের মাধ্যমে তিনি একটা আবশ্যকতা ও অনুভবের অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করতেন যদিও এক্ষেত্রে তখন স্বচ্ছন্দ পর্বান্তর ঘটানোই ছিল দস্তুর।

তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল ধ্বনি। একে তিনি দৃশ্যের সমমর্যাদাই দিতেন। তাঁর ছবিতে ধ্বনির ব্যবহার শুধুমাত্র ঘটনাস্থলের আবহ না-হয়ে একটি নাটকীয় মাত্রা যোগ করত। তাঁর আবহে স্তরীকৃত ধ্বনি, অর্থবহ ও প্রতিফলক শব্দ, সঙ্গীত এবং সংলাপ একত্রিত হয়ে দৃশ্যগত ভাষ্য ও সাধারণভাবে বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধতর করত। স্বকীয়তায় পূর্ণ তাঁর আবহের সঙ্গীত নিজেই রচনা করতেন।

অনুগামী ও উত্তরাধিকারীদের চোখে

যে ৮টি চলচ্চিত্র ঋত্বিক তৈরি করেন, তার মধ‍্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) এবং অযান্ত্রিক (১৯৫৮)। ১৯৫৮ সালে নির্মিত বিমল রায়ের ছবি মধুমতী, যার কাহিনী ও চিত্রনাট্য ঋত্বিক ঘটকের, তা সর্বকালের হিন্দি চলচ্চিত্রের একটি ধ্রুপদি  সৃষ্টি। এর সবটাই অপূর্ব ও অবিস্মরণীয়। এর কাহিনি, বিশেষ করে অন্তিমপর্বের মোচড়, শিল্পী সমন্বয়, আবেগবিহ্বল ও বিয়োগান্তক প্রেম, বহির্দৃশ্যায়নের পারিপার্শ্বিক— এর সবটাই ছিল দুই দিকপাল চলচ্চিত্র নির্মাতার অনন্য যৌথ সৃষ্টি যা তৈরি করেছিল সেই ম‍্যাজিক।

                                                              সত্যজিৎ রায়ের সাথে (ছবি: নিমাই ঘোষ)

পুরোনো কথাগুলো ভাবলে এটা মনে আসে, একান্ত অনুরাগী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে আমার কোনও ব‍্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠল না। শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁর সঙ্গে আমি কখনও দেখা করিনি। চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ‍্যে যিনি আমার চোখে নায়কের আসনে, তাঁর সঙ্গে ব‍্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের জড়তাই হয়তো কারণ। আমার অনুজরা, বিশেষ করে মণি কাউল ও কুমার সাহানীর সঙ্গে ছিল তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁরা নিজেদের তখন ঋত্বিকের অনুগত শিষ্য ও উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

এটা খুবই বিস্ময়কর যে জীবদ্দশায় তাঁর কোনও চলচ্চিত্রই আন্তর্জাতিক উৎসবে যায়নি। তিনি নিজেও কখনো দেশের বাইরে যাননি। অথচ তাঁর অকাল মৃত‍্যুর পর পরই বিদেশের বহু উৎসবে তাঁর চলচ্চিত্রের রেট্রোসেপেক্টিভ হয়েছে।

পুণে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করে বেরোনোর এক দশক পর দিল্লির একটি চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি ও তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে এক মঞ্চে আসন পাওয়ার সুযোগ আসে আমার। মনে হল আমার শিক্ষককে একবার সম্মান জানিয়ে আসি। তাঁর কাছাকাছি গিয়ে আমি বললাম, ‘স্যার, পুণে ইনস্টিটিউটে আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। আমাকে চিনতে পারছেন?’

তিনি মুখ তুলে একটা শূন্যদৃষ্টি দিয়ে আমাকে দেখে উত্তর দিলেন: ‘না।’

এটুকুই!

নোট
১. আদুর গোপালকৃষ্ণন লিখেছেন ১৯৫৮ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে-এর মাধ্যমে ঋত্বিকের যাত্রা শুরু। যদিও ঋত্বিক ঘটকের প্রথম মুক্তি প্রাপ্ত চলচ্চিত্র অযান্ত্রিক। মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালের ২৩ মে। আর বাড়ি থেকে পালিয়ে দ্বিতীয় মুক্তি প্রাপ্ত ছবি। মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালের ২৪ জুলাই। তাঁর তৈরি ছবি প্রথম ছবি নাগরিক। নির্মিত হয় ১৯৫২-৫৩ সালে, কিন্তু মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর।

ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
ঋণ: দ্য হিন্দু 

ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কিত মার্কসবাদী পথে প্রকাশিত অন্যান্য লেখা পড়ুন:
১। ঋত্বিক ঘটক বিজন ভট্টচার্য ও মাতৃতত্ত্ব
২। গান শেষের গান
৩। মেঘে ঢাকা তারা (প্রথম পর্ব)
৪। মেঘে ঢাকা তারা (দ্বিতীয় পর্ব)


প্রকাশের তারিখ: ০৪-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org