|
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠন: সূচনাপর্ব (দ্বিতীয় পর্ব)সরোজ মুখোপাধ্যায় |
জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে এই ইশতেহারটি বিলি করা হয়। এতে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে বলা হয়: পুরোনো কংগ্রেসের বিপর্যয় ঘটেছে। কংগ্রেস এবার গর্বের সঙ্গে যে কোনও উপায়ে স্বরাজ অর্জনের দৃপ্ত পতাকা উঁচুতে তুলে ধরেছে। জাতীয় কংগ্রেসের সামনে আজ সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা জাতীয় সংগ্রামে জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা নেওয়া। শ্রমিক ও কৃষক জনগণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এরাই হল যথার্থ বিপ্লবী শক্তি। এই শক্তি রাষ্ট্রনৈতিক শাসনের পরিবর্তন আনতে পারে। কংগ্রেস যদি এই গণজাগরণের সঙ্গে কোনও যোগ না-রেখেই নেতৃত্বের আশা করে তবে এই কংগ্রেসকেও তার পূর্বসূরীর মতো অতীতের অন্ধকারে অখ্যাতির মাঝে নির্বাসন ভোগ করতে হবে। |
[প্রথম পর্বের পর] শ্রমিকদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষের ফলে বিভিন্ন শিল্পে বিশের দশকে স্ট্রাইক হয়। ১৯২০-২৩ সালের মধ্যে কয়েকটি বড়ো বড়ো ধর্মঘট হয়। বোম্বাইয়ে আমেদাবাদে সুতাকলে স্ট্রাইক, মাদ্রাজ-বাংলাতে রেলওয়ে স্ট্রাইক, বাংলায় আসামে চা-বাগানে স্ট্রাইক, চা-বাগান মজদুর স্ট্রাইক (আসাম-চাঁদপুর) প্রভৃতি সংগ্রামের মধ্যে শ্রমিকদের চেতনা উন্নীত হতে থাকে। কমিউনিস্টরা এইসব স্ট্রাইক আন্দোলনের মধ্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার ফলে ট্রেড ইউনিয়নগুলিতে সংগ্রামপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রথমদিকে শ্রমিক আন্দোলনে উদারনীতিক নেতারাই সামনে ছিলেন। ১৯২০ সালে নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস গঠিত হয়, এম এন যোশি, লালা লাজপত রায় প্রমুখ নেতৃত্ব করেন। ১৯১৮ সালে গান্ধীজী নিজে আমেদাবাদ সুতাকল স্ট্রাইকে নেতৃত্ব দেন ও মজদুর মহাজন গঠন করেন। পরবর্তী বছরগুলিতে বিভিন্ন শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনে কমিউনিস্ট কর্মীরা প্রবেশ করতে থাকেন। ধীরে ধীরে নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে তদানীন্তন বামপন্থী কংগ্রেস নেতারা (জওহরলাল নেহরু, সুভাষ বসু প্রমুখ) সামনে আসেন, সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিস্টরা সমস্ত ট্রেড ইউনিয়নে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। বাংলাদেশ, মালাবার, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি প্রদেশে কৃষক বিক্ষোভ দেখা দিলেও কৃষক সমিতি তখনও গড়ে ওঠেনি। কৃষকদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে ওঠে বিশ দশকের শেষ দিকে। কৃষক আন্দোলন খুবই সংগ্রামী মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠায় ব্রিটিশ সরকার প্রচণ্ড দমন-পীড়নের আশ্রয় নেয়। এ সম্পর্কে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের একটি বিবৃতি ১৯২৩ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল (এম এন রায় সম্পাদিত ভ্যানগার্ড-এ)। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহক কমিটির এই বিবৃতিতে বলা হয়: সমস্ত দেশের শ্রমিক ভাইরা ভারতে সাম্রাজ্যবাদীরা যে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তারই প্রতিবাদে সভা-মিছিল করুন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই নৃশংসতার তীব্র নিন্দা করুন। ভারতে সাম্রাজ্যবাদের বিচারে ১৭২ জনকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। চৌরিচোরায় ২২৮ জন কৃষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২২ জন পুলিস একটি বিক্ষোভের ফলে নিহত হওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ১৯১৯ সাল থেকে ভারতে গণহত্যা শুরু হয়েছে পাশবিক দমন-পীড়ন চলছে। অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগে যে হত্যাকাণ্ড তারা চালিয়েছিল তারপর থেকে সর্বত্র ট্যাঙ্ক, মেশিনগান ও বেয়নেটের সাহায্যে ভারতবাসীকে দমন করছে। ৩০ হাজার নারী-পুরুষ ভারতের কারাগারে বন্দি রয়েছেন। মালাবারের ৬৬৮৯ জন গরিব কৃষক (মোপলা) কারা লাঞ্ছনা ভোগ করছেন। পাঁচজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে আর ৭০ জনকে রুদ্ধকক্ষে আটক রেখে মেরে ফেলেছে। ৫৬০০ জন শিখ কৃষক পাঞ্জাবের জেলে বন্দি। তাদের প্রহার করা হয়েছে। তার উপর উত্তরপ্রদেশে এই ১৭২ জনের এখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। দমন-পীড়নের বলি হলেন যাঁরা তাঁদের অধিকাংশ হচ্ছেন গরিব কৃষক। বিবৃতির শেষে ব্রিটেনের লেবার গভর্নমেন্টকে বলা হয়েছে এদের জীবন রক্ষা করতে হবে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টির কাছেও আবেদন করা হয়েছে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করে এদের জীবন রক্ষা করুন। ১৯২২ সালের পর থেকে কয়েক বছরে ভারতে মার্কসবাদী প্রচারের জন্য বিদেশে ও ভারতের অভ্যন্তরে কয়েকটি পত্রপত্রিকা ও পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। এম এন রায় বিদেশ থেকে ভ্যানগার্ড পত্রিকা প্রকাশ করে দেশে পাঠাতেন প্রচারের জন্য। এস এ ডাঙ্গে বোম্বাইয়ে গান্ধী বনাম লেনিন পুস্তিকা লেখেন। দি সোস্যালিস্ট নামে একখানা পত্রিকাও বোম্বাই থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। বাংলাদেশে মুজফ্ফর আহ্মদের সম্পাদনায় নবযুগ-এ নভেম্বর বিপ্লব ও শ্রমিকশ্রেণি সম্পর্কে প্রবন্ধ ও সংবাদাদি প্রকাশিত হতে থাকে। পরে লাঙল, গণবাণী প্রভৃতি পত্রিকা বাংলায় প্রকাশিত হতে থাকে। সিঙ্গারাভেলু চেট্টীয়ার মাদ্রাজে ১৯২৩ সালে প্রথম মে দিবস পালন করেন। দুটি জনসভায় শ্রমিকরা সমবেত হয়ে ঐ দিবস পালন করেন। কৃষকরাও এই সভা দুটিতে সমবেত হয়েছিলেন। তামিল ভাষায় একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছিল এই উপলক্ষে। (ভ্যানগার্ড, ১৫ জুন, ১৯২৩)। ১৯২৪ সালের ২০ মে কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলার সেসন কোর্টের রায় প্রকাশিত হয়। এই মামলায় কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ, এস এ ডাঙ্গে, সৌকত উসমানি ও নলিনী দাশগুপ্তের প্রত্যেকের চার বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ১৯২৩ সালের মে মাসে এই মামলা শুরু হয় এই মামলা কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা বলে খ্যাত। এই মামলা চলাকালে এভিলিন রায় (এম এন রায়ের স্ত্রী) ব্রিটিশ লেবার গভর্নমেন্টের কাছে প্রেরিত একটা চিঠিতে প্রত্যেকটি অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচিতি দিয়ে লেখেন এইসব রাজনৈতিক কর্মীদের কেন ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি লেখেন ভারতবাসীর মুক্তি আন্দোলনকে এইভাবে ব্রিটেনের লেবার পার্টির সরকার দমন করে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ-বিরোধী কাজ করবে? এম এন রায় প্রমুখ ১৯২০ সালের অক্টোবরে প্রকাশ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেছেন। সারা দুনিয়ার কাছে এই পার্টির কর্মসূচি প্রকাশ্যে প্রচার করা হয়েছে। এর কর্মসূচি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ৩৭তম অধিবেশনে (গয়া, ১৯২২) পেশ করা হয়েছে। ভারতের সংবাদপত্রে এটা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি চিঠিতে ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণির কাছে আবেদন করে এই মামলা প্রত্যাহারের দাবি করতে বলেন। (ইন্টারন্যাশনাল প্রেস করেসপন্ডেন্স, ১৯২৪, ১৭ এপ্রিল)। শত দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার, কারালাঞ্ছনা উপেক্ষা করে মুষ্টিমেয় কমিউনিস্টরা শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রচারের কাজ চালিয়ে যান। শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক চেতনা প্রসারের কাজ দমন-পীড়নেও স্তব্ধ হয়নি। ১৯২৬-২৭ সালে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ব্যাপকভাবে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক সংগঠনের রূপ হিসাবে বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ করে বাংলা ও বোম্বাইয়ে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টি গঠন করা হয়। এর মধ্যে জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও জাতীয় কংগ্রেসের বামপন্থীরা যোগ দেন। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের পার্টি কলকাতার এক সম্মেলনে গঠিত হয়। তারপর বোম্বে, উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবে শ্রমিক-কৃষক দল, কীর্তি-কিসান দল প্রভৃতি নামে গঠিত হয়। ১৯২৮ সালে এগুলি সারা ভারত ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টিতে সম্মিলিত হয়। কলকাতায় এই বছরে ডিসেম্বরে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের আগে একটি সম্মেলনে সারা ভারত পার্টি গঠিত হয়। জাতীয় কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনগণের একটা মঞ্চ রূপেই কমিউনিস্টরা গ্রহণ করেছিল। এ বিষয়ে ঔপনিবেশিক থিসিস আলোচনার সময়েই কমরেড লেনিন এম এন রায়ের কতকগুলি ভ্রান্ত ধারণার সমালোচনা করেছিলেন, এম এন রায় ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশান, স্টেট প্রভৃতি বই লেখেন। সে সব বইয়ে ভারত সম্পর্কে মার্কসবাদী বিশ্লেষণ ফুটে ওঠেনি। ভারত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও মার্কসবাদসম্মত লেখা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় কমরেড রজনীপাম দত্তের মডার্ন ইন্ডিয়া-তে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের পঞ্চম কংগ্রেসে (১৯২৪ জুলাই) ম্যানুইলাস্কি জাতীয় এবং ঔপনিবেশিক প্রশ্নের আলোচনা উপসংহার ভাষণে যা বলেছিলেন তা লেনিনের মতের সঙ্গে এম এন রায়ের পার্থক্য সূচীত হয়। এই রিপোর্টে আছে: কমরেড লেনিন তাঁর থিসিসে বলেছিলেন, উপনিবেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে অবশ্যই সমর্থন করতে হবে। যদিও এর অন্তবস্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক এবং এর নেতৃত্বে থাকছে বুর্জোয়ারা, তথাপি এই আন্দোলন আমাদের সমর্থন করতে হবে। কিন্তু এইসব দেশের নতুন কমিউনিস্টরা তাদের নিজস্ব ভূমিকা ও কর্তব্য সম্পর্কে যেন অবহিত থাকে। লেনিন লিখেছিলেন “কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিক ও অনগ্রসর দেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলিকে সমর্থন করবে। কিন্তু এইসব দেশের ভবিষ্যতের সর্বহারা পার্টি গঠনের শক্তিগুলিকে একত্রিত করতে হবে, তারা শুধু নামে কমিউনিস্ট হবে না। তাদের ঐক্যবদ্ধ করে মার্কসবাদে শিক্ষিত করে তুলতে হবে যাতে তারা তাদের স্বীয় কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষন করতে হবে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়া চলবে না।” এই রিপোর্টে বলা হয়েছে এম এন রায়ের বক্তব্য ছিল, বুর্জোয়া পরিচালিত জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে যাওয়া বা সমর্থন দেওয়া চলবে না। এ সম্পর্কে একেবারে নেতিবাচক মনোভাব তিনি গ্রহণ করেছিলেন। শুধু শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনগুলিকে সমর্থন দিতে হবে। তাঁর ধারণা হয়েছিল এই সব আন্দোলন (শ্রমিক-কৃষক) খুবই অগ্রসর যেন তাদের মধ্যে কমিউনিস্ট চেতনা এসে গেছে। তাঁর মতে ঔপনিবেশিক দেশের বুর্জোয়ারা সামন্তবাদীদের থেকে পৃথক নয়, জাতীয় আন্দোলন বিশেষত ভারতে ভাবাদর্শগত দিক থেকে প্রতিক্রিয়াশীল। আলোচনার পর লেনিন ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক’-এর বদলে ‘জাতীয় বিপ্লবী আন্দোলন’ কথাগুলি বসান এবং সংক্ষেপে বলেন তিনটি বিষয়ের উপর লক্ষ রাখতে হবে: ১। জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতেই হবে, ২। এই আন্দোলনে বুর্জোয়াদের আপসমুখীন ঝোঁকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এবং ৩। স্বতন্ত্র শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন ও গণভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। এই নীতি নিয়েই ভারতের কমিউনিস্টরা প্রথম থেকে জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে থেকে কাজ করেছেন। প্রত্যেকেই কংগ্রেসের সভ্য হয়েছেন এবং কর্মকর্তা নির্বাচিতও হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে শ্রমিক কৃষকদের বক্তব্য পেশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ১৯২১ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম প্রকাশিত ইশতেহারের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যায়। জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে এই ইশতেহারটি বিলি করা হয়। এতে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে বলা হয়: পুরোনো কংগ্রেসের বিপর্যয় ঘটেছে। কংগ্রেস এবার গর্বের সঙ্গে যে কোনও উপায়ে স্বরাজ অর্জনের দৃপ্ত পতাকা উঁচুতে তুলে ধরেছে। জাতীয় কংগ্রেসের সামনে আজ সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা জাতীয় সংগ্রামে জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা নেওয়া। শ্রমিক ও কৃষক জনগণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এরাই হল যথার্থ বিপ্লবী শক্তি। এই শক্তি রাষ্ট্রনৈতিক শাসনের পরিবর্তন আনতে পারে। কংগ্রেস যদি এই গণজাগরণের সঙ্গে কোনও যোগ না-রেখেই নেতৃত্বের আশা করে তবে এই কংগ্রেসকেও তার পূর্বসূরীর মতো অতীতের অন্ধকারে অখ্যাতির মাঝে নির্বাসন ভোগ করতে হবে। শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলির দাবিদাওয়া কংগ্রেস নিজের দাবি বলে গ্রহণ করুক। কৃষক সংগঠনের কর্মসূচিকে কংগ্রেস তার নিজের কর্মসূচি হিসাবে স্বীকার করুক। যে স্লোগানে জনসংখ্যার অধিকাংশের স্বার্থ প্রতিফলিত হয় এবং যার ফলে তাঁরা সচেতনভাবে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার প্রেরণায় উদ্দীপিত হয়, সে স্লোগান হল— কৃষককে জমি দাও, আর শ্রমিককে রুটি দাও। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের ও জাতীয় মুক্তির বিমূর্ত ধারণায় জনগণকে নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করে মাত্র। সুস্পষ্ট কর্মসূচির উপর দাবি-দাওয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। কংগ্রেসের কর্মসূচিতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের সমস্যাটির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে সে সম্বন্ধে কিছু বলা প্রয়োজন। জাতি, ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের ব্যবধান দূর করতে কৃত্রিম ও আবেগময় প্রচারে কোনও কাজ হবে না। ভারতে শ্রেণিশোষণ চলছে। এই অর্থনৈতিক অমোঘ শক্তির জোরেই হিন্দু শ্রমিক আর হিন্দু কৃষক তাদের মুসলমান শ্রমিক-কৃষক ভাইদের কমরেডদের সহকর্মীদের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছেন। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের এটাই একমাত্র পথ। (মুজফ্ফর আহ্মদ– আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পৃ- ৬২৫) শ্রমিকশ্রেণির অগ্রগতি ও ব্রিটিশের দমন-পীড়ন দুঃখকষ্ট ও অর্থাভাবের মধ্যেও কমিউনিস্ট কর্মীরা, জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা, ভারতের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ চালিয়ে যান। প্রচণ্ড দমন-পীড়ন তাঁদের দমাতে পারেনি। ১৯২৫ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত চারটি বছরে অসংখ্য শ্রমিক-ধর্মঘট, সভা-সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ সরকার সব থেকে বেশি ভয় করতে থাকে শ্রমিক আন্দোলনকে এবং শ্রমিকশ্রেণির জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলিকে। তদানীন্তন সরকারি রিপোর্টগুলিতে ব্রিটিশ সরকারের এই আতঙ্কের ছবি ফুটে ওঠে। শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকেই তারা তখন অঙ্কুরেই বিনাশ করতে চেয়েছিল। ১৯২৫ থেকে ১৯২৮ সাল ৪ বছরের শ্রমিক ধর্মঘট ও লক-আউটের সংখ্যা ছিল: ১৩৪, ১২৮, ১২৯, ২০৩। আন্দোলনে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল: ২,৭০,৪২৩; ১,৮৬,৮১১; ১,৩১,৬৫৫; ৫,০৬,৮৫১ জন। ১৯২৮ সালে ৩ কোটি ১৬ লক্ষ ৪৭ হাজার শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছিল। এই সংখ্যা থেকেই বোঝা যায় যে শ্রমিকশ্রেণির জঙ্গি আন্দোলন ক্রমাগত বেড়ে চলেছিল এই সময়। ১৯২৮ সালে ২০৩টি শ্রমিক-মালিক বিরোধ ঘটে; বোম্বাইয়ে ১১১, বাংলায় ৬০, বিহার-ওড়িশায় ৮, মাদ্রাজে ৭, পাঞ্জাবে ২। শিল্প হিসাবে সুতাকলে ১১০. চটকলে ১৯. ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ১১, রেল ওয়ার্কশপে ৯ এবং কয়লাখনিতে ১। ছাঁটাই ও বেতন হ্রাসের বিরুদ্ধে মূল আন্দোলন চলেছিল এই কয়েক বছর ধরে। ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রমিকশ্রেণির অগ্রগতি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশের দমননীতি শ্রমিক আন্দোলনের দুর্বার গতিবেগ স্তব্ধ করতে ব্যর্থ হয়। ১৯২৯ সালে বড়োলাট লর্ড আরউইন তদানীন্তন অ্যাসেম্বলিতে (সংসদ) এক ভাষণে বলেছিলেন: কমিউনিস্ট মতবাদের বিপজ্জনক প্রসার আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ১৯২৮-২৯ সালের সরকারি রিপোর্টে ভারতে কমিউনিজমের প্রচার ও প্রভাব বৃদ্ধির কথা লিপিবদ্ধ করা হয়। এতে বিশেষ করে কতকগুলি বড়ো বড়ো শিল্প-শহরে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে এই প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। ১৯২৯ সালের প্রথম দিকেই ব্রিটিশ সরকার শ্রমিকশ্রেণির সংগঠকদের উপর আঘাত হানার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে ৩২ জন শ্রমিক নেতাকে সারা ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের বিরুদ্ধে মীরাটে কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা শুরু করা হয়। ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্র-পরিচালিত মামলা ছিল এটি। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ, সামসুল হুদা, ধরণী গোস্বামী, গোপেন চক্রবর্তী, গোপাল বসাক, পি সি যোশি, জি এম অধিকারী, শিবনাথ ব্যানার্জি, সোহন সিং জোশ, এস এস মিরাজকর, এস ভি ঘাটে, এস এ ডাঙ্গে, রাধারমণ মিত্র প্রমুখ ২৯ জন ভারতীয় এবং ফিলিপস স্প্র্যাট, বেন ব্র্যাডলে ও এস এল হাচিনসন- তিনজন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট। এঁরা সকলেই শ্রমিক সংগঠনের বিভিন্ন পদাধিকারী ছিলেন নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের একজন প্রাক্তন সভাপতি, একজন সহ-সভাপতি, ২ জন সহ-সম্পাদক, বোম্বে ও বাংলার প্রাদেশিক টি ইউ সি'র সম্পাদকদ্বয়, গিরনি কামগার ইউনিয়ন, জি আই পি রেলওয়ে ইউনিয়ন, চটকল মজদুর ইউনিয়ন প্রভৃতি ট্রেড ইউনিয়নের সম্পাদক ও অন্যান্য কর্মকর্তা, বোম্বে, বাংলা ও উত্তরপ্রদেশের ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টির সম্পাদকগণ, নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির তিনজন সদস্য, বোম্বের প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক। এঁদের কেউ কেউ পরবর্তী যুগে শ্রমিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেছেন। মুক্তির পর এঁদের রাজনৈতিক ভূমিকা ও কার্যকলাপ যাই হোক-না-কেন, যখন তাঁরা গ্রেপ্তার হলেন তাঁরা সকলেই ভারতের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন-সংগ্রামের পুরোভাগে। কমরেড রজনীপাম দত্ত তাঁর বিখ্যাত পুস্তক ইন্ডিয়া টুডে-তে লিখেছেন এঁদের গ্রেপ্তার, এঁদের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ ও মামলার সময় কোর্টে তাঁরা যে সব বিবৃতি দিয়েছিলেন সেসব কিছুর মধ্য থেকে পরবর্তী যুগের শ্রমিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মীরা অফুরন্ত প্রেরণা পেয়েছেন, ভারতে শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজতন্ত্রের পতাকা সামনের দিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁরা এর থেকে পেয়েছেন অসীম উদ্দীপনা। সাড়ে তিন বছর ধরে মামলা চলে। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের বিভিন্ন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের আদেশ দেওয়া হয়। পাঁচজনকে বার বছর, তিন জনকে দশ বছর বাকিদের তিন বছর ধরে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের এই বন্দিদের মুক্তির দাবিতে। এই আন্দোলন সফল হয় এবং সকলেরই কারাদণ্ড হ্রাস প্রাপ্ত হয়। ১৯৩৬ সালের মধ্যে সকলের মুক্তি হয়। কিছুদিনের জন্য শ্রমিকশ্রেণির অগ্রণী নেতা ও কর্মীদের ব্রিটিশ সরকার কর্মস্থল থেকে সরিয়ে নিলেও, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন থেকে তাঁদের ছিনিয়ে নিলেও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এরপর শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন দ্বিগুণ বেগে বেড়ে উঠতে থাকে। ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট সংগঠন বিভিন্ন প্রদেশে পুনঃসংগঠিত হতে থাকে এবং কয়েকটি প্রদেশে আন্দোলন ও সংগঠন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠনের যে প্রবাহ এইভাবে সেদিন সৃষ্টি হল তা পরবর্তীকালে দ্রুতবেগে ব্যাপক আকার ধারণ করল। পরবর্তী যুগের শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের কর্মীদল সেই প্রবাহকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় মার্কসবাদী পথ-এর প্রথম খণ্ড, প্রথম সংখ্যায় ৫ আগস্ট, ১৯৮১ সালে। প্রকাশের তারিখ: ১৮-অক্টোবর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |