ত্রিপুরার কমিউনিস্ট আন্দোলন : উত্থান, সংগ্রাম, সাফল্য, চ্যালেঞ্জ (প্রথম পর্ব)

মানিক সরকার
আমূল ভূমি সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য জমি বন্দোবস্ত করার ব্যবস্থা করা হল। দুই হেক্টা পর্যন্ত জমির খাজনা মকুব করা হল। কলেজস্তর পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করে দেওয়া হল। ত্রিপুরার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে মিড ডে মিল চালু করা হল। গরিব অংশের মানুষের জন্য বিভিন্ন রকম সামাজিক পেনশন চালু করা হল। গ্রামীণ এলাকায় বর্মসংস্থানের সমস্যা মোকাবিলায় গরিব অংশের মানুষের জন্য এস আর ই পি এবং এন আর ই পি কর্মসংস্থান প্রকল্প নিয়ে আসা হল।

উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম রাজ্য ত্রিপুরা একসময়ে উপজাতিপ্রধান রাজ্য হিসাবে উপজাতি সামন্ত রাজবংশের শাসনাধীন ছিলএরপর ১৯৪৭ সালের মে মাসে সর্বশেষ রাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের জীবনাবসানের পর রাজন্য শাসনের রিজেন্ট পদে আসীন হন মহারাণী কাঞ্চন প্রভা দেবীপরবর্তী সময়ে ভারত সরকার এবং ত্রিপুরার রিজেন্ট মহারানীর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর তারিখে ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়

রাজতন্ত্র
প্রজাদের ভালোমন্দের বিষয়ে ত্রিপুরার সামন্ত রাজারা একেবারেই নির্বিকার ছিলেনরাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না, কোনো স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ ছিল না, শিক্ষা পরিকাঠামো, সেচব্যবস্থা, ভূমি সংস্কার কিছুই ছিল নাজীবনধারণের একমাত্র উপায় ছিল জুমচাষ, সেটাও আবার বৃষ্টিপাতের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীলবেঁচে থাকার কঠিন লড়াই আরো দুর্বিসহ হয়ে উঠত, যখন খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে রাজার পুলিশ বর্বর অত্যাচার চালাতসাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জমা হতে হতে কখনো কখনো বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠতরাজন্য শাসনাধীন ত্রিপুরাতে একাধিক বিদ্রোহের ইতিহাস রয়েছে-তিলা বিদ্রোহ (১৮৫০), কুকি বিদ্রোহ (১৮৬০-৬১), জামাতিয়া বিদ্রোহ (১৮৬৩) এবং রিয়াং বিদ্রোহ (১৯৪২-৪৩)। তবে প্রতিটি বিদ্রোহকেই নৃশংসভাবে দমন করে রাজবাহিনী

কমিউনিস্টদের উত্থান
গত শতাব্দীর ত্রিশ-এর দশকের মধ্যভাগে ত্রিপুরার কয়েকজন ব্যক্তি সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ত্রিপুরার কুমিল্লা জেলাতে (বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত) সি পি আই জেলা কমিটির মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত করেনএর পর ১৯৪৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে সুধন্ব দেববর্মা, হেমন্ত দেববর্মা, দশরথ দেববর্মা প্রমুখ কয়েকজন শিক্ষিত উপজাতি যুবক জনশিক্ষা সমিতি গঠন করেনএই কাজে তাঁদের গোপনে দিশানির্দেশ দিয়ে সহায়তা করেন আগরতলার কমিউনিস্ট নেতা বীরেন দত্তজনশিক্ষা সমিতির লক্ষ্য ছিল শিক্ষার স্পর্শ না পাওয়া উপজাতি তরুণদের মধেধ শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়াশিক্ষা প্রসারের এই মহান উদ্যোগ অচিরেই সাধারণ উপজাতি সমাজে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেকিন্তু অন্যদিকে ত্রিপুরার রাজা কুপিত হয়ে ওঠেনতাঁর আশঙ্কা হয়, শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজত্বের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবেএই আশঙ্কা থেকে শুরু হয় সংঘাত এবং তৈরি হয় রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনরাজবাহিনি এই আন্দোলনকে দমন করার যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালালেও এটি ক্রমেই এক জনপ্রিয় সামাজিক গণআন্দোলনে পরিণত হয়গণমুক্তি পরিষদে সংগঠিত স্বাধীনচেতা প্রগতিশীল উপজাতি যুবকরা সভাপতি দশরথ দেববর্মার নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালে রাজার পুলিশের দমনমূলক আক্রমণের দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলেনসাধারণ উপজাতি মানুষের উপর এই ঘটনাক্রমের ব্যাপক প্রভাব পড়েতাঁদের মনে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার চেতনা সৃষ্টি হয়রাজশক্তির দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রতিরোধ সংগ্রাম চালানোর পাশাপাশি গণমুক্তি পরিষদ সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রগতিশীল আন্দোলন শুরু করেঅস্পৃশ্যতা, কুসংস্কার, পণপ্রথা, ডাইনি প্রথা এবং সামন্ততান্ত্রিক শোষণের মত নেতিবাচক পশ্চাদমুখী সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারাভিযান শুরু হয়এভাবেই রাজ্যের উপজাতি সমাজে কমিউনিস্টদের মজবুত গণভিত্তি গড়ে ওঠে

উদ্বাস্তু আগমন
ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির পর পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে লক্ষ লক্ষ বাঙালি উদ্বাস্তু ত্রিপুরাতে আসতে শুরু করেবহুদিন পর্যন্ত উদ্বাস্তু আগমন ঘটতে থাকেমাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই রাজ্যের জনবিন্যাস পুরোপুরি পালটে যায়উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্যগুলিতে এমনটা হয় নি, কিন্তু ত্রিপুরাতে উদ্বাস্তু স্রোত আগমনের মধ্য দিয়ে আগের সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতিরা এক সময়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়তৎকালীন কংগ্রেস সরকার এই জটিল সমস্যার প্রতি একেবারেই উদাসীন ছিলনিরাশ্রয় উদ্বাস্তুদের জন্য যথোপযুক্ত কোনো পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত যেমন হল না, তেমনি বাঙালিদের আগমনে সংখালঘু হয়ে পড়া উপজাতিদের উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপও করা হল নাতৎকালীন কংগ্রেস সরকারের এই ইচ্ছাকৃত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে কমিউনিস্টরা সংসদের ভিতরে বাইরে সোচ্চার হলেন

রাজ্যমর্যাদার দাবিতে আন্দোলন
ত্রিপুরার ভারতভুক্তির পর শাসক কংগ্রেস এই রাজ্যকে আসামের অঙ্গীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়তবে সরকার তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি, কারণ কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে রাজ্যের উপজাতি -উপজাতি অংশের মানুষ দাঁতে দাঁত চেপে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে লড়াই করেনতখন রাজ্যটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে ঘোষণা করা হয়রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হায় কেন্দ্রনিযুক্ত চীফ কমিশনারকেত্রিশ-সদস্যের ইলেক্টোরাল কলেজ গঠন করা হলেও এর কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল নাপরবর্তী সময়ে ১৯৬৩ সালে ইলেক্টোরাল কলেজকে সরিয়ে ত্রিশ সদস্যের টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল আনা হয়রাজ্যমর্যাদার দাবিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে লাগাতার লড়াই চলতে থাকেসেই সংগ্রামের সাফল্য আসে ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে, যখন ত্রিপুরাতে ষাট সদস্যের বিধানসভা গঠন এবং ত্রিপুরাকে রাজ্য মর্যাদা প্রদানের ঘোষণা করা হয়

শাসকের কমিউনিস্ট-বিরোধী রোষ 
প্রথমে রাজার পুলিশ বাহিনি এবং পরে কংগ্রেস শাসনের বিরুদ্ধে অন্তত - বছর নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজ্যের উপজাতি সমাজে সংগঠন ব্যাপক প্রভাব বিস্তাব করতে সক্ষম হয়রাজ্যবাসীর কাছে পার্টি কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৯৫২ সালের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে, যখন রাজ্যের দুটি লোকসভা আসনেই পার্টি জয়লাভ করেপরবর্তী ১৯৫৭ সালের নির্বাচনেও রাজ্যের দুটি লোকসভা আসনেই জয়ী হন কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীরাপ্রথম লোকসভা নির্বাচনের সময়ে দশরথ দেব আত্মগোপন করে ছিলেন, সরকার তাঁকে পলাতক বলে ঘোষণা করেছিলসেই অবস্থাতেও তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেনএরপর ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময়ে নৃপেন চক্রবর্তীসহ পার্টির অধিকাংশ নেতাকে মিসা আইনে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়বন্দি অবস্থায় তাঁদের স্থানীয় কারাগারে না রেখে দূরবর্তী রাজ্যের কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়ফলত ১৯৬২ সালের নির্বাচনে দুটি লোকসভা আসনেই পার্টি পরাস্ত হয়এরপর ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকযুদ্ধের সময়ে আবার পার্টি নেতাদের অধিকাংশকে গ্রেপ্তার করে কারারুদ্ধ রাখা হয়ফলে ১৯৬৭ সালের নির্বাচনেও পার্টির পরাজয় ঘটেপার্টি নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার করার ঘটনা এর পরেও ঘটেছেপরবর্তী কালে ১৯৭৫ সালে, জরুরি অবস্থা জারি করার আগেই রাজ্যে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকারকে বিধানসভার অভ্যন্তরে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পার্টির বিধায়কসহ বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় সময়ে বিধানসভার অভ্যন্তরে শাসকপক্ষ আড়াআড়ি দুই গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। 

বৃহত্তর জনস্বার্থে আন্দোলন 
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকেই ত্রিপুরাতে বৃহত্তর জনস্বার্থে কমিউনিস্ট পার্টি একের পর এক আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকেযাটের দশকের দুর্ভিক্ষে ত্রাণের দাবিতে আন্দোলন, মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন, এবং মহাজন, অসাধু ব্যবসায়ী, ঠিকাবার গ্রামীণ মাফিয়া, যাদের প্রায় সকলেই কংগ্রেস দলের একনিষ্ঠ সমর্থক, তাদের শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সংগঠিত হতে থাকেউপজাতি অংশের মানুষ বহুযুগ ধরে টিলাভূমিতে জুমচাষ করে আসছেন, কিন্তু সেইসব টিলাভূমিকে 'সংরক্ষিত বনঘোষণা করে দেওয়া হয়ফলত বন দপ্তরের সঙ্গে জুমিয়াদের বিবাদের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটতে লাগলকখনো কখনো এই বিবাদ থেকে তৈরি হল সহিংস সংঘর্ষকমিউনিস্ট পার্টি তখন জুমিয়াদের স্বার্থরক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বনভূমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে

টি ইউ জে এম-এর বিভেদকামী রাজনীতি
উপজাতিদের থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কংগ্রেস জন্ম দিল সাম্প্রদায়িক ভাবনাপূর্ণ এক উপজাতি দলের, যার নাম দেওয়া হল ত্রিপুরা উপজাতি যুব সমিতি (সংক্ষেপে টি ইউ জে এস)। পূর্বতন মহারাজার পরিবার থেকে এই দলের প্রতি আশীর্বাদ বর্ষিত হলতাদের মূল রাজনৈতিক মতলবকে আড়াল করতে তারা প্রথমে বলল, তারা নাকি কংগ্রেসও নয়, কমিউনিস্টও নয়তারা আরো বলল, শুধুমাত্র উপজাতিদের স্বার্থ নিয়ে তারা লড়াই করবে এবং এই লড়াইয়ে শুধু উপজাতিদেরই শামিল করা হবেতাদের এই অবস্থানকে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করলেন দশরথ দেবতিনি বললেন, এই দল একদিকে কংগ্রেসের দমনমূলক শাসনের কোনো প্রতিবাদ করে না, তথা পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলে না, যে শোষণের শিকার হয়ে উপজাতি এবং -উপজাতি, উত্তর অংশের মানুষই বিপর্যন্তঅন্যদিকে এরা বাঙালি সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক অংশ থেকেও দূরত্ব তৈরি করে, অথচ এই গণতান্ত্রিক অংশের বাঙালিরাও উপজাতি স্বার্থের প্রতি পূর্ণ সহমর্মিতা পোষণ করেনঅত্যন্ত সুদৃঢ় নৈতিক অবস্থান থেকে পার্টি ১১৭৪ সালে উপজাতি জনগণের স্বার্থসম্বলিত চারটি মূল বিষয় চিহ্নিত করে এবং সংশ্লিষ্ট দাবি নিয়ে রাজ্যব্যাপী আন্দোলন শুরু করেএকই সঙ্গে মানুষের সামনে টি ইউ জে এস-এর বিভেদকামী ভূমিকা প্রকাশ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে চলে পার্টিদাবি চারটি ছিল-

উপজাতিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করতে ত্রিপুরার উপজাতি এলাকাগুলি নিয়ে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠন করতে হবে
ককবরক-কে রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষাহিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে
বনাঞ্চলে উপজাতিদের ব্যবহারের জন্য কোনো জমি চিহ্নিত সংরক্ষিত করা যাবে না বলে যে সরকারি অধ্যাদেশ জারি করেছেন রাজ্যপাল, সেটি প্রত্যাহার করতে হবে
উপজাতিদের অধিকারে থাকা যে সকল ভূমি অবৈধ উপায়ে -উপজাতির দখলে চলে গেছে, সেগুলি উদ্ধার করে উপজাতিদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবেদাবিগুলি নিয়ে আন্দোলনে রাজের উপজাতি অংশের জনগণ -উপজাতি গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষের প্রভূত সমর্থন মেলেএই চার দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনকে দমন করতে কংগ্রেস সরকারের পুলিশ নির্মম হিংসার পথ বেছে নেয়, ১৯৭৫ সালের মার্চ তারিখে পুলিশের গুলিতে ধনঞ্জয় ত্রিপুরার মৃত্যু হয়। 

বামফ্রন্ট সরকার গঠন 
জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার পর ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ভারতের শাসনক্ষমতা থেকে প্রথমবারের মত বিদায় ঘটে কংগ্রেসেরত্রিপুরাতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ কংগ্রেস পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েকংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বিধায়করা কংগ্রেস ফর ডেমোক্রেসি (সি এফ ডি) গঠন করে সরকার গঠনে সমর্থনের জন্য পার্টিকে অনুরোধ করেনপরবর্তী সময়ে জনতা পার্টির নামে আরো কিছু কংগ্রেসতাশী বিধায়ক পার্টির কাছে সমর্থনের জন্য অনুরোধ করেনএভাবে পরপর দু'দুটি কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় রাজ্যে, কিন্তু সরকার গঠনের পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হওয়ায় কোনোটিই টিকতে পারে নিশেষপর্যন্ত ১১৯৭৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়সি পি আই (এম) অন্য দুই দল আর এস পি এবং ফর‌ওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে মিলে বামফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেফলাফল অনুযায়ী বিধানসভার ৬০টি আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট ৫৬টিতে জয় হাসিল করে মানুষের বাঁধভাঙা সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেবাকি ৩টি আসন যায় টি ইউ জে এস-এর দখলে, কংগ্রেস একটিও আসন জিততে পারে নি

বামফ্রন্ট সরকারের সদর্থক ভূমিকা
নৃপেন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে প্রথম বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভা শপথ নেয় ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি তারিখেনবগঠিত সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান করে নেয় উপজাতিদের স্বার্থসম্বলিত চারটি বিষয়ের বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সংস্থাগুলির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকংগ্রেস শাসনে পঞ্চায়েত নির্বাচন হত হাত তুলে, কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার সিদ্ধান্ত নিল, প্রতিটি নির্বাচন হবে গোপন ব্যালটের মাধ্যমেসেইমত পঞ্চায়েত পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন হলকংগ্রেস শাসনে পুরসভা চালানো হত সরকার মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমেকিন্তু বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর পৌরসভার নির্বাচনও গোপন ব্যালটের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলআমূল ভূমি সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে ভূমিহীন গৃহহীনদের জন্য জমি বন্দোবস্ত করার ব্যবস্থা করা হলদুই হেক্টা পর্যন্ত জমির খাজনা মকুব করা হলকলেজস্তর পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করে দেওয়া হলত্রিপুরার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে মিড ডে মিল চালু করা হলগরিব অংশের মানুষের জন্য বিভিন্ন রকম সামাজিক পেনশন চালু করা হলগ্রামীণ এলাকায় বর্মসংস্থানের সমস্যা মোকাবিলায় গরিব অংশের মানুষের জন্য এস আর পি এবং এন আর পি কর্মসংস্থান প্রকল্প নিয়ে আসা হলকৃষক এবং গ্রামীণ হস্তশিল্পীদের মহাজনী শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে সমবায় সমিতি গঠন করে ন্যূনতম সুদে ঋণ প্রদান শুরু হলআজকের দিনে যে রাবার উৎপাদনের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার জি ডি পি স্ফীত হয়ে ওঠে, সেই রাবার বাগান শুরু হয় বামফ্রন্ট সরকারের সময়েজুমিয়াদের জন্য নিয়ে আসা হল আর্থিক প্যকেজ, জুম চাষের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান শুরু হল। 

উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদের দাবিতে সংগ্রাম
উপজাতিদের স্বার্থসম্বলিত দাবির প্রতি বামফ্রন্ট সরকার সবসময়েই সমানভাবে আন্তরিক থেকেছেরাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতি মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন, সেই ককবরক ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়উপজাতিদের জন্য পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম করা হয় ককবরক ভাষাকেপাশাপাশি এই ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ করা হয়উপজাতি মানুষের অধিকারে থাকা যেসকল জমি বেআইনিভাবে হস্তান্তর হয়ে গেছে, সেগুলিকে পুনরুদ্ধার করার প্রয়াস শুরু হয়এর পাশাপাশি যে সকল বাঙালি পরিবার বেআইনিভাবে হস্তান্তরিত জমির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে জীবনধারণ করত, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় সরকার তরফেঅন্যদিকে সংবিধান সংশোধন করে ত্রিপুরাতে সংবিধানের ষষ্ঠ তপশিল অনুসারে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠনের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ করা হয়, কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই সেই দাবি খারিজ করে দেনতিনি বরং সপ্তম তপশিল অনুসারে জেলা পরিষদ গঠনের পরামর্শ দেনসেইমত রাজ্য বিধানসভায় ডি সি আইন অনুমোদিত হয়জেলা পরিষদের নির্বাচন সম্পাদন এবং কর্মপরিচালন সংক্রান্ত নিয়মাবলিও চূড়ান্ত করা হয়জনকল্যাণে বামফ্রন্ট সরকারের একের পর এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ উপজাতি এবং -উপজাতি, উভয় অংশের মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করেপরিস্থিতি দেখে কংগ্রেস এবং তাদের সহযোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েতারা বেআইনিভাবে হস্তান্তরিত ভূমির পুনরুদ্ধার এবং ডি সি আইন, এই দুই বিষয় নিয়ে বাঙালিদের উসকানি দিতে শুরু করেজমি পুনরুদ্ধার এবং ডি সি আইনের অপব্যাখ্যা প্রচার করে কংগ্রেস এবং আনন্দমার্গের ছত্রছায়ায় গঠিত 'আমরা বাঙালি' রাজ্য জুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়জনমনে যাতে সন্দেহের কোনো বাতাবরণ সৃষ্টি না হয়, তার জন্য পার্টি গোটা রাজ্যে প্রচারাভিযান শুরু করেসরকারের তরফে পরের বছর ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ (টি টি এডিসি) নির্বাচনের নির্ঘণ্ট তৈরি করা হয়, কিন্তু ঠিক তখনই টিইউ জে এস গ্রামীণ এলাকাতে সাম্প্রদায়িক উসকানি সৃষ্টির লক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী বাজার বয়কট' করার ঘোষণা করেদাবি হিসাবে তারা বলে, ১৯৫০ সালের পরে যে সকল বাঙালি রাজ্যে এসেছে, তাদের বিতাড়ন করতে হবেএটা স্পষ্ট যে, একদিকে উগ্র উপজাতি বিদ্বেষী 'আমরা বাঙালি' এবং অন্যদিকে প্রচণ্ড বাঙালিবিদ্বেষী টি ইউ জে এস, আসলে একে অন্যের পরিপুরক শক্তি হিসাবে কাজ করে যাচ্ছিলদু'পক্ষেরই লক্ষ্য ছিল অভিম-চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্ট করে রাজ্যের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করাযেমনটা আশঙ্কা করা গিয়েছিল, ঠিক তেমনটাই হলএক গ্রামীণ বাজারে সামান্য তর্কবিতর্ক হল, আর তাকে কেন্দ্র করে নিমেষের মঝে গোটা ত্রিপুরায় হিংসার আগুন জ্বলে উঠলহিংসার আবহে উভয় সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ প্রাণ হারালেনঅসংখ্য বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হলদু'লক্ষেরও বেশি মানুষ ঘর ছেড়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেনরাজ্য সরকার এবং বামফ্রন্ট অতিদ্রুত মাঠে নেমে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস সহমর্মিতা ফিরিয়ে এনে শান্তি স্থাপনে প্রয়াসী হয়হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মাঠে নামে বামফ্রন্ট সরকারবিরোধীদের বাসনা ছিল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন বলবৎ করা যাবেকিন্তু তাদের হতাশ করে বছরখানেকের মধ্যেই রাজ্যে পুরোপুরি স্বাভাবিক বাতাবরণ ফিরে এলপরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে সপ্তম তপশিল অনুসারে রাজ্যের টি টিএ ডি সি নির্বাচন সম্পন্ন হয়, এবং বামফ্রন্ট সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেএর পাশাপাশি চলছিল রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ডিসি-কে ষষ্ঠ তপশিলভুক্ত করার দাবি জানানোরাজ্যের কংগ্রেস নেতৃত্ব এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও রাজ্য সরকারের লাগাতার দাবি জানানোর ফলে এক সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন, ১৯৮৪ সালে সংবিধান সংশোধনী বিল অনুমোদন করে ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত ডেলা পরিষদকে (টিটি এএডিসি) ষষ্ঠ তপশিলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়


ঋণ- ডেইলি দেশের কথা 
[শেষ পর্ব প্রকাশিত হবে আগামীকাল]


প্রকাশের তারিখ: ২৫-এপ্রিল-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org