লেনিনবাদের প্রবক্তা কমরেড স্তালিন

প্রমোদ দাশগুপ্ত
তিনি লিখেছেন: আধুনিক পুঁজিবাদের মূল অর্থনৈতিক নিয়মকে সংক্ষেপে বলা যায়, তার লক্ষ্য হল “উচ্চতম লাভ”। এর ফলে যে কোনও দেশের জনগণের অধিকাংশই শোষিত হয়ে দারিদ্র্যের নিম্নতম পর্যায়ে নেমে যায়। অন্যান্য দেশগুলি এবং বিশেষ পশ্চাদপদ দেশগুলি দাসত্বের বাঁধনে আটকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর ফলে যুদ্ধ বেধে যায় এবং জাতীয় অর্থনীতি এক সামরিক অর্থনীতিতে পরিণত হয় এবং তা উচ্চতম লাভ আদায়ের সুযোগ করে দেয়। এই সর্বনাশা উচ্চতম লাভের নেশায় আধুনিক পুঁজিবাদ উন্মত্তের মতো ছুটছে।

কমরেড স্তালিন লেনিনবাদের প্রবক্তা। কমরেড লেনিন কার্ল মার্কসের রচনা এবং শিক্ষাগুলির বিকাশ ঘটিয়ে কার্ল মার্কসের বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে মার্কসবাদরূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মার্কসবাদের মূল সূত্রগুলিকে আরও সমৃদ্ধ করেন। ঠিক তেমনি কমরেড জে ভি স্তালিন লেনিনের রচনা এবং শিক্ষাগুলির বিকাশ ঘটান, লেনিনের শিক্ষাগুলিকে লেনিনবাদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আজ স্তালিন-বিরোধীরা কমরেড স্তালিনের নাম মুছে ফেলার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করছেন।

কিন্তু কমরেড স্তালিন বেঁচে রয়েছেন তাঁর মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সৃষ্টিশীল রচনার মধ্যে। বেঁচে রয়েছেন লেনিনবাদের প্রবক্তা হিসাবে।

কমরেড লেনিনের মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তাঁর জীবনের সঙ্গে কমরেড স্তালিনের জীবন ছিল অবিচ্ছেদ্যরূপে জড়িত। তাঁরা একত্রে গড়ে তুলেছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির আদর্শপার্টি— বলশেভিক পার্টি। তাঁরা একত্রে পত্তন করেছিলেন সোভিয়েত রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্র সর্বদাই বিশ্ববিপ্লবের দুর্গ হিসাবে কাজ করেছে। লেনিনের সাথে একত্রে কমরেড স্তালিন তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠা করেন এবং লেনিনের সাথে থেকে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বে ও কর্মে এবং শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতায় এই প্রতিষ্ঠানকে দীক্ষিত করে তোলেন।

এই সবকিছুতেই কমরেড স্তালিন লেনিনের কাজকে অব্যাহত রেখেছেন, এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এই সবকিছুতেই তিনি লেনিন যা শিখিয়েছেন শুধু যে তা প্রয়োগ করেছেন তা নয়— তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশ সাধন করেছেন, তাকে নতুন নতুন স্তরে উন্নীত করেছেন।

যেমন কর্মকাণ্ডে তেমনি মার্কসবাদী তত্ত্বে স্তালিনের এত অবদান রয়েছে যে, তাঁর যে-কোনও একটির জন্যই তিনি মার্কসবাদের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিতে পারেন।

স্তালিন ছিলেন লেনিনের পরম অনুগত শিষ্য ও সহযোদ্ধা এবং লেনিনের শিক্ষার যোগ্য উত্তরাধিকারী। কমরেড কার্ল মার্কসের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর অকৃত্রিম সহযোদ্ধা এবং বন্ধু ফ্রেডারিক এঙ্গেলস বলেছিলেন: 

ডারউইন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন, মার্কসও তেমনি মানব-ইতিহাসের ক্রমবিকাশের নিয়ম উন্মোচন করেন। রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প কলা, ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করার আগে অর্থাৎ সবকিছুর আগে মানুষকে খাদ্য, পানীয়, পরিধেয় ও বাসস্থান পেতে হবে। এই সহজ-সরল সত্যটি এতকাল অসংখ্য মতবাদের আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্যে আশু প্রয়োজনীয় বস্তুগত উপকরণগুলি উৎপাদন এবং তার ফলে কোনও এক নির্দিষ্ট যুগে, কোনও জাতি অর্থনৈতিক বিকাশের যে নির্দিষ্ট মাত্রা অর্জন করতে সমর্থ হয়, তারই উপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট জাতির সর্বপ্রকার রাষ্ট্রীয় সংগঠন, আইন, শিল্পকলা, এমন কি ধর্ম সম্পর্কিত ধারণাগুলিও গড়ে ওঠে। অথচ এতদিন উল্টো দিক থেকেই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা তো। সুতরাং (মার্কসের আবিস্কৃত) ঐ নিয়মের আলোকেই বিষয়গুলি সম্পর্কে এখন ব্যাখ্যা করতে হবে, উল্টো দিক থেকে নয়।

ঠিক তেমনি কমরেড লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত সমূহের দ্বিতীয় সারা ইউনিয়ন কংগ্রেসে ভাষণ দিতে গিয়ে কমরেড স্তালিন বলেন: 

গুরুভার ও অসহনীয় ভাগ্যই এতকাল শ্রমিক শ্রেণির জুটে এসেছে। বেদনা ও দুঃখদায়ক যন্ত্রণা সয়ে এসেছেন মেহনতী জনগণ। ক্রীতদাস ও ক্রীতদাস ব্যবসায়ী, ভূমিদাস ও ভূমিদাস মালিক, কৃষক ও জমিদার, শ্রমিক ও পুঁজিপতি, অত্যাচারী ও অত্যাচারিত— স্মরণাতীতকাল থেকে জগৎ সংসার এইভাবে গড়ে উঠেছে এবং আজকের দিনেও বিপুল সংখ্যক দেশে এই অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। শতকে শতকে বহুবার এবং বাস্তবিকপক্ষে শত শতবার মেহনতী জনগণ তাঁদের পিঠের উপর থেকে অত্যাচারীদের ছুঁড়ে ফেলতে ও নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা হবার জন্য বহু চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবার, পরাজিত ও অপমানিত হয়ে তাঁরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছেন, বুকের মধ্যে পুষে রেখেছেন ক্ষোভ ও অপমানের জ্বালা, ক্রোধ ও হতাশা, আর চোখ তুলে তাকিয়েছেন দুর্জেয় আকাশের পানে এই আশায় যে, স্বর্গ থেকে নেমে আসবে তাঁদের মুক্তি। দাসত্বের শৃঙ্খল তেমনই অটুট রয়েছে বা বড়ো জোর পুরোনো শৃঙ্খলের জায়গায় চেপেছে নতুন শৃঙ্খল, যা সমানই গুরুভার ও অপমানজনক। একমাত্র আমাদের দেশেই অত্যাচারিত ও পদদলিত মেহনতী জনগণ জমিদার ও পুঁজিপতি ধনিকদের শাসন ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তার জায়গায় শ্রমিক-কৃষকের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছেন। আপনারা জানেন এবং সমগ্র বিশ্বও এখন স্বীকার করে যে, এই বিরাট সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন কমরেড লেনিন ও তাঁর পার্টি। লেনিনের মহত্ব রয়েছে সর্বোপরি এখানেই যে, সোভিয়েত সাধারণতন্ত্র সৃষ্টি করে তিনি সমগ্র বিশ্বের অত্যাচারিত জনগণের সামনে কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ করেছেন যে, মুক্তির আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়নি, জমিদার ও পুঁজিপতিদের শাসন স্বল্পস্থায়ী, মেহনতী জনগণ নিজেদেরই চেষ্টায় শ্রমজীবী মানুষের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এবং শ্রমিক রাজত্ব স্বর্গে নয়, প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এই মাটির পৃথিবীর বুকেই। এভাবেই তিনি সমগ্র বিশ্বের শ্রমিক-কৃষকের অন্তরকে মুক্তির আশায় উদ্দীপিত করে তোলেন। মেহনতী ও শোষিত জনগণের কাছে লেনিনের নামটি যে কেন এত বেশি প্রিয় তা এ থেকেই বোঝা যায়।

এঙ্গেলস যখন মার্কসের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন মার্কসের আদর্শের প্রতি, শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন সমাজ পরিবর্তনে মার্কসের দর্শনের প্রতি, ঠিক তেমনি স্তালিন লেনিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তুলে ধরেছিলেন তাঁর মহান আদর্শ, তাঁর সৃষ্টি এবং মহান কর্মকাণ্ডগুলি। আর লেনিনের এই আদর্শকেই স্তালিন প্রতিষ্ঠিত করেন লেনিনবাদ হিসেবে, বিশ্বের কোটি কোটি নিপীড়িত জনগণের মুক্তির নিশান হিসেবে।

লেনিনের বিপ্লবী প্রতিভা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্তালিন বলেছিলেন: 

লেনিনের জন্মই হয়েছিল বিপ্লবের জন্য। সত্যই তিনি ছিলেন বৈপ্লবিক সংগঠনের প্রতিভা এবং বিপ্লব নেতৃত্বের দক্ষতায় সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। বিপ্লব অভ্যুত্থানের সময় তিনি যেমন মুক্ত স্বাধীন ও সুখীবোধ করতেন, অন্য কোনও সময়েই তেমন করতেন না। এ কথা বলে আমি এটা বোঝাতে চাইনি যে, লেনিন সব বিপ্লবী অভ্যুথানকেই সমানভাবে সমর্থন করতেন অথবা সবসময়ে ও সকল অবস্থায় বিপ্লব সংঘটনের পক্ষপাতী ছিলেন। আদৌ তা নয়। আমি যা বলতে চাইছি তা এই যে, বিপ্লব সংঘটনকালে লেনিনের প্রতিভার অন্তর্দৃষ্টি যত পারিপূর্ণ ও সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পেত, অন্য কোনও সময়ে তা হত না। বিপ্লবের সময় তিনি যেন পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠতেন, হতেন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা, আগেই দেখতে পেতেন শ্রেণিগুলির গতিবিধি এবং বিপ্লবের সম্ভাব্য আঁকা-বাঁকা পথের রেখা-এ সবই যেন তাঁর হাতের তালুতে আঁকা রয়েছে।

যথার্থই লেনিনের জন্ম হয়েছিল বিপ্লবের জন্য। আর স্তালিনের জন্ম হয়েছিল সেই বিপ্লবের বিজয়কে রক্ষা করার জন্য, জন্ম হয়েছিল সেই বিপ্লবী আদর্শের শিখা দেশে দেশে ছড়িয়ে দেবার জন্য। এখন প্রশ্ন হল, লেনিনের এই বিপ্লবী প্রতিভার ভিত্তি কী?

কমরেড স্তালিন লেনিনের যে শিক্ষাগুলি ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠা করেন সেটাই হল লেনিন-প্রতিভার মূল ভিত্তি। কমরেড স্তালিন বলেছেন: 

লেনিন ছিলেন মার্কসবাদী, সুতরাং মার্কসবাদই ছিল তাঁর বিশ্বদর্শনের ভিত্তি। .... লেনিনের মতবাদ ব্যাখ্যা করার অর্থ এই যে, লেনিনের গ্রন্থাবলীতে যা কিছু নতুনত্ব আর বৈশিষ্ট্য আছে, মার্কসবাদের সাধারণ কোষাগারে যা দান করেছেন, যা স্বভাবতই শুধু তাঁরই নামের সঙ্গে জড়িত— তারই ব্যাখ্যা করা। 

লেনিনবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্তালিন লেনিন-প্রতিভার যে বিষয়গুলির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন তা হল: কেউ কেউ বলেন, লেনিনবাদ হচ্ছে রুশ দেশের বিশেষ অবস্থায় মার্কসবাদের প্রয়োগ। এই সংজ্ঞার মধ্যে কিছুটা সত্য আছে বটে, কিন্তু সত্যের সবটুকু আছে একথা কিছুতেই বলা চলে না। লেনিন অবশ্য রুশ দেশের বিশেষ অবস্থায় যথেষ্ট নৈপুণ্যের সঙ্গেই মার্কসবাদকে প্রয়োগ করেছিলেন। কিন্তু লেনিনবাদ বলতে যদি কেবল রুশ দেশের বিশেষ অবস্থায় মার্কসবাদ প্রয়োগ করাই বোঝাত তবে এটা নিছক জাতীয় ব্যাপার হত— শুধুমাত্র রুশ দেশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু আমরা জানি লেনিনবাদ শুধু রুশ দেশের ঘরোয়া ব্যাপার নয়, এ হল আন্তর্জাতিক ব্যাপার, এর মূল নিহিত রয়েছে সমগ্র আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে।

আর একদল বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে মার্কসবাদে যে বৈপ্লবিক ভাবধারা ছিল তার পুনরুজ্জীবনই হল লেনিনবাদ। পরবর্তী আমলে এই মার্কসবাদই নাকি নরমপন্থী বিপ্লব-বিরোধী আকার ধারণ করেছিল। মার্কসের শিক্ষাকে নরমপন্থী আর বিপ্লবী-এই দুভাগে ভাগ করার এই স্কুল, নির্বোধ চেষ্টার কথা আমরা যদি ছেড়ে দিই তবে এই অসম্পূর্ণ, অসন্তোষজনক সংজ্ঞার মধ্যেও কিছু সত্য আছে বলে আমাদের স্বীকার করতে হয়। সত্যটা হল এই যে, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীরা মার্কসবাদের যে বিপ্লবী ভাবধারাকে ধামা-চাপা দিয়ে রেখেছিল, লেনিন সত্যই তাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তবু এটা সত্যের একটা সামান্য অংশ মাত্র। লেনিনবাদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সত্যটুকু হল এই যে, লেনিনবাদ শুধু মার্কসবাদকে পুনরুজ্জীবিত করেছে তা নয়, আরও অগ্রসর হয়ে গেছে— পুঁজিবাদ এবং শ্রমিকদের শ্রেণি-সংগ্রামের নতুন অবস্থায় মার্কসবাদকে আরও পরিবর্ধিত করেছে।



লেনিনবাদ সম্পর্কে বিকৃত সংজ্ঞাগুলিকে কমরেড স্তালিন যে কেবল নস্যাৎ করলেন তাই নয়, তিনি লেনিনবাদের একটা যথার্থ সংজ্ঞাও নিরূপণ করলেন:

লেনিনবাদ হল সাম্রাজ্যবাদ এবং শ্রমিক বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, লেনিনবাদ হল সাধারণভাবে শ্রমিক বিপ্লবের মতবাদ ও রণকৌশল এবং বিশেষভাবে এ হল শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের মতবাদ ও রণকৌশল।

বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যখন জন্ম হয়নি, সর্বহারারা যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, শ্রমিক বিপ্লব যখন কার্যক্ষেত্রে আশু এবং অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি সেই প্রাকবিপ্লব যুগে (আমরা এখানে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবের কথাই বলছি) মার্কস এবং এঙ্গেলস তাঁদের কার্যকলাপ চালাতেন। আর মার্কস এবং এঙ্গেলসের শিষ্য লেনিন তাঁর কাজ চালিয়েছেন বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যুগে, শ্রমিক বিপ্লবের বিকাশের যুগে যখন শ্রমিক বিপ্লব একটি দেশে ইতিমধ্যেই জয়যুক্ত হয়েছে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে চূর্ণ করে, শ্রমিকশ্রেণির গণতন্ত্রের, সোভিয়েততন্ত্রের যুগের সূত্রপাত করেছে। এই কারণেই লেনিনবাদ হল মার্কসবাদের আরও বিকশিত রূপ।

১৯২৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রথম আমেরিকান শ্রমিক প্রতিনিধিদল কমরেড স্তালিনকে প্রশ্ন করেছিলেন লেনিন ও কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদের কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগে কী কী নতুন নীতি যুক্ত করেছেন? এটা বলা কি সঠিক হবে যে, লেনিন ‘সৃষ্টি-ধর্মী বিপ্লবে’ বিশ্বাস করতেন, আর সেখানে মার্কস ছিলেন অর্থনৈতিক শক্তিগুলির বিকাশ তুঙ্গে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অধিকতর আগ্রহী?

এই প্রশ্নের জবাবে কমরেড স্তালিন বলেছিলেন: 

আমি মনে করি, লেনিন মার্কসবাদে কোন ‘নতুন নীতি সংযোজনা’ করেননি, বর্জনও করেননি মার্কসবাদের কোন ‘পুরোনো’ নীতিকে। লেনিন ছিলেন এবং এখনও রয়েছেন মার্কস ও এঙ্গেলসের বিশ্বস্ততম ও একনিষ্ঠ ছাত্র এবং তিনি সমগ্রভাবে ও পরিপূর্ণভাবে মার্কসবাদের নীতির উপরে নিজেকে ভিত্তি করে ছিলেন। কিন্তু লেনিন নিছক মার্কস ও এঙ্গেলসের শিক্ষাকে সম্পাদন করেননি। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে সেই শিক্ষার ধারক, বাহক ও পরিবর্ধক। তার অর্থ কি? তার অর্থ হল, তিনি মার্কস ও এঙ্গেলসের শিক্ষাকে আরও বিকশিত করে তোলেন নতুন পরিবর্তিত উন্নত অবস্থা, পুঁজিবাদের নবপর্ব ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, উপযোগী করে। তার অর্থ হল, পুঁজিবাদের প্রাক-সাম্রাজ্যবাদী যুগে মার্কস ও এঙ্গেলস যতটা তত্ত্ব সম্পদ সৃষ্টি করে রেখে যেতে পেরেছেন, শ্রেণি-সংগ্রামের নতুন অবস্থায় মার্কস ও এঙ্গেলসের সেই শিক্ষাকে আরও বিকশিত, পরিবর্ধিত করে তুলতে গিয়ে লেনিন সেই তুলনায় মার্কসবাদের সাধারণ সম্পদ ভাণ্ডারে নতুন নতুন কিছু অবদান রেখেছেন; তা সত্ত্বেও, মার্কসবাদের ভাণ্ডারে লেনিনের নতুন অবদান সমগ্র ও সম্পূর্ণভাবে মার্কস ও এঙ্গেলস রচিত নীতির উপরে ভিত্তি করেই উপস্থাপিত। এই অর্থে আমরা লেনিনবাদকে বলি, এ হল সাম্রাজ্যবাদ ও প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ।

কমরেড স্তালিন আরও বলেছেন: 

দুই ধরনের মার্কসবাদী রয়েছেন। উভয়েই কাজ করেন মার্কসবাদের পতাকাতলে এবং মনে করেন নিজেদের ‘খাঁটি’ মার্কসবাদী বলে। তৎসত্ত্বেও তাঁরা কোনক্রমেই একরূপ নয়।

প্রথম গ্রুপটি সাধারণত মার্কসবাদের বাহ্যিক সমর্থন ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে। মার্কসবাদের মূল সত্তাকে উপলব্ধি করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়ে তাকে কাজে পরিণত করতে অসমর্থ হওয়া বা অনিচ্ছা থাকার দরুন এরা মার্কসবাদের প্রাণবন্ত বৈপ্লবিক নীতিগুলিকে প্রাণহীন অর্থহীন কতকগুলি সূত্রে পরিণত করে।

পক্ষান্তরে, দ্বিতীয় গ্রুপটি সমস্যাকে বুঝে মার্কসবাদের ভিত্তিতে তার সমাধানের চেষ্টা করে, মার্কসবাদকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। এরা যাতে মূলত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, তা হল পরিস্থিতির পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী মার্কসবাদকে বাস্তবে রূপ দিতে উপায়-উপকরণ নির্ধারণের উপর এবং পরিস্থিতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই উপায়-উপকরণগুলিও বদলানোর উপর। এঁরা ইতিহাসের সদৃশ উদাহরণ থেকে পথের নিশানা ও নির্দেশ পান না, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার বিশ্লেষণ করে পথ চলার পাথেয় আহরণ করে। উদ্ধৃতি ও প্রবচন নয়, এঁদের কাজকর্মের ভিত্তি হল ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা, প্রতিটি পদক্ষেপ অভিজ্ঞতা দিয়ে যাচাই, ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে অপরকে শেখানো কী করে একটি নতুন জীবন গড়ে তুলতে হয়। বস্তুত সে জন্যই বুঝতে পারা যায় কেন এই গ্রুপের কাজকর্মের মধ্যে কথা ও কাজে কোন গরমিল নেই। এদের হাতে মার্কসের বৈপ্লবিক শিক্ষা পূর্ণ জীবন্ত থাকে। এদের বেলায় মার্কসের সেই উক্তি পুরোপুরিভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে যে, মার্কসবাদীরা বিশ্বের ব্যাখ্যা করেই খুশি থাকবে না, তাদের আরও এগিয়ে যেতে এবং একে বদলাতে হবে। এই গ্রুপের নাম বলশেভিজম, কমিউনিজম, এই দলের সংগঠক ও নেতা হলেন ভি আই লেনিন।

লেনিনের শিক্ষাগুলিকে সূত্রবদ্ধ করে কমরেড স্তালিন ১৯২৪ সালে যে রচনাগুলি লেখেন তাই তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ লেনিনবাদের ভিত্তি

লেনিনবাদ রক্ষায়

কমরেড স্তালিন তাঁর তাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডে কেবল যে লেনিনের শিক্ষাগুলিকে লেনিনবাদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন তাই নয়, তিনি বিভিন্ন ধরনের আক্রমণের হাত থেকে লেনিনবাদকে রক্ষা করার জন্য দীর্ঘ এবং কঠিন-কঠোর সংগ্রাম চালান। মার্কসের মৃত্যুর পর এক সময়ে হিলকার ডিং, বার্নস্টাইন প্রমুখ দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পণ্ডিতেরা মার্কসবাদের এক অবিপ্লবী ও সংস্কারপন্থী ব্যাখ্যা দিয়ে মার্কবাদকে ‘ভদ্র’ করে তুলেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে কাউৎস্কি একই পথ গ্রহণ করেছিলেন। তখন কমরেড লেনিন সমালোচনার তীব্র কশাঘাতে তাদের মার্কসবাদকে ‘ভদ্র’ করার হাত থেকে রক্ষা করে তার বিপ্লব চরিত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। ঠিক তেমনি লেনিনের মৃত্যুর পরও এক নতুন কায়দায় লেনিনবাদকে বিকৃত করার চেষ্টা দেখা গেল। সে চেষ্টা হল ট্রটস্কিবাদ। ট্রটস্কি বললেন, এ দেশে সমাজতন্ত্র গঠন করা অসম্ভব। বিপ্লবকে এই মুহূর্তে ছড়িয়ে দিতে হবে পশ্চিম ইউরোপে। পশ্চিম ইউরোপের শিক্ষিত ও সংস্কৃতিতে উন্নত শ্রমিকশ্রেণির সহায়তা ব্যতীত বিপ্লবকে রক্ষা করা যাবে না। এই নতুন তত্ত্বের তিনি নাম দিলেন ‘স্থায়ী বিপ্লব’। ট্রটস্কি বললেন: 

জাতীয় পরিধির মধ্যে একটি সর্বহারার বিপ্লব শেষ জয়ে পরিণত হতে পারে না বলে যে দৃঢ় প্রত্যয়টি ‘শান্তির কর্মসূচী’তে পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত হয়েছে তা আমাদের সোভিয়েত সাধারণতন্ত্রের প্রায় পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা দ্বারা খণ্ডিত হয়েছে বলে কোনও কোনও পাঠকের কাছে প্রতীয়মান হতে পারে। কিন্তু এইরূপ একটি সিদ্ধান্তের কোনও ভিত্তি নেই। একটি দেশে এবং তাও একটি অনগ্রসর দেশে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্র যে সমস্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে টিকে আছে এই ঘটনাটি কেবল সর্বহারাদের বিপুল শক্তিরই সাক্ষ্য দেয়। এই শক্তিই অধিকতর অগ্রসর, অধিকতর সভ্য দেশগুলিতে সত্যই বিস্ময়কর ঘটনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। কিন্তু আমরা রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে রাষ্ট্র হিসাবে টিকে থাকলেও আমরা সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করার মত অবস্থায় পৌঁছাইনি, এমন কি পৌঁছাতে আরম্ভও করিনি। একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র হিসাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামের পরিণামে এই যুগে আমাদের উৎপাদন শক্তিগুলির চরম অবনতি ঘটেছে। অথচ তাদের (উৎপাদন শক্তিগুলির) বৃদ্ধি ও বিকাশের ভিত্তিতেই মাত্র সমাজতন্ত্রের কথা ভাবা যায়। বুর্জোয়া দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক আলোচনা, তাদের বিশেষ সুবিধাদান, জেনোয়া সম্মেলন এবং অনুরূপ ঘটনাবলী জাতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ কাজের অসম্ভাব্যতার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়। প্রধান প্রধান ইউরোপীয় দেশগুলির সর্বহারাদের জয়ের পরেই মাত্র রুশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সত্যিকারের অগ্রগতি সম্ভবপর হবে।” (ট্রটস্কি, ভল্যুম ৩, পৃষ্ঠা- ৯২-৯৩)।

কমরেড স্তালিন ট্রটস্কির এই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন: 

জাতীয় রাষ্ট্র পরিধির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্যের অসম্ভাব্যতার কথা যখন ট্রটস্কি বলেন তখন তিনি কার বিরোধিতা করেন? নিশ্চয় স্তালিন কিংবা বুখারিনের নয়। ট্রটস্কি এখানে কমরেড লেনিনেরই বিরোধিতা করছেন এবং তাও মৌলিক প্রশ্নে, অন্য কোনও প্রশ্নে নয়— জাতীয় রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ কার্যের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে।

কমরেড স্তালিন লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখালেন— 

বস্তুত, সমস্ত বৃহৎ উৎপাদনের উপায়গুলির উপর রাষ্ট্রের ক্ষমতা, সর্বহারাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, অসংখ্য দরিদ্র ও অতি দরিদ্র কৃষকদের সঙ্গে এই সকল সর্বহারাদের মৈত্রী, কৃষকদের উপর সর্বহারাদের সুনিশ্চিত নেতৃত্ব প্রভৃতি- সমবায় থেকে এবং একমাত্র সমবায় থেকে পূর্বে যাকে আমরা একটি মাত্র মিশ্র পদ্ধতি বলে গণ্য করতাম এবং এখনও ‘নেপে’র অধীনে যাকে কোনও কোনও বিশেষ দিক হতে মিশ্র পদ্ধতি বলে গণ্য করবার অধিকার আমাদের আছে- পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করার জন্য যা প্রয়োজন এইগুলিই কি তার সব নয়? একটি পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের জন্য যা প্রয়োজন এইগুলিই কি তার সব নয়? সমাজতান্ত্রিক সমাজ এখনও গঠিত হয়নি বটে, কিন্তু তা গঠন করার পক্ষে বা কিছু প্রয়োজন এবং যথেষ্ট এইগুলিই তার সব। (লেনিন রচনাবলী, ভল্যুম- ২৭)।

লেনিনের এই উদ্ধৃতি দিয়ে কমরেড স্তালিন বললেন: 

আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, কোনও না কোনও আকারে ট্রটস্কি প্রচ্ছন্ন অথচ সুনির্দিষ্টরূপে কমরেড লেনিনের বিরোধিতা করে কয়েকবারই এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন এবং প্রত্যেকবারই ট্রটস্কি এই প্রশ্নটিকে লেনিন ও লেনিনবাদের মনোবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করেননি, আলোচনা করেছেন লেনিন ও লেনিনবাদ-বিরোধী মনোভাব নিয়ে। 

ট্রটস্কি যখন তাঁর স্থায়ী বিপ্লবের তত্ত্ব দেন তখন সেটা শুনতে খুবই ভালো লাগে।কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে নভেম্বর বিপ্লব বিজয়ী রুশ শ্রমিকশ্রেণির উপর অনাস্থা এবং বিপ্লবের প্রাণশক্তির উপর অবিশ্বাস। আর ছিল রুশ কৃষকের উপর চরম অবজ্ঞা। ট্রটস্কির এই স্থায়ী বিপ্লবের নীতির সঙ্গে মার্কসবাদের অবশ্য কোনও সংশ্রব নেই। মার্কসবাদ কখনোই ‘অবিচ্ছিন্ন অবিরল’ ধারায় বিশ্বাস করে না। মার্কসবাদের কাছে গতির ছন্দ হল, গতি ও বিরতি এবং পুনরায় গতি ও পুনরায় বিরতি। অগ্রগমন সরল রেখায় হয় না, হয় ক্রমবর্ধিত চক্রাকারে।

মার্কসবাদসম্মত সেই প্রগতির সূত্র ধরে কমরেড স্তালিন সেদিন বলেছিলেন: প্রথমে বিজয়ী বিপ্লবকে এক দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত ও দৃঢ় করতে হবে, সেখানে সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করতে হবে এবং তা করা সম্ভব। বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণি একা নয়, সাহায্যকারী ও সমর্থক হিসাবে তার সঙ্গে আছে বিশাল কৃষক সম্প্রদায়।

ট্রটস্কির দল চিৎকার করে উঠলেন বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে, জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতি হচ্ছে। তার উত্তরে সেদিন স্তালিন বলেছিলেন: একটি দেশে বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করে সর্বহারাদের শক্তি প্রতিষ্ঠা করা সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিজয়, একথা নিশ্চয় বলা যায় না। বিজয়ী সর্বহারাকে সর্বপ্রথমে তার নবার্জিত রাষ্ট্রশক্তিকে সুসংহত করতে হবে। কৃষক-সমাজকে স্বপক্ষে এনে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে মনোনিবেশ করতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শুধুমাত্র একটি দেশের শক্তিতেই সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত জয় হবে, বাইরের পুঁজিবাদী বহিঃশত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে তথা পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টার বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্র রক্ষা করা যাবে। সেজন্য আরও অন্তত কয়েকটি দেশে বিপ্লব হওয়া প্রয়োজন। অন্যান্য দেশের বিপ্লব সমর্থন করা বিজয়ী বিপ্লবের একটি অন্যতম প্রধান কর্তব্য। অতএব এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে, একটি বিজয়ী বিপ্লব একাই নিজেকে অসীম শক্তিশালী বলে মনে করতে পারে না। সেটা একটা শক্ত ঘাঁটি, শক্ত দুর্গমাত্র— যার উপর ভিত্তি করে অন্যান্য দেশের শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবও ত্বরান্বিত হবে এবং সাহায্য পাবে।

ট্রটস্কিবাদের অতি বিপ্লবী বুলি যা কার্যত প্রতিবিপ্লবকেই সহায়তা করত, তার উত্তরে কমরেড স্তালিনের বিশ্লেষণ যে কত দূর বাস্তব, বিজ্ঞানসম্মত ও নির্ভুল তা আজ পোল্যান্ড থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ মুক্ত বিজয়ী বিপ্লবী দেশগুলিই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বে কমরেড স্তালিনের সর্বশেষ দান তাঁর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমস্যাবলী। মার্কস যেমন পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়মাবলী ও পুঁজিবাদী সমাজের প্রগতির নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন, যেমন কমরেড লেনিন মার্কসের এই তত্ত্বকে সাম্রাজ্যবাদী যুগে আরও সম্প্রসারিত করে গিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদী যুগের বিশ্লেষণে, তেমনি কমরেড স্তালিন দিয়ে গিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক সমাজের উৎপাদনের নিয়মাবলী, সেই সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদী সমাজের নিয়মেও যে গুরুতর পরিবর্তন এসেছে তাও তিনি তাঁর নতুন পুস্তকে দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন: আধুনিক পুঁজিবাদের মূল অর্থনৈতিক নিয়মকে সংক্ষেপে বলা যায়, তার লক্ষ্য হল “উচ্চতম লাভ”। এর ফলে যে কোনও দেশের জনগণের অধিকাংশই শোষিত হয়ে দারিদ্র্যের নিম্নতম পর্যায়ে নেমে যায়। অন্যান্য দেশগুলি এবং বিশেষ পশ্চাদপদ দেশগুলি দাসত্বের বাঁধনে আটকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর ফলে যুদ্ধ বেধে যায় এবং জাতীয় অর্থনীতি এক সামরিক অর্থনীতিতে পরিণত হয় এবং তা উচ্চতম লাভ আদায়ের সুযোগ করে দেয়। এই সর্বনাশা উচ্চতম লাভের নেশায় আধুনিক পুঁজিবাদ উন্মত্তের মতো ছুটছে।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

গড়পড়তা লাভই ছিল কিছুকাল পূর্ব পর্যন্ত পুঁজিবাদের মূল নিয়ম। কিন্তু আজ আর তা নেই। কমরেড স্তালিনের এই নতুন আবিষ্কার আধুনিক পুঁজিবাদকে বোঝাতে অমূল্য সাহায্য করবে। তাঁর এই নতুন অবদানের তুলনা হতে পারে একমাত্র লেনিনের সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির বিশ্লেষণের সঙ্গে। লেনিন মার্কসবাদকে নতুন অবস্থার আলোকে ব্যাখ্যা করে আরও সমৃদ্ধ করে গিয়েছিলেন, স্তালিনও সমাজতান্ত্রিক যুগে তার পরিবর্তনগুলিকে নতুন করে সূত্রাকারে গ্রথিত করে গেলেন। তাঁর এই অবদান মার্কসবাদের ইতিহাসে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিনের সঙ্গে একইভাবে মর্যাদা পাবে। কমরেড স্তালিন লেনিনবাদকে কেবলই সুপ্রতিষ্ঠিতই করেননি, তিনি লেনিনবাদকে রক্ষা করেছেন, লেনিনবাদকে এক বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত করেছেন।

অন্য দেশের বিপ্লবী সংগ্রামে স্তালিনের অবদান

কমরেড স্তালিন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের কেবল যে বিকাশ ঘটান বা কেবল যে তা সোভিয়েত ইউনিয়নের বুকে বাস্তব প্রয়োগ ঘটান তাই নয়, দেশে দেশে বিশেষ করে ঔপনিবেশিক ও পরাধীন প্রাচ্য জগতের মুক্তি সংগ্রামে স্তালিনের অবদান অবিস্মরণীয়। বলা বাহুল্য, এই সমস্ত দেশের মুক্তি আন্দোলন কীভাবে পরিচালিত হবে, এই সমস্ত দেশে মাকর্সবাদ-লেনিনবাদের প্রয়োগ কীভাবে ঘটবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তাঁরই হাতে তৈরি। ঔপনিবেশিক ও পরাধীন প্রাচ্যদেশগুলির মুক্তি আন্দোলনে কমরেড স্তালিনের দান অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। চীন বিপ্লবের উপর তিনি অসাধারণ গুরুত্ব দিতেন। তাই চীন বিপ্লবের প্রতি পদে তিনি পরামর্শ দিয়ে বিপ্লবকে সার্থকতার পথে পরিচালিত করেছেন। তিনি মনে করতেন প্রাচ্যের ঔপনিবেশিক জগতের বিপ্লবে চীনের গুরুত্ব অসাধারণ। কোনও ঔপনিবেশিক দেশের বিপ্লবই চীনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে উপেক্ষা করতে পারে না।

সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থান প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য জগতের সীমানায় বলে কমরেড স্তালিন বলেছিলেন: রাশিয়ার বিপ্লব হবে প্রাচ্যের ঔপনিবেশিক বিপ্লব এবং প্রতীচ্যের উন্নত পুঁজিবাদী দেশের শ্রমিক বিপ্লবের মধ্যে সেতু স্বরূপ।

প্রাচ্যের শ্রমজীবীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সভার ভাষণ দিতে গিয়ে ১৯২৫ সালের ১৮ই মে কমরেড স্তালিন বলেছিলেন:

১। একটি বিজয়ী বিপ্লব ব্যতীত উপনিবেশ ও পরাধীন দেশগুলির সাম্রাজ্যবাদের কবল হতে মুক্তিলাভ করা অসম্ভব। স্বাধীনতা আপনারা দান স্বরূপ পাবেন না।

২। যতদিন পর্যন্ত আপসপন্থী জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি বিচ্ছিন্ন না হচ্ছে, বিপ্লবী ছোটো বুর্জোয়ারা যতদিন না এই বুর্জোয়াদের প্রভাব হতে মুক্ত হচ্ছে, যতদিন না সর্বহারার নেতৃত্ব স্থাপিত হচ্ছে এবং শ্রমিকশ্রেণির অগ্রণী অংশ যতদিন না একটি স্বতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সংগঠিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং ধনতান্ত্রিকভাবে উন্নত উপনিবেশ ও পরাধীন দেশগুলির পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করতে পারা যাবে না।

৩। এই দেশগুলির মুক্তি সংগ্রামের সাথে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলির সর্বহারা আন্দোলনের প্রকৃতবন্ধন সৃষ্টি না হলে ঔপনিবেশিক এবং পরাধীন দেশগুলিতে স্থায়ী বিজয়লাভ করা সম্ভব হবে না।

ঔপনিবেশিক এবং পরাধীন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মৌলিক কর্তব্য হবে এই সিদ্ধান্তগুলিকেই তাঁদের বৈপ্লবিক কাজের ভিত্তি হিসাবে গণ্য করা।

এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ঔপনিবেশিক এবং পরাধীন দেশগুলির বৈপ্লবিক আন্দোলনের আশু কর্তব্য কী?

বর্তমানকালে ঔপনিবেশিক এবং পরাধীন দেশগুলির বৈশিষ্ট্য এই যে, এখন আর একটি মাত্র সর্বব্যাপী ঔপনিবেশিক প্রাচ্যের অস্তিত্ব নেই। পূর্বে ঔপনিবেশিক প্রাচ্যকে একটি একক এবং সমপ্রকৃতিসম্পন্ন দেশ বলে ধরা হতো। এই ধারণা এখন আর সত্যের স্বার্থে মিল খায় না।

কমরেড স্তালিন ঔপনিবেশিক এবং পরাধীন দেশগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। কিন্তু এই সমস্ত রণকৌশল যে একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিই সার্থকভাবে বাস্তবায়িত করতে পারে সে বিষয়ে কমরেড স্তালিনের কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। তিনি বললেন: এই সকল দেশের অগ্রণী কমিউনিস্টদের মূল স্লোগান হবে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির স্বাতন্ত্র্য, কারণ একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির দ্বারাই সর্বহারার নেতৃত্বের পথ প্রস্তুত করা এবং সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু আপসপন্থী বুর্জোয়া শ্রেণিকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার পর শহর এবং গ্রামের ছোটো বুর্জোয়াদের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি বুর্জোয়া শ্রেণির বিপ্লবী অংশের সাথে একটি প্রকাশ্য ব্লক সৃষ্টি করতে পারে এবং তা করতে হবে। 

ধনতান্ত্রিকভাবে উন্নত উপনিবেশ এবং পরাধীন দেশগুলিতে বিপ্লবী আন্দোলনের আশু কর্তব্য সম্পর্কে কমরেড স্তালিনের বক্তব্য হল:

১। শ্রমিক শ্রেণির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের কমিউনিজমের পক্ষে আনা এবং স্বতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করা।

২। আপসপন্থী জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের একটি জাতীয় বিপ্লবী ব্লক গঠন করা।

৩। এই ব্লকে সর্বহারাশ্রেণির নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।

৪। শহর এবং গ্রামাঞ্চলের ছোটো বুর্জোয়াদের আপসপন্থী জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রভাব হতে মুক্ত করার চেষ্টা করা।

৫। মুক্তি আন্দোলন এবং উন্নত দেশগুলির সর্বহারা আন্দোলনের মধ্যে বন্ধন স্থাপন করা।

কমরেড স্তালিন এই সমস্ত দেশের কেবল বৈপ্লবিক আন্দোলনের কর্তব্যই নিরূপণ করেন না, এই আন্দোলন পরিচালনাকালে যে সমস্ত বিচ্যুতির আশঙ্কা রয়েছে, সেই সম্পর্কেও তিনি সতর্ক করে দেন। তিনি বললেন, 

প্রথম বিচ্যুতি হল, এই দেশগুলির বিকাশের স্তর ও অবস্থার যথার্থ বিবেচনা না করেই উপনিবেশ এবং পরাধীন দেশগুলিতে মুক্তি আন্দোলনের সম্ভাবনাকে কম করে দেখা এবং একটি সম্মিলিত সর্বব্যাপী জাতীয় ফ্রন্টের ধারণাকে বড়ো করে দেখা। এটা দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতিই। 

দ্বিতীয় বিচ্যুতি হল: 

মুক্তি আন্দোলনের বৈপ্লবিক সম্ভাবনাকে বড়ো করে দেখা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণি এবং বিপ্লবী বুর্জোয়াদের মিত্রতার গুরুত্ব ছোটো করে দেখা। এটা বামপন্থী বিচ্যুতি।

কমরেড স্তালিন এই উভয়বিধ বিচ্যুতি পরিহার করতেই পরামর্শ দিলেন। কমরেড স্তালিনের এই শিক্ষা ঔপনিবেশিক এবং পরাধীন দেশগুলির কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিগুলিকে তত্ত্বগতভাবে এবং রণকৌশলের দিক থেকে সমৃদ্ধ করে তুলল। তাঁর এই শিক্ষাগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির হাতিয়ারে পরিণত হল। আর কমরেড স্তালিনের এই শিক্ষা ছিল লেলিনবাদী নীতির ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত।

স্তালিন-বিরোধিতার অর্থ লেনিনবাদকেই নস্যাৎ করা

কমরেড স্তালিন তত্ত্বগত দিক থেকে লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠিত করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বুকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি লেনিনবাদের বিকাশ ঘটান এবং দেশে দেশে কীভাবে লেনিনবাদের প্রয়োগ ঘটবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেন। এইরূপ একজন মহান লেনিনবাদী নেতাকে যাঁরা নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছেন বা এখনও চেষ্টা করছেন। তাঁরা প্রকৃতপক্ষে লেনিনের নাম করে লেনিনবাদকেই নস্যাৎ করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা স্তালিনের অবদানগুলি খাটো করে দেখতে গিয়ে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকেই খাটো করছেন। একটি-দুটি উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে। স্তালিনের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান: “স্তালিন জোর করে যৌথ খামার প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। লক্ষ লক্ষ চাষিকে উপবাসী রেখে তাদের যৌথ খামারে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন।” যৌথ খামার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে গিয়ে তাঁকে হয়তো কিছুটা বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে তাঁকে তা করতে হয়েছিল? প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক আনা লুই স্ট্রং-এর ভাষায়: 

আমি ওই সময় ঘুরে ঘুরে দেখেছি, আমি জানি, কী ঘটেছিল। স্তালিন অবশ্যই পরিবর্তন চালু করেছিলেন, এটা পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু স্তালিন যে গতিতে যৌথ প্রথা প্রবর্তন করার পরিকল্পনা করেছিলেন, প্রবর্তন তার চেয়ে এত বেশি দ্রুত হল যে, খামারগুলোর জন্যেই যথেষ্ট যন্ত্রপাতি প্রস্তুত পাওয়া গেল না। দেশের লোকের সাধ ছিল, কিন্তু পটুতা ছিল না, তার সঙ্গে যুক্ত হল কুলাকদের প্ররোচনায় আতঙ্কগ্রস্ত চাষিদের গোরু-ঘোড়া বধ। তার উপর দেখা দিল দু-বছর অনাবৃষ্টি। ফলে ১৯৩২ সালে খাদ্য সংকট ঘটল, সেটা ঘটল স্তালিনের ‘চাপ’-এর দু-বছর পরে। সারা দেশব্যাপী কড়া রেশনিং ব্যবস্থা চালিয়ে মস্কো সে সংকটের মধ্যে দেশকে পার করে দিল।

যাঁরা যৌথ খামার পদ্ধতির ‘বাড়াবাড়ির’ উপর গুরুত্ব দেন তাঁরা কি সোভিয়েত ইউনিয়নের কৃষকদের অবস্থার পরিবর্তনগুলিকেই খাটো করে দেখেন না? তাঁরা কি জমিদার, কুলাক, ব্যবসাদার, মুনাফাখোর, সুদখোরদের শোষণের অবসানকেই খাটো করে দেখেন না?

সোভিয়েত বিশ্বকোষে স্তালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়: 

মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিচারে তিনি ভুল করেছিলেন। সোভিয়েত-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির গুরুত্বকে বড়ো করে দেখার সোভিয়েত ভূখণ্ডে আক্রমণের জন্য জার্মান ফ্যাসিস্ত বাহিনীর প্রস্তুতি সম্বন্ধে গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্টকে তিনি বিবেচনা করেননি।

যে অনাক্রমণ চুক্তির সমালোচনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সংশোধনবাদীরা মুখর সেই চুক্তি কোন পরিস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল? এই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ধনবাদী বিশ্ব দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিটি মুহূর্তে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রান্ত হবার আশঙ্কা। যুদ্ধের উন্মত্ততায় জার্মানি আর জাপান জাতিপুঞ্জ ত্যাগ করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সোভিয়েত ইউনিয়ন শান্তির পতাকা হাতে জাতিপুঞ্জে প্রবেশ করল। ইউরোপ যখন প্রতি মুহূর্তে হিটলার কর্তৃক পোলান্ড আক্রমণের প্রতীক্ষা করছিল, ঠিক সেই সময়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় ইউরোপের শক্তির হেরফের হয়ে গেল। আর এই ভারসাম্যের পরিবর্তন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকূলেই হয়েছিল পরবর্তী ইতিহাসই তার প্রমাণ।

দীর্ঘ ৩০ বছরের ঘটনাবহুল জীবনে কমরেড স্তালিন যে কোনও ভুল ত্রুটি করেননি সেকথা কেউ বলবেন না। কিন্তু তার বিচার করতে হবে কোন পরিস্থিতিতে তিনি কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, আর সেই সিদ্ধান্তের সাফল্যই বা কতটা, আর ব্যর্থতাটাই বা কী? যে সিদ্ধান্ত কোটি কোটি মানুষকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে রক্ষা করে তা ‘বাড়াবাড়ি’ হলেও সেই সিদ্ধান্ত লেনিনবাদী নীতির বাস্তব প্রয়োগ, যে সিদ্ধান্ত ফ্যাসিস্ত আক্রমণের হাত থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করে সেই সিদ্ধান্তকে যতই ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিচারে ভুল’ বলে চিহ্নিত করা হোক না কেন তা যে সঠিক লেনিনবাদী নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

স্তালিন-বিরোধী কুৎসা রটনাকারীরা যতই কুৎসা রটনা করুক না কেন ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার কোনো সাধ্য তাঁদের নেই। লেনিনবাদ চিরন্তন, আর লেনিনবাদের সঙ্গে কমরেড স্তালিনের নামও চির অম্লান।

প্রথম প্রকাশ- গণশক্তি, স্তালিন সংখ্যা, ১৯৭৯


প্রকাশের তারিখ: ২৯-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org