|
মোদী-শাসনে বিপন্ন সংবিধান, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাসীতারাম ইয়েচুরি |
মোদী জমানায় সংবিধানের চারটি বুনিয়াদি স্তম্ভকে পরিকল্পিতভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেই চারটি স্তম্ভ হল ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক ন্যায়। সাধারণতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক চরিত্রকে বদলে দিয়ে এই দেশকে তীব্রভাবে অসহিষ্ণু, ঘৃণা ও হিংসাভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ধরনের হিন্দুত্ব রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। বিজেপির সেই প্রয়াসের বিরুদ্ধেই এই নির্বাচন। ভোট পর্ব শুরুর ঠিক আগে ফ্রন্টলাইন পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। |
এই সাধারণ নির্বাচনকে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থীরা কোন পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখছে? দুর্নীতিগ্রস্তদের রক্ষা করার জন্যই ইন্ডিয়া ব্লক জোট বেঁধেছে, বিজেপির এই অবস্থান সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? এটা পুরোপুরি অর্থহীন অভিযোগ। একদিকে ইন্ডিয়া ব্লকের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করছে সিবিআই/ইডি/আইটি। অথচ যে মুহুর্তে এই সব নেতারা বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন তখন তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি স্রেফ উধাও হয়ে যাচ্ছে। আসল ঘটনা হল, মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপিই এদেশে সব রকমের দুর্নীতির আসল উৎস। সম্প্রতি দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া ব্লকের বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল একটা ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে। তা হল, এই সাধারণতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চরিত্রকে, সাধারণতন্ত্রের সংবিধানকে এবং গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য বিজেপিকে পরাস্ত করা। কয়েকটি রাজ্যে ইন্ডিয়া ব্লকের কয়েকটি দলের মধ্যে সংঘাত থাকতে পারে, এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে এটা স্ববিরোধী। কিন্তু ঘটনা হল এই সংঘাতগুলি নতুন কিছু নয়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতি থাকার জন্যই বিজেপি দুর্বল হচ্ছে এবং তাদের নির্বাচনে পরাজিত করা যাবে। দয়া করে একথা মনে রাখবেন যে, রাজনীতি নিছক পাটিগণিত নয়। কেরালায় সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন এলডিএফ (লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা হচ্ছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)-এর। এর ফল যা হবে তা হল, কেরালায় বিজেপি বিধানসভা বা লোকসভার কোনও আসনেই জিতবে না। এই যে জেডি (ইউ), আরএলডি, পল্লবী প্যাটেলের আপনা দল, প্রকাশ আম্বেদকারের বিভিএ ইন্ডিয়া ব্লক থেকে বেরিয়ে গেল, এবং এনসিপিতে ভাঙন হল, আপনি কি মনে করেন এগুলো বড় ধরনের ধাক্কা? বিরোধী জোট কতটা গতি পেয়েছে? শুধু নেতারা এক জায়গায় এলেই ইন্ডিয়া ব্লকের সংহতি গড়ে ওঠে না। যদিও নেতাদের এক জায়গায় আসাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল জনগণের মধ্যে ঐক্য যা ভারতকে, ভারতের সংবিধানকে ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় আমরা এটা দেখেছি। গণতন্ত্রকে ফেরানোর জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষাই তখন বহু দলের নেতাদের বাধ্য করেছিল একসঙ্গে আসতে, প্রতিরোধ জোরদার করতে এবং শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থাকে পরাজিত করতে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ইন্ডিয়া ব্লকের উড়ান শুরু হয়ে গেছে এবং তাতে ধীরে ধীরে গতি সঞ্চারিত হচ্ছে। ‘জুড়েগা ভারত’, ‘জিতেগা ইন্ডিয়া’ স্লোগানের জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ। ইন্ডিয়া ব্লক অভিন্ন ইস্তাহার প্রকাশ করবে, তেমন সম্ভাবনা আছে কি? আপনাদের দলের ইস্তাহারে অনেক প্রস্তাব রয়েছে। যেমন, ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপ, সন্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিলগ্নিকরণের পুনর্বিবেচনা, বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ইত্যাদি। এসবগুলো আপনাদের মিত্রদের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। ইন্ডিয়া ব্লকের সবকটি দল হয় তাদের নিজস্ব ইস্তাহার প্রকাশ করেছে, নয়ত করবে। এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। নির্বাচন কাছাকাছি এসে গেলে একটা অভিন্ন অ্যাজেন্ডা প্রকাশ করা হবে। কেন্দ্রে বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় এলে যেসব বুনিয়াদি ন্যূনতম কর্মসূচি গ্রহণ করবে অভিন্ন অ্যাজেন্ডায় তারই রূপরেখা পাওয়া যাবে। একবার সরকার গঠন হয়ে গেলে সবসময়ই অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি সূত্রবদ্ধ হয়ে যায়। এমনটাই ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার গঠনের সময়, ১৯৯৯ সালে এনডিএ সরকার গঠনের সময়, অথবা ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার গঠনের সময়। কিছু কিছু দলের বিভিন্ন ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। পাশাপাশি অভিন্ন ন্যূনতম চুক্তি হল সেটাই যেখানে ইন্ডিয়া ব্লকের সব দল একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। আপনাদের পার্টির ইস্তাহারে ‘ইডির বিষদাঁত ভাঙা’র কথা বলা হয়েছে, বলা হয়েছে পিএমএলএ এবং ইউএপিএ বাতিলের কথা। আপনাদের পার্টি একথাও স্বীকার করেছে যে, ইউপিএ জমানাতেই পিএমএলএ এবং ইউএপিএকে আরও কঠোর করে তোলা হয়েছিল। বিজেপি বলছে, ইউপিএ আমলের আইনগুলিই তারা কাজে লাগাচ্ছে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কাজে। ইন্ডিয়া ব্লক কি শুধুমাত্র এই সব আইনের অপব্যবহার নিয়েই উদ্বিগ্ন? নাকি অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য স্ট্যাটিউট বই থেকেই তারা এগুলো একেবার দূর করে দিতে চায়? ইডির বিষদাঁত ভাঙার, পিএমএলএ ও ইউএপিএ বাতিলের ডাক দিয়েছে সিপিআইএম। কারণ এই দুটো আইনই মোদী সরকারের আনা সংশোধনের সাহায্যে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। দুটো আইনেই এখন ভয়ঙ্কর সব ধারা রয়েছে যা জামিন পাওয়াকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে। দুটো আইন মিলে আইনশাস্ত্রের নীতিগুলিকে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রাথমিক নিয়মটিকে পায়ের বদলে একেবারে উল্টো করে মাথার ওপর দাঁড় করিয়ে দিেয়ছে। এই ধারাগুলি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত, আইনশাস্ত্রের মূল কথা ছিল, যতক্ষণ না কোনও ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি নির্দোষ। আর এখন একজন পুরুষ বা মহিলা যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারছেন ততক্ষণ তিনিই দোষী। ঠিক এই কারণেই আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কোনও রকম অভিযোগ দায়ের না হওয়া সত্ত্বেও লোকেরা জেলে পচছে। ভীমা কোরেগাঁও মামলাতেই একথা স্পষ্ট যে, বহু বছর ধরে জেলে পচিয়ে নাগরিকদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। এমনকী চার্জশিটও দাখিল করা হচ্ছে না। সেকারণেই এই সব কঠোর আইনগুলি অবশ্যই খারিজ করতে হবে। এগুলি গণতন্ত্র বিরোধী এবং এগুলোতে ফ্যাসিবাদী ধরনের পদ্ধতির ছাপ রয়েছে। বিজেপি দাবি করছে যে, তারা এই আইনগুলি কাজে লাগাচ্ছে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করার জন্য। তাদের এই দাবি যে অন্তঃসারশূন্য তা বারে বারে প্রমণিত হয়েছে। যেহেতু ইডি ও এনআইএ চার্জ গঠন করতেই পারছে না, তখন বিজেপির দাবির কোনও ন্যায্যতাই থাকতে পারে না। এখন যে আকারে এই আইনগুলি স্ট্যাটিউট বইতে আছে সেগুলিকে বাতিল করতে হবে। এছাড়াও, দেখেশুনে মনে হচ্ছে যারা ক্ষমতাবান, আদর্শ আচরণ বিধি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অযোধ্যায় রাম মন্দির সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী যেসব মন্তব্য করেছেন সেই উদাহরণের কথা ভাবুন। কংগ্রেসের ইস্তাহার সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যের কথা ভাবুন। পুরো মন্তব্যগুলোই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আরও তীক্ষ্ণ করার লক্ষ্যে করা হয়েছে। মনে হচ্ছে ভারতের নির্বাচন কমিশন এগুলোকে এমনকী নজরেই আনছে না। মিডিয়াকে গিলে ফেলে এবং সোশাল মিডিয়ার ওপর আধিপত্য কায়েম করে বিজেপি বাড়তি সুবিধা কাজে লাগাচ্ছে। ইন্ডিয়া ব্লকের দলগুলি এসবের মোকাবিলা করছে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ গড়ে তুেল এবং প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করে। নির্বাচনী বন্ড প্রকল্পে আপনাদের পার্টি ঘোষণা করেছে, যে অর্থ সংগ্রহের জন্য নির্বাচনী বন্ড মারফৎ টাকা নেওয়া হবে না। এই অবস্থানের কারণ কী? এবিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে আপনি কীভাবে দেখছেন? সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে নির্বাচনী বন্ড অসাংবিধানিক। এই রায়কে আমরা স্বাগত জানাই। যদিও আমরা মনে করি, এটা অনেক আগেই হওয়া দরকার ছিল। এই স্কিম সম্পর্কে যেসব বিশদ তথ্য ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে তাতে এটা প্রতিষ্ঠিত যে, ক) ইডি/সিবিআই/আইটির মতো এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর টাকা তোলা হয়েছে। খ) বিপুল টাকা চাঁদার বিনিময়ে বিভিন্ন প্রকল্পের বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েেছ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েেছ। এগুলি সবই পছন্দের লোকেদের সঙ্গে দেওয়া-নেওয়ার ভিত্তিতে মধুর বোঝাপড়ার ব্যাপার। এবং গ) এক্ষেত্রে প্রচুর টাকা নয়ছয় করা হয়েছে এবং ব্যালান্স শিটে যত মুনাফা দেখানো হয়েছে তার চেয়েও বহু কোটি টাকার বেশি বন্ড কিনেছে অনেক সংস্থা। এই তিনটে বিষয়েই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার। সিপিআই(এম) চায়, সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে এই বিষয়গুলির দ্রুত তদন্ত করুক একাধিক স্বাধীন সংস্থা। এ ঘটনা তখনই ঘটছে যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে যে, এই পদক্ষেপের পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে। এটা কি নেহাতই কাকতালীয় যে বিজেপিও ত্রিচূর কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে? এই পদক্ষেপের নিন্দা করে আমরা নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লিখেছি। এবং জানতে চেয়েছি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু হয়ে যাওয়ার পর এধরনের কাজে কীভাবে অনুমোদন দিচ্ছে কমিশন? কারণ এই ধরনের পদক্ষেপই তো সব দলের সমানভাবে নির্বাচনে লড়ার সুযোগটাই কেড়ে নিচ্ছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার ১৫ এপ্রিল, ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত শিরোনাম মার্কসবাদী পথের ভাষান্তর : সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ২৮-এপ্রিল-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |