নির্মাণ শ্রমিকরা ধর্মঘটে

স্বাতী শীল
কিন্তু মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই। যদিও তা লেখা আছে আইনে। বাধ্য হয়ে মহিলা শ্রমিকরা গর্ভাবস্থার শেষ সময় পর্যন্ত কাজ করেন। বাচ্চা জন্মের ক’দিন পরেই ফের কাজে ফিরতে বাধ্য হন। হাড়ভাঙা খাটুনি, হাজারো কেজির মাল বওয়ার কাজ মহিলা শ্রমিকদের শরীরে প্রভাব পড়ছে। অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভপাত, প্রসব সমস্যা-সহ নানা যৌন রোগেরও শিকার হচ্ছেন তাঁরা। বাড়ছে সদ্যজাত শিশু মৃত্যুর হার। বহু মহিলা শ্রমিকরাই কোলের শিশুকেও কাজের জায়গায় আনতে বাধ্য হন। বাড়িতে কেউ দেখার থাকে না বলে। সাইটে না আছে ক্রেশ, না আছে নূন্যতম সন্তান লালন পালনের ব্যবস্থা। ধুলো বালি, শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বড় হয় বাচ্চা।

রাজ্যে নির্মাণ শ্রমিকদের টাকা সরিয়ে অন্য খাতে: 

অসংগঠিত ক্ষেত্রের নির্মাণ শ্রমিকরা এমনিতেই পান নামমাত্র কিছু সুযোগ-সুবিধা। নামেই রয়েছে নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড। 

নতুন শ্রম কোড এখনও চালু চালু হয়নি। তার আগেই কেরালা ছাড়া দেশের সব রাজ্যে এই তহবিলের ভয়াবহ অপব্যবহার ও সুবিধার কাটছাঁট লক্ষ্য করা গিয়েছে। আর শ্রম কোড একবার কার্যকর হলে, এই সামান্য সুযোগ-সুবিধাটুকুও থাকবে না, ছাঁটাই করা হবে। দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আইনকে গ্রাস করেছে নতুন সামাজিক সুরক্ষা কোড এবং পেশাগত সুরক্ষা কোড। যেগুলি এতদিন মূলত পরিযায়ী শ্রমিকসহ নির্মাণ শ্রমিকদের কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। একটি হলো নির্মাণ ও অন্যান্য নির্মাণ কর্মী (নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৯৬। অন্যটি আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, ১৯৭৯।

নতুন শ্রম কোড চালু হলে রেজিস্টার্ড নির্মাণ শ্রমিকরা হারাবেন আবাসন ঋণ-সহ অগ্রিম বা অ্যাডভান্স পাওয়ার সুবিধা। শিশুদের শিক্ষার জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে থাকবে কেবল প্রকল্প-ভিত্তিক সুবিধা। কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে শুধুমাত্র সরকারের নির্ধারিত শর্তে। সেস, সুদ ও ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত আদায় অযোগ্য অর্থ বোর্ড বাতিল করতে পারবে। রাজ্য সরকার এখন বোর্ডের কাজে ব্যর্থতা বা বিলম্ব হলে তা বাতিল করে দিতে পারবে। এবং পুনর্গঠনের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমাও থাকবে না। 

নির্মাণ ও অন্যান্য নির্মাণ কাজ-এর সংজ্ঞা পরিবর্তন করে ৫০ লক্ষ টাকার নিচের আবাসন প্রকল্পকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে অনেক শ্রমিকই আর রেজিস্ট্রেশনের যোগ্য থাকবেন না। কল্যাণ তহবিলে বাধ্যতামূলক চাঁদা বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষার জন্য মালিকরা আর দায়বদ্ধ থাকবে না। বিল্ডিং অ্যান্ড আদার কনস্ট্রাকশানস (বিওসিডব্লিউ) আইনে আগে যেসব মৌলিক সুবিধা বাধ্যতামূলক ছিল– যেমন বিনামূল্যে অস্থায়ী বাসস্থান, পানীয় জল ও শৌচাগার– তা এখন হবে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী। যার ফলে শ্রমিকদের অধিকার ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে। 

‘কর্মচারী ক্ষতিপূরণ আইন’ এখন শুধুমাত্র দ্বিতীয় তালিকাভুক্ত কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য। ফলে বহু নির্মাণ শ্রমিকই পাবেন না দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ। দুর্বল করা হয়েছে সেস সম্পর্কিত নিয়মবিধি। মালিক এখন নিজেরাই সেস নির্ধারণ করতে পারবে। কমিয়ে দেওয়া হারে সুদ বা সেস দিতে পারবে। শ্রমিকরা যদি আইন ভাঙে, তাহলে তাদের ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হবে। অথচ, মালিকরা যদি ৩০ দিনের মধ্যে সংশোধন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা হবে না। আগে ট্রেড ইউনিয়ন সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারত। এখন সেটা কেবল ‘ইনস্পেক্টর কাম ফ্যাসিলিটেটর’-এর মাধ্যমে করা যাবে। ফলে অভিযোগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়বে। শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়া দিন দিন আরও কঠিন হবে।

নতুন শ্রম কোড আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, ১৯৭৯-কে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধিকারই খর্ব করা হয়েছে। এখন থেকে কেবল ১০ জন বা তার বেশি পরিযায়ী শ্রমিক নিয়োজিত থাকলে, তবেই এই আইন প্রযোজ্য হবে। যা আগে ছিল ৫ জন। ফলে ছোট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা সুরক্ষার বাইরে চলে যাবেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের এখন সাধারণ ঠিকা শ্রমিক হিসেবে গণ্য করা হয়। যার ফলে তাদের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ অধিকার মিশে যাচ্ছে দুর্বল সাধারণ আইনে। পানীয় জল ও ক্রেশের মতো কল্যাণমূলক সুবিধা এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। বরং ঐচ্ছিক।  

কন্ট্রাক্টর-এর সংজ্ঞা থেকে ‘নিয়োগকারী’ বা ‘রিক্রুটার’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের দায়দায়িত্ব-ও কমে গিয়েছে। যদিও, পরিযায়ী শ্রমিক-এর সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করে স্বাধীন অভিবাসীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ১৯৭৯ সালের আইনের অনেক অধিকার।

এতদিন জানা ছিল মালিকদের থেকে সংগৃহীত সেস টাকায় চলে কল্যাণ প্রকল্প। কিন্তু তথ্যের অধিকার আইনে কনস্ট্রাকশানস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (সিডব্লিউএফআই) এবিষয় জানতে চাইলে প্রকাশ পেয়েছে ভয়াবহ তথ্য। জানা গিয়েছে, শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য সংরক্ষিত হাজার হাজার কোটি টাকা পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। আরও ভালো ভাবে বললে বিলকুল চুরি হয়ে যাচ্ছে! কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রক স্বীকার করেছে যে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য রাজ্য কল্যাণ বোর্ডগুলির সংগৃহীত প্রায় ৭০,০০০ কোটি সেস আজও খরচ হয়নি! ২০০৫ সাল থেকে ১,১৭,৫০৭ কোটি টাকা তোলা হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছেছে মাত্র ৬৭,০০০ কোটি টাকা। ওদের কথা, ৬ কোটি শ্রমিক নথিভুক্ত, রেজিস্ট্রেশন দিয়ে কী হবে, যদি টাকা না পৌঁছায়?

এটা শুধু অব্যবহৃত টাকার বিষয়ই নয়। অনেক টাকা আদায়ই করা হয়নি। সন্দেহ ছিল বিল্ডাররা সিস্টেমকে ধোঁকা দিচ্ছে। এখন হাতে প্রমাণ মিলছে। যেমন মহারাষ্ট্রে গত ১৯ বছরে মাত্র ১৯,৫০০ কোটি সেস তোলা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, ওই সময়কালে মাত্র ১৯ লক্ষ কোটি টাকার নির্মাণ হয়েছে ওই রাজ্যে। কিন্তু বাস্তব নির্মাণ মূল্য যে অনেক বেশি, তা সকলেই জানেন-বোঝেন। এর অর্থ স্পষ্ট, বিশাল পরিমাণ সেস ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ, সরাসরি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া। 

কেরালাই একমাত্র রাজ্য, যারা তাদের সংগৃহীত সেস প্রায় পুরোটাই শ্রমিকদের জন্য ব্যয় করেছে। 

আবার এই অব্যবহৃত টাকা শুধু পড়ে নেই। সরাসরি অন্য খাতেও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটা কোনও ছোটখাটো ভুল নয়! শ্রমিকদের সঙ্গে প্রহসন। যা এই কল্যাণ বোর্ডগুলোর মূল উদ্দেশ্যকেই ধ্বংস করছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৬০০ কোটি টাকা বিওসিডব্লিউ ফান্ড থেকে বেমালুম তুলে নিয়ে রাখা হয়েছে রাজ্যের সাধারণ কোষাগারে। তেলেঙ্গানাতেও এমনই হয়েছে, সেখানে অর্থের পরিমাণ ছিল ২৫৫৪ কোটি! পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও ভয়াবহ। ২০১৭ সালে, রাজ্য সরকার নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড-সহ আরও কিছু বোর্ডকে একত্র করে ‘বিনা মূল্যে সামাজিক সুরক্ষা যোজনা’ নামে একটি স্কিমে রূপান্তর করে। এই একীকরণ বা মার্জার ছিল আসলে এক প্রহসন। এর ফলে শ্রমিকদের প্রায় সমস্ত পুরোনো সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়। কেবলমাত্র থাকে সামান্য একটি পেনশন সুবিধা। আগে পাওয়া যেত আবাসনের জন্য ঋণ, সন্তানের শিক্ষার জন্য সাহায্য, চিকিৎসা সুবিধা। এখন সব কিছুই বন্ধ!

সরকার মালিকদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আরও সহজ করে দিচ্ছে। এ থেকেই স্পষ্ট, সরকার কোন পক্ষের হয়ে কাজ করছে। শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও কঠিন করা হয়েছে। এখন কোনও ট্রেড ইউনিয়ন সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবে না। সেটা করতে হবে কেবলমাত্র ‘ইনস্পেক্টর-কাম-ফ্যাসিলিটেটর’-এর মাধ্যমে। এর ফলে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে। শ্রমিকদের পাওনা আদায় আরও কঠিন হবে। 

শ্রমজীবী মহিলারা যেখানে নিছকই ‘অদক্ষ সহায়ক’: 

নির্মাণশিল্পে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত মহিলা শ্রমিকরা। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার। মহিলা নির্মাণ শ্রমিকদের সিংহভাগ যুক্ত থাকেন অদক্ষ শ্রমে। ইঁট, বালি, সিমেন্ট বয়ে নিয়ে যাওয়া, পাথর ভাঙ্গা, মাটি কাটা, বালি-সিমেন্ট-স্টোনচিপস মিক্সিং-এর মতো কাজ তাঁদেরকে দিয়েই করানো হয়। এক একজন মহিলা শ্রমিক দিনে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার কেজির বেশি মাল বওয়ার কাজ করেন, অথবা ২০ হাজার কেজি মাটি কাটেন, কিংবা ১৩ কিলোমিটার হাঁটতে বাধ্য থাকেন (স্টেটাস অব ফিমেল ওয়ার্কার্স ইন কনস্ট্রাকশান ইন্ডাস্ট্রি ইন ইন্ডিয়া: এ রিভিউ, আইওএসআর জার্নাল অব হিউম্যানিটিস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স, এপ্রিল, ২০১৩)!

এহেন অমানবিক কায়িক শ্রমের পরেও নির্মাণ শিল্পে তাঁদের তকমা জোটে ‘অদক্ষ সহায়কের’!

পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় তাঁদের মজুরি অনেক কম। সিংহভাগ ঠিকাদারই মহিলা শ্রমিকদের কাজকে ‘কাজ’ বলে মানেন না। শুধুমাত্র তাঁদের স্বামীকে, একই সাইটে কাজ করা পুরুষ শ্রমিককে মজুরি দেন। ধরেই নেওয়া হয়, স্বামীর ‘স্ত্রী’ হিসেবে মহিলাদের কাজই হলো তাকে ‘সাহায্য’ করা। তাঁর কাজটা কোনও ‘কাজ’ না! নিছকই ‘সাহায্য করা’! এতে আবার মজুরি কীসের! এক ভয়ঙ্কর পিতৃতান্ত্রিক শোষণের শিকার হন তাঁরা। Primus Partners ও World Trade Centre-এর রিপোর্ট বলছে: ভারতে মহিলা নির্মাণ শ্রমিকরা তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ কম মজুরি পান। প্রতি ঘণ্টায় একজন মহিলা শ্রমিকের গড় মজুরি ২৬ টাকা ১৫ পয়সা। বিপরীতে একজন পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক গড় আয় ৩৯ টাকা ৯৫ পয়সা।

সেইসঙ্গেই রোজকার যৌন হয়রানির শিকার হন মহিলা শ্রমিকরা। কাজের অনিশ্চয়তা, সংসারের অভাব, মরদের একার রোজগারে সংসার চলার মত ‘দুর্বলতার’ সুযোগ নেয় ঠিকাদাররা। ঠিকাদারদের ‘খুশি রাখতে হবে’ তবেই মিলবে কাজ, দেশের প্রায় প্রতিটি নির্মাণ সাইটে এখন এটাই দস্তুর। কাজের জন্য ‘নাকা’, চৌমাথায় অপেক্ষায় থাকা কোলে শিশু নিয়ে মহিলা শ্রমিকরা যৌনপ্রস্তাবের সম্মুখীন হন সরাসরি! মুক্তি নেই কাজের জায়গাতেও। আব্রু রক্ষা হতে পারে টয়লেটের এই সুবিধাটুকুও নেই। ফলে প্রয়োজনে খুঁজতে হয় ঝোপঝাড়ের আড়াল। একটু বয়স হয়ে গেলে কাজ মেলাই দুষ্কর।

নির্মাণ শিল্পে বাড়তে থাকা অটোমেশন কাজ ক্রমশ ছিনিয়ে নিচ্ছে অদক্ষ মহিলা শ্রমিকদের। কমছে কাজের দিন। মাসে ১৫ দিন কাজ পাওয়াই এখন প্রায় অসম লড়াইয়ের সামিল। পাল্লা দিয়ে কোপ পড়ছে আয়ে।

অধিকাংশ মহিলা নির্মাণ শ্রমিকই প্রজনন বয়সে যোগ দেন কাজে। কিন্তু মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই। যদিও তা লেখা আছে আইনে। বাধ্য হয়ে মহিলা শ্রমিকরা গর্ভাবস্থার শেষ সময় পর্যন্ত কাজ করেন। বাচ্চা জন্মের ক’দিন পরেই ফের কাজে ফিরতে বাধ্য হন। হাড়ভাঙা খাটুনি, হাজারো কেজির মাল বওয়ার কাজ মহিলা শ্রমিকদের শরীরে প্রভাব পড়ছে। অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভপাত, প্রসব সমস্যা-সহ নানা যৌন রোগেরও শিকার হচ্ছেন তাঁরা। বাড়ছে সদ্যজাত শিশু মৃত্যুর হার। বহু মহিলা শ্রমিকরাই কোলের শিশুকেও কাজের জায়গায় আনতে বাধ্য হন। বাড়িতে কেউ দেখার থাকে না বলে। সাইটে না আছে ক্রেশ, না আছে নূন্যতম সন্তান লালন পালনের ব্যবস্থা। ধুলো বালি, শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বড় হয় বাচ্চা। মা ব্যস্ত থাকে মাল বওয়া বা সিমেন্ট মাখার কাজে। বদলাতে থাকে ঠিকাদার। বদলায় কাজের সাইট। অ আ ক খ-র দুনিয়া থেকে ক্রমশ সরে যেতে থাকে বাচ্চারা। তারাও নেমে পড়ে মায়ের সঙ্গে। শিশুশ্রমিক বনে যায় তারা বিলকুল দশ বছরেই!

দুর্ঘটনা এখানে বারোমাস। মৃত্যুও চেনা শব্দ। কখনও হাইডেল পাওয়ার-এর টানেল নির্মাণে, কখনও উঁচু সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে। জোটে না সুরক্ষা সরঞ্জাম। মহিলা শ্রমিকরা স্ক্যাফোল্ডে ভারী বোঝা নিয়ে ওঠেন, যেখান থেকে পড়ে গিয়ে প্রায়ই গুরুতর আঘাত পান। সাইটে নেই প্রাথমিক চিকিৎসা। নেই সুরক্ষা প্রশিক্ষণ। এমনকি চিকিৎসার খরচ দিতেও অনীহা রক্তচোষা ঠিকাদারদের। কোনও ট্রেড ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে মৃত্যুকালীন ক্ষতিপূরণ থেকেও বঞ্চিত হন শ্রমিকরা। কিছু টাকা হাতে গুঁজে সান্ত্বনা ছাড়া কিছুই জোটে না অনেক ক্ষেত্রেই।

অথচ, শ্রমিকদের সুরক্ষায় গালভরা গাদাগুচ্ছের আইন আছে। BOCW Act, Contract Labour Act, Interstate Migrant Workmen Act, Maternity Benefit Act, Minimum Wages Act, Payment of Wages Act, Equal Remuneration Act, Sexual Harassment Act ইত্যাদি ইত্যাদি। এই একটি আইনও মালিকশ্রেণির দয়ার দান নয়। শ্রমিকশ্রেণির বহু দিনের আন্দোলনের ফসল। কিন্তু বাস্তবে আইনগুলির প্রয়োগ ছিটেফোঁটা নেই বললেও চলে। যেমন BOCW Act অনুযায়ী, যেখানে ৫০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে শিশুদের জন্য ক্রেশ, পানীয় জল, শৌচাগার, ফার্স্ট এড, নির্দিষ্ট সময়ের কাজ বাধ্যতামূলক। রাজ্য নির্মাণ কল্যাণ বোর্ডকে বাধ্য করা হয় দুর্ঘটনা সহায়তা, পেনশন, ঋণ, চিকিৎসা, বীমা, শিক্ষায় সহায়তা দিতে। Sexual Harassment Act অনুসারে অভ্যন্তরীণ বা স্থানীয় অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। Interstate Migrant Workmen Act অনুয়ী রেজিস্ট্রেশন, যাতায়াতের খরচ, থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্য মজুরি ও শৌচাগার, জলের মতো মৌলিক সুযোগও আইনে আছে।

নির্মম বাস্তব হলো এই আইনগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রযোজ্য নয়। অধিকাংশ সাইটেই এই আইন মানা হয় না। মালিকরা নির্বিঘ্নে আইন ভাঙে, কারণ জানে, কেউ বাধা দেবে না। Equal Remuneration, Maternity Benefit, Minimum Wage– এসব আইনের একটিও বাস্তবে মানা হয় না।                        

শ্রমিকরা অধিকাংশই অসংগঠিত, এমনকি যাঁরা সংগঠিত তাঁরাও নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন। ফলে তাঁরাও আইন প্রয়োগের দাবিও করতে পারেন না। শ্রমদপ্তরের বহু কর্মচারী মালিকদের সঙ্গে মিলে হাত মিলিয়ে কাজ করেন। নয়া উদারবাদ শ্রম আইন প্রয়োগের পুরো কাঠামোটাই ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সমাধান একটিই। জোট বাঁধা। ইউনিয়নের নেতৃত্বে দীর্ঘস্থায়ী দাবি আদায়ের সংগ্রাম। এ পথে অন্য কোনও শর্ট কার্ট নেই। জঙ্গি আন্দোলন ছাড়া। ধর্মঘট ছাড়া দাবি আদায় করা যাবে না। তথাকথিত ‘সুরক্ষা আইন’ ততক্ষণ কার্যকর হবে না, যতক্ষণ না শ্রমিকরা গড়ে তুলছেন কার্যকরী প্রত্যাঘাত।

অতএব  প্রতিবাদে দাবি আদায়ের লড়াইয়ে ৯ জুলাই বাকিদের সঙ্গে তাই শামিল হবেন নির্মাণ শ্রমিকরাও।

৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘট এই চলমান আন্দোলনেরই গুরুত্বপুর্ণ অংশ। নির্মাণ শ্রমিকরা অন্যান্য শিল্প শ্রমিকদের সঙ্গে সামিল হবেন ধর্মঘটে। রাস্তার ব্যারিকেড থেকে সাইটে সাইটে পিকেট লাইন। রেল রোকো থেকে রাস্তা রোকো। ধর্মঘটের দিন থাকবেন নির্মাণ শ্রমিকরা। ছেনি হাতুড়ি গাইতি নিয়ে। পুলিশি বাধা, ঠিকাদারের ফতোয়া, মালিকদের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে নির্মাণ শ্রমিকরাও সফল করে তুলবেন এই ধর্মঘট।

এক ক্লিকেই যুক্ত হন মার্কসবাদী পথের সঙ্গে


প্রকাশের তারিখ: ০৬-জুলাই-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org