বর্তমান ভারত: বিদ্যাসাগরের প্রাসঙ্গিকতা (২)

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
এবার যে-ঘটনার কথা বলব সেটির তাৎপর্য আরও বেশি। বিপ্লবী দলের পক্ষ থেকে মেদিনীপুর গেছেন তরুণ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। সেখানে দেখা হল এক স্কুলের অতিবৃদ্ধ পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে। তাঁকে যখন ভূপেন্দ্রনাথ বিপ্লবী দলের কর্মসূচির কথা বললেন, আঁতকে উঠে সেই বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, ‘কবে হবে, কোথায় হবে?’ ভূপেন্দ্রনাথ উত্তর দেন, ‘হবে কি মহাশয়!’

পর্ব- ২

জীবনীকাররা বিদ্যাসাগর সম্পর্কে যেসব গল্পকথা ছড়িয়েছেন তার অনেককটিই পরে ভুল বলে প্রমাণ হয়েছে। যেমন, তিনি নাকি শৈশবে রাস্তার ধারে গ্যাসের আলোয় পড়তেন, কারণ প্রদীপের তেল কেনার সামর্থ্যও ঠাকুরদাসের ছিল না; মায়ের আদেশ রাখতে দামোদরের বান অগ্রাহ্য করে সাঁতরে বীরসিংহ গিয়েছিলেন, ইত্যাদি। এসব গল্পকথা কী করে চালু হল তা বলা শক্ত। তবে লোকে যে কেন এসব গল্প অনায়াসে বিশ্বাস করেন তা সহজেই বোঝা যায়। বিদ্যাসাগর তো সত্যিই গরিব ঘরের ছেলে, মা-কেও শ্রদ্ধা করতেন খুব। অর্থাৎ যাঁরা এই গল্পগুলো রটান আর যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা কেউই বদ-মতলবি নন, বিদ্যাসাগরের শত্রুপক্ষও নন। বরং একটু বাড়াবাড়ি রকমের শ্রদ্ধা দেখাতেই তাঁরা এমন কাণ্ড করেন। আর তার ফলে বিদ্যাসাগরের অন্যান্য কীর্তি চাপা পড়ে যায়, তিনি হয়ে ওঠেন, অমলেন্দু চক্রবর্তীর মোক্ষম বর্ণনায়, ‘মাতৃভক্ত সাঁতারু’।১১ 

কিন্তু আর একটি গল্প কী করে চালু হল তা জানতে ইচ্ছে হয়। একটা গল্প চালু আছে— সুমিত সরকারের মতো ঐতিহাসিকও বিনা বিচারে সেটি মেনেও নিয়েছেন— যে, বিদ্যাসাগর নাকি শেষজীবনে কার্মাটাড়েই থাকতেন, সেখানকার সাঁওতালরাই ছিলেন তাঁর একমাত্র সঙ্গী।১২ এর থেকে এমন সিদ্ধান্তও করা হয়েছে: ঘরে-বাইরে আঘাতে আঘাতে তিনি নাকি মানুষ সম্পর্কেই অনাস্থাবাদী বা সিনিক হয়ে ওঠেন; মানববিদ্বেষী, মিস্‌অ্যানথ্রোপ বললেও ভুল হয় না।১৩ 

গল্পটা যাঁরাই চালু করে থাকুন, তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। বিদ্যাসাগর কখনোই স্থায়ীভাবে কলকাতা ছেড়ে যাননি; ছুটিছাটার সময়ে, বিশেষ করে পুজোর ছুটি বা টানা ছুটির পর্বে তিনি কার্মাটাড় চলে যেতেন। অথবা স্বাস্থ্য উদ্ধারের আশায় থাকতেন চন্দননগর বা অন্য কোথাও। জীবনের শেষ ক’বছরেও তিনি কলেজের কাজকর্ম দেখেছেন ভাঙা স্বাস্থ্য নিয়েও, পাল্কি করে এসেছেন বাদুড়বাগান থেকে শঙ্কর ঘোষ লেনে। সব তথ্য যাচাই করেই বলা যায়: কার্মাটাঁড়ে পাকাপাকি থাকা বা মানববিদ্বেষী হয়ে ওঠার গল্পটি পুরোপুরি বানানো।১৪ নিজের স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের অবসরের পরে তাঁদের জন্যে কোনো আর্থিক ব্যবস্থা কবে যেতে পারলেন না— মৃত্যুশয্যায় এই ছিল তাঁর প্রধান দুঃখ।১৫ রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছিলেন: 

বিদ্যাসাগর তাঁহার জীবনের অবশিষ্টকাল এই স্কুল ও কলেজটিকে একাগ্রচিত্তে প্রাণাধিক যত্নে পালন করিয়া, দীনদরিদ্র রোগীর সেবা করিয়া, অকৃতজ্ঞদিগকে মার্জনা করিয়া, বন্ধুবান্ধবদিগকে অপরিমেয় স্নেহে অভিষিক্ত করিয়া, আপন পুষ্পকোমল এবং বজ্রকঠিন বক্ষে দুঃসহ বেদনাশল্য বহন করিয়া, আপন আত্মনির্ভরপর উন্নত বলিষ্ঠ চরিত্রের মহান আদর্শ বাঙালি জাতির মনে চিরাঙ্কিত করিয়া দিয়া ১২৯৮ সালের ১৩ই শ্রাবণ রাত্রে ইহলোক হইতে অপসৃত হইয়া গেলেন।১৬ 

মনীষীদের সম্পর্কে গালগল্প চালু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিদ্যাসাগর সম্পর্কে যেসব গালগল্প চালু হয়েছে সেগুলো তাঁর মহিমা বাড়ায় না, বরং তাঁর মহত্ত্বকে খর্ব করে, তাঁর কীর্তির প্রসারকে সঙ্কুচিত করে। তার ফলে চোখের আড়ালে চলে যায় তাঁর জ্ঞান ও কর্মর বিশাল জগৎ। আসলে বিদ্যাসাগরের মতো বিচিত্র পুরুষ শুধু বাঙলায় নয়, যে-কোনো দেশেই দুর্লভ। পরিবেশ তাঁকে সামান্যই সাহায্য করেছিল। নিজের অজেয় পৌরুষ দিয়ে তিনি বরং প্রভাবিত করেছিলেন তাঁর পরিবেশকে, অনেকখানি পাল্টেও ছিলেন শিক্ষা ও সমাজের হাল। ধর্মে কোনো মতি ছিল না তাঁর, শিক্ষানীতি ছিল আদ্যোপান্ত অ-ধর্মীয়, সেকিউলার।১৭ তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ভাবেই কোনো ধর্মীয় ছোপ তিনি লাগতে দেননি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষক ও ছাত্র এখানে পড়িয়েছেন ও পড়েছেন। 

কিন্তু, কী আশ্চর্য এই দেশ, কী অদ্ভুত এ-দেশের শিক্ষিত সমাজ, কী অশালীন এখানকার গবেষককুল! ধর্মগুরু না-হয়েও যিনি আপামর জনসাধারণের কাছে অকুণ্ঠ সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র, তাঁকে নিজেদের মাপে ছেঁটে কেটে দুর্বল, ভীরু, আপসপন্থী, স্থিতাবস্থার পরিপোষক ইত্যাদি বিকৃতরূপে হাজির করার কত অপচেষ্টাই হয়েছে ও হচ্ছে। একটা কুটো ভেঙে দুটো করার মুরোদ যাদের নেই তারাও দেখি বিদ্যাসাগরের খুঁত ধরে অপার আনন্দ পায় । 

আপাতত আমি একটা প্রশ্ন তুলতে চাই। সেটি হল: বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পরে, গত ১১৪ বছরে কিছু লোকের এত আপত্তি সত্ত্বেও, বিদ্যাসাগরের ভাবমূর্তি একটুও চোট খায়নি কেন? মূর্তিভাঙার দল তাঁদের অপকর্মর ভুল বুঝেছেন; সকলে না-হোক অনেকেই! এই মুহূর্তে অন্তত কেউ আর রাতের অন্ধকারে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙছেন না! [এ-প্রবন্ধ যখন লেখা হয় এবং পুনর্মুদ্রিত হয় তখনও ২০১৯ সালে বিদ্যাসাগর কলেজে-ই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনাটি ঘটেনি।– মার্কসবাদী পথ] কালাপাহাড় সেজে কোনো লাভই হয় না, বরং সাধারণ মানুষের থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হতে হয় এই বোধটা দেরিতে হলেও, এসেছে (যদিও ভবিষ্যতে আবার কোনো মাথাগরম দল যে ঐ একই কাণ্ড করবে না তা নিশ্চিত বলা যায় না)। 

প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে আরও দু-একটি কথা বলে নিই। ধরুন, শিবরাম চক্রবর্তী। তিনি যে গোপাল বর্গর ছেলে ছিলেন না— এ তো সকলেই জানেন। ইশকুলের লেখাপড়ায় তাঁর মন ছিল না। গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিলেন কলকাতায়। তার জন্যেই আমরা একটি চমৎকার কিশোর উপন্যাস (বাড়ি থেকে পালিয়ে) আর তার অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র (পরিচালক: ঋত্বিককুমার ঘটক) পেয়েছি। তাঁর গল্প-উপন্যাসে গোপালদের প্রতি কোনো পক্ষপাত দেখা যায় না— এই সুবাদে একটা সার্টিফিকেটও তিনি পেয়েছেন।১৮ তবু সেই শিবরাম বলতেন, তাঁর জীবনের আদর্শ তিনজন বিদ্যাসাগর, দেশবন্ধু আর মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ।১৯ এর ব্যাখ্যা কী? 

আমাদের দেশে রাজনীতির চর্চা শুরু হয়েছিল সমাজসংস্কারকদের এড়িয়ে গিয়ে। এদেশের রাজভক্ত ও নরমপন্থী কংগ্রেস নেতারা মনে করতেন: আগে চাই সমাজসংস্কার, পরে স্বাধীনতা। অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে তরুণ বিপ্লবীরা কিন্তু চাইলেন: আগে স্বাধীনতা, পরে সমাজসংস্কার। শেষ পর্যন্ত রাজনীতির দাবিই জিতল, সমাজসংস্কার পড়ল পেছিয়ে।২০ 

এর থেকে মনে হতে পারে: বিদ্যাসাগরই তো সমাজসংস্কারের প্রধান উদ্যোগী (রামমোহন অবশ্যই তার অগ্রদূত)। সুতরাং বিপ্লবীদের কাছে বিদ্যাসাগরের অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়ার কথা। বাস্তবে কিন্তু তেমন হয়নি। ১৮৯৩ সালেই অরবিন্দ ঘোষ (পরে শ্রীঅরবিন্দ) বুঝেছিলেন : বিদেশি শাসনের আওতায়, বিজাতীয় শিক্ষার আবহে বাঙলা ভাষাকে নতুন যুগের উপযোগী করে গড়ে তোলাই একটি রাজনৈতিক কাজ। বঙ্কিমকেই তিনি সবচেয়ে বড় কৃতিত্বর ভাগী করেছেন, কিন্তু তার জন্যে ভুলে যাননি বিদ্যাসাগর আর অক্ষয়কুমার দত্তকে।২১ 

তেমনি স্বদেশি যুগে কার্জন-শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে লিখতে বসে (বন্দে মাতরম্, ৮.৫.১৯০৭) অরবিন্দ স্মরণ করেছিলেন বিদ্যাসাগরের পৌরুষকে, সরকারি ঘুষ যিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন ঘৃণাভরে।২২ সরকারি সাহায্য ছাড়াই বিদ্যাসাগর গড়ে তুলেছিলেন তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রমাণ করেছিলেন তাঁর ক্ষমতা— কার্যত এটিই তো বয়কটের পূর্বদৃষ্টান্ত। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের এই কীর্তির রাজনৈতিক তাৎপর্য অরবিন্দও বুঝতেন। 

এবার যে-ঘটনার কথা বলব সেটির তাৎপর্য আরও বেশি। বিপ্লবী দলের পক্ষ থেকে মেদিনীপুর গেছেন তরুণ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। সেখানে দেখা হল এক স্কুলের অতিবৃদ্ধ পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে। তাঁকে যখন ভূপেন্দ্রনাথ বিপ্লবী দলের কর্মসূচির কথা বললেন, আঁতকে উঠে সেই বৃদ্ধ জানতে চাইলেন, ‘কবে হবে, কোথায় হবে?’ ভূপেন্দ্রনাথ উত্তর দেন, ‘হবে কি মহাশয়!’২৩ 

এই আঁতকে ওঠার ব্যাপারটা ভয়ের নয়, উত্তেজনার। এই পণ্ডিতের কাছেই ভূপেন্দ্রনাথ জানতে পারেন, বিদ্যাসাগর তাঁর বন্ধুদের কাছে বলতেন, ‘তোমাদের আর উপায় নাই, জঙ্গলে গিয়া পল্টন তৈয়ার কর।’ জ্ঞানেন্দ্রনাথ জানান: বিদ্যাসাগর ‘সময়ে সময়ে এত গরমভাবে কথা বলিতেন যে, বন্ধুরা তাঁহার ঘরের কপাট বন্ধ করিয়া দিতেন।’ জ্ঞানেন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই ভূপেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন: ‘এই মানসিক প্রস্তুতি দ্বারাই এই অতি বৃদ্ধ পণ্ডিত আমাদের কৰ্ম্মে সহানুভূতিশীল হইয়াছিলেন৷ তিনি পরে আমাদের সঙ্গে নির্ভয়ে মেলামেশা করিতে থাকেন।’ 

দেখা যাচ্ছে, বিদ্যাসাগরকে তরুণ বিপ্লবীরা শত্রু বলে ভাবেন নি, এমনকি বিদ্যাসাগরকে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী বলেও বাতিল করেন নি।২৪ বরং রামমোহন, ইয়ং বেঙ্গল, বিদ্যাসাগর কাউকে বাদ দিয়েই বাঙলার বিপ্লববাদকে বোঝা যাবে না— এই ছিল ভূপেন্দ্রনাথের সিদ্ধান্ত।২৫ 

এই যে কথাগুলি বললুম এর কোনোটাই নতুন নয়। ভূপেন্দ্রনাথের ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম (অপ্রকাশিত রাজনীতিক ইতিহাস-এর প্রথম খণ্ড) বেরিয়েছিল ১৯৪৯-এ। বন্দে মাতরম্ পত্রিকার ফাইল কোনোদিনই দুষ্প্রাপ্য ছিল না। অরবিন্দ জন্মশতবর্ষে তাঁর রচনাবলির প্রথম খণ্ডে ঐ পত্রিকায় প্রকাশিত অরবিন্দর লেখাগুলি সংকলিত হয়েছিল (১৯৭১)। ১৯৭৩-এ বন্দে মাতরম্ নাম দিয়ে আলাদা বই হয়ে সেটি বেরয়। তবু বিদ্যাসাগর-গবেষকরা এই উৎস দুটির উল্লেখ পর্যন্ত করেন নি। এর কারণ নিশ্চয়ই অজ্ঞতা নয়।২৬ আসলে বিদ্যাসাগরকে যে-মূর্তিতে তাঁরা হাজির করতে চান, সেই মূর্তির সঙ্গে অরবিন্দ বা ভূপেন্দ্রনাথের মত ও অভিজ্ঞতা মেলে না— এই কারণেই তাঁরা সযত্নে বিষয়গুলি এড়িয়ে গেছেন। 

বিদ্যাসাগর যে কী মাপের মানুষ ছিলেন, তাঁর কাজের প্রভাব কতদূর অবধি পৌঁছেছিল— তা বোঝার সাধ্য সকলের থাকে না। বিদ্যাসাগর বিষয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাটি শেষ হয়েছিল এক আশ্চর্য চরণ দিয়ে: ‘যেহেতু ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন না ঈশ্বর বাস্তবিক।’২৭ হ্যাঁ, ঈশ্বরচন্দ্র ঈশ্বর ছিলেন না, মানুষই ছিলেন। অন্য দশজনের মতো তাঁরও কিছু দুর্বলতা, ক্ষমতার সীমা ইত্যাদি ছিল।২৮ কিন্তু তার চেয়েও অনেক বড়ো কথা— তিনি ছিলেন কাজের লোক। যা কিছু গড়তেন তাকেই নিখুঁত করার চেষ্টা চালাতেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। সংস্করণের পর সংস্করণ প্রতিটি বইয়ের মেরামতি চলত।২৯ একইভাবে তিনি নিখুঁত করতে চেয়েছিলেন তাঁর গড়া মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনকে। 

কিন্তু মানুষের কোনো কাজই পুরোপুরি নিখুঁত হয় না, বিদ্যাসাগরের কাজেরও হয়নি। তবু নিজের দেশকালের সীমা ছাড়িয়ে, গুরু না-হয়েও, তিনি হয়ে উঠেছেন এক একক প্রতিষ্ঠান। তাঁর কীর্তিগুলি এখনও ছড়িয়ে আছে বাঙলার নানা প্রান্তে। বিদূষক ও দূষকদের অক্লান্ত চেষ্টায় তাঁকে সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু একটু কষ্ট করলেই বোঝা যায়; কোনো গণ্ডিতেই তাঁকে আটকে রাখা যায় না। তাঁর কীর্তির পরিমাণ ও গুণ এতই বিচিত্র যে অন্ধর হাতি দেখার মতো ছোটো মাপের লোকরা তাঁকে নিতান্তই টুকরো টুকরো করে দেখতে ও দেখাতে চান। রাজনীতির লোক না-হয়েও তিনি তাই পুরোধা রাজনীতিক, স্কুলের প্রথম পাঠ্য বই লিখেও দেশবিদেশের নানা সংস্থার (গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড-এর রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটি, জার্মান প্রাচ্যবিদ্যা সমিতি) সম্মানের পাত্র। বিদ্বান্ চিনতে আলব্রেশ্‌ট্‌ ভেবের, এইচ. ব্রোকহাউস প্রমুখের ভুল হয়নি।৩০ 

‘প্রাসঙ্গিকতা’ শব্দটি বহু ব্যবহারে মলিন হয়ে গেছে। সর্বদা তার অর্থ সকলের কাছে স্পষ্ট নয়। এমনকি প্রাসঙ্গিকতা বলতে সকলেই হয়তো এক ব্যাপার বোঝেন না। শব্দটি দিয়ে আমি বুঝি: যে-যুগে, যে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদ্যাসাগর কিছু বলেছিলেন ও করেছিলেন, সেই যুগ ও পরিস্থিতি বদলে গেলেও সেই কথা ও কাজের মূল্য হারিয়ে না-যাওয়া। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর ১২০ বছর পার হয়ে গেছে। কালের নিয়মে তাঁর অনেক কীর্তি ঐতিহাসিক মর্যাদা পেয়েছে, কিন্তু পরবর্তী যুগে আর প্রাসঙ্গিক থাকেনি। যে-বর্ণপরিচয় দিয়ে গ্রাম-শহরের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের লেখাপড়া শুরু হত, কালের নিয়মে তার বদলে অন্য বই এসেছে। কিন্তু যে-আধুনিক শিক্ষার আদর্শ নিয়ে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের পাঠক্রম সংস্কার করেছিলেন, ছাত্রদের টেনে এনেছিলেন মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন-এ, খুলে দিয়েছিলেন জনশিক্ষার পথ, তার প্রাসঙ্গিকতা নিকট ভবিষ্যতেও হারাবে না। আজকের ভারতে ভুবনীকরণের নামে যেভাবে জাতীয় চরিত্রর সর্বনাশ করা হচ্ছে, ‘সাহেবানুজীবী’৩১ হওয়াকেই ধরে নেওয়া হচ্ছে বাঙলা তথা ভারতের নিয়তি, জাতীয় সম্ভ্রমবোধ আর আত্মসম্মান বিকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা পাকা করছে নানা রঙের রাজনৈতিক দল, সেখানে বিদ্যাসাগরের উন্নত পৌরুষ আর দৃঢ়তা বাতিঘরের মতো অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলতে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আজ এই মুহূর্তে তিনি যত প্রাসঙ্গিক, আর কখনও তিনি এত প্রাসঙ্গিক ছিলেন না। 


টীকা 
১২. সুমিত সরকার, আধুনিক ভারত ১৮৮৫-১৯৪৭, কে.পি. বাগচী, ১৯৯৩, পৃ. ৭০ । 
১৩. প্রমথনাথ বিশী, ইন্দ্রমিত্র-র করুণাসাগর বিদ্যাসাগর-এর সমালোচনা, আনন্দবাজার পত্রিকা ১৯ এপ্রিল ১৯৭০, টী. ৪, পৃ. ৭৭০-৭২-এ উদ্ধৃত। 
১৪. সন্তোষকুমার অধিকারী, বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ দিনগুলি, অনন্য প্রকাশন, ১৯৮৫, পৃ. ১০৯; ইন্দ্রমিত্র (টী. ৪), পৃ. ৪২৫-২৬।  বিদ্যাসাগরের চন্দননগর বাস সম্পর্কে যোগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় যে-স্মৃতিকথা লিখে গেছেন সেটি পড়ে একবারও সন্দেহ হয় না যে, বিদ্যাসাগর মানববিদ্বেষী হয়ে পড়েছিলেন। বরং তার উলটোটাই মনে হয়। ‘স্মৃতিতে সেকাল’, ঐতিহাসিক, বর্ষ ৭, সংখ্যা ১/২, পুনর্মুদ্রণ ২০০১, পৃ. ২-১৫ দ্র.। বিদ্যাসাগর বিষয়ে যোগেন্দ্রকুমারের স্মৃতিকথা প্রথম বেরিয়েছিল ১৩০২ ও তারপর ১৩৪০-এ। 
১৫. ইন্দ্রমিত্র (টী. ৪), পৃ, ৩৭৩, পৃ. ৫৮৩ দ্র. । 
১৬. রবীন্দ্র-রচনাবলী (টী. ১০), পৃ. ১৮১। 
১৭. এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য আমার বাঙালির নতুন আত্মপরিচয়: সমাজসংস্কার থেকে স্বাধীনতা, অবভাস, ২০১০, পৃ. ৩০-৪৪ দ্র.। 
১৮. শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্ব সমাস: উপনিবেশবাদ ও বাংলা শিশু সাহিত্য, প্যাপিরাস, ১৯৯১, পৃ. ২৮১ দ্র.। 
১৯. গল্পমেলা, বার্ষিক সংকলন, ডিসেম্বর, ২০০৩, পৃ. ১২ দ্র. । 
২০. টী. ১৭, পৃ. ৪৫-৫৮ দ্র.। 
২১. শ্রীঅরবিন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি (১৮৯৩), পণ্ডিচেরী: শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম, ১৯৬৪, পৃ. ৩৬-৩৮ । 
২২. শ্রীঅরবিন্দ, বন্দে মাতরম্, শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম, ১৯৭৩, পৃ. ৩২৮। 
২৩. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম, নবভারত পাবলিশার্স, ১৯৮৩, পৃ. ৯৩। পরের সব উদ্ধৃতিই এখান থেকে নেওয়া। 
২৪. এই ভুল করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। টী. ১৭, পৃ. ৩৯-৪০ । 
২৫. টী. ২৩, পৃ. ৬ 
২৬. অবশ্য যথেষ্ট তথ্য না জানার দরুনই কেউ কেউ এমন কথা বলেন যে, ইংরেজ শাসন নিয়ে তাঁর [বিদ্যাসাগরের] কোনো আপত্তি প্রকাশ পায়নি, বা ‘ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যায় অত্যাচার সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানা নেই' [অশোক সেন, কথায় উপকথায় বিদ্যাসাগর, প্যাপিরাস, ১৯৯৮, পৃ.৫২, ৬৩]। 'প্রকাশ' শব্দটি খুবই ঝাপসা আর ‘প্রকাশ্য' ['প্রকাশিত' অর্থে] প্রতিক্রিয়া যদি কেউ লিখে বা বক্তৃতা দিয়ে না-ও জানান, বিষয়গত (অবজেকটিভ) দিক দিয়েও তো সে-প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়ে থাকতে পারে। বাঙলা ভাষাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোরও একটা রাজনৈতিক মাত্রা আছে। ১৯০৫-এ সরকারি ভাষাচ্ছেদ নীতির সময়ে তা বোঝা গিয়েছিল। অরবিন্দ ঘোষ অবশ্য ১৮৯৩-এ বাঙলা ভাষার এই রাজনৈতিক মাত্রাটি ধরতে পেরেছিলেন (টী. ১৭, পৃ. ১০৬ দ্র.)। আধুনিক ও আধুনিকোত্তর লেখকরাই এই বিষয়টিতে আশ্চর্য রকমের অসাড়। 
২৭. সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ‘লাগসই’, ছেলে গেছে বনে; গাঙ্গেয় পত্র, সংকলন ৬, ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮, পৃ. ৫৩-য় পুনর্মুদ্রিত। 
২৮. যেমন, গোপাল হালদার লিখেছেন: 'ত্রুটি তাঁর [বিদ্যাসাগরের] না ছিল তা নয়, একগুঁয়ে, একযোগে কাজ করতে প্রায় অনভ্যস্ত এবং রাজনৈতিক কর্মে সাধারণ অনীহা, সমাজ সংস্কারেও ইংরেজ শাসকবর্গের পথ চেয়ে থাকা—এ সব নিশ্চয়ই তাঁর শক্তিকে খর্ব করেছে—সমগ্রভাবে জাগরণের যুগকেও পুষ্ট করতে পারেনি' (বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ, জিজ্ঞাসা, ১৯৮৬, পৃ. ৩১)। কিন্তু এইটুকু বলেই গোপাল হালদার থামেন নি। ব্যক্তিগত ত্রুটি-বিচ্যুতির ওপরেও যে বিদ্যাসাগরের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল, সেকিউলার ও মানবিক আদর্শের তিনিই মূর্ত রূপ—এই কথাগুলিও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়ে লিখেছিলেন। হালের বিদ্যাসাগর-দূষকরা বিষয়ীগত (সাবজেকটিভ) ব্যাপারে এতই আগ্রহী যে বিষয়নিষ্ঠভাবে বিদ্যাসাগরের গর্যালোচনা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বিদ্যাসাগরের-বিদূষকরা যে কথাগুলো এড়িয়ে যান, দূষকরা সেগুলো নিয়ে নাচানাচি করেন—তফাত বলতে এই। 
২৯. ১৮৭৮-এ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখলেন, কার্মাটাড়ে বসে বিদ্যাসাগর রাত থেকেই কথামালা কি বোধোদয়-এর প্রুফ শোধরাচ্ছেন, বিস্তর কাটকুট হচ্ছে। হরপ্রসাদ বললেন, ‘কথামালা-র প্রুফ আপনি দেখেন কেন, আর রাত জেগেই বা দেখেন কেন?” বিদ্যাসাগর উত্তর দিলেন, 'ভাষাটা এমনি জিনিস, কিছুতেই মন [মানে?] স্পষ্ট হয় না; যেন আর একটা শব্দ পেলে ভালো হতো—তাই সর্বদাই কাটকুট করি।' হরপ্রসাদ ভাবলেন: ‘বাপরে, এই বুড়া বয়সেও ইঁহার বাংলার ইডিয়মের ওপর এত নজর।' 'কার্মাটাড়ে বিদ্যাসাগর', প্রসঙ্গ বিদ্যাসাগর, বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি, ১৯৯১, পৃ. ৩২। 
৩০. এ বিষয়ে অন্যত্র আলোচনা করেছি। এই বই-এর অধ্যায় ১৪ দ্র.। 
৩১. রবীন্দ্র-রচনাবলী (টী. ১০), পৃ. ১৭৯-তে এই তাৎপর্যপূর্ণ শব্দটি পাওয়া যাবে। শুধু চাকরির ক্ষেত্রে নেয়, লেখাপড়ার জগতে এখনও ‘সাহেবানুজীবী’রাই রাজত্ব করছেন। কখনও ‘আধুনিক', কখনও বা ‘আধুনিকোত্তর' ভেক ধরে। 


প্রবন্ধটি বিদ্যাসাগর কলেজ প্রাক্তনী ও বিশ্বকোষ পরিষদ আয়োজিত বিদ্যাসাগর স্মারক বক্তৃতা (১৯.২.২০০৫)-র সংশোধিত পাঠ। এবং বিদ্যাসাগর: নানা প্রসঙ্গ বই থেকে পুনর্মুদ্রিত। কৃতজ্ঞতা স্বীকার— শম্পা ভট্টাচার্য, সিদ্ধার্থ দত্ত।


প্রকাশের তারিখ: ২৭-সেপ্টেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org