|
সমকালে আম্বেদকরের চিন্তাধারার প্রাসঙ্গিকতাবি ভি রাঘভুলু |
কমিউনিস্টরা জাতপ্রথার অবসানের লক্ষ্যকে কখনওই ভুলেও যায়নি বা উপেক্ষাও করেনি। ১৯২৮ সালে কারারুদ্ধ অবস্থায় ভগৎ সিং-এর জাতপ্রথার বিরুদ্ধে ও সমাজতন্ত্র নিয়ে লেখা কোনও অকস্মাৎ ঘটনা নয়। এতে প্রমাণ হয় যে, আমাদের দেশে কেউ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ভাবলে তার পক্ষে জাতপ্রথার অবসানের কথা উপেক্ষা করা সম্ভব না। এ কথা বললে অতিকথন হবে না যে, ফুলে, এবং আম্বেদকর ছাড়া কেবলমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি বাদে আর অন্য কোনো সংগঠন ছিল না, যা জাতপ্রথা, এবং তার নিপীড়নের চেহারার বিরুদ্ধের লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকেছে। বেশিরভাগ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল জাতপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাঁরা যত গ্রামীণ কৃষক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, জাতভিত্তিক বৈষম্যের অবসান ছিল সেগুলির প্রত্যেকটির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। |
আজকের সময়ে এসে ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরের জীবন ও কাজ নিয়ে সকলে কথা বলছেন। আম্বেদকরের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী সম্ভবত আগ্রহের এই আকস্মিক বহিঃপ্রকাশের অন্যতম কারণ। যদিও আম্বেদকরের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির আগ্রহের পিছনে অন্যান্য শক্তপোক্ত রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। আম্বেদকরের কাজ মূলত স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে। তিনি প্রয়াত হন ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। তখনও স্বাধীনতার এক দশকও পেরোয়নি। এমনকী সংবিধান ঘোষণারও পাঁচ বছর হয়নি – যে সংবিধান রচনায় তিনি মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। স্বাধীন ভারতে গত সাত দশকে শাসকদলগুলির নিজ স্বার্থে আম্বেদকরের উত্তরাধিকার সূত্র দাবি করার একাধিক চেষ্টা দেখা গিয়েছে বটে, তবে বর্তমানের মতো উদগ্র চেষ্টা আগে দেখা যায়নি। দলিত, এবং অন্যান্য দুর্বল অংশের হারিয়ে ফেলা সমর্থনকে পুনরুদ্ধারের জন্য কংগ্রেস আম্বেদকরকে আবার আপন করার চেষ্টা করছে। দলিত এবং অন্যান্য দুর্বল অংশের মানুষ কংগ্রেসের পোক্ত ভোট ব্যাঙ্ক ছিল; এই মানুষগুলির স্বার্থবিরোধী নয়া উদারবাদী নীতির সূচনা, ও অনুসরণের ফলে বিভিন্ন রাজ্যে সেই সমর্থন কমতে শুরু করে। এখন, দরিদ্র-বান্ধব মুখোশ পরে থাকার দরকার উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে এবং হারিয়ে ফেলা ভোট ব্যাঙ্ক ফিরে পেতে, দুর্বল অংশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কৌশল হিসাবে কংগ্রেস আম্বেদকরের খ্যাতিকে ফের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। সঙ্ঘ পরিবারও আম্বেদকরের প্রতি নিবিড় আগ্রহ দেখাচ্ছে, কারণ তাদের হিন্দুত্ব প্রকল্পের বাস্তবায়নের পথে ওঁর চিন্তাধারা, এবং ব্যক্তিত্বকে সঙ্ঘ প্রবল বাধা হিসাবে গণ্য করে। এই বাধা অতিক্রম করার জন্য সঙ্ঘ আম্বেদকরের চিন্তাধারাকে বদলে ও বিকৃত করে দখল করার চেষ্টা করছে। চেষ্টা করছে তাঁকে নিজেদের আগ্রাসী মতাদর্শের সমর্থক প্রতিপন্ন করতে। এই কাজে সঙ্ঘ পরিবার দুটি কৌশল অনুসরণ করে – দলিতদের আক্রমণ করা, ও নত হতে বাধ্য করা; এবং আম্বেদকরের সত্তাকে বিকৃত করে দখল করা। বিজেপি-র ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া মাত্র দলিত ও অন্যান্য দুর্বল অংশের মানুষের উপর শারীরিক আক্রমণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আই আই টি মাদ্রাজ-এ আম্বেদকর-পেরিয়ার স্টাডি সার্কেল-এর সংগঠকদের হেনস্থা করার ঘটনা, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা, ‘ভারতীয় সংষ্কৃতি’-র নামে ‘সবর্ণ সংষ্কৃতি’-কে প্রতিষ্ঠা করার যে উদ্দেশ্য বিজেপির রয়েছে, তা প্রকাশ্যে এনে দেয়। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি-র মহিলা মোর্চা-র প্রেসিডেন্ট-এর তরফ থেকে দুর্বল অংশের মানুষের পক্ষে অবমাননাকর যে আপত্তিকর ভাষা শোনা গেছে তা হল এরকমই আরেক উদাহরণ। কবছর আগে আম্বেদকরের ব্যক্তিত্বকে কালিমালিপ্ত করে অরুণ শৌরি যে বই লিখেছিলেন তা আমরা ভুলিনি। সঙ্ঘ পরিবার খুব ভাল করে জানে যে, স্রেফ আক্রমণ করে, আম্বেদকরের চিন্তাধারাকে মুছে দিতে পারবে না। সেজন্যই তাঁর দেওয়া শিক্ষাকে বিকৃত করে, নিজেদের হিন্দুত্ববাদের প্রকল্পকে কায়েম করার জন্য, সঙ্ঘ নিজের কৌশলের দ্বিতীয় অংশ হিসাবে আম্বেদকরকে দখল করার পথটি অনুসরণ করছে। এরা প্রচার করে যে, আম্বেদকর একজন এমন সমাজ সংস্কারক যিনি হিন্দু ধর্মের সংস্কার করে তার উন্নতি সাধনের চেষ্টা করেন এবং ইসলাম ও খৃষ্ট ধর্মকে বাতিল করে, ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তর্গত বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রহণ করেছিলেন। এরা আম্বেদকরকে সঙ্ঘ পরিবারের নেতা ও মতাদর্শবাদীদের ঈশ্বর হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে চলেছে। যদিও সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির এই প্রচেষ্টায় সততার অভাব রয়েছে। আম্বেদকর সারাজীবন যে চিন্তাধারার প্রসার ঘটিয়েছেন তা সম্পূর্ণভাবে হিন্দুত্ববাদী শক্তির ভাবধারার বিরুদ্ধে ছিল। আজীবন তিনি জাতপ্রথার অবসানের জন্য এবং জাতপ্রথাকে তুলে ধরা হিন্দুত্বের মুখোশ খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। আম্বেদকর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, হিন্দুত্ব যতদিন বহাল থাকবে, জাতপ্রথা ও অস্পৃশ্যতাও ততদিন বহাল থাকবে, এবং দলিত মানুষেরা এই নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হলে, তবেই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হবেন। এজন্যই গভীর ভাবনাচিন্তার পর তিনি হিন্দুত্ব ছেড়ে তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। ফলত আম্বেদকরকে হিন্দু ধর্মের সংস্কারক হিসাবে যে প্রচার তা কাউকে সঙ্ঘ পরিবার বিশ্বাস করাতে পারেনি, বিশেষত নিপীড়িত মানুষকে। একেবারে ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া চলে এমন কিছু সংগঠন ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যাঁরা দাবি করেন যে, তাঁরাই হলেন আম্বেদকরের প্রকৃত উত্তররাধিকার। জাতপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ও দলিতদের মুক্তির লড়াইয়ে অগ্রগতির জন্য দলিত এবং অন্যান্য দুর্বল অংশের মানুষের ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা’-র স্লোগান এঁদের মধ্যে কিছুজনকে দোটানায় ফেলে দিয়েছিল। এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে কিছু সংগঠন ও বুদ্ধিজীবী সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্নে হতাশ হয়ে নিজেদের শাসকদলের দ্বারা ব্যবহৃত হতে দেয়। এঁরা এমন এক ধারণা তৈরির চেষ্টা করেন যে, এই দলিত মানুষদের মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষই বাকি সকলের উন্নতিকল্পে নেতৃত্ব দেবে। তবে দলিতদের সামনে সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে এই সব ভ্রম ভঙ্গ হচ্ছে। ফলে ধনতন্ত্র ইচ্ছাকৃত দুর্বল অংশের মধ্যে থেকে কিছু মানুষকে সমাজের উঁচু অংশে ঠেলে দিচ্ছে, যাতে সমাজ-কাঠামোর স্থিতি বজায় থাকে। এই মুষ্টিমেয় মানুষকে শাসকের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে বাসনা ধনতন্ত্রের রয়েছে, তার বাস্তব রূপ হল ‘ক্ষমতায় ভাগিদারী’-র মতো স্লোগান। বহু আগে মার্কস এই প্রসঙ্গে লিখেছেন: ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা সমাজে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যক্তি পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আরেক অনাকাঙ্ক্ষিত বাহিনীকে নিয়ে আসে, যা কিনা পুঁজির বিধি-রীতিকেই ইন্ধন জোগায়, বুনিয়াদকে প্রশস্ত করে, এবং সমাজের নিচুতলা থেকে নতুন নতুন শক্তিকে নিযুক্ত করে… ক্ষমতাধর শ্রেণি, যত বেশি অবদমিত শ্রেণি থেকে মানুষকে নিজের দিকে টেনে নেয়, তত বেশি পোক্ত ও বিপজ্জনক হবে এর বিধি-রীতি। (ক্যাপিটাল, ভলিউম ৩, পৃষ্ঠা ৭৩৫ থেকে ৭৩৬) দলিত বুদ্ধিজীবীদের আরেকটি অংশ নয়া উদারবাদী নীতির প্রতি আক্রমণাত্মক। যাকে আম্বেদকর 'অনুগ্রহ' বলেছিলেন, সেই সংরক্ষণের ব্যর্থতা ও হ্রাসমান উপযোগিতাকে এঁরা নিরীক্ষা করার ক্ষেত্রে বলেন যে নয়া উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে না লড়ে সংরক্ষণকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, ও ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী সংস্কৃতিকে সামনে তুলে ধরে জাতপ্রথা সংক্রান্ত শোষণ, ও বৈষম্যের প্রসঙ্গটিকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে প্রচেষ্টা হিন্দুত্ববাদী শক্তির রয়েছে, তার বিরুদ্ধেও এঁরা আক্রমণাত্মক। দলিত বুদ্ধিজীবীরা দলিত আন্দোলনে বিদ্যমান হতাশাকে চূর্ণ করে ততক্ষণ এগোতে পারবে না, যতক্ষণ এই শক্তিগুলি নয়া উদারবাদী নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, এবং সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াকে সামনে তুলে ধরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করা আম্বেদকরের যে নির্দিষ্ট চিন্তাধারা রয়েছে, সেগুলিকে চিহ্নিত করতে পারছে। দলিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশ তাদের মার্কসবাদ বিরোধিতা ত্যাগ দিতে পারেননি, এবং শোষিতদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম চালানো, আন্দোলন, ও শক্তিগুলির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী থেকেছে। এদের মধ্যে বহু মানুষ প্রচলিত জাতভিত্তিক বৈষম্য, এবং ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার গভীর যোগসূত্রটিকে উপলব্ধি করেননি। যতদিন না তাদের এই উপলব্ধি হচ্ছে, ততদিন শাসকের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আম্বেদকরের ভাবধারাকে বিকৃত করার কাজে, এবং ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম রাখতে শাসককে তারা সাহায্য করতে থাকবে। আম্বেদকরের উপর আস্থা রাখা সমস্ত দলিত সংগঠনের, এবং বুদ্ধিজীবীদের, হাত ধরা উচিত তাদের, যারা আম্বেদকরের ভাবধারাকে তুলে ধরতে, এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত। কমিউনিস্টরা আম্বেদকরের ভাবধারায় আগের চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিজেপি, এবং কংগ্রেসের অবস্থানের সম্পূর্ণ পৃথক অবস্থানে দাঁড়িয়ে কমিউনিস্টরা দলিত ও দুর্বল অংশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে আম্বেদকরের ভাবধারার ক্রান্তিকারী দিকটিকে সংরক্ষণ করতে, ও এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। স্বাভাবিকভাবেই, এই অবস্থান কিছু অর্থবহ, একই সঙ্গে কিছু অসংগত সমালোচনার উত্থাপন করে। বহু বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী মানুষ জাতপ্রথার অবসানের জন্য কমিউনিস্টদের সংগ্রামের নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কমিউনিস্টরা জাতপ্রথার অবসানের লক্ষ্যকে কখনওই ভুলেও যায়নি বা উপেক্ষাও করেনি। ১৯২৮ সালে কারারুদ্ধ অবস্থায় ভগৎ সিং-এর জাতপ্রথার বিরুদ্ধে ও সমাজতন্ত্র নিয়ে লেখা কোনও অকস্মাৎ ঘটনা নয়। এতে প্রমাণ হয় যে, আমাদের দেশে কেউ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ভাবলে তার পক্ষে জাতপ্রথার অবসানের কথা উপেক্ষা করা সম্ভব না। এ কথা বললে অতিকথন হবে না যে, ফুলে, এবং আম্বেদকর ছাড়া কেবলমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি বাদে আর অন্য কোনো সংগঠন ছিল না, যা জাতপ্রথা, এবং তার নিপীড়নের চেহারার বিরুদ্ধের লড়াইয়ে সামনের সারিতে থেকেছে। বেশিরভাগ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল জাতপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাঁরা যত গ্রামীণ কৃষক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, জাতভিত্তিক বৈষম্যের অবসান ছিল সেগুলির প্রত্যেকটির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জাতপ্রথাকে চিহ্নিত করা, বা তার বিরুদ্ধে লড়াই কমিউনিস্টদের দুর্বলতা ছিল না। দুর্বলতা ছিল জাতপ্রথার অবসানের সংগ্রাম, ও শ্রেণির অবসানের সংগ্রামের মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটিকে বোঝার ব্যর্থতায়, এবং শ্রেণির অবসান আপনা আপনি জাতপ্রথার অবসান ঘটিয়ে ফেলবে – এই একমুখী ভাবনায়। এই দুর্বলতা কেবল জাতপ্রথায় সীমাবদ্ধ থাকে না। নারীদের প্রশ্নে, সাংস্কৃতিক বিষয় বোঝার প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য। এ কথা কমিউনিস্টরা বহু আগে বুঝেছে, ফলে জাতভিত্তিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আম্বেদকরের যে চিন্তাধারা, তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সংকোচ করেনি। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস না করে যে ভারতে জাতপ্রথা ধ্বংস করা যাবে না, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য শ্রেণি-ঐক্য তৈরি করার পথে জাতপ্রথা যে বাধাগুলি সৃষ্টি করে, তাদের চিহ্নিত করা দরকার। আম্বেদকরের বুনিয়াদি মতাদর্শ এবং কমিউনিস্টদের মতাদর্শ ভিন্ন মেরুর হলেও, দলিত, ও দুর্বল অংশের মানুষের উন্নতিকল্পে ও জাতপ্রথার বিরুদ্ধে লড়তে আম্বেদকরের গৌরবান্বিত প্রচেষ্টাকে কমিউনিস্টরা কখনো অস্বীকার করেনি। আম্বেদকরের ভাবধারার যাবতীয় ভালটুকুকে গ্রহণ করে, সমাজবদলের জন্য উপযোগী তার আদর্শকে চিহ্নিত, ও বিকশিত করে, এবং যা যা এই প্রশ্নে খাপ খায় না, সেগুলিকে পরিহার করে কমিউনিস্টরা এগোতে চেয়েছে। আমাদের দেশের শাসক শ্রেণিরা তাদের রীতি-বিধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে আম্বেদকরকে এক নিরীহ, নির্দোষ প্রতীকে রূপান্তরিত করছে। এই প্রকল্পে তাঁর মূর্তিগুলি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আম্বেদকরের প্রতিটি মূর্তি গড়া হয়েছে তাঁর হাতে একটি সংবিধান সমেত। যেন সংবিধান রচনা ছাড়া আর কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ সারাজীবনে তিনি করেননি। সংবিধান রচনায় আম্বেদকরের ভূমিকা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, এমনকী সংবিধানের রচনার জন্য তাঁকে প্রশংসা করাও অতিরঞ্জন হবে না। দুর্বল অংশের জন্য সংরক্ষণকে সুনিশ্চিত করা ছাড়াও একটি মুক্তমনা, ও গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনায় তাঁর চিহ্ন স্পষ্ট। এতদসত্ত্বেও, ভুললে চলবে না যে, আমাদের সংবিধান তার মৌলিক চরিত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সুরক্ষা প্রদান করে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত সে সংক্রান্ত বিষয়কে মৌলিক অধিকার না বানিয়ে রেখে দেওয়া হয় নির্দেশমূলক নীতিতে। আম্বেদকরকে যদি এই সংবিধান রচনায় পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হত, তাহলে কী মানের সংবিধান গড়ে উঠতে পারত, তা কনস্টিটুয়েন্ট কমিটিতে দাখিল করা তাঁর লেখা স্মারকলিপিটি দেখলে যেকোনো মানুষই বুঝতে পারবেন। সংবিধানের প্রস্তুতির কাজটি করার জন্য আম্বেদকর নিজের গোটা জীবনের মাত্র দুই থেকে তিন বছর ব্যয় করেছিলেন। ওঁর জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে জাতপ্রথার বিরুদ্ধে, এবং দুর্বল অংশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করে। আম্বেদকরের জীবন, ও কাজের বুনিয়াদি বিশেষত্বকে, জাতপ্রথার অবসানের জন্য ওঁর চিন্তাধারাকে পিছনে ঠেলে দিয়ে, তাঁকে কেবল সংবিধানের রচয়িতা হিসাবে তুলে ধরা ওঁর চিন্তাধারার প্রতি গুরুতর অন্যায্য কাজ হবে। আম্বেদকরের জীবনের নানা দিক থাকলেও, জাতপ্রথার অবসানে তাঁর সংগ্রাম, এবং দলিত মানুষের মুক্তির জন্য তাঁর সংগ্রাম সবচেয়ে উঁচু স্থান অর্জন করে। আম্বেদকর সারাজীবন জাতপ্রথা প্রসঙ্গে পঠনপাঠন, ও লেখালেখি করতে থাকেন। জাতপ্রথার ভিতরের গতিশীলতা ও চলনকে বুঝে সমাজ বদলাতে চান যাঁরা, জাতপ্রথা প্রসঙ্গে আম্বেদকরের বেশ কিছু দর্শন ও বোঝাপড়া, তাঁদের জন্য কার্যকর হবে। ওঁর বক্তব্যে, জাতপ্রথা কেবল শ্রমের বিভাজনই নয়, শ্রমিকেরও বিভাজন বটে; এটি নির্দেশ করে যে, শোষিত শ্রেণির মধ্যে উপস্থিত জাতপ্রথার কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়েই এই শ্রেণির মধ্যে প্রকৃত ঐক্য গড়ে তোলা যাবে। আম্বেদকরের আরও একটি বোঝাপড়া হল যে, জাতপ্রথার যে বিচিত্র ধরনের বৈষম্য দেখা যায় তা জাতবিরোধী চেতনার সাধারন বিকাশে বাধা দেয়। এই বৈষম্যকে তিনি ক্রমবিভাজিত (গ্রেডেড) বৈষম্য হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন; অর্থাৎ প্রতিটি জাতই তার উপরের ক্রমে থাকা জাতের উচ্চমণ্যতাকে অপছন্দ করছে, অথচ, তার নিচের ক্রমে থাকা জাতের উপর নিজের উচ্চমণ্যতা চাপিয়ে দিচ্ছে। এমনকী দলিতদের মধ্যেকার উপ-জাতগুলিও এই ক্রমবিভাজিত বৈষম্যের কবল থেকে মুক্ত নয়। আম্বেদকর বারবার জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন যে, এই সর্বজনীন ক্রমবিভাজিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে না লড়লে, জাতপ্রথাকে ভাঙা, এবং শ্রেণিঐক্য গড়ে তোলা, বা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে না। জাতপ্রথার টিঁকে থাকা, ও শক্তিশালী হয়ে ওঠায় ভারতীয় গ্রামের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন আম্বেদকর। ওঁর মতে, অস্পৃশ্যতাকে যারা বয়ে নিয়ে চলেছে তাদের থেকে দলিতদের সরিয়ে নিয়ে যেতে পারলে তাঁরা জাতভিত্তিক বৈষম্য থেকে মুক্ত হবেন। এই কারণেই তিনি দলিতদের জন্য পৃথক গ্রাম দাবি করেছিলেন। জাতপ্রথার ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে গ্রাম সম্বন্ধে আম্বেদকরের এই বোঝাপড়ার সত্যতা রয়েছে। জাতপ্রথার শক্তিবৃদ্ধি বিভিন্ন জাতের কাছাকাছি থাকার ফলে হয় না, বরং উঁচু জাত, ও ক্ষমতাধরদের হাতে জমির সঞ্চয়নের কারণে হয়। নিচু জাতের বেঁচে থাকার জন্য সেই জমির উপর নির্ভরশীলতা উঁচু জাতকে জাতপ্রথা টিঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। জমির উপর উঁচুজাতের একচ্ছত্র আধিপত্য যদি শেষ করা যায়, গ্রামে জাতপ্রথার ক্ষমতার ভিত্তিকে ভাঙা যাবে। এবং এটি ভবিষ্যতের জাতপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনের পথকে প্রশস্ত করবে। জাতপ্রথার শোষণ থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে আম্বেদকর শিক্ষার ভূমিকাতেও জোর দিয়েছেন। শূদ্র, নারী, এবং অস্পৃশ্যদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা জাতপ্রথা বহাল থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসাবে তিনি চিহ্নিত করেছেন। শোষিত অংশের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসারকে গ্রামীণ, ও জাতভিত্তিক বৈষম্যের অবসানের ক্ষেত্রে, ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার চেতনা বৃদ্ধির পক্ষে একটি জরুরি অস্ত্র হিসাবে দেখেছেন। সেজন্যই আম্বেদকর দলিত মানুষদের মধ্যে আজীবন শিক্ষার প্রসারের কাজ করেছেন। এই মুহূর্তের চাহিদা হল, আম্বেদকরের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারার যে যে দিকগুলি সমাজ বদলকে সুনিশ্চিত করবে, সেগুলিকে বিশেষত তুলে ধরা ও রক্ষা করা। আম্বেদকরের ভাবধারার ক্রান্তিকারী দিকটি যা কিনা আমূল সমাজ বদলের কথা বলে তাকে শক্তিশালী করতে হবে রক্ষা করতে হবে। সমাজ বদলের কথা বলা কেউ আমাদের দেশে আম্বেদকরের জীবন ও কাজকে উপেক্ষা করতে পারবেন না। ১৭ এপ্রিল ২০১৬ , পিপলস ডেমোক্রেসি
প্রকাশের তারিখ: ১৪-এপ্রিল-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |