পশ্চিমবঙ্গে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ সর্বোচ্চ, শাস্তি সর্বনিম্ন

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
এরই পাশাপাশি উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ‍্য। নারীর উপর সংঘটিত অপরাধের মামলায় শাস্তির হারে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা রাজ্যগুলির দলে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সময়পর্ব পশ্চিমবঙ্গে নারীর নির্যাতনের মামলার শাস্তির হার অত্যন্ত কম। ৫ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২২ সালে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৯ শতাংশ হয়েছিল।

নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যেমন রাজ্যে, তেমনি সারা দেশে। অপরাধ শুধু সম্ভ্রমহানি বা ধর্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের নানা স্তর থেকে বারবার উচ্চারিত এমন বক্তব্য যা নারীর শতবর্ষের অর্জিত অধিকারকে কেড়ে নিয়ে বা সীমিত করে আবার গৃহকোণের বন্দিত্বে ফেরানোর ইঙ্গিত বহন করছে। 

পশ্চিমবঙ্গে বা অবশিষ্ট ভারতের কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেই এর বিরুদ্ধে সামগ্রিক লড়াইকে খাটো করে রাজ্য ও কেন্দ্রের দুই শাসকপক্ষের মধ্যে শুরু হয়ে যায় কুস্তি প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতাটি যেন কে একশ’তে দশ, আর কে সাত পেয়ে ফেল করেছে তারই পরীক্ষা! এবং দিনের শেষে দুই পক্ষের ডাহা ফেলকে আড়াল করতে নামে বাণিজ‍্যিক মিডিয়া। 

পশ্চিমবঙ্গে ঘটনা ঘটলে রেফারির ভূমিকা নিতে চায় কেন্দ্রের শাসকরা। আর অবশিষ্ট ভারতের কোনো ঘটনা ঘটলে বিচারকের আসনে বসে রাজ্যের শাসকপক্ষ। 

এই কুস্তির মধ্যে চাপা পড়ে যায় নির্মম কঠিন সত‍্য! 

দুর্গাপুরের গণধর্ষণের একটি ঘটনার অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে মন্তব্য করেছেন, তা বিরোধী রাজনৈতিক দল-সহ সামগ্রিক নাগরিক সমাজে প্রবলভাবে সমালোচিত হয়েছে। সঙ্ঘের মনুবাদী স্বর মুখ‍্যমন্ত্রীর গলায়! এই ঘটনার সূত্র ধরে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে রাজ্যে নারীর নিরাপত্তা ও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল অংশের দায়হীনতার প্রসঙ্গ। আরজি কর মেডিকেল কলেজে ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে রাজ্যব্যাপী উত্তাল প্রতিবাদের এক বছর যেতে না যেতেই প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা থেকে আসা মেডিকেল ছাত্রীর উপর সংঘটিত অপরাধের ঘটনা। গত বছর রাজ্য সরকার কতগুলি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল, যেখানে নৈশকালীন কর্তব্যে নারী চিকিৎসকদের না রাখার কথা বলা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপত্তিতে পরবর্তীতে সেটি প্রত্যাহৃত হয়।

এবারের গণধর্ষণের অভিযোগে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কর্তৃপক্ষকে অধিকতর দায়িত্ব নিয়ে খেয়াল রাখতে হবে যাতে বেশি রাতে ছাত্ররা, বিশেষ করে ছাত্রীরা ছাত্রবাসের বাইরে না বেরোয়। তাঁর দাবি, রাজ্যে নাকি এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে শূন্য-সহনশীলতার নীতি অনুসৃত হয় প্রশাসনের তরফে। বাইরের রাজ্য থেকে যারা এই রাজ্যে শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে এসেছে তাদের প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর উপদেশ, তারা যেন রাতে বাইরে না বেরোয়। পরে অবশ্য তিনি দাবি করেন তাঁর বক্তব্য ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিকৃত’ করা হয়েছে। 

মুখ্যমন্ত্রী শূন্য-সহনশীলতার দাবি করলেও তথ্য ভিন্ন কথা বলে। পরিসংখ্যান বলছে, এ ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেইনি। সেখানে দেখা যাচ্ছে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির হার অত্যন্ত কম এবং বিপরীতে নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধের মামলা বকেয়া পড়ে রয়েছে বিপুল সংখ্যায়।

২০১৮ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে নারীর উপর সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ নিয়ে। সারা দেশের সাপেক্ষে ধারাবাহিকভাবে এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে সর্বোচ্চ স্তরে। ২০২১ থেকে ২০২৩-এর মধ্যবর্তী সময়ে সারা দেশে ‘অ্যাসিড হামলা’ বা ‘অ্যাসিড হামলার প্রচেষ্টার’ অভিযোগের সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গ সারা দেশের মধ্যে রয়েছে শীর্ষে। ‘ধর্ষণের চেষ্টা’-র অভিযোগের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে দেশে দ্বিতীয়স্থানে। ২০১৯ সাল থেকেই এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ‘স্বামী বা তার পরিজনদের দ্বারা সংঘটিত নিষ্ঠুরতা’-র অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে তৃতীয় স্থানে।


সবকিছুকে একত্রিত করলে দেখা যাচ্ছে ২০১৮ থেকে ২০২৩-র সময়পর্বে নারীর উপর সংঘটিত বহুবিধ অপরাধের সর্বাধিক অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়া রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম। 

এরই পাশাপাশি উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ‍্য। নারীর উপর সংঘটিত অপরাধের মামলায় শাস্তির হারে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা রাজ্যগুলির দলে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সময়পর্ব পশ্চিমবঙ্গে নারীর নির্যাতনের মামলার শাস্তির হার অত্যন্ত কম। ৫ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২২ সালে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৯ শতাংশ হয়েছিল।




এ-সবই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে অপরাধের খুবই স্বল্পাংশ আদালতে শাস্তির স্তর অবধি পৌঁছায়। রাজ্যওয়ারি হিসেবে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থাটি অত্যন্ত করুণ। ২০২৩ সালে নারীর প্রতি সংঘটিত অপরাধে শাস্তির হারে ৩৬টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ৩৫-এ। 


ফলে, নারীর প্রতি অপরাধের মামলায় বেকসুর খালাস পাওয়ার সংখ্যাও ৮,০০০ থেকে চমকপ্রদভাবে বেড়ে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ১৯,০০০-এ। সারা দেশে সর্বোচ্চ!

তাছাড়া, নারীর প্রতি অপরাধের বকেয়া পড়ে থাকার মামলার সংখ্যা ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ লক্ষে। এটাও দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ! 

২০১৭ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে বকেয়া মামলা সংখ্যা বেড়েছে ৫৬ শতাংশ হারে। 

ফলে তথ্য সোজাসাপ্টা এই কথাই বলে যে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের কথা উঠলেই এই সত্যটিই উঠে আসে— পশ্চিমবঙ্গ শাস্তির হারে সর্বনিম্ন, বেকসুর খালাসে সর্বোচ্চ এবং বিপুলায়তন বকেয়া পড়ে থাকা মামলায়ও সর্বোচ্চ স্তরে! 

তথ‍্যে স্পষ্ট অপরাধ, অপরাধীদের আড়াল করার কারণেই বাড়ছে অপরাধের সংখ‍্যা। ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের সঙ্গেই চলেছে অপরাধীদের প্রতি সর্বোচ্চ-টলারেন্স!

ঋণ: দ‍্য হিন্দু


প্রকাশের তারিখ: ১৮-অক্টোবর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org