দহনে বড় বিষ, দহনে বড় জ্বালা

রতন খাসনবিশ
মমতার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। কারণ সব সন্দীপ ঘোষকেই প্রশ্রয় দিয়ে রাজ্যে এক বীভৎস প্রশাসন গড়ে তুলেছেন তিনি নিজে। এই প্রশাসন প্রতি পদে মানুষকে দংশন করছে, বিষের জ্বালায় জর্জরিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই মানুষ মমতার পদযাত্রায় আর মুগ্ধ হচ্ছেন না। অ-রাজনৈতিক সমঝোতাকারী নামিয়েও এই জনতরঙ্গ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যে দহনে আক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, সে দহনে বড় বিষ, সে দহনে বড় জ্বালা। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাইছেন এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভ করতে।

১৯৯০ সালের ৩০ মে এই রাজ্যে তিনজন মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর একটি বর্বর আক্রমণ ঘটে। ঘটনাস্থল বানতলা। অভিযোগ, আক্রমণকারীরা স্থানীয় সিপিআই(এম) কর্মী। ঘটনাটি ঘটে সন্ধের দিকে। ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পৌঁছয় রাত আটটা নাগাদ। রাত দশটা নাগাদ আক্রান্ত ৩ মহিলাকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। সরাসরি ধর্ষণের শিকার অনীতা দেওয়ানের মৃত্যু হয় হাসপাতালে আনার পর। মৃত্যু ঘটে তাঁরা যে গাড়িতে আসছিলেন তার চালকেরও– স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে তাঁকেও প্রবল আক্রমণের মুখে পড়তে হয়।

এখন আর জি করে ঘটে যাওয়া বর্বর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিপরীতে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে বানতলার ঘটনাকে- তিরিশ বছরেরও আগে যা ঘটেছিল। যারা এটা করছেন তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। বর্তমান ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, বামপন্থীরা যেন তা থেকে কোনওরকম রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে না পারেন। সেটা তাদের প্রথম লক্ষ্য। এদের আবির্ভাব ঘটে প্রধানত আন্দোলনের অ-রাজনৈতিক মুখ হিসাবে। কিন্তু এদের একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা আছে। যদিও প্রকাশ্যে সেটা স্পষ্ট না থাকায় মানুষকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা এদের বেশি থাকে।

আর জি করের নারকীয় ঘটনার বিপরীতে এরা যখন তুল্যমূল্যে বানতলার ঘটনাটি নিয়ে আসেন, তখন দু’টি তথ্য তারা সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রথমত, বানতলার ঘটনায় অপরাধী যে তথাকথিত সিপিআই(এম) সমর্থক ৬ জন, তারা এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্মম শাস্তি ভোগ করছে। এবং তা প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই। তাদের শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা যে বামফ্রন্ট-ই করেছিল, এটা একবারের জন্যও মনে করানো হয় না। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা-ও মনে করানো হয় না যে, তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রশান্ত শূর হাসপাতালে নিজে হাজির থেকে আহতদের চিকিৎসা ও নিহতের পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করেছিলেন। 

রাজ্যবাসী আজ যেভাবে বিমূঢ় হয়ে গেছেন, স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে নেমেছেন, বানতলার ঘটনার সময় সে ধরনের কিছু ঘটেনি। না ঘটার কারণ অপরাধ সম্পর্কে রাজ্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী। এরকম ঘটনা সে সময়ে কেউ কল্পনা করতে পারত না যে, সরকার এক সিভিক ভলান্টিয়ারের ঘাড়ে ঘটনার যাবতীয় দায় চাপিয়ে দিয়ে কোনও একটা কিছু আড়াল করার চেষ্টা করবে। বানতলার ঘটনায় পুলিশি তৎপরতার অভাব ছিল অথবা রাজ্য সরকারের কর্তাব্যক্তিরা অপরাধীর পক্ষে দাঁড়িয়ে সওয়াল করছিলেন, ঘটনাক্রম একেবারেই সেরকম ছিল না। 

এক্ষেত্রে, অর্থাৎ আর জি করের ঘটনার ক্ষেত্রে বিষয়টি দাঁড়িয়েছে একেবারেই অন্যরকম। সরকারি প্রশাসন ঘটনাটিকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। একটি আত্মহত্যার গল্প সাজিয়ে নিহত ট্রেনি চিকিৎসকের পিতা-মাতাকে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়ার ব্যবস্থা করে, স্থানীয় বিধায়ককে নির্দেশ দিয়ে, পানিহাটি মহাশ্মশানে অত্যাচারিতার দেহটি পুড়িয়ে দিয়ে, প্রমাণ লোপের যাবতীয় চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনা এটাই এবং ফেসবুক-বিপ্লবীরা একথা অস্বীকার করতে পারবেন না যে, অভয়ার ধর্ষণ এবং খুন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যই আত্মহত্যার গল্পের পিছনে চিরকালের জন্য নির্বাসিত থাকত, যদি না ঘটনাস্থলে ডিওয়াইএফআই নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যথাসময়ে হাজির হয়ে শবদেহ আটকাবার ব্যবস্থা করতেন। 

পরিস্থিতি এই রাজ্যে এখন এতটাই ভয়াবহ যে, সচেতন হস্তক্ষেপ ছাড়া এরাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসন যে কোনও সংবেদনশীল বিষয়কে ধামাচাপা দেবার ব্যবস্থা করতে পারে। ধামাচাপা দেবার প্রবণতা পুলিশ প্রশাসনের থাকতেই পারে। ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রশাসন এই সমস্ত দুষ্কর্ম করে আসছে। বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, যার জোরে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দল জনাদেশ রক্ষার স্বার্থে পুলিশ ও প্রশাসনের সংগঠিত দুষ্কর্মগুলির বিরোধিতায় নামে। অর্থাৎ অপরাধ হয়তো রোধ করা যায় না, কিন্তু সভ্য, সমাজস্বীকৃত উপায়ে অপরাধের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এই ভাবে। বানতলা কাণ্ডে এটাই ঘটেছিল। আর জি কর-কাণ্ডে ঘটল ঠিক উল্টো ঘটনা। অপরাধটি ঢেকে রাখার জন্য অপরাধের ঘটনাস্থলটি ঘিরে সারা সকাল ধরে চলল বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের আগমন ও নির্গমন। পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব– সকলে মিলে একটি আত্মহত্যার চিত্রনাট্য তৈরি করল। একমাত্র প্রতিরোধ যেখান থেকে আসতে পারত সেটা হল নিহত ওই ট্রেনি চিকিৎসকের পিতা-মাতা। তাদের বটল আপ করার সমস্যা ছিল। কেননা, একটি মানুষ প্রশাসনের কাছে সব সময়ই অসহায়। নির্যাতিতার পিতামাতার পাশে দাঁড়াতে পারত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনের যাবতীয় দুষ্কর্ম রোধ করার জন্য এটাই হতে পারত যথেষ্ট। মমতা ব্যানার্জির রাজত্বে এটা ঘটবে না। আর জি করের স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব থেকে পানিহাটি মহাশ্মশান এলাকার তৃণমূল নেতৃত্বকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিল আর জি করের প্রশাসন। নির্যাতিতার হত্যা দাঁড়িয়ে গেল আত্মহত্যায়। হয়ত কিছু ভাড়াটে সাংবাদিক ইতিমধ্যে আত্মহত্যার স্টোরিও তৈরি করে ফেলেছিল। মীনাক্ষী মুখার্জিদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে যা একেবারে তছনছ হয়ে গেল। 

আর জি করকে যারা অরাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্র হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাছে আবেদন থাকবে, তাঁরা যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাত্রাটিকে বাদ দিয়ে এই ঘটনাকে বিচার করার চেষ্টা না করেন। আত্মহত্যার গল্পটি পুরোমাত্রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যে রাজনীতি এই গল্পটি তৈরি করার চেষ্টা করেছিল তা হল তৃণমূলের রাজনীতি, বানতলার ঘটনার যুগে যে রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে ছিল বিরল প্রজাতির রাজনীতি। মমতা ব্যানার্জির অপরাধ, এই রাজনীতিকেই তিনি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে প্রধান ভূমিকায় নিয়ে এসেছেন। তাঁর দল ঘটনা নির্মাণের সাহস পায়। তাঁর দল, রাজনৈতিক প্রতিরোধ বর্ম যাদের নেই, সেই অসহায় মানুষকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে! আর জি করে নির্যাতিতার পিতা-মাতাকে নিয়ে যা ঘটছিল। লক্ষ্যণীয় যে, মামুলি প্রতিবাদে পিছু হটবার মানুষ এরা নয়। অপরাধ স্থলটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রমাণ লোপের যাবতীয় চেষ্টা যে ভদ্রলোক সারা সকাল ধরে করে গেছেন, সেই সন্দীপ ঘোষকে তাঁর তৎপরতার পুরস্কার হিসাবে শ্রীমতি ব্যানার্জি আরও ভাল পোস্টিং দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। দেড় কোটি টাকা খরচ করে কপিল সিব্বালকে তিনি সুপ্রিম কোর্টে দাঁড় করিয়েছেন তাঁর স্বাস্থ্য দপ্তরের কালসাপগুলিকে রক্ষা করার জন্য।

যদিও এ রাজ্যে আনা হয়েছে অপরাজিতা আইন, তবু আর জি করের গণ প্রতিরোধ থামবার কোনও লক্ষ্মণ নেই। অপরাধীদের শনাক্ত করে সাত দিনের মধ্যে ফাঁসির ব্যবস্থা করার দাবিতে পথ হেঁটেছেন মমতা ব্যানার্জি। সঙ্গে ছিল তাঁর অনুগ্রহপুষ্ট বিশাল এক স্তাবক বাহিনী। তারপরেও প্রতিবাদী মিছিলের আয়তন আরও বেশি স্ফীত হয়ে উঠছে, আরও বেশি মানুষ রাস্তায় নামছেন মমতা ব্যানার্জির এই কুৎসিৎ কুনাট্যের বিরুদ্ধে। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, আর জি করের ঘটনার দায় এই সব পদে আসীন কোনও ব্যক্তিই এড়াতে পারেন না। 

মমতা ব্যানার্জি রাজনৈতিক সততার পরিচয় দিতেন যদি ঘটনার দায় স্বীকার করে নিয়ে অপরাধের শাস্তি বিধানের যে চিরচরিত পথ রাষ্ট্রনেতাদের কাছে রয়েছে, মানুষ যে পথে সুবিচার আশা করেন, সেই পথ গ্রহণ করতেন। তাঁর পক্ষে এটি সম্ভব নয়। কারণ সব সন্দীপ ঘোষকেই প্রশ্রয় দিয়ে রাজ্যে এক বীভৎস প্রশাসন গড়ে তুলেছেন তিনি নিজে। এই প্রশাসন প্রতি পদে মানুষকে দংশন করছে, বিষের জ্বালায় জর্জরিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই মানুষ মমতার পদযাত্রায় আর মুগ্ধ হচ্ছেন না। অ-রাজনৈতিক সমঝোতাকারী নামিয়েও এই জনতরঙ্গ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যে দহনে আক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সে দহনে বড় বিষ, সে দহনে বড় জ্বালা। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাইছেন এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভ করতে। ২০২৬ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে এঁরা সম্ভবত আর রাজি নন। 


প্রকাশের তারিখ: ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org