|
চাঁদে জল, তাও বেদের জানা ছিল?অরুণাভ মিশ্র |
|
সম্প্রতি একটি ভাষ্যে প্রচারিত হয়েছে, ‘কিছুদিন আগে ইসরোর চেয়ারম্যান একটি বক্তৃতায় বলেছেন যে চাঁদে জল আছে। বেদের দৃষ্টান্ত টেনে এই কথা আগে যদি আমি বক্তৃতা করতাম তাহলে আপনারা হাসতেন। কিন্তু আজকে চন্দ্রাভিযানের পর সেটা প্রমাণিত হয়ে গেছে।’ এই বক্তব্য প্রসঙ্গে শুধু নয়, ধারাবাহিকভাবে এমন বহু কথা আজ আসছে যার মধ্যে সত্যতার চেয়ে আবেগ বেশি। যেখানে লতায় পাতায় বেদে সবই বলা ছিল এমন দেখানোর কৌশল। এই কৌশলের মুখ্য উদ্দেশ্য আমাদের অতীত কত সমৃদ্ধ ছিল তা তুলে ধরা। অনেকটা নিজেকে বিশ্বগুরু প্রমাণ করা। আমাদের অতীত বিজ্ঞান চর্চা বেশ কিছু বিষয়ে সত্যি উন্নত ছিল। কিন্তু সব বিষয়ে আমরা সেরা ছিলাম, একথা ঠিক নয়। যেমন ঠিক নয় আধুনিক বিজ্ঞানের সব আবিষ্কারের কথা আমাদের পূর্বপুরুষদের আগেই জানা ছিল বলা। বিজ্ঞানের অগ্রগতির একটা ধারাবাহিক পথ রয়েছে। সে পথ বা ধারা টপকে কিছু হওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাস আমাদের তাই শেখায়। ফলে বিশ্লেষণী মনোভাব নিয়ে উপরের বক্তব্যটি বিচার করে দেখতে হবে। দেখতে হবে, যুক্তি ও প্রমানকে হাতিয়ার করে। এ প্রসঙ্গে বলি, বেদে অর্থাৎ সংহিতাগুলোতে কোথাও আমাদের একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের ক্রেটার বা গহ্বরে জলের অস্তিত্বের কথা সরাসরি বলা নেই। কৃষ্ণ যজুর্বেদের সঙ্গে জড়িত তৈত্তিরীয় উপনিষদের মধ্যে চাঁদ ও জল সম্পর্কিত কিছু কথা আছে। মূল বেদের অঙ্গীভূত চারটি সংহিতার একটি যজুর্বেদ। কৃষ্ণ ও শুক্ল দুই যজুর্বেদ। কৃষ্ণ যজুর্বেদ সংহিতার সঙ্গে যুক্ত দুটি ব্রাহ্মণ ও দুটি আরণ্যক হল কঠ ও তৈত্তিরীয়। কিন্তু উপনিষদ চারটি। এগুলি হল, কঠ, তৈত্তিরীয়, স্বেতাশ্বেতর এবং মৈত্রী। শুক্ল যজুর্বেদের ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক একটি, শতপথ। আর উপনিষদ দুটি। বৃহদারণ্যক ও ঈশ। ভাগের কথাটা আগে বলে নিলাম বোঝার অস্পষ্টতা এড়াতে। তৈত্তিরীয় উপনিষদের আরণ্যক অংশে ‘মন্ত্র পুষ্পমের’ মধ্যে খানিকটা ঐ জল ও চাঁদের সংযোগ দেখা যায়। নিচে সেই শ্লোকটি আমি সম্পূর্ণ উল্লেখ করছি। দেখবেন তাতেও চাঁদে জলের অস্তিত্বের কথা সরাসরি বলা হয়নি। মূল শ্লোকটিতে বলা আছে— ‘চন্দ্রমা বা আপাম পুষ্পম। পুষ্পবান্ প্রজাবান্ পশুমান্ ভবতি য এবং বেদ। যো আপাম্ আয়তনম্ বেদ আয়তনবান্ ভবতি।।’ এই কথার অর্থ— চাঁদ হল জলের ফুল/ বা সার। (য এবং বেদ) যে এই তত্ত্ব জানে, সে ফুল, সন্তান ও পশুসম্পদে সমৃদ্ধ হয় (পুষ্পবান্ প্রজাবান্ পশুমান্ ভবতি)। যে জলের আসল উৎস/ আধার জানে, সে নিজেও জীবনে প্রতিষ্ঠা ও আশ্রয় পায়। (যো অপাম্ আয়তনম্ বেদ আয়তনবান্ ভবতি)। আপ মানে Cosmic fluid বা সৃষ্টির মূল রস। চাঁদ এই রস বা সৃষ্টির মূলকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে কল্পনা করা হয়েছে। তৈত্তিরীয় উপনিষদের এই মন্ত্রের মধ্য দিয়ে জল, চাঁদ ও সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ককে এক কল্পনার রূপকে প্রতীকীভাবে আঁকা হয়েছে। এখানে চাঁদকে বলা হয়েছে ‘জলের ফুল’। জল থেকে উৎপন্ন সার অংশ। শ্লোকে কল্পনায় চাঁদের সঙ্গে জলের সম্পর্ক টানা হয়েছে। জলের সাগরে ভাসা চাঁদ। আকাশ গাঙে যেন ভাসছে সে। এখানে বাস্তবে দেখা, পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা বা তথাকথিত দিব্যজ্ঞানের মাধ্যমে পাওয়া কোন বিষয় নয়। নিছক কল্পনা অথবা রূপক হিসেবে উঠে আসা কথা। এর সঙ্গে বাস্তবের চাঁদ আর তাতে বিজ্ঞানীদের লাগাতার জলের ও অন্যান্য রাসায়নিকের দুঃসাহসী সব খোঁজ এর বাস্তবিক কোন সম্পর্ক আছে কি? পশুপালন আর আদিম কৃষি যখন অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বৈদিক যুগের শেষ দিকে চাঁদ সম্পর্কে এই রচনা একটি মোহময় কল্পনা ছাড়া আর কী হতে পারে? বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনো পর্যন্ত এই, ২০২০ সালের নাসার সোফিয়া (SOFIA) মিশনের আগে চাঁদের সূর্যালোকিত অংশে জলের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব ছিল না। সোফিয়া মিশনে নিশ্চিতভাবে চাঁদের সূর্যালোকিত অংশে জলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। H2O অনু হিসেবে জলকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। তবে সে জল চাঁদের ধুলোর দানার মধ্যে আটকে থাকা জল। কোন প্রবাহিত জলধারা বা সঞ্চিত জল নয়। তার আগে অবশ্য ২০১৮ সালে ‘মুন মিনারোলজি ম্যাপার’ নামে যে যন্ত্র ২০০৯ সালের চন্দ্রায়ন ১ অভিযানে ভারত পাঠিয়েছিল, তার সমস্ত তথ্য বিশ্লেষিত হয়ে প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায় ৩০০ কোটি বছর ধরে চাঁদের ছায়া ঢাকা যে গহ্বর গুলি রয়েছে, সেখানে জল জমে তৈরি হওয়া বরফের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে। ২০২০-র সোফিয়া মিশন তা আরও নিশ্চিত করে। আর ২০২৩ সালে জ্যোতির্বিদদের ধারাবাহিক চর্চায় চাঁদের কোথায় কোথায় জল আছে তার একটা সম্ভাব্য ম্যাপ খাড়া করা সম্ভব হয়েছে। তা সত্বেও আজও চাঁদ সাহারা মরুর চেয়ে ১০০ গুণ খটখটে শুকনো! চাঁদে জলের কল্পনা ছিল ওলন্দাজ জ্যোতির্বিদ মিচেল ভান লংগ্রেনের ও। তিনি ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে চাঁদের কালো অংশগুলোকে ল্যাটিনে ‘মারিয়া’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন তার প্রকাশিত চাঁদের ম্যাপে। ল্যাটিন মারিয়ার অর্থ হল সাগর। তাঁর কল্পনা ছিল চাঁদ ছোট ছোট সাগরে ভরা। মারে কথাটির বহুবচনে হয় মারিয়া। তখন দূরবীন আবিষ্কার হলেও লংগ্রেন তা ব্যবহার করেছিলেন কিনা জানা নেই। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে যেহেতু দূরবীন আবিষ্কার হয়ে যায় তাই তাঁর সে যন্ত্র ব্যবহার করাই স্বাভাবিক। তিনিই প্রথম ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে চাঁদের একটা ম্যাপ করে তাতে কালো ছোপ দিয়ে জলের সাগরগুলি বা মারিয়া চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু এই অংশগুলি আদপে শিলাময় গহ্বর। অবিরত আছড়ে পড়া প্রস্তর খণ্ডের আঘাতে সৃষ্টি এই গহ্বর গুলোর। তারা শুষ্ক হলেও লংগ্রেনের দেওয়া নামে আজও তারা মারিয়া বা মারে হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে চিহ্নিত হয়। পরে উইলিয়াম পিকারিং পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ১৮০০ সালে প্রথম বলেন, চাঁদের আবহমণ্ডল নেই। যেহেতু মেঘ বা আবহমণ্ডল নেই তাই চাঁদে জল পড়লে তা সহজে বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। অতএব তিনি সিদ্ধান্ত টানলেন, চাঁদে জল নেই। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাঁর যুক্তি মেনে নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন এই ধারণায় স্থির ছিলেন জ্যোতির্বিদরা। ১৯৬১ সালে আবার নতুন ভাবনা এল কেনেথ ওয়াটসনের হাত ধরে। কেনেথ ওয়াটসন ছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৬১ সালে তিনি এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করে বলেন চাঁদের সূর্যালোকিত অংশ এতটাই গরম যে, সেখানে যদি জল থাকে তারা সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। এ কথা সমর্থন যোগ্য। কিন্তু এতৎসত্বেও চাঁদে জলের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। কীভাবে সম্ভব তা জানাতে গিয়ে ওয়াটসন বলেন, চাঁদের যে সমস্ত গর্তে সূর্যের আলো পৌঁছয় না, তার তলায় জল জমে বরফ হয়ে থাকতে পারে। এই স্থায়ী ছায়াভরা অঞ্চলগুলোতে জলের বরফ থাকার সম্ভাবনার কথা তখন বিজ্ঞানীদের মাথায় এলো। তবে অ্যাপোলো মিশনে (১৯৬৯-১৯৭২) যে চাঁদের মাটি আনা হয়েছিল, তাতে জলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে পিকারিং এর শুষ্ক চাঁদের ধারণাই দৃঢ় হল। কিন্তু ১৯৯৪ সালে নাসার ক্লেমেন্টাইন মিশন থেকে চাঁদের ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলে জলের বরফ থাকার ইঙ্গিত মেলে। দুমাস চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে অনেক ছবি তুলেছিল ক্লেমেন্টাইন। পরিষ্কার ছবি না হওয়ায় তখন বরফের থাকা নিশ্চিত করা যায়নি। এই ইঙ্গিত পেয়ে অ্যাপোলো মিশনের পাওয়া নমুনাগুলো আবার পরীক্ষা করা হয় ২০০৮ সালে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে। তখন দেখা যায় ওই মাটির ভেতরে থাকা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় বেরুনো কাঁচের টুকরোর মধ্যে হাইড্রোজেন রয়েছে। এখন যেহেতু চাঁদের কোন আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে না, তাই এই হাইড্রোজেন বহু আগের, যখন চাঁদের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হতো। ফলে প্রমাণিত হয়, আগে চাঁদে জলের একটি অংশ (হাইড্রোজেন) ছিল। পরবর্তী চন্দ্রায়ন ১ (২০০৯) সহ অন্যান্য অভিযানের কথা আগেই বলেছি। সোফিয়া মিশন নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে, চাঁদে জল আছে। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও তথ্য থেকে দেখা যায়, দীর্ঘ এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চাঁদে জলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, আজও চাঁদ এক শুকনো পাথুরে বন্ধুর এলাকা। প্রকৃত উপনিষদ ভাষ্য এর একদম ভিন্ন। সেখানে চাঁদ জলে ভাসছে। অনেকটা সপ্তদশ শতাব্দীর জ্যোতির্বিদ মিচেল ভান লংগ্রেনের ভাবনার মতো! এই দুই তথ্য পাওয়ার পর আপনারা কি বলবেন, বেদে বলা ছিল যে চাঁদে জল আছে? প্রকাশের তারিখ: ৩০-জুন-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |