|
ডিজিটাল গণমাধ্যম: দক্ষিণপন্থার জোরালো হাতিয়ারসুচিক্কণ দাস |
কারণ স্বৈরতন্ত্রী, দক্ষিণপন্থী শাসন দাঁড়িয়ে থাকে যুক্তির বিনাশের ওপর। অবিরত ভুল ও মিথ্যা প্রচারেই যুক্তির ধার ভোঁতা করে দেওয়া যায়। সেকারণে দক্ষিণপন্থীদের সাধারণ মানুষের মনোজগতে যুক্তির বিনাশ ও অযুক্তির সৌধ নির্মাণ চালিয়ে যেতে হয় অবিরত। এবং সেই কাজে সুপরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল পণ্যের ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠেছে দক্ষিণপন্থীরা। এই সব ডিজিটাল পণ্য যারা তৈরি করে ও বাজারে বিক্রি করে সেই সব পুঁজিবাদী সংস্থাও দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। |
১ ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার— পুঁজিবাদী প্রযুক্তির উৎপাদিত পণ্য হিসাবেই বিশ্ববাজারে এগুলির আবির্ভাব। স্মার্টফোন, আইপ্যাড, ল্যাপটপ, পামটপ, কম্পিউটারের মতো পূর্ববর্তী প্রজন্মের পণ্যগুলির বাজার আরও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যেই জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা হয় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারের মতো ডিজিটাল পণ্যগুলিকে, এবং পুঁজির সেই পরিকল্পনা সফল, কারণ গোটা বিশ্বে এখনও এই সব পণ্যের চাহিদা বেড়েই চলেছে এবং বাড়িয়ে চলেছে পুঁজির মুনাফা। যে কোনও পুঁজিবাদী প্রোডাক্ট পণ্য হয়ে ওঠে দুটি কারণে, তার ব্যবহার মূল্য বা ইউজ ভ্যালু এবং বিনিময় মূল্য বা এক্সচেঞ্জ ভ্যালু। বেশির ভাগ পুঁজিবাদী পণ্যের ব্যবহার মূল্য তাৎক্ষণিক। সাবান, টুথপেস্ট, টিভি, গাড়ি—এসবই স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার মূল্যের পণ্য। কিন্তু পুঁজিবাদী ডিজিটাল পণ্য হিসাবে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারের ব্যবহার মূল্য একেবারে অন্য ধরনের। একদিকে এই সব পণ্যগুলি তুলনামূলকভাবে কম খরচে সমাজের একেবারে শেষ লোকটিকেও তার নিজের মত প্রকাশের বা মত বিনিময়ের সুযোগ করে দেয়। (টিভি, আইপ্যাড,ল্যাপটপ, কম্পিউটারের মতো দামি পণ্য কেনার চেয়ে কোনোক্রমে একটা শস্তার স্মার্টফোন কিনে ফেলা যায় এবং কম পয়সার রিচার্জ করে আন্তর্জালের বিচিত্র জগতে ঢুকে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়)। স্মার্টফোন মানেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারের জগতে ঢুকে পড়ার সুযোগ পাওয়া এবং অসংখ্য তথ্য দেখার, জানার ও মত বিনিময় করার সুযোগ করতলগত হওয়া। এই প্রক্রিয়াটি শেষ বিচারে ব্যক্তির মতামত তৈরির প্রক্রিয়াকে খুবই ভাল পরিমাণে প্রভাবিত করে। এক কথায়, ব্যক্তি মানুষের মতামত তৈরিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ডিজিটাল পণ্যগুলি। এখানেই অন্য পুঁজিবাদী প্রোডাক্টগুলির তুলনায় ডিজিটাল পণ্যের ভার অনেক বেশি। কারণ এগুলি সামাজিক মানুষের চেতনাকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার সর্বোচ্চ প্রয়াস চালায় অবিরত এবং নানা কৌশলে। আগের শতকের পুঁজিবাদী পণ্যগুলি, যেমন খবরের কাগজ, রেডিও বা টিভিতে এই ধরনের সুযোগের ব্যবহার ছিল সীমিত।যদিও খবরের কাগজ, রেডিও বা টিভি গণমাধ্যম হিসাবেই পরিচিত, তবু দূরত্বের কারণে এগুলির উপস্থিতি ছিল নৈর্ব্যক্তিক। একবিংশ শতকের ডিজিটাল পণ্যগুলি একইসঙ্গে যৌথভাবে সামাজিক গোষ্ঠীগুলির সামনে এবং আলাদা করে প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের সামনে মতপ্রকাশের, মত আদানপ্রদানের এবং তথ্য জানার যে দিগন্ত উন্মোচিত করেছে,তা আগে কখনও দেখা যায়নি। গণজ্ঞাপণ বা মাস মিডিয়ার এই পণ্যগুলির উপস্থিতি পুরোপুরি ব্যক্তিভিত্তিক বা খুব বেশি রকমের পার্সোনালাইজড। এবং এই সব কনটেন্টগুলিই ব্যক্তি মানুষের মতামত গঠনেও ভালরকম প্রভাব ফেলে। সেকারণে সংবাদপত্র, রেডিও বা টিভির চেয়ে পরবর্তী পর্বের ডিজিটাল পণ্যগুলির সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি। ২ বিগত এক দশকে একটা বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, টুইটারের মত ডিজিটাল মাধ্যমগুলি গোড়ার দিকে ব্যক্তির মত প্রকাশের, অন্যমত জানার, মত বিনিময় করার হাতিয়ার হিসাবেই বিকশিত হয়েছিল। এগুলি আবার সহজে আত্মপ্রচারেরও মাধ্যম। আগে যে কোনও প্রচারই ছিল ব্যয়সাপেক্ষ। এখন নিজের বা নিজের ঘনিষ্ঠজনদের বিষয়ে লাগাতার প্রচার গড়ে তোলা যায় প্রায় নিখরচায় বা একেবারেই ন্যূনতম খরচে। এবং এই পণ্যের বিক্রিকে একেবার মাইক্রোস্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা এক ঘণ্টা, একদিন কিংবা একবছর — যে কোনও সময়ের জন্য ব্যবহার করা যায়। বিশ্বায়নের অর্থনীতির প্রোডাক্ট হিসাবে ডিজিটাল পণ্যগুলি প্রাথমিক স্তরে ছিল বিশ্বজুড়ে তথ্য জানা, তথ্য আদানপ্রদান ও মত বিনিময়ের হাতিয়ার। কিন্তু দুনিয়ায় নয়া উদারবাদী পুঁজির শোষণ যত তীব্র হল, যত বেশি করে নয়া উদারনৈতিক শাসন দেশে দেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হল, যত বেশি মতাদর্শ হিসাবে দক্ষিণপন্থা তার সামাজিক পরিসর বাড়িয়ে নিতে পারল, যত বেশি স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের আবির্ভাব ঘটতে লাগল, ততই বেশি করে নয়া উদারবাদী, দক্ষিণপন্থার অনুসারী রাজনৈতিক শক্তিগুলির জোরালো হাতিয়ার হয়ে উঠল ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, টুইটারের মত ডিজিটাল মাধ্যমগুলি। কারণ স্বৈরতন্ত্রী, দক্ষিণপন্থী শাসন দাঁড়িয়ে থাকে যুক্তির বিনাশের ওপর। অবিরত ভুল ও মিথ্যা প্রচারেই যুক্তির ধার ভোঁতা করে দেওয়া যায়। সেকারণে দক্ষিণপন্থীদের সাধারণ মানুষের মনোজগতে যুক্তির বিনাশ ও অযুক্তির সৌধ নির্মাণ চালিয়ে যেতে হয় অবিরত। এবং সেই কাজে সুপরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল পণ্যের ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠেছে দক্ষিণপন্থীরা। এই সব ডিজিটাল পণ্য যারা তৈরি করে ও বাজারে বিক্রি করে সেই সব পুঁজিবাদী সংস্থাও দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কারণ তারা চরিত্রের বিচারে সংগঠিত এবং বিশ্বায়িত নয়া উদারবাদী পুঁজির প্রতিনিধি। দক্ষিণপন্থী শাসকের সমর্থন জোগাড়ে ও দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ প্রসারে ডিজিটাল পণ্যগুলি কতদূর ভূমিকা পালন করতে পারে তার আদর্শ উদাহরণ আমেরিকায় ট্রাম্প এবং ব্রাজিলে বোলসোনারোর শাসনপর্ব। নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে তো বটেই,এমনকি প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উস্কানি দিতেও বিশেষ দড় এই সব মাধ্যমগুলি। ইদানীং লাতিন আমেরিকার নানা দেশে বামপন্থী সরকারগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একই কৌশল কাজে লাগাচ্ছে সেদেশের দক্ষিণপন্থীরা। বোঝাই যায়, পুঁজিবাদী মালিক ও পুঁজিবাদী শাসকের ভালরকম তালমিল ছাড়া এতটা সম্ভব হয় না। ডিজিটাল পণ্যকে ব্যবহার করে জনমানসে দক্ষিণপন্থার চাষ করার কাজে আরেকটি দক্ষ সংগঠন হল এদেশের ভারতীয় জনতা পার্টি। ট্রাম্প কিংবা বোলসোনারোদের চেয়ে বিজেপির দক্ষতা ও সাফল্য মোটেই কম নয়। টুইটারে গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার প্রথমে ট্রাম্পের ও তারপরে নরেন্দ্র মোদির। তাছাড়া সুসংগঠিত আইটি সেলের মাধ্যমে জমনতকে কীভাবে প্রভাবিত করার কাজে এদেশে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে বিজেপিই। সুতরাং চেতনার জগতে যদি দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে সংঘাত গড়ে তুলতে হয়, তাহলে কীভাবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই মাধ্যমগুলিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বিজেপি, তা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকাশের তারিখ: ২১-মে-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |