|
জ্ঞান ও শ্রমের বিভাজন এবং আজকের বিশ্বায়নসাত্যকি রায় |
পুঁজিবাদে এই বিভাজন উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত ও পুনরুৎপাদিত হতে থাকে। মানসিক শ্রমকে কায়িক শ্রম থেকে আলাদা করা হয় যাতে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর পুঁজির কর্তৃত্ব স্থাপন করা সুবিধাজনক হয়। মার্কস এই প্রক্রিয়ার বিস্তৃত বিবরণ ও বিশ্লেষণ করেছেন ক্যাপিটাল এর প্রথম খন্ডে যেখানে তিনি ম্যানুফ্যাকচারিং এর উন্মেষের আলোচনা করেছেন। আধুনিক পুঁজিবাদী উৎপাদনের আগে কারিগর বা আর্টিজান তার উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর পুরো নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত। বিকশিত পুঁজিবাদ এই প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারল নতুন কারখানাভিত্তিক শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থায় কায়িক ও মানসিক শ্রমের নির্দিষ্ট বিভাজন তৈরি করা হল। কিছু অল্পসংখ্যক লোক উৎপাদন পরিকল্পনা, ডিজাইন ইত্যাদি করবে, উৎপাদন সংগঠনের উপর নজরদারি করবেন। এরাই ম্যানেজার, সুপারভাইজার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি আর বাকি শ্রমিকদের কাজ হল চিন্তা না করে শুধু উপরের লোকদের নির্দেশ পালন করা। |
মানসিক ও কায়িক শ্রমের বিভাজন পুঁজিবাদের আগেও সমাজে বিদ্যমান ছিল। প্রাক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই বিভাজন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথার দ্বারা উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ এই বিভাজন সামাজিক প্রথার দ্বারা পুনরুৎপাদিত হত। যেমন আমাদের দেশের বর্ণাশ্রম প্রথা বংশানুক্রমিক ভাবে এই বিভাজনকে সুরক্ষিত করতে চেয়েছিলো। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই বিভাজন কোনো সামাজিক প্রথার দ্বারা সুরক্ষিত হয় না, বরং তা উৎপাদন প্রক্রিয়ার দ্বারাই প্রতিনিয়ত পুনরুৎপাদিত ও প্রসারিত হয়। কোন অংশের মানুষ কোন ধরণের কাজে নিযুক্ত হবে সেটা পুঁজিবাদে কোনো নিয়মে লেখা নেই কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ কায়িক শ্রম করবে এবং অল্পসংখ্যক মানুষ মানসিক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং তাঁদের আধিপত্য শ্রমজীবীদের উপর কার্যকরী হবে এটা উৎপাদন ব্যবস্থা ও বিভাজনের পরিকাঠামোর দ্বারা সুনিশ্চিত করা হয়ে থাকে। এটা মনে রাখা দরকার যে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে জ্ঞান ও দক্ষতার ধারণাটি রাজনৈতিক ভাবে তৈরি হয় অর্থাৎ এর সাথে ক্ষমতার কাঠামো ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। একজন পদার্থবিদ্যার বা অর্থনীতির অধ্যাপক তার নিজস্ব বিষয়ে পারদর্শী কিন্তু তাঁকে যদি বলা হয় কোনো একটি মরশুমে ফসল ফলিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে অথবা কাঠ কেটে দরজা বানিয়ে দিতে হবে অথবা সুস্বাদু কোনো খাবার প্রস্তুত করে দিতে হবে, এর প্রতিটি পরীক্ষায় উনি গোল্লা পাবেন। ঠিক যেমন একজন কৃষক, কাঠমিস্ত্রি বা রাঁধুনিকে যদি পদার্থবিদ্যা বা অর্থনীতি পড়ানোর পরীক্ষা দিতে হয় তবে তারাও সে পরীক্ষায় গোল্লা পাবেন। প্রশ্ন হল অধ্যাপকের কৃষি না জানাটা সম্মানের কিন্তু কৃষকের পদার্থবিদ্যা না জানাটা মূর্খামি। এখানেই জ্ঞান ও দক্ষতার রাজনৈতিক বিন্যাস সংজ্ঞায়িত হয়, মানসিক শ্রম কায়িক শ্রমের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পুঁজিবাদে এই বিভাজন উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত ও পুনরুৎপাদিত হতে থাকে। মানসিক শ্রমকে কায়িক শ্রম থেকে আলাদা করা হয় যাতে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর পুঁজির কর্তৃত্ব স্থাপন করা সুবিধাজনক হয়। মার্কস এই প্রক্রিয়ার বিস্তৃত বিবরণ ও বিশ্লেষণ করেছেন ক্যাপিটাল এর প্রথম খন্ডে যেখানে তিনি ম্যানুফ্যাকচারিং এর উন্মেষের আলোচনা করেছেন। আধুনিক পুঁজিবাদী উৎপাদনের আগে কারিগর বা আর্টিজান তার উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপর পুরো নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত। বিকশিত পুঁজিবাদ এই প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারল নতুন কারখানাভিত্তিক শ্রম বিভাজনের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থায় কায়িক ও মানসিক শ্রমের নির্দিষ্ট বিভাজন তৈরি করা হল। কিছু অল্পসংখ্যক লোক উৎপাদন পরিকল্পনা, ডিজাইন ইত্যাদি করবে, উৎপাদন সংগঠনের উপর নজরদারি করবেন। এরাই ম্যানেজার, সুপারভাইজার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি আর বাকি শ্রমিকদের কাজ হল চিন্তা না করে শুধু উপরের লোকদের নির্দেশ পালন করা। এই শ্রমবিভাজন আসলে উৎপাদনের উপর শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ বিপুল ভাবে কমিয়ে দিল। এই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হল ফোর্ডিজম-এর উৎপাদন সংগঠনের মধ্যে দিয়ে। উৎপাদন আরও গভীর ভাবে খণ্ডিত করা হলো অ্যাসেম্বলি লাইন এর মধ্যে দিয়ে। কোনো একটি টাস্কের বাইরে শ্রমিকের গোটা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো নিয়ন্ত্রনই থাকলো না। কায়িক শ্রমকে চিন্তার প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে উৎপাদনের উপর পুঁজির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অনেক দূর এগিয়ে গেল। আসলে সব ধরণের শ্রমেই চিন্তা ও শারীরিক শক্তির বিভিন্ন মাত্রায় সংমিশ্রণ ঘটে থাকে। শ্রমে চিন্তার ভাগ যত বেশি হবে পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকের ব্যক্তিগত দর কষাকষির সম্ভাবনা তত বেশি হবে। পুঁজিবাদের কাছে তা সর্বদাই বিপজ্জনক। সেই কারণে পুঁজি সর্বদাই চাইবে চিন্তার অংশকে শ্রম প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করতে। এই কাজ যেমন শ্রম বিভাজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কার্যকরী হয় সেরকম আরেকটি প্রক্রিয়া হল শ্রমের যান্ত্রিকীকরণ অর্থাৎ অটোমেশন বা মেশিনের ব্যবহার। কোনো একটি জটিল শ্রম প্রক্রিয়াকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধাপে বিভক্ত করে তাকে যদি কোডের সাহায্যে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা যায় তা হলেই ওই জটিল কাজ যন্ত্রের মধ্যে নিহিত করা সম্ভব হয়। এই প্রক্রিয়া পুঁজির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে নানা ভাবে সাহায্য করে। প্রথমত, যন্ত্র নির্বাক এবং তাকে যত সময় খুশি কাজে লাগানো যায়। যন্ত্র প্রতিবাদ করতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা হল পুঁজি যেহেতু যন্ত্রের মালিক তাই যন্ত্রের ক্ষমতা পুঁজির যোগ্যতা হিসেবে শ্রমিকের কাছেও প্রতিভাত হয়, যা শেষ বিচারে শ্রমিককে পুঁজির অধীনতা মানসিক ভাবে মেনে নেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। মার্কস একে জীবিত শ্রমের উপর উপর মৃত শ্রমের কর্তৃত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এ হল শ্রমের অবজেক্টিফিকেশন যা মেশিন বা কোনো সফটওয়্যার এর ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর। মেশিন বা সফটওয়্যার তৈরি হয়ে যাওয়ার পর তা একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য মাত্র যার উপর শুধুমাত্র ক্রেতার অধিকার আছে কিন্ত ওই যন্ত্র বা সফটওয়্যারের সৃষ্টিকর্তার কোনো অধিকার নেই। এটা কথা নয় যে যন্ত্র মানুষের শত্রু, সমস্যা হল একটি বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক অর্থাৎ পুঁজিসম্পর্কে পুঁজির অধীনস্ত যন্ত্র বা সফটওয়্যার মানুষের শত্রুতে পরিণত হয় কারণ এই প্রযুক্তির সুফল থেকে শ্রমিক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রযুক্তির সুফলকে ব্যবহার করে অর্জিত বর্ধিত মুনাফা কুক্ষিগত থাকে মুষ্টিমেয় পুঁজির মালিকদের হাতে। মানসিক ও কায়িক শ্রমকে আলাদা করা ও মানসিক শ্রমের মাধ্যমে সৃষ্ট জ্ঞানের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা এবং জ্ঞান উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত মানুষদের পুঁজির স্বার্থের অধীনে রাখা পুঁজিবাদের আধিপত্য কায়েম রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত। জ্ঞানজনিত আধিপত্যকে পুঁজির আধিপত্যের সঙ্গে এক করা যায় তখনই যখন জ্ঞান ব্যক্তিগত মালিকানার অধীন। এই কাজ করার জন্য পুঁজিবাদে নানা ধরণের প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয়েছে যেমন পেটেন্ট বা আরও নানা ধরণের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট। এই ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে অর্জিত মুনাফা প্রযুক্তির উদ্ভাবকের সঙ্গে কিছুটা ভাগ করে নেওয়া হয়। মানসিক ও কায়িক শ্রমের বিভাজনের ফলে জ্ঞানের অগ্রগতি সামাজিক শ্রমের মধ্যে দিয়ে ঘটলেও উদ্ভাবক একে সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতার ফসল হিসেবে ভাবতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভাবনের ফসল ব্যক্তি মালিকানায় কুক্ষিগত হওয়ার কারণে তা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও জ্ঞান চর্চার উপর সেই অংশের মানুষদের আধিপত্য বজায় থাকে যারা আগের অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণার উপর অধিকার কুক্ষিগত করে রাখতে পেরেছে। মানসিক ও কায়িক শ্রমের বিভাজন ক্রমাগত প্রসারিত হতে হতে এটি জ্ঞান ও শ্রমের বিভাজন হিসেবে প্রতিভাত হতে থাকে যেখানে জ্ঞান জনিত চর্চা কায়িক শ্রমের বিপরীতে অবস্থিত হয়। এই জ্ঞান জনিত চর্চার আধিপত্য ও কায়িক শ্রমের উপর তার কর্তৃত্ব আজকের পৃথিবীর আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর উৎপাদন ব্যবস্থা দুই অংশে বিভক্ত বলে মনে করা হয়: হেডকোয়ার্টার ইকোনমি আর ফ্যাক্টরি ইকোনমি। প্রথমটি বলতে বোঝায় উন্নত উচ্চ আয়ের দেশ এবং দ্বিতীয় ধরনের মধ্যে পড়ে উন্নয়নশীল ও নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশ সমূহ। এর তাৎপর্য হল প্রথম অংশের দেশ গুলি উৎপাদনের ভাবনা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত আর দ্বিতীয় ধরণের দেশগুলি ওই ভাবনা কাজে রূপান্তরিত করে উৎপাদন করে থাকে। উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক ধারণা সৃষ্টি, ডিজাইন, পরিকল্পনা ইত্যাদি করে থাকে উন্নত দেশগুলি। এই সম্পর্কিত গবেষণার জন্য বিপুল পরিমান পুঁজির দরকার যা এই দেশগুলির কাছে রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক ভাবে গড়ে ওঠা জ্ঞানের উপর কর্তৃত্ব ও মালিকানা। এছাড়া পুঁজির জোর থাকার কারণে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে মেধা জোগাড় করতে পারে এবং এর সাথে বিশ্বব্যাপী মার্কেটিং ও লজিসটিক্স-র উপরও কর্তৃত্ব করে থাকে। অন্যদিকে যারা মূলত ম্যানুফ্যাকচারিং করে সেই উন্নয়নশীল দেশগুলি মোট সৃষ্ট মূল্যের সবচেয়ে কম অংশ পেয়ে থাকে। একারণেই পৃথিবীর ম্যানুফ্যাকচারিং এর কাজে নিযুক্ত মোট শ্রমিকদের প্রায় ৮৩ শতাংশ নিম্ন আয়ের দেশগুলি থেকে হলেও মোট উৎপাদিত মূল্যের ৩১ শতাংশ এই দেশগুলির অধিকারে। আজকের পৃথিবীতে পুঁজির মুনাফা গড়ে উঠছে মূলত ধনী দেশের প্রযুক্তি ও উন্নয়নশীল দেশ গুলির সস্তা শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু এই সংযোগ সমতার সংযোগ নয় বরং সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার আধারে স্থাপিত। যে সমস্ত উপকরণগুলি ধনী দেশে বেশি পাওয়া যায় যেমন জ্ঞানসংক্রান্ত উপকরণ সেগুলির উপর মালিকানা সুরক্ষিত রাখা হয়েছে নানা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সাহায্যে। সব দেশের কাছে এই জ্ঞান সম্পর্কিত উপকরণ সহজলভ্য নয়। অথচ উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশ গুলিতে যে শ্রমিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিপুল পরিমানে রয়েছে তাকে উদারীকরণের নামে বিশ্ব পুঁজির কাছে হাট করে খুলে দেওয়া হয়েছে। এই বিশ্বায়ন তাই মানসিক ও কায়িক শ্রমের বিভাজন ও মানসিক শ্রমের আধিপত্যকে আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনের চেহারায় রূপান্তরিত করেছে। প্রকাশের তারিখ: ০৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |