মানবাধিকার লঙ্ঘনে সত্যি কি গদি হারায় কোন লিচ্ছবি রাজা?

অরুণাভ মিশ্র
গণতন্ত্রের প্রতি ছিল লিচ্ছবিদের অসীম শ্রদ্ধা। সমগ্র রাজ্য অসংখ্য ছোট ছোট প্রশাসনিক ভাগে বিভক্ত ছিল। ক্ষুদ্র গণপরিষদে সকলের ভোটাধিকার ছিল। সাধারণ গণপরিষদের সভাপতি বা গণমূখ্যও ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হতেন। মহাবীরের মামা চেতক বা চেড়গ ও এভাবেই গণমুখ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গণপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হতো। তবে লিচ্ছবি প্রজাতন্ত্রে মহিলা ও দাসেদের ভোটাধিকার ছিল না। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এখানে কতটা রক্ষিত হল তা পাঠক বিচার করবেন। 

সম্প্রতি প্রচার চলছে, 'এখন যে মানবাধিকার আন্দোলন বা মানবাধিকারের কথা শুনি আমরা, তা প্রাচীন ভারতবর্ষে বিদ্যমান ছিল। লিচ্ছবি রাজবংশের রাজা রাভাক বৈশালীতে অর্থাৎ বিহারে গদীচ্যুত হয়েছিলেন হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন বা মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণে’। এমন বিষয় বার বার আলোচনায় উঠে আসছে। আগে কৃতি ছাত্রছাত্রীদের সম্বর্ধনা সভায় উপরের আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি হাওড়ায় এক দুর্গাপূজার উদ্বোধনে গিয়ে একই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবার একই ধরনের কিছু কথা উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, ‘গ্রীসের গণতন্ত্র ৯৯ বছরের বেশি সার্ভাইভ করতে পারেনি। নার্ভাস নাইন। সেঞ্চুরির কাছে গিয়ে আউট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশের গণতন্ত্র প্রাচীন যুগ থেকে শক্তিশালী। আমরা পৃথিবীর মধ্যে প্রথম তামিলনাড়ুতে তালপাতাকে ব্যালট হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। বিহারে লিচ্ছবি রাজবংশের প্রথম রাজা রভক তার গদী হারিয়েছিলেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য, তাও বৈশালীর মানুষদের দ্বারা।’ 

ব্যালট ও গণতন্ত্র প্রসঙ্গে পরে কোনদিন আলোচনায় আসবো। আজ কেবল লিচ্ছবি রাজবংশ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে তাদের রাজার গদিচ্যুতির ইতিহাস নিয়ে চর্চা হোক। একথার সত্যতা খুঁজে দেখা দরকার।

২

ভারতের ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখি প্রাথমিক কৌমভিত্তিক গোষ্ঠীগুলি পিতৃতান্ত্রিক ছিল, এবং রাজা প্রথম দিকে কেবলমাত্র একজন নেতা ছিলেন সামাজিক প্রথা এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। ক্রমে ‘গোষ্ঠীভিত্তিক ব্যবস্থা’র পরিবর্তন হয় ও ‘নির্দিষ্ট ভূমি ভিত্তিক রাষ্ট্র’ গড়ে ওঠে। রাজতন্ত্র ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মধ্যগাঙ্গেয় উপত্যকায় ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ গড়ে ওঠার নিদর্শন পাওয়া যায় (সূত্র: অঙ্গুত্তরা নিকায়া)। এই জনপদগুলি হলো কাশী, কোশল, অঙ্গ, মগধ, বৃজি, মল্ল, চেদী, মৎস্য, শূরসেন, কুরু পাঞ্চাল, বৎস্য, অস্মক, অবন্তী, গান্ধার, ও কম্বোজ। এর মধ্যে বৃজিই ছিল অন্যতম অরাজনৈতিক জনপদ, যা আদপে একটি গণরাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। বৃজির অবস্থান ছিল উত্তর বিহার থেকে নেপালের তরাই অঞ্চল পর্য্যন্ত বিস্তৃত। এর রাজধানী ছিল বর্তমান মুজফ্ফরপুরের নিকট অবস্থিত বৈশালী। অনেকগুলি গোষ্ঠী বৃজিসঙ্ঘ গড়ে তুলেছিল। লিচ্ছবিরা তাদের অন্যতম। (সূত্র: ইতিহাস, ঐচ্ছিক পাঠ ৯, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়,  পৃ. ৬ - ১১)। বৃজিসঙ্ঘতে লিচ্ছবিরা ছাড়া বৈদেহী, তীরভুক্তি প্রভৃতিরাও ছিল। তবে বৃজিদের মুখ্য অংশ ছিল লিচ্ছবিরা।

রামায়ণ অনুসারে বৈশালিক বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইক্ষাকুর পুত্র বিশাল। মহাকাব্যের সুন্দর শহর ‘বিশালা’ এবং এই শহর সম্ভবতঃ অভিন্ন ছিল। 

‘বিশালং নগরীং রম্যং দিব্যং স্বর্গোপমং তদা’ (রামায়ণ, আদিকান্ড, ৪৫, ১০)

আবার বিষ্ণু পুরাণ বলে বিশাল ছিলেন ইক্ষাকুর ভ্রাতা নভাগের বংশধর (প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস, হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী, ১৯৮৯, পৃ. ১০২)। রাজা বিশাল থেকে বৈশালী নগরীর নামকরণের কথা অনেকে বলে থাকলেও, অনেকে আবার মনে করেন বৈশালী নগরীর নামকরণ তার বিশালতার কারণে। ইউয়ান - চুয়াং লিখেছেন "প্রাচীন বৈশালীনগর ৬০। ৭০ লী বিস্তৃত এবং নগরীর প্রাচীর বেষ্টিত অংশের পরিধি ৪।৫ লী। অর্থাৎ বুদ্ধঘোষ বর্ণিত তিনটি প্রাচীর বেষ্টিত অংশই ইউয়ান - চুয়াং এর 'প্রাসাদ নগরী', এবং উপকণ্ঠ লইয়া সমগ্র নগরটির পরিসর ছিল ২০ মাইল।" 

তিব্বতীয় দুলভে নিম্নলিখিত বিবরণ আছে:- বৈশালীতে তিনটি পরগনা ছিল প্রথম পরগনায় সুবর্ণ মিনার যুক্ত ৭০০০ গৃহ ছিল, মধ্যবর্তী পরগনায় রৌপ্য মিনারযুক্ত চতুর্দশ সহস্র গৃহ ছিল এবং তৃতীয় পরগনায়  তাম্র মিনারযুক্ত একবিংশ সহস্র গৃহ ছিল। পদমর্যাদা অনুসারে এই সকল গৃহে ধনী মধ্যবিত্ত ও দুঃস্থ লোকেরা বাস করিত। (উদ্ধৃত: বিমলাচরণ লাহা, লিচ্ছবি জাতি,প্রকাশক - শ্রী রঘুনাথ শীল, বিশ্ব ভান্ডার প্রেস, পৃ. ৪০, ৪১)

ইক্ষাকু পুত্র বিশাল লিচ্ছবিদের রাজধানী বৈশালী প্রতিষ্ঠা করেন ও তাদের বংশের শেষ রাজা সুমতি, এই তথ্য ডঃ ঝা-ও সমর্থন করেন। তারপর আর বৈশালী রাজ্যের কথা শোনা যায় না। মহাবীরের মা ত্রিশলা ছিলেন লিচ্ছবি কন্যা। তার ভাই চেতক ছিলেন বৈশালীর এক লিচ্ছবি রাজা। এই চেতক বা চেড়গ ৩০ বছর রাজ্য শাসন করেছিলেন। ( সূত্র:  Dr Hit Narayan Jha, The Licchavis (of Vaishali) , Chowkhamba Sanskrit series office, Varanasi -1,  India, 1970)।

 ৩

লিচ্ছবিরা ছিল বশিষ্ঠ গোত্রীয় এদেশীয় ক্ষত্রিয়। এরা বিষ্ণু, ব্রহ্মা, সূর্যের মতো হিন্দু দেব-দেবীদের পূজা করত। এমনকি বেদ এবং স্মৃতি পাঠও তারা করত। নিজেরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মাশ্রয়ী হলেও বৌদ্ধ এবং জৈনদের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল ছিল। শুধু শ্রদ্ধাশীল নয়, হেমচন্দ্রের মতে, তাদের জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের মতো অব্রাহ্মণ ধর্মের প্রধান রক্ষক হিসেবে দেখা যায়। যখন তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ব্যাপারে অবহেলা দেখাতে শুরু করেন তখন তাদের ব্রাত্যের পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া হয় (হেমচন্দ্র, ১০৪)। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শ্রদ্ধাশীল ছিল বলে তারা সকল ধর্মের মানুষের ভাবনা ও আদর্শকে সমান মর্যাদা দিত। ফলে লিচ্ছবিদের কোনো কোনো পরিবারে বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন দেবতার আরাধনা করতে দেখা যেত। 

বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হওয়ার আগেই বৈশালী পূর্ব ভারতের অন্যতম গণরাজ্য ছিল। বর্তমান বিহারের চম্পারণ, মুজফফরপুর এবং দ্বারভাঙ্গা জেলা জুড়ে ছিল প্রাচীন বৈশালী রাজ্যের অবস্থিতি (সূত্র: S Beal, Buddhist records, Vol ll; Cunningham, Ancient geography of India, 1924)। বৈশালী ছিল প্রজাতান্ত্রিক রাজ্য এবং সেখানে আইনের চোখে প্রত্যেকেই ছিল সমান। রাজ্য প্রশাসনে সকলেই সমান অধিকারে অংশ নিত। বৈশালীতে বসবাসকারী বাইরে থেকে আসা অতিথিদেরও নগরবাসী হিসেবে সমান অধিকার দেওয়া হতো। গণতন্ত্রের প্রতি ছিল লিচ্ছবিদের অসীম শ্রদ্ধা। সমগ্র রাজ্য অসংখ্য ছোট ছোট প্রশাসনিক ভাগে বিভক্ত ছিল। ক্ষুদ্র গণপরিষদে সকলের ভোটাধিকার ছিল। সাধারণ গণপরিষদের সভাপতি বা গণমূখ্যও ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হতেন। মহাবীরের মামা চেতক বা চেড়গ ও এভাবেই গণমুখ্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। গণপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হতো। তবে লিচ্ছবি প্রজাতন্ত্রে মহিলা ও দাসেদের ভোটাধিকার ছিল না। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এখানে কতটা রক্ষিত হল তা পাঠক বিচার করবেন। লিচ্ছবিদের একটা গুণ ছিল। তা হল, অপরাধ স্বীকার করার নৈতিক সাহস! তবে তাদের পুরুষদের চারিত্রিক বিশুদ্ধতা নিয়ে কোন বক্তব্য ছিল না, যদিও নারীদের একই অপরাধে প্রাণদণ্ড দেওয়া হতো। মানবাধিকারে এই বৈষম্য নজর করার মতো। তাদের প্রজাতন্ত্রে সুরূপা নারীকে বিবাহ না করে ‘নগরশোভিনী’ হয়ে থাকতে হতো গণের মানুষদের আনন্দ দেওয়ার জন্য (সূত্র: IHQ, Vol 23, 1947)। এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত সংস্কৃতিমনা গণিকা অম্বাপালীর কথা আসতে পারে। এও নিশ্চয়ই মানবাধিকার রক্ষার মধ্যে পড়ে না! এতসব ঐতিহাসিক তথ্য থাকলেও, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারনে  কোন লিচ্ছবি রাজা গদিচ্যুত হয়েছিলেন এমন ইতিহাস ডঃ ঝা এর বই থেকে পাইনি। (Dr H N Jha,1970)।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে লিচ্ছবিদের গণমুখ্য বা তাদের প্রজাতন্ত্রের প্রধান ছিলেন চেতক বা চেড়গ। চেড়গের বোন ত্রিশলার বিয়ে হয়েছিল নায়িক গণমুখ্য সিদ্ধার্থর সঙ্গে। সিদ্ধার্থ ও ত্রিশালার পুত্র ছিলেন মহাবীর, যিনি ২৪ তম জৈন তীর্থঙ্কর। পরে ভাগ্নের ধর্ম গ্রহণ করেন চেতক। ফলে বৈশালী জৈন ধর্মের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে ওঠে। লিচ্ছবি প্রজাতন্ত্র একটি গণসংঘ হিসেবে সংগঠিত ছিল। অর্থাৎ এটি ছিল একটি উপজাতীয় প্রজাতান্ত্রিক সংগঠন যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের বড় অংশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রজাতন্ত্র ছিল অভিজাত পৃষ্ঠপোষকতা যুক্ত প্রজাতন্ত্র। যেহেতু বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলিতে বারবার বৈশালীর কথা পাওয়া যায়, তাই বলা যায়, বৈশালী খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দে গৌতম বুদ্ধের জন্মের আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অতএব এটি বিশ্বের এক পুরনো নগর এবং সেখানে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকলে তা বেশ পুরোনো প্রজাতন্ত্র তাতে সন্দেহ নেই! 

৪

মজঝিম নিকায়ে বলা আছে, বজ্জি ও মল্লরা সঙ্ঘ বা গণ দ্বারা পরিচালিত হতো। কোন নৃপতি নয়, শাসনভার থাকতো জাতিসংঘ নির্বাচিত সম্মিলনীর হাতে ( পি টি এস, খণ্ড ১, পৃ - ২৩১)। গঙ্গার দক্ষিণে যে সময়ে মগধ দেশে শিশুনাগ, নন্দ ও মৌর্যবংশীয়গণের অধীনে এক সুবৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেইসময় গঙ্গার অব্যবহিত উত্তরে লিচ্ছবিগণ এক শক্তিশালী জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করিয়া বহুকাল ধরিয়া মগধ রাজগণের আক্রমণ ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছিল (বিমলাচরণ, পৃ. ৯৪)। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও আছে, "লিচ্ছবি, বৃজি, মল্ল, মদ্র, ককুর, কুরু, পাঞ্চাল প্রভৃতি জাতিসংঘের ব্যক্তিরা 'রাজশব্দোপজীবিন:' ছিল। অর্থাৎ তারা রাজা আখ্যা ব্যবহার করতে পারত (অর্থশাস্ত্র, শ্যামশাস্ত্রীর অনুবাদ, পৃ- ৪৪৫)। ললিতবিস্তরে আছে যে বৈশালীতে বয়স পদমর্যাদা উচ্চ নিচ ভেদ ছিল না; সেখানে "একৈক এব মন্যতে অহং রাজা অহং রাজেতি"  (ললিতবিস্তর, Ed by Left mann, Vol 1, p -21) । 

আবার একপন্ন জাতক ও ভান্ডারকরের মত অনুযায়ী সেখানে প্রতি ক্ষুদ্র সংঘের রাজার একজন উপরাজা, একজন সেনাপতি ও একজন ভান্ডাগারিক পদ ছিল। তাই  ক্ষুদ্র সংঘমুখ্য ব্যক্তিরা ‘রাজা’ উপাধি ব্যবহার করতে পারতেন বলেই মনে হয়। জাতিসংঘপ্রধান ছিলেন মুখ্য রাজা। 

বুদ্ধঘোষকৃত মহাপরিনিব্বানসুত্তন্তের অটঠকথায় লিচ্ছবিদের বিচার পদ্ধতির একটা বর্ণনা পাওয়া যায়। বজ্জি রাজাগণের নিকট কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি আনিত হইলে তাহারা তাহাকে বিনিচ্চয় মহামাত্যর কাছে পাঠাতেন। কোন লিচ্ছবি রাজাকে তেমন পাঠানো হয়েছিল তার নজির এই গ্রন্থে নেই।

লিচ্ছবিরা দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন ছিল এবং পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রীতে বিভিন্ন ধরণের রঙের ব্যবহার অত্যন্ত ভালোবাসত। সৌন্দর্যের প্রতি তাদের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। 

এই ইতিহাসের বাইরে রাভাক বা রভক বলে যার কথা বারবার উচ্চারণ করা হয়েছে তার কোন কথা ইতিহাসে নেই। তবে নভাগ বা নাভাগ বলে একজন লিচ্ছবি রাজার উল্লেখ দেখা যায় বিষ্ণু পুরাণে। এর কথা উৎসসহ হেমচন্দ্রের ইতিহাসেও আছে। বিষ্ণুপুরাণে মনু বংশের বিস্তার বলতে গিয়ে রয়েছে, - 

“সূর্য্য হতে মনু জন্মে ওহে মহামতি।

নয় পুত্র পায় মনু খ্যাত বসুমতী।।” 

মনুর এই নয় পুত্রের একজন নাভাগ। অন্যরা হলেন ইক্ষাকু, ধৃষ্ট, শর্যাতি, নরিষন্তি, পাংশু, নেদিষ্ট, করূষ, ও পৃষধ্র। (বৃহৎ বিষ্ণুপুরাণ, কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, প্রকাশক - সীতানাথ রায়, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ১৮৪)। এই বংশেই কয়েক প্রজন্ম পরে বিশাল নামে এক সন্তানের হাতে বৈশাল নামে বড় এক নগরী স্থাপনের কথা আছে বিষ্ণুপুরাণে। বৈশাল থেকে পরে নাম বৈশালী হয়ে থাকতে পারে। এজন্য এদের সকলকে বৈশালিক রাজা বলা হয়,- এমন কথাও বিষ্ণুপুরাণে আছে। নাভাগ থেকে সুমতি পর্যন্ত ৩৪ জন রাজার কথা বিষ্ণুপূরাণে রয়েছে। কিন্তু নাভাগের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে গদিচ্যুত হওয়ার কোন কথা বিষ্ণুপুরাণে দেখা যায়নি।

৫

হোরাস হেমেন উইলসন বিষ্ণুপুরাণ কে প্রাচীনতম পুরাণ বলে মনে করেন। তার মতে  এর রচনাকাল প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ । যদিও গেভিন ফ্লাডের মতে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে এই পুরান রচিত হয়। 

এখন প্রশ্ন, বিষ্ণুপুরাণকে কি আমরা ইতিহাস বলবো? অবশ্যই কোন পুরাণ বা ধর্মশাস্ত্রকে ইতিহাস বলা যায় না। বিষ্ণুপুরাণে মিথ আর ইতিহাস পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে আছে। তাতে রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী যেমন আছে, যেমন আছে বিষ্ণুর পৃথিবী সৃষ্টি করে মহাসাগরের মাঝে বসিয়ে তার ওপর পাহাড়, গাছ, প্রাণী সাজিয়ে দেওয়ার কথা, তেমনি তাতে আছে বৌদ্ধ ও শুঙ্গ বংশের কথাও। বিষ্ণু পুরাণে এও আছে দক্ষের জন্মের পর থেকে নর নারীর সংযোগে সন্তানের সৃষ্টি শুরু হয়েছে। তার আগে কেবল সংকল্প আর দর্শন বা স্পর্শেই সন্তান জন্ম নিতো।

“সংকল্প মাত্রেতে আর দর্শন মাত্রেতে।

সন্তান জন্মিত সব ইহার পূর্বতে।।” 

(বৃহৎ বিষ্ণুপুরাণ, কালীপ্রসন্ন, পৃ - ৪৯)

বিষ্ণুপুরাণ মানতে হলে আমাদের কোভিডের সময় ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক পরা ছিল শাস্ত্রীয় এক অনুচিত কাজ। ডাক্তাররা রোগী দেখার সময় প্রতিদিন বা অপারেশনের সময় প্রতিদিন যে কাজ করে থাকেন, তাকে এখানে শাস্ত্রীয় অনাচার বলা হয়েছে। বিষ্ণু পুরাণে আছে,- 

"নাসিকাতে বস্ত্র ঢাকা কখনো না দিবে। 

শাস্ত্রের বিধান এই অন্তরে জানিবে।।" 

(কালীপ্রসন্ন, পৃ- ১৬৪) 

তাই, বিষ্ণুপুরাণ একটি পৌরাণিক শাস্ত্র। মিথ ও ইতিহাস মেশা। সেখানে রাভাক বা রভকের কোন কথা নেই। অতএব, লিচ্ছবিদের সময়ে ভারতে যে গণতন্ত্রমূলক রাষ্ট্রপদ্ধতির প্রচলন ছিল তা নিয়ে কোন প্রশ্নই আসে না। নাভাগ বা নভাগ নামে কোন রাজাও তাদের থাকতে পারে। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘন করায় কোন লিচ্ছবি রাজা কে গণহস্তক্ষেপে গদীচ্যুত করার কোন নজির ইতিহাসে নেই! 


প্রকাশের তারিখ: ০১-নভেম্বর-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org