আজকের প্রেক্ষিতে শিক্ষা-সাক্ষরতার আন্দোলন

বিকাশ রায়
শিক্ষা উপরিকাঠামোর একটি প্রধান দিক, তাই শিক্ষার ধারাকে নিজ শ্রেণির স্বার্থে পরিচালিত করা শোষকের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন।  বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকার সাথে সমাজ বিবর্তনের স্তরগুলির যে সম্পর্ক বিদ্যমান, তার সাথে সঙ্গতি রেখেই শিক্ষার বিষয়টি বুঝতে হবে। সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছে সমাজ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। সমাজ ব্যবস্থার একাধিক অবস্থান মূলত গড়ে ওঠে প্রতিটি ব্যবস্থার অভ্যন্তরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর এবং প্রতিনিয়ত সম্পর্কের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এই বিবর্তনের মধ্য  দিয়েই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটেছে, শ্রমবিভাগ তৈরি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে উদ্বৃত্তসম্পদের, উৎপত্তি হয়েছে শ্রেণিবিভাজনের ।

পৃথিবীর বুক থেকে নিরক্ষরতা দূর করার প্রচেষ্টা দীর্ঘ দিনের। ১৯৬৫ সালে ইরানের তেহরানে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন থেকে স্থির হয় যে, পৃথিবী থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে সব দেশই উদ্যোগ নেবে। সে জন্য ১৯৬৬ সালে ঘোষণা করা  হয় যে, ৮ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসাবে পালন করা হবে। তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতি বছর ৮ই সেপ্টেম্বর পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। সেই হিসাবে এবারে ৫৭তম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হচ্ছে। আমাদের দেশও ওই তেহরান সম্মেলনের অংশীদার। এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের থিম হল - পৃথিবীর উত্তরণের জন্য সাক্ষরতা: স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন (Promoting literacy for a world in transition: Building the foundation for sustainable and peaceful societies)। ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের জমতিয়েনে অনুষ্ঠিত  এক সম্মেলন থেকে ফের বিশ্বের নিরক্ষরতা দূর করার জন্য আহ্বান জানানো হয়—যার ফলে পরবর্তী সময়ে সাক্ষরতার দশক পালিত হল। যদিও তার দশ বছর পরে ২০০০ সালে সেনেগালের ডাকারে অনুষ্ঠিত সম্মেলন থেকে আগের দশকের অগ্রগতির ভিত্তিতে শিক্ষার আরও অগ্রগতি ঘটানোর ও স্থায়ী উন্নয়ন গড়ে তোলার যে ডাক দেওয়া হয় তার অগ্রগতি আশাপ্রদ নয়। আসলে ধনবাদী দেশগুলি শিক্ষাকে তথা উন্নয়নকে খুব বেশি প্রসারিত করতে রাজি নয় তাদের শ্রেণিস্বার্থে। এবারে ইউনেস্কো-র রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে যে, পৃথিবীতে সাক্ষরতার প্রসার ধাক্কা খাচ্ছে। পাঠ্যের অর্থ বুঝে সাধারণ পাঠে দক্ষ ১০বছর পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭০ শতাংশ। বিপুল সংখ্যক শিশু বিদ্যালয় বহির্ভূত থেকে গেছে। আমাদের দেশের চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়।

১৯৪৫ সালের এই দিনেই ভিয়েতনামে সাক্ষরতার ডিক্রী জারি করেন হো চি মিন। বিদেশী শাসন থেকে ভিয়েতনামকে মুক্ত করে সেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষরতার কর্মকাণ্ডকে তিনি যুক্ত করে নিয়েছিলেন। এই গণশিক্ষার অভিযানকে দেশাত্মবোধক কাজ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল: 

“সাক্ষরতা কেন্দ্রে পড়া হল দেশপ্রেম, সাক্ষরতা কেন্দ্রে পড়ানো হল দেশপ্রেম। সাক্ষরতা আন্দোলনকে সাহায্য করাই হল দেশপ্রেম, অজ্ঞতার শত্রুকে ধ্বংস করার অর্থ হল ভিয়েতনামকে শক্তিশালী করা, নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে লড়াই হল বিদেশী আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধেই লড়াই করা”।

এই রকম আরও স্লোগান দেওয়া হয়েছিল: ‘যদি তুমি পড়তে পারো—পড়াও, যদি তুমি পড়তে না পারো—পড়ো’।

সাক্ষরতার প্রসারের জন্য ভিয়েতনামে নানা উদ্ভাবনী পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল। ফলে এই দিনেই পৃথিবীর একটি দেশ তাদের জাতীয়তাবোধের সঙ্গে, দেশাত্মবোধের সঙ্গে সাক্ষরতা প্রসারের কর্মসূচিকে যুক্ত করে নিয়ে বিশাল সাফল্য লাভ করেছিল – এই বোধ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

এই দিনটির আরও এক তাৎপর্য হচ্ছে যে, ১৯৮৭ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বুকে বিভিন্ন গণ-আন্দোলনের আঙিনায় থাকা নিরক্ষর মানুষদের সাক্ষর করে তোলা এবং তাদের পরিবারের বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী সমস্ত শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর ভাবনা নিয়ে গড়ে তোলা হয় বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি। মূলত সাংগঠনিক উদ্যোগে সাক্ষরতা প্রসারের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সচেতনতা ও সক্ষমতার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়েই সেই কাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় সাক্ষরতা মিশন স্থাপিত হলে ব্যাপকভাবে সাক্ষরতার অভিযান পরিচালিত হয়। এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ। এই কাজে বিরাট অগ্রগতি ঘটে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বুকে। কিন্তু যেখানে এই কাজের ধারাবাহিকতা রাখার দরকার ছিল দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করতে। তা না করে ক্রমে ক্রমে এই প্রকল্পের কাজকে ক্ষীণ করে দিয়ে ২০০৯ সালে সরকারের তরফে  সমস্ত কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সারা ভারতের জনগণনার সাম্প্রতিক তথ্য আমাদের হাতে নেই। কারণ ২০২১ সালের জনগণনা কোভিড অতিমারির অজুহাতে তা বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে এখন ভারতের জনসংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা-সাক্ষরতা, বাসস্থান ইত্যাদি  সাম্প্রতিক তথ্যগুলি যা জনগণনা থেকে পাওয়া যায়, সেগুলি  হাতের কাছে পাওয়া দুষ্কর। তবে বিগত  জনগণনা  অর্থাৎ ২০১১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, ভারতে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ ২৬ ভাগ মানুষ এখনো লেখাপড়া জানেন না। প্রায় ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতে  নিরক্ষরতার পরিমাণ তাহলে দাঁড়াচ্ছে  প্রায় ৩০ কোটির কাছাকাছি। এখন প্রশ্ন হল,  এই বিপুল  নিরক্ষরতা নিয়ে আমাদের দেশ কি এগোতে পারবে? আরও প্রশন আসে - এত বিপুল নিরক্ষরতা কেন? ‘সকলের জন্য শিক্ষা’র কথাটি বারবার উচ্চারিত হলেও বা বিভিন্ন গণ-আন্দোলন থেকে এই দাবি উত্থাপিত হলেও  তা রূপায়িত হয়নি বা উপেক্ষিত থেকে গেছে। এক কথায় বলা যায়, রাষ্ট্র সকলের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি। অথচ খুব ঘটা করে ‘স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব’ পালিত হচ্ছে, ‘নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ এই সময়ে লাগু হচ্ছে, ভারত ‘বিশ্বগুরু’ হতে যাচ্ছে - এই সব নানা বাক-বিভূতি ছড়ানো হচ্ছে। সেখানে এই বিপুল নিরক্ষরতা দূর করার কথা বা নিরক্ষরতাজনিত পশ্চাতপদতার কারণে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র ভাবনা যে ‘ব্রেক’ হতে পারে তার ন্যূনতম উদ্বেগের সুর শোনা যায় না কেন? কিন্তু একথা আমাদের কাউকেই বলে দিতে হবে না যে, যে মানুষগুলি এখনও নিরক্ষর আছেন, তাঁরা দরিদ্র এবং এই দারিদ্রের কারণেই তাঁরা স্বাস্থ্যহীনতা, বাসস্থানহীনতা, পুষ্টিহীনতার শিকার। এঁদের মধ্যেই শিশমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার বেশি। সর্বোপরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই মানুষগুলিই সর্ব প্রকারে অধিকারহীন। এই দরিদ্র, অধিকারহীন মানুষগুলিকে তাহলে কতটা অধিকার দেওয়া হয়েছে? এখানে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস্-এর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। এঙ্গেলস্ বলেছিলেন:” বুর্জোয়াজী যেহেতু শ্রমিকদের ততটুকুই জীবনধারণের সুযোগ দেয় যতটুকু নিতান্ত প্রয়োজন, সুতরাং আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, তারা শ্রমিককে ততটুকুই শিক্ষার সুযোগ দেয় যতটুকু নিজেদের (বুর্জোয়াদের) স্বার্থে প্রয়োজন”।

শিক্ষা উপরিকাঠামোর একটি প্রধান দিক, তাই শিক্ষার ধারাকে নিজ শ্রেণির স্বার্থে পরিচালিত করা শোষকের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন।  বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকার সাথে সমাজ বিবর্তনের স্তরগুলির যে সম্পর্ক বিদ্যমান, তার সাথে সঙ্গতি রেখেই শিক্ষার বিষয়টি বুঝতে হবে। সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছে সমাজ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। সমাজ ব্যবস্থার একাধিক অবস্থান মূলত গড়ে ওঠে প্রতিটি ব্যবস্থার অভ্যন্তরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর এবং প্রতিনিয়ত সম্পর্কের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এই বিবর্তনের মধ্য  দিয়েই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটেছে, শ্রমবিভাগ তৈরি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে উদ্বৃত্তসম্পদের, উৎপত্তি হয়েছে শ্রেণিবিভাজনের । সমাজ বিবর্তনের সঙ্গে যে শ্রেণিবিভাজন তৈরি হয়, সেই শ্রেণিগুলির মধ্যে চাহিদার ক্ষেত্রে অসম বিকাশ ক্রমশই বেড়ে ওঠে। আর এই চাহিদা পূরণের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষা ও জ্ঞান সম্প্রসারণের ইচ্ছা। এই বৈষম্যের অনিবার্য ফল হিসাবে শিক্ষাধারা সামগ্রিকভাবে দুটি ভিন্ন স্তরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি ধারাকে যদি বলা যায় সাক্ষরতা বিযুক্ত শিক্ষা তবে অপর ধারাটি হল সাক্ষরতা যুক্ত শিক্ষা।

ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদের বিন্যাস ও পুনর্বিন্যাসের যে প্রচেষ্টা তা থেকেই প্রয়োজন হয়েছে জ্ঞান ও শিক্ষার সম্প্রসারণ বা সংকোচন বা সংরক্ষণ। ভারতের মতো আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসক-শোষক শ্রেণি এই প্রচেষ্টাই চালিয়ে এসেছে। রাশিয়ার জারের আমলের শিক্ষানীতি সম্পর্কে টলস্টয় যে উক্তি করেছিলেন—যেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিক্ষা সংস্কার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, সেটি হল: “The strength of the Government lies in the people’s ignorance, and the Government knows this, and will therefore always oppose true enlightenment”. অর্থাৎ রাষ্ট্র-পরিচালকরা তাদের শ্রেণিস্বার্থে নিরক্ষরতা জিইয়ে রাখে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক আদর্শে যে সমস্ত রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেখানে সকলের শিক্ষার অধিকার স্বীকার করা হয় এবং সেই অনুযায়ীই রাষ্ট্রনীতি নির্মাণ হয়। ফলে সেই সমস্ত রাষ্ট্রগুলিতে নিরক্ষরতা প্রায় নেই। 

এখন প্রশ্ন আসে, আমাদের দেশ সকলের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি কেন? কারণ এটাই যে - (১)রাষ্ট্র তার প্রশাসনের সাহায্যে অসম বন্টনের ধারাকে অব্যাহত রেখেছে এবং (২) সমাজের উপরিকাঠামো যেমন চিন্তা-ভাবনার উৎস অর্থাৎ শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইত্যাদিকে পুরোপুরি শ্রেণিস্বার্থে নিয়োজিত করে, দরিদ্র-অধিকারহীন, শ্রমজীবি ও কৃষক সম্প্রদায়ের নিজস্ব মতাদর্শকে বিকৃত করে, সেখানে শোষক শ্রেণির মতাদর্শকে সর্বজনস্বীকৃত শ্রেণিনিরপেক্ষ মতাদর্শ হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর উদ্যোগ নিয়েছে।

দেশের স্বাধীনতার আগে প্রায় দু’শো বছরের ইংরেজ শাসন আমাদের দেশের আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে। শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে যখন পৃথিবীর দেশে দেশে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা-প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানোর প্রয়োজন ছিল, তখন ইংরেজ সরকার তা না করে ভারতে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের স্বার্থে শাসন চালিয়েছে এবং যতটুকু উন্নয়ন ঘটিয়েছিল তা ছিল তাদের শোষণ-শাসনের স্বার্থেই। ফলে শিক্ষাপ্রসারের ক্ষেত্রেও এই নীতি ও উদ্যোগের ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেখানে তাদের শাসন ও শোষণ বজায় রাখার স্বার্থে একটা ছোট শিক্ষিত বাহিনী তৈরি করেছিল এবং বাকিদের জন্য কোনো ব্যাপক উদ্যোগ ছিল না। তবে মিশনারিরা তাদের ‘বিশেষ লক্ষ্য’কে সামনে রেখে কিছুটা শিক্ষার উদ্যোগ নিলেও তা ছিল কয়েকটি শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে সকলের জন্য শিক্ষার দাবী উপেক্ষিতই থেকেছে। কারণ তা তারা তাদের শ্রেণি স্বার্থেই চায়নি।

স্বাধীনতার পরের চিত্রে দেখি যে, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর  ১৯৫০ সাল থেকে চালু হল সংবিধান। সেখানে বলা হল সংবিধান চালু হওয়ার পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে চৌদ্দ বছর পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। স্বাধীনতার পর প্রায় ৭৫ বছর পেরিয়ে গেল, এখন ও প্রায় শতকরা ২৬ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। বিশাল সংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে। ২০১০ সালে ‘শিশুর শিক্ষার অধিকার আইন-২০০৯’ লাগু হয়েছে, কিন্তু তাও অসম্পূর্ণ। সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ রূপায়ণের কাজ চলছে, সেখানে শিক্ষার অধিকারটাই থাকে কিনা সেই প্রশ্নটাই সামনে আসছে। শিক্ষার মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে - শিক্ষাকে তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি হাতে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারও ওই জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়নের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বহু বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, কোভিড উত্তর পরিস্থিতিতে নানা কারণে  সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, ফলে বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষার আঙিনার বাইরে চলে গেছে। ওইশিশুদের শিক্ষার আঙিনায় আনার কোন আন্তরিক উদ্যোগ সরকারি পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে  আমাদের নজরে আসে না—কিছু মামুলী উদ্যোগ ছাড়া। অনলাইন শিক্ষা যে সকলের জন্য নয় তা প্রমানিত হয়েছে। ফলে ‘সকলের জন্য শিক্ষা’র কথা বলা হলেও তা যে ‘সকলের জন্য’ নয় তাও প্রমানিত হচ্ছে। এখানে একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আসে তা হল, ইংরেজ সরকার না হয় বিদেশী সরকার, তারা না হয় ভারতে শিক্ষা প্রসারে বাধা দিল। কিন্তু ভারতের স্বাধীন সরকারগুলো শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন? ‘শিশুর শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯-এর কী হবে - এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে বয়স্ক শিক্ষাকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সেখানে বিদ্যালয়ে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র অনলাইনে চালানোর কথা, তাই তার পরিচালনার দায়িত্ব জাতীয় মুক্ত বিদ্যালয়কে দেওয়া হয়েছে। ভারতে যে বিপুল পরিমাণ নিরক্ষরতা আছে, তাতে করে সে কাজে এই ধরনের ভাবনা শুধু বয়স্ক শিক্ষার গুরুত্বকে খাটো করে দেখায় নয়—তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

ফলে আমরা দেখতে পাই যে ,শিক্ষা-সাক্ষরতা শ্রেণি নিরপেক্ষ নয় – তারও শ্রেণিভিত্তি আছে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি প্রায় ৩৫বছরের পথ চলতে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তৈরি  হওয়া সংগঠন - অগ্রগতি আন্দোলনে ঘটেছে। সেই প্রেক্ষিতে সাক্ষরতা আন্দোলনের কর্মী –সংগঠকদের  সামগ্রিক বিষয়টিকে পর্যালোচনা করে বুঝতে  হবে যে, এই সংগঠন - আন্দোলনের অগ্রগতি ঘটানোর প্রক্রিয়াটি কোন স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তার ফসল নয়। পিছন ফিরে তাকালে তার এক বিশাল অতীত দেখতে পাওয়া যাবে। পরাধীন ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা মানুষের সাথে সংযোগ গড়ে তোলার মাধ্যম  হিসাবে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদানত হয়ে থাকা সম্বন্ধে মানূষের মনে ঘৃণা সৃষ্টি করার জন্য সান্ধ্য বয়স্ক শিক্ষার কেন্দ্র চালু করতেন। এ প্রসঙ্গে বেঙ্গল সোস্যাল সার্ভিসের নাম উল্লেখ্য। বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলি শ্রমিকদের জন্য বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র চালু করত। পরে কৃষক ও ছাত্র আন্দোলন সাধারণ মানুষকে লেখাপড়া শেখানোর কাজ করেছে। এই প্রেক্ষিতে চারের দশক থেকে সাতের দশক পর্যন্ত  গণ-আন্দোলনগুলির কথা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন ১৯৭২ সালে রাজ্য কাউন্সিল সভার গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী রাজ্যের কয়েকটি জেলায়  সাংগঠনিক উদ্যোগে বয়স্ক শিক্ষার কেন্দ্র চালু করে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়। এই সময়ে ১৯৭৪ সালে তৈরি হয় হুগলী জেলা নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও জনশিক্ষা প্রসার সমিতি, ১৯৭৬ সালে ঝাড়্গ্রাম মহকুমা জনশিক্ষা প্রসার সমিতি। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি মানুষকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করার কাজে রত ছিল। ১৯৭৭ সালে সারা দেশে বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়। আমাদের রাজ্যেও এক নতুনতর পরিস্থিতি আমরা লক্ষ করেছি। সেই সময়ে রাজ্যে যে তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয় তা হল - ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত এবং শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ। এই তিনটি মূল কাজে সাফল্য আনতে সব থেকে আগে যা প্রয়োজন তা হল শিক্ষার প্রসার ঘটানো। আমরা, সাক্ষরতা আন্দোলনের কর্মীরা, সাক্ষরতার পাশাপাশি সচেতনতা ও সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিয়ে থাকি। লেনিন বলেছিলেন- ‘Illiterate masses can have no socialism’ এই কথা আমরা বিশ্বাস করি।

এই পরিস্থিতিতে সাক্ষরতা আন্দোলনকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার জন্য ব্যাপকতম মঞ্চ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি স্কুলে না যাওয়া বা কোভিড অতিমারির সময়ে স্কুল বন্ধ থাকা বা অনলাইন ব্যবস্থার কারণে যে সমস্ত শিশু স্কুলছুট হয়েছে, তাদের নিয়ে বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষা সহায়ক কেন্দ্র এবং ঐ সমস্ত শিশুদের বাবা-মা বা এলাকার বয়স্ক নিরক্ষর পুরুষ–মহিলাদের নিয়ে বিদ্যাসাগর বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করছে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি অনুযায়ী। সেই সাথে সর্বভারতীয় স্তরের সংগঠনগুলির সঙ্গে মিলিত হয়ে বিজ্ঞানচেতনা প্রসার ও কেন্দ্রের নতুন জাতীয় শিক্ষা নীতির (২০২০) বিরুদ্ধেও আন্দোলন করছে। বিশেষ বিশেষ দিবস পালন করে চেতনা প্রসারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসবই বাস্তব পরিস্থিতির প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এজন্য সেই সমস্ত গণসংগঠনগুলি যাদের মধ্যে নিরক্ষর মানুষ আছেন এবং সেই সমস্ত গণসংগঠনগুলি যাদের মধ্যে কোন নিরক্ষর মানুষ নেই - এই দুই ধরনের গণসংগঠনগুলির সম্মিলিত উদ্যোগে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতিকে যুক্ত করে পশ্চিমবঙ্গের বুকে একদিকে সাক্ষরতা-সচেতনতা-সক্ষমতা প্রসারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষার উপর নেমে আসা যাবতীয় আক্রমণগুলির বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ করতে হবে। কারণ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের লক্ষ্যই হল মানুষের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া। ফলে শিক্ষার অধিকার অর্জন এবং সেই সাথে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ও যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাশ্রয়ী সমাজ গড়ে তুলতে শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে হবে। 

আলোচনার কলেবর খুব বেশি না বাড়িয়ে যে কথা বলতেই হবে তা হল, নবজাগরণের যুগ থেকে যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী আমরা, সেই প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক সাক্ষরতা আন্দোলনকে দেখতে হবে। মানুষকে অন্তর থেকে জাগিয়ে তোলা  এবং সেই সঙ্গে নিজের সক্রিয়তাকে আর একটু বাড়িয়ে তোলা আমাদের কাজ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্তের শিক্ষাভাবনার চর্চা আরও বেশি করে করতে হবে। শিক্ষিত সমাজকে এই কাজে যুক্ত করতে আমাদের আরও বেশি মনযোগী হতে হবে। শিক্ষা-সাক্ষরতার আন্দোলন শ্রেণিনিরপেক্ষ আন্দোলন নয়—সামগ্রিক শ্রেণি-আন্দোলনের অংশ হিসাবেই তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যত্নবান হতে হবে।

 


প্রকাশের তারিখ: ০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org