|
মন্বন্তরের আটদশকটিম মার্কসবাদী পথ |
দেশের ৭৪.১ শতাংশ, সংখ্যায় ১০০ কোটির বেশি মানুষের নেই স্বাস্থ্যকর খাবারের সামর্থ্য! শুনিয়েছে ফাও, আইএফএডি, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি এবং হু’র যৌথ সমীক্ষা– দ্য স্টেট অফ ফুড সিকিওরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, ২০২২। সেই নিয়েই ২৫-৩১ আগস্ট, মার্কসবাদী পথে সাতদিনে সাতলেখা। লিখছেন উৎসা পট্টনায়েক, সৌমিত্র লাহিড়ী, সৈকত ব্যানার্জী, সুচিক্কণ দাস, সাত্যকি রায়। |
‘অন্ধকার সময়ে কি গান হবে না?’ ১৯৩৯, ব্রেখট বললেন, ‘হবে, অন্ধকার সময়কে নিয়েই গান হবে।’ সেই সময়টাকে চেনানোর গান। ১৯৪৩, লেখক-সাহিত্যিক গোপাল হালদারকে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশী বললেন, ‘তোমরা এই মন্বন্তরের কালকে সাহিত্যে এক্সপ্রেশন দিচ্ছ না কেন?’ বিস্ময়চোখে গোপালবাবুর জিজ্ঞাসা, ‘কিভাবে দেব?’ শুনে যোশীর পরামর্শ, ‘পারো যদি তাহলে নভেল লেখো।’ পরে সেই রচনার তাগিদ থেকেই গোপাল হালদার লিখলেন মন্বন্তর নিয়ে তাঁর বিখ্যাত ট্রিলজি— পঞ্চাশের পথ, ঊনপঞ্চাশী আর তেরশ’ পঞ্চাশ। অক্টোবর, ১৯৪৪। পঞ্চাশের পথ উপন্যাসের প্রথম প্রকাশ। পরম সুহৃদ ‘কমরেড রেবতী বর্মণ’কে উৎসর্গ করা উপন্যাসটিতে ‘ঘটনাই মহানায়ক’। গোপালবাবুর নিজের কথায়, ‘সত্যিকারের যে কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে গেলে এই হয় সমস্যা। ঘটনাকে বিকৃত করা চলে না, মানুষকে অবান্তর করে তোলাও চলে না। সেরূপ উপন্যাসে আসলে ঘটনাই মহানায়ক।’ সবিনয়ে তাঁর অকপট ভাষ্য, ‘সাহিত্যকর্মের দিক থেকে বুঝছিলাম, এ মন্বন্তর একইসময় মহাকাব্য ও মহাট্র্যাজিডি, তাকে রূপ দেওয়ার মতো শক্তি ও সাধনা আমার কই?’ ঊনপঞ্চাশী-তে যেমন বলেছেন, ‘এ গ্রন্থ ইতিহাস নয়, ঐতিহাসিক কথাচিত্র, অর্থাৎ ইতিহাসকে বিকৃত না করেও স্বীকার করা মানুষকে; আবার কোনো একজনার কথাকে একান্ত না করে প্রাধান্য দেওয়া নানা মানুষের কথাকে, ঘটনা-চিত্রকে।’ মন্তন্তরের ওই সময়ে তেরশ’ পঞ্চাশ প্রথম আটমাসেই শেষ। বছর ঘুরতে বের করতে হয় দ্বিতীয় সংস্করণ। হালের গরু কবেই বিকিয়ে গিয়েছে। বেহাত এক টুকরো জমিও। গ্রামে কাজ নেই। ভাত নেই। ভিটেমাটি বিক্রি করেও চাল জোটানো দুস্কর। বাজারে চালের দাম চড়া। গাঁয়ের মায়া কাটিয়ে গ্রামবাংলা অচেনা শহরে। কঙ্কালসার, ক্ষয়াটে শরীরের মিছিল। ‘এট্টু ফ্যান দাও মা!’ অসহায় আর্তনাদ। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা লাশ। শকুনে, শেয়ালে টানাটানি। ব্ল্যাকআউট, কালোবাজারি— নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয়। তিরিশ লাখ মানুষের বেঘোরে মৃত্যু। চার্চিলের তাচ্ছিল্য, ওরা খরগোশের মতো বাচ্চা পাড়ে! ১৯৪৩, ব্রিটেনের কেম্ব্রিজ মজলিস থেকে বের হয় একটি পুস্তিকা - দ্য ম্যান মেড ফেমিন। লেখক জ্যোতি বোস, বসু নয়। জ্যোতি বসু তখন লিখতেন এই ছদ্মনামে, যেমন সুশোভন সরকার লিখতেন ‘অমিত সেন’ নামে। অমর্ত্য সেনের বয়স তখন দশ। চারদশক পরে লিখছেন দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধা ও অপুষ্টি শুধু খাদ্যের অপ্রতুলতার কারণে হয় না। প্রাচুর্যের মধ্যেও থাকতে পারে ক্ষুধার্ত মানুষ। সেটা এ কারণে যে সমাজের কিছু মানুষের আয় একেবারেই কম। মন্তন্তরের সেবছরই বোম্বাইয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেস। মঞ্চে মার্কস এঙ্গেলস লেনিন স্তালিনের পোর্ট্রেট আঁকলেন চিত্তপ্রসাদ। সেসময়ই ওই শহরে গণনাট্য সংঘের জন্ম। পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষে বিজন ভট্টাচার্য মঞ্চস্থ করেন আগুন। পরে জবানবন্দি। শেষে চুয়াল্লিশে নবান্ন। মন্বন্তরের ছবি নিয়ে চিত্তপ্রসাদের হাঙরি বেঙ্গল। ব্রিটিশরা বাজেয়াপ্ত করে তার পাঁচ হাজার কপি। সোমনাথ লাহিড়ী তখন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি। চোখের সামনেই মন্বন্তর। বাংলা ১৩৫০। সোমনাথ লিখলেন ছোটগল্প ১৯৪৩। পরে উনিশশো চুয়াল্লিশ। আসলে মন্বন্তরের ডকুমেন্টশন। গোপাল হালদারের মতোই তথ্যনিষ্ঠ ও ইতিহাসনিষ্ঠ। দলে দলে মরছে, তবু ছিনিয়ে খায়নি। ছিনিয়ে খায়নি কেন— লিখলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আগে সাড়ে সাত সের চাল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখলেন, গ্রাম উঠে গিয়েছে শহরে/ শূন্য ঘর, শূন্য গোলা/ ধান-বোনা জমি আছে পড়ে।/ শুকনো তুলসীর মঞ্চে/ নিস্প্রদীপ অন্ধকার নামে/ আগাছায় ভরেছে উঠোন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিবৃতি: আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে/ জমে ভিড় ভ্রষ্টনীড় নগরে ও গ্রামে/ দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল/ প্রত্যেক নিরন্ন প্রাণে বয়ে আনে অনিবার্য মিল। রেডিওতে বক্তৃতা দিতে ঘাটশিলা থেকে কলকাতায় এসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার হাহাকার দেখে লিখলেন অশনি সংকেত, পরে সত্যজিৎ রায় একই নামে তার ছবি বানালেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, সমরেশ বসুর তিনটি গল্পে ১৯৩৩, ১৯৪৩ ও ১৯৫৩’র ঠিকানা বসিয়ে মৃণাল সেন করলেন কলকাতা একাত্তর। পর্দায় আকালের সন্ধান। স্বাধীনতার সাতাত্তর। রিপাবলিক অব হাঙ্গার! এক ক্ষুধার সাধারণতন্ত্র! ২০২২, বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭। রোয়ান্ডা, নাইজিরিয়া, ইথিওপিয়া, কঙ্গো, সুদানের মতো আফ্রিকার হতদরিদ্র দেশগুলিও আমাদের চেয়ে এগিয়ে। দেশের ৭৪.১ শতাংশ, সংখ্যায় ১০০ কোটির বেশি মানুষের নেই স্বাস্থ্যকর খাবারের সামর্থ্য! শুনিয়েছে ফাও, আইএফএডি, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি এবং হু’র যৌথ সমীক্ষা– দ্য স্টেট অফ ফুড সিকিওরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, ২০২২। সেই নিয়েই ২৫-৩১ আগস্ট, মার্কসবাদী পথে সাতদিনে সাতলেখা। লিখছেন উৎসা পট্টনায়েক, সৌমিত্র লাহিড়ী, সৈকত ব্যানার্জী, সুচিক্কণ দাস, সাত্যকি রায়। প্রকাশের তারিখ: ২৫-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |