|
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব-৮)আর বি মোরে |
একবার উনি আগেভাগেই খবর পেয়ে যান যে এক পুলিশ ওঁকে গ্রেপ্তার করতে চলেছে; সেই ইন্সপেক্টরের উপরই উনি কড়া নজর রাখতে শুরু করেন। একদিন, ইন্সপেক্টর ঘোড়ায় চেপে টহলে বেড়িয়েছেন একা। চন্দ্রায়া ওঁকে থামিয়ে বলেন যে পুলিশ অফিসার যদি ঘোড়া থেকে নামেন তাইলে ওকে ডাকসাইটে ডাকাত চন্দ্রায়ার খোঁজ দেবেন উনি। পুলিশ ইন্সপেক্টর ঘোড়া থেকে নামামাত্র ওকে গাছে বেঁধে ঘোড়া নিয়ে চম্পট দেয় চন্দ্রায়া। লোকের মুখে মুখে ওঁকে নিয়ে এই গল্প প্রচলিত ছিল। তালেবাসীদের মধ্যে এ-জাতীয় অসংখ্য কিংবদন্তির চল ছিল। এক-আধবার গরিব মানুষকে অর্থসাহায্যও করতেন বলেও জানা যায়। |
[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ। প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ] বিয়ের পাঠ চুকে গেলে, আমার পড়াশোনার প্রশ্নটা ফের মুখ্য হয়ে ওঠে। মানগাঁও তেহসিলের তালের অন্তর্গত খত মহাজনের গ্রামে একখানা বড়ো মারাঠি স্কুল ছিল। সেখানে ইংরেজি তৃতীয় শ্রেণি অবধি পড়াশোনা চলত। সেই গ্রামেই মাহারদের স্কুলও ছিল একটা। আমার শ্বশুর ছিলেন সেই স্কুলের শিক্ষক। বিয়ের পরপর উনি আমায় তালেতে নিয়ে গিয়ে সেই বড়ো স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে আমাকে ভর্তি করানোর জন্যে চেষ্টা চালাতে লাগলেন। গোড়ায় সেই স্কুলের ডিরেক্টর মুখের উপর না-করে দিল। পরে, কিছু প্রভাবশালী মানুষের মধ্যস্থতায়, উনি স্কুল রেজিস্টারে আমার নাম তুলতে রাজি হলেন। আমাকে কোথায় বসানো হবে তার জন্যে এক পরিকল্পনা ফাঁদা হল। তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসঘর লাগোয়া একটা জানালা ছিল বাইরের দিকে মুখ করে। আড়াই-তিন ফুট লম্বা জানালাটার গা ঘেঁষে বাইরে একটা মাচা বাঁধা হবে। ছোট্ট মই বেয়ে সেই মাচাতে উঠে বসে ক্লাসঘরের দিকে মুখ করে আমি থাকতে পারব, শিক্ষকদের সঙ্গে মৌখিক আদানপ্রদানটুকুও এতে করা যাবে, আবার কারও সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি যাতে না-হয় তা-ও নিশ্চিত করা যাবে। আমার শ্বশুর-দাদা এই প্রস্তাবে রাজি হন আর পরদিন চারজন মজুর ভাড়া করা হয় মাচাটা শক্ত করে বাঁধতে। স্কুলপ্রাঙ্গণেই একটা নান্দুকি গাছের কিছু ডালপালা কেটে দাদার তত্ত্বাবধানেই দুইদিনের মধ্যে মাচাটি বানানো সম্ভব হল। এরপরে দাদা আমায় স্কুল, ক্লাসঘর, আমার বসবার জায়গা দেখাতে নিয়ে গেল আমায়। গোটা বন্দোবস্ত দেখে আমি দাদাকে স্পষ্ট বলি আমি এইভাবে স্কুলবিল্ডিংয়ের বাইরে বসে ক্লাস করতে প্রস্তুত নই— “মাহাদের স্কুলে ওরা আমায় ক্লাসঘরের বাইরে আলাদা করেই বসতে দিত ঠিকই, কিন্তু আমি অন্তত স্কুলবাড়ির মধ্যেই থাকতে পারতাম। এইখানে একটা মাচায় স্কুলবিল্ডিংয়ের বাইরে একখানা জংলিজমির মধ্যে বসে ক্লাস করতে বাধ্য আমি। এ আমার মোটে পছন্দ না!” দাদা ও আরও কিছুজন আমাকে রাজি করাতে অনেক কসরত করল, কিন্তু তাতে কোনও লাভ হল না। দু-তিন দিন বাদে দাদা আমার ব্যাপারটা বুঝতে পারে, আমাকে ওই স্কুলে পাঠাবার যাবতীয় পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। মাহাদে পয়সার অভাবে আমাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। এখানে পয়সার অভাব ছিল না, বরং পয়সা থাকলেও অস্পৃশ্যতার সমস্যা আমার পথের কাঁটা হয়ে ওঠে। মোদ্দায় আমার পড়াশোনার পাঠ আর্থিক আর সামাজিক টানাপোড়েনে থমকে গেল কিছুকালের জন্যে। যখন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল যে আমায় কোনও স্কুলে পাঠানো হবে না, তখন তালের কাছে চড়াই গ্রামে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল অতিথি হিসাবে। আমার বউয়ের দাদু থাকত সেইখানে। ওঁর নাম ছিল পুতালাজি আর ওঁর নিজস্ব জমিতে ফি-বচ্ছর এক হাজার টাকার ফসল হত। সেই সময়ে উনি ছিলেন গ্রামের পুলিশ পাতিল। বর্ষাকালেও ওঁর গোলাঘরে বিশ-চল্লিশ খানা চালের বস্তা থাকত। ওঁর বাড়িতে রোজই চার-পাঁচটা বড়ো ভাঁড়ে দুধ আসত। এতটাই ধনী ছিলেন উনি! ওঁর ছেলেমেয়েরা দাশগাঁওতে বিয়ে উপলক্ষ্যে এলেও উনি নিজে আসেননি। চড়াইতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ওঁর সঙ্গে মোলাকাত করতে চেয়ে। উনি, ওঁর স্ত্রী আমাদের সাদরে বরণ করলেন, আন্তরিক আপ্যায়ন করলেন। চড়াই থেকে আমি তালেতে ফিরলাম। কিছুদিন বাদে দাশগাঁওতেই আমায় ফিরত পাঠানো হল। তালে যাবার পথে এক ডাকাতের সঙ্গে যাত্রায় পাঠানো হয়েছিল আমায়। এইখানে এই কাণ্ড নিয়ে আমি দু-চারকথা বলতে চাই। তালে থানা এলাকায় সেইকালে কুখ্যাত ডাকাত চন্দ্রায়া কাটকারির রমরমা ছিল। ওকে নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত ছিল। বড়োলোক আর সরকারি কর্মচারিদের ভীতির কারণ হয়ে উঠেছিল এই ডাকাত। কেউ যদি কোনও গরিবের উপর অকথ্য অত্যাচার চালাত, তাইলে উনি তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতেন। খত মহাজনদের উপর ওঁর প্রভাব ছিল যথেষ্ট। পুলিশ ওঁর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারত না। একবার উনি আগেভাগেই খবর পেয়ে যান যে এক পুলিশ ওঁকে গ্রেপ্তার করতে চলেছে; সেই ইন্সপেক্টরের উপরই উনি কড়া নজর রাখতে শুরু করেন। একদিন, ইন্সপেক্টর ঘোড়ায় চেপে টহলে বেড়িয়েছেন একা। চন্দ্রায়া ওঁকে থামিয়ে বলেন যে পুলিশ অফিসার যদি ঘোড়া থেকে নামেন তাইলে ওকে ডাকসাইটে ডাকাত চন্দ্রায়ার খোঁজ দেবেন উনি। পুলিশ ইন্সপেক্টর ঘোড়া থেকে নামামাত্র ওকে গাছে বেঁধে ঘোড়া নিয়ে চম্পট দেয় চন্দ্রায়া। লোকের মুখে মুখে ওঁকে নিয়ে এই গল্প প্রচলিত ছিল। তালেবাসীদের মধ্যে এ-জাতীয় অসংখ্য কিংবদন্তির চল ছিল। এক-আধবার গরিব মানুষকে অর্থসাহায্যও করতেন বলেও জানা যায়। চড়াইয়ের পুটল্য মাহার পাতিল ধনী হলেও ওঁর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, চন্দ্রায়া মাঝেমধ্যেই ওঁর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেন। ওঁর সূত্র ধরে আমার শ্বশুরও চন্দ্রায়ার পরিচিত হয়ে ওঠেন। দাদাকে চন্দ্রায়া অত্যন্ত সম্মান করতেন, এমনকি ধনসম্পদ, হিরে-জহরত পর্যন্ত উপহার দিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু দাদা ওঁর থেকে কখনওই কিছু গ্রহণ করেননি। বরং, দাদা ওঁকে বোঝাতেন যাতে এই ডাকাতির জীবন, চৌর্যবৃত্তির পথ পরিত্যাগ করে জীবনে সৎপথে আসেন। পুলিশের ধরা-ছোঁয়া থেকে বাঁচতে আধাগোপনেই তিনি চলাফেরা করতেন বলা চলে। কিছু সময় মধ্যরাতে দাদার কাছে আসতেন। আমি একবার দাদাকে বলেছিলাম গাঁয়ের যাত্রা দেখতে আমার মন কাঁদে। এর কিছুদিনের মাথায় চন্দ্রায়া দাদাকে দেখতে আসে। ঠিক সেসময় একখানা যাত্রা হচ্ছিল। ও আমায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সেই গ্রামে নিয়ে যায় যেখানে যাত্রাখানা হচ্ছিল। যাত্রাটা হচ্ছিল ঘন জঙ্গলের ঠিক লাগোয়া মাঠে। যাত্রায় পৌঁছাতে যখন আর এক মাইলও বাকি নেই, উনি আমায় বললেন যে উনি জঙ্গলে অপেক্ষা করবেন— ‘তুই যা। যাত্রা দেখে আয়। শেষ হলে আমার সঙ্গে ঠিক এইখানে এসে দেখা করবি। আমরা একসঙ্গে ফিরে যাব তালেতে। কাউকে বলবি না যে তুই কে কিম্বা কার সঙ্গে এসেছিস।’ আমি ওঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করলাম। ভোর হবার আগেই আমাকে উনি তালে নিয়ে দাদার কাছে পৌঁছে দিলেন। এর দু-তিনদিন পরে আমি দাদার থেকে জানতে পারি যে আমাকে যে লোকটা অত রাতে যাত্রা দেখাতে ঘাড়ে চাপিয়ে ঘন বনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেছে সেইদিন, সে ওই অঞ্চলের ডাকসাইটে ডাকাত! আমি যখন পরে মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিত হই তখন আমি বুঝতে শিখি কেন চন্দ্রায়ার মতন দুঃসাহসী ভদ্দরলোককেও ডাকাত বনতে হয়। আমি তালে থেকে দাশগাঁও ফিরে আসি। আমার বিয়ের পরে তালে আর চড়াই ঘুরে এসে আমার জীবন ফের আগেকার রুটিনেই চলতে লাগল। মাহাদের স্কুল আর লাড়াওয়ালির বসতি ছেড়ে দাশগাঁও আসা ইস্তক একইরকম জীবনের গতি আমার। দাশগাঁওয়ে আমি নানান কাজে-অকাজে নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম। আমি বিয়ের গান গাইতাম। গৌরীদেবীর গুণসংকীর্তন করতাম। নাচতাম। খেলতাম। আখাড়া যেতাম পাট্টা (খেলার জন্যে তৈরি কাঠের তলোয়ার), বিচাভা (ছোট ছুরি) আর বোনদাথি চালানো শিখতে। পালোয়ানদের খাম্বা মানে মালখাম্বে লাফাতাম-কুঁদতাম। তামাশা দেখতাম। গল্প আর কীর্তন শুনতাম। গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরতাম মোষের লড়াই দেখতে। যাত্রা দেখতে যেতাম। পুজোআচ্চা করতাম। উপোস রাখতাম। পুঁথি পড়তাম। মন্ত্রোচ্চারণ শিখতাম। মাকে মাঠেঘাটের কাজে সাহায্য করতাম। বড়ো বাড়িসহ অনেকেরই কমবেশি ফাইফরমাশ খেটে দিতাম আমি। যদি কেউ কোনও কাজের ভার আমায় দিত, তা আমার আয়ত্তের মধ্যে থাকলে আমি না-করতাম না। আমার এই সহৃদয় মনের সুযোগ নিত বাড়ির কিছু বৌমা। যখন হামানদিস্তায় ওরা ধান ভানত, আমাকে বলত নোড়াটা ধরে থাকতে। বয়স্ক মাসি-পিসিদের আমায় দেখে করুণা হত আর ওদের বকাঝকা করত। গাঁয়ের মধ্যে ছিল একটা শুঁড়িখানা। বাড়ির বড়োরা রাত কত হল তার খেয়াল না-রেখেই আমাকে পাঠাত ওদের হয়ে মদ আনতে। যেহেতু শুঁড়িখানার মালিকও ছিল আমাদেরই গ্রামের লোক, দিনে-রাতে যখন ইচ্ছে মদ বিক্রি বা নাবালকের হাতে মদ বেচায় অন্যায় কিছু দেখত না, যদিও আইনত দুটোই ছিল অবৈধ। প্রতিরাতেই দুই তিনজন আমাকে মদ আনতে পাঠাত। আমিও বেরিয়ে পড়তাম নিডর হয়ে। বনের পশু, বিছে, কাঁটা, ভূতপ্রেতের ভয়কে কোনওরকম পরোয়া না-করেই। যাতে আমি এই কাজটুকু করতে মানা না-করি ওরা আমার সঙ্গে আদর করে কথা বলত। এমনকি পারিশ্রমিক বাবদ মাঝে-মধ্যে আমাকে এক-দুই ছিপি মদও চাখতে দিত যাতে খুশি রাখা যায় আমায়। এই চক্করে আমিও মদ খেতে শিখে গেলাম। দাশগাঁওয়ের দুই যুবকের পরিবারের লোকেরা আমাকে জানায় যে ওরা সীমান্তে লড়তে গিয়েছে। এই দুইজন আমার সঙ্গে চতুর্থ মারাঠি ক্লাস অবধি পড়েছে। যদিও বয়সে আমার থেকে বেশ কিছুটা বড়ো ছিল। আমিও অনুভব করতে শুরু করি যে আমারও যুদ্ধে গিয়ে লড়া উচিৎ। একদিন এক নিয়োগকর্তা বড়োবাড়িতে আসেন। সেইখানে দু-দিন টানা থাকেন। আমার জ্যাঠতুতো দাদাদের থেকে আমার সম্বন্ধে জানতে চান। আমার সম্বন্ধে সব জেনে, উনি বলেন, ‘রামচন্দ্রকে আমার সঙ্গে পাঠান। ও পড়বার সুযোগ পাবে আরও, আর সেনাবাহিনীতে ভবিষ্যতে বড়ো অফিসার হতে পারবে।’ আমি যেতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু বড়োবাড়ির কেউ আমাকে পাঠালো না। দু-দিন পরে, দাশগাঁওয়ের ধর্মশালার পার্শ্ববর্তী ময়দানে খেড়, চিপলুন আর মাহাদ থেকে দুই তিনশো নবনিযুক্ত সেনা-জওয়ান ক্যাম্প করে থাকতে শুরু করে। ক্যাম্প বানিয়ে ওরা বোম্বের দিকে মার্চ করা শুরু করে। সামনে ছিল ব্যান্ড। তার পিছনে সুসজ্জিত পোশাকপরিহিত সেনাদল ব্যান্ডের তালেতালে কদম বাড়িয়ে চলে। পাহাড়ি খাত ওরা যখন পেরিয়ে যায়, আমি আর দুই বন্ধু বড়োদের নজর এড়িয়ে সেনাদের পিছুপিছু চলতে আরম্ভ করি। এক দেড় মাইল যেতে-না-যেতেই আমাদের ওরা থামিয়ে দেয় আর সেনারা এগিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ভগ্ন মনোরথে আমরা ঘরে ফিরে আসি। এই সেনা পল্টনের সকলেই ছিল মাহার জাতের। ১৮৯১ সালে মাহার সেনাদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় আর মাহার প্লাটুন ১১১ তৈরি হয় প্রথমবারের জন্যে। এই জওয়ানেরা ছিলেন এই প্লাটুন থেকেই। পড়াশোনা বা কাজের বালাই ছিল না কোনও। আমার সময় কাটতে লাগল বিয়ের গান মনে রাখা, ফকির, গোসাভি, গোন্ধালি, ভাট আর ভাইদু সম্প্রদায়ের মতো যাযাবরদের আদব-কায়দা নকল করার মতন ফালতু কাজে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হল আমার পায়ে কাঁটা ঢুকে এক বিপজ্জনক চোট। মাসের পর মাস আমি বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কঁকাতে লাগলাম। চোট সেরে ওঠামাত্রেই আমাকে বোম্বে পাঠানো হল চাকরির জন্যে। এটা ছিল আমার দ্বিতীয় বোম্বে যাত্রা। আমার আত্মীয় আমাকে একটা কাজ খুঁজে দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। কিন্তু আমি নাবালক ছিলাম বলে কোনও কাজ জোটাতে পারছিলাম না। যে-বোম্বেবাসী আমাকে টিকিট কালেক্টর হিসাবে কাজ জুটিয়ে দেবে বলেছিল এখন তার টিকির নাগালও পেলাম না। অফিসবয়ের কাজ আমি পেয়ে যেতাম ঠিকই, কিন্তু ও কাজ আমি চাইছিলাম না। বোম্বে আসবার পরে আমি আমার বংশেরই এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে চৌলে থাকছিলাম। ওর মাকে আক্কা বলে ডাকতাম। আমি আর আমারই মতন দাশগাঁওয়ের আরও তিন-চারজন আক্কার ঘরেই থাকতাম। বাকি সবাই কোথাও-না-কোথাও কাজ করত আর আক্কাকে খাবার খরচটুকু দিত। আমি একমাত্র চার-পাঁচ মাস কাটিয়ে ফেললেও কোনও কাজ জোটাতে পারিনি তখনও। ফলে আমি নিজের খাবার খরচাটুকুও দিতে পারছিলাম না। তাও আমাকে কেউ গালিগালাজ করেনি, বরং স্নেহ উজাড় করে দিত। বোম্বে থাকাকালীন আমি প্রথমবার ড. আম্বেদকরকে দেখলাম। ড. আম্বেদকরকে দেখে আমি ভীষণভাবে শিক্ষার্জনের গুরুত্বটা উপলব্ধি করি। আমাকে মাঝপথে স্কুল ছাড়তে হয় কারণ আমার পড়াশোনার খরচ চালানোর মতো কেউ ছিল না। মাঝের বছরগুলো নষ্ট না-হলে আমি এতদিনে ম্যাট্রিক পাশ করে ফেলতাম। আর এখন নিজেকে দেখি: ঠিকঠাক আমি পড়াশোনাটাও করতে পারলাম না, চাকরিও জোটাতে পারলাম না। বাবা মারা যাবার পরে মামা অনেকটা সময় আমাদের ভরণপোষণ করেছে। মায়েরও খানিক শ্রমলাঘব হয়েছে তাতে, আমিও কয়েকবছর নির্বিঘ্নে স্কুলে পড়তে পেরেছি। আর এখন আমার মাকে কী কষ্টটাই না-করতে হচ্ছে! আর আমি বোম্বের রাস্তায় টো-টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কী দুর্দশাই না আমার হয়েছে! এই দুর্ভাবনারা মাঝে-মধ্যেই আমাকে কুড়ে কুড়ে খেত। আমার বংশলতিকায় বেশ কিছু জোয়ান ছেলের সঙ্গে আমার পরিচিতি হয়েছে এর মধ্যে। ওদের সঙ্গে বিড়ি খেতে আমার বাধত না, মদের দোকানে গিয়ে একসঙ্গে তাড়ি খেতেও আমার সমস্যা হত না। ওদিকে মারআই দেবীর এক মন্দির ছিল। ওই মন্দিরের পূজারী আমার বন্ধুর মতন হয়ে ওঠে। আমি ওঁর সঙ্গে রোজ মন্দিরে যেতাম, ভজন গাইতাম, গ্রন্থপাঠ করতাম, মাঝেমধ্যে ওর দেওয়া ছিলিম থেকে গাঁজার ধোঁয়াতেও টান দিতাম। একতারার ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ স্বরে সকরুণ সুরে গান গাওয়াটা ভালোই রপ্ত করেছিলাম আমি। আমি যেহেতু মারাঠিতেও চোস্ত ছিলাম, তাই না-তুতলিয়েই একটানা গ্রন্থপাঠ করতে পারতাম। ভজনপ্রভু আর পবিত্র গ্রন্থপাঠের দায়িত্বে থাকা লোকজন আমাকে বই হাতে বসিয়ে দিত আর তার ভিতরকার লেখা পড়তে বলত। অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ প্রকাশের তারিখ: ২৭-এপ্রিল-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |