|
ব্রাজিলে শ্রেণি সংগ্রাম ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসুচিক্কণ দাস |
নানা কৌশলে ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত জনাদেশ খারিজ করার প্রবণতা সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে গোটা বিশ্বজুড়ে। ভারতে বিজেপি জনাদেশ নাকচ করে টাকা দিয়ে বিধায়ক সাংসদ কিনে। দরকারে কাজে লাগানো হয় নির্বাচন কমিশন থেকে রাজ্যপাল সব শক্তিকে। |
দিশার লড়াই আগামী দিনে কোন পথে যাবে ব্রাজিল? পরীক্ষিত বামপন্থী নেতা লুলা ডা সিলভার নেতৃত্বে গণতন্ত্র ও বামপন্থাকেই বেছে নেবেন ব্রাজিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটদাতারা? নাকি জাইর বোলসোনারোর হাত ধরে থেকে যাবে দক্ষিণপন্থী, নিওফ্যাসিস্তরাজনীতির শিবিরে? প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এরকমই এক ঐতিহাসিক বাঁকের মুখে লাতিন আমেরিকার এই দেশটি। ৩০ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটের ফলাফলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। কলম্বিয়ার পর ব্রাজিলেও গণতন্ত্র ও বামপন্থার জয় পতাকা উড়বে কিনা তা বোঝা যাবে দ্বিতীয় দফার ভোটের ফলাফলে। জনাদেশ, দক্ষিণপন্থা ও ট্রাম্প সিন্ড্রোম অবশ্য একথাও জোর দিয়ে বলা যায় না যে, ভোটে হারলেও পরাজয় মেনে নেবেন বোলসোনারো। জয়–পরাজয় অল্প ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হলে ব্রাজিলে দেখা যেতে পারে ট্রাম্প সিন্ড্রোম। বোলসোনারো ইতিমধ্যেই পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে রেখেছেন। ফলে অল্প ব্যবধানে হারলে ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকার করতে পারেন এই নিওফ্যাসিস্তশাসক। ট্রাম্পের আদলে সমর্থকদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে তৈরি করতে পারেন বিশৃঙ্খলা। এবং সামরিক বাহিনী ও দক্ষিণপন্থী শক্তির মদতে জনাদেশকেই নাকচ করার প্রয়াস চালাতে পারেন। নানা কৌশলে ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত জনাদেশ খারিজ করার প্রবণতা সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে গোটা বিশ্বজুড়ে। ভারতে বিজেপি জনাদেশ নাকচ করে টাকা দিয়ে বিধায়ক–সাংসদ কিনে। দরকারে কাজে লাগানো হয় নির্বাচন কমিশন থেকে রাজ্যপাল— সব শক্তিকে। এজেন্সি লাগিয়ে দলবদলে বাধ্য করা হয় বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের। এই মডেলেই কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র দখলের পথে এগিয়েছে তারা। একইভাবে ভোট হেরেও ক্ষমতা ছাড়তে না চাওয়া, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, হামলা ও গৃহযুদ্ধের ভয় দেখিয়ে জনাদেশ নাকচ করার প্রয়াসের কৌশল শিখিয়ে গেছেন বিশ্বে দক্ষিণপন্থার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিনিধি ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষমতায় যেহেতু দক্ষিণপন্থী শাসক, তাই ব্রাজিলেও একই প্রয়াস চালানো হতে পারে। সেখানে ট্রাম্পের পোশাকে দেখা যেতে পারে বোলসোনারোকে। ঠিক যেমন কোভিড অতিমারির প্রকোপের সময় জাইর বোলসোনারোকে দেখা গিয়েছিল ব্রাজিলের মিঃ ট্রাম্প হিসাবে। এ এক পরিব্যাপ্ত দক্ষিণপন্থা যা আমেরিকা থেকে ব্রাজিল, হাঙ্গারি, তুরস্ক, ফিলিপিন্স হয়ে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত। এগিয়ে লুলা, তবে বাধা অনেক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ২ অক্টোবর প্রথম দফার ভোটে অবশ্য জিতেছেন লুলা। এই দফার ভোটে লুলা পেয়েছেন ৪৮.৪৩ শতাংশ ভোট ( ৫২,২৫৭,৪৭৩টি) ভোট। প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ থেকে সামান্যই কম ভোট। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৩.১০ শতাংশ (৫১,০৭১,১০৬ ভোট)। ব্রাজিলের িনয়ম অনুযায়ী, প্রথম দফায় কোনও প্রার্থী যদি ৫০ শতাংশ ভোট না পান, তাহলে ফের ভোট নেওয়া হবে দ্বিতীয় দফায়। সেখানেই হবে চূড়ান্ত ফয়সালা। এবং দ্বিতীয় দফার এই লড়াইটা ব্রাজিলের বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে একটা বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ ব্রাজিলের সমাজ মোটের ওপর আড়াআড়ি ভাবে বিভাজিত এবং দক্ষিণপন্থীদের শক্তিও হেলাফেলা করার মতো নয়। কতগুলো তথ্য উল্লেখ করলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। মিডিয়ার পোস্ট–ট্রুথ প্রথমত, দেশের মূলস্রোতী মিডিয়া দক্ষিণপন্থার পক্ষে। ৪৮ শতাংশেরও বেশি ভোট পাওয়ার পর দেখা গেল দেশের পত্রপত্রিকাগুলো নেমে পড়েছে এটা প্রচার করতে যে, প্রথম দফায় লুলা যেহেতু ৫০ শতাংশ ভোট পাননি, তাই তিনি আসলে হেরে গেছেন। আর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন বোলসোনারো, তাই জিতবেন তিনিই। এভাবেই আসল সত্যকে আড়াল করে সাজানো মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পড়ে লেগেছে ব্রাজিলের মূল ধারার মিডিয়া। লক্ষ্য দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বোলসোনারোই জিতবেন বলে জনমানসে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা। দক্ষিণপন্থা জনমানসকে বিভ্রান্ত করতে পোস্ট–ট্রুথকে কীভাবে কাজে লাগায়, তার উদাহরণ মিলবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্বে মিডিয়ার ভূমিকায়। ওপরতলায় দক্ষিণপন্থার ঘাঁটি দ্বিতীয়ত, ব্রাজিলের শাসন পরিষদের উচ্চতর ও নিম্নতর কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে দক্ষিণপন্থীদের। উচতর কক্ষ সেনেটে বলসোনারের পার্টিডো লিবারাল বা লিবারাল পার্টি জিতেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে। সেনেটে মোট আসন ২৩। এর মধ্যে লিবারাল পার্টি জিতেছে ১৪টি আসনে। অন্যদিকে লুলার নেতৃত্বাধীন পিটি বা ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীরা জিতেছেন ৮টি আসনে। নিম্নকক্ষ চেম্বার অফ ডেপুটিজে আসন সংখ্যা ৫১৩। এখানেও সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসন জিতেছে লিবারাল পার্টি। তাদের সদস্য সংখ্যা ৯৯। দেশের প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল হ্যামিলটন মুরাও, প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী টেরিজা ক্রিস্টিনা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী দামারেস অ্যালভেজ – জিতেছেন সেনেটর হিসাবে এবং এবং এরা সকলেই বলসোনারের দক্ষিণপন্থার কট্টর সমর্থক। রয়েছেন বোলসোনারোর ছেলে এডুয়ার্ডো। দেশে কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা তোলায় কৃষিমন্ত্রী ক্রিস্টিনা ব্রাজিলের কৃষকদের কাছে পরিচিত পয়জন মিউজা নামে। তবু তিনি ভোটে জিতেছেন। এছাড়াও জিতেছেন বোলসোনারোর প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এডুয়ার্ডো পাজুয়েল্লো। করোনা অতিমারির সময় এই মন্ত্রীর ব্যর্থতাতেই প্রাণ গিয়েছিল ৭ লক্ষ মানুষের। এমনকী বোলসোনারোর প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী রিকোর্ডো সালেশ, যাঁর নেতৃত্বে ধ্বংস হয়েছে অ্যামাজন অরণ্যের বিশাল এলাকা, তিনিও এখন নিম্নকক্ষ চেম্বার অফ ডেপুটিজ বা ন্যাশনাল কংগ্রেসের সদস্য। বোলসোনারো প্রেসিডেন্ট পদে থাককালীন কোভিডে এত মৃত্যু এবং ট্রাম্পের মতোই তাঁর টিকাবিরোধী অবস্থানে ক্ষতি হয়েছে সমাজের। তাঁর আমলেই অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। বহু সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি হাতে তুলে দিয়েছেন দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট। এরপরেও বোলসোনারোর প্রাপ্ত ভোট ৪৩ শতাংশের সামান্য বেশি। এবং সেনেট ও কংগ্রেসে ঘাঁটি গেড়ে বসে কট্রর দক্ষিণপন্থীরা। দেশের এতবড় সর্বনাশ করার পরেও প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরিবেশমন্ত্রীর ভোটে জয়লাভ কোন সমীকরণে? এই বিষয়গুলি খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করার দাবি রাখে। ভোটারদের কোন যুক্তিবোধ এহেন দেশ ও সমাজবিরোধীদের ভোটে জেতায়, নাকি যুক্তির ধ্বংসই এদের জয়ের ভিত্তি— এনিয়ে গভীর বিচার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ‘ছদ্ম দক্ষিণপন্থী’ এছাড়াও রয়েছে চেম্বার অফ ডেপুটিজ বা ন্যাশনাল কংগ্রেসে রয়েছে প্রায় ২৪টি দক্ষিণপন্থী দলের প্রতিনিধিরা। এরা হল ‘বিফ,বাইবেল আর বুলেট’–এর প্রতিনিধি। এদের মধ্যে রয়েছে কৃষি বাণিজ্য লবি, রক্ষণশীল চার্চপন্থীরা এবং সামরিক বাহিনী ও পুলিশের দিকে ঝুঁকে থাকা শক্তি। নামে মধ্যপন্থী হলেও এরা এমন একটা সুবিধাবাদী ব্লক যারা ক্ষমতার স্বার্থে সমঝোতা করে দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গেই। নয়া উদারবাদী মধ্যবিত্ত ও চার্চ এরপর রয়েছে নয়া উদারবাদের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া একটা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা কী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, কী সমাজজীবনে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণবাদী ভূমিকা একেবারে পছন্দ করে না। অপরিমিত আয় ও ভোগবিলালে মত্ত একটা জীবন কাটানোই তাদের স্বপ্ন। মতাদর্শগতভাবে তারা বামপন্থীর বিরোধী ও দক্ষিণপন্থার কট্টর সমর্থক। সবশেষে রয়েছে চার্চের অনুগামীরা যারা মনে সমাজের বামপন্থী পরিবর্তন ঠেকিয়ে দিয়ে ধর্মভিত্তিক পরিবারতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারেন একমাত্র একমাত্র বোলসোনারো। রিং অফ ফায়ার মিডিয়া, সেনেট ও কংগ্রেসে গেড়ে বসে থাকা দক্ষিণপন্থী শিবির, মধ্যপন্থার ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা দক্ষিণপন্থী শক্তি, কৃষি বাণিজ্য লবি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশের দিকে ঝুঁকে থাকা শক্তি, নয়া উদারবাদী মধ্যবিত্ত, চার্চের অনুগামী শক্তি, সাধারণভাবে ব্রাজিলের পিতৃতান্ত্রিক পরিবার তন্ত্রের রক্ষণশীল মূল্যবোধ এবং সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে প্রচ্ছন্ন মার্কিনী হস্তক্ষেপ — সবটা মিলিয়ে দক্ষিণ পন্থী শক্তিগুলোর বিরাট একটা রিং অফ ফায়ার বা অগ্নিবলয় হয়ে দাঁড়িয়ে লুলার সামনে। এহল ব্রাজিলিয় সমাজের সম্পত্তিবান শ্রেণিগুলি ও রক্ষণশীলদের জোট, যারা কোনওভাবেই বামপন্থাকে ব্রাজিলে ফিরতে দিতে চায় না। এই অগ্নিবলয় ভেদ করেই লুলা প্রথম দফায় পেয়েছেন ৪৮.৪৩ শতাংশ ভোট, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের চেয়ে ৫.৩৩ শতাংশ ভোটে এগিয়ে। বোঝাই যায়, ব্রাজিলিয় সমাজের সম্পত্তিহীন শ্রেণিগুলিকে জড়ো করে কী বিপুল সংগ্রাম তাঁকে করতে হয়েছে এই জায়গায় পৌঁছতে। নির্বাচন যুদ্ধের আড়ালে থাকা এই তিক্ত শ্রেণি সংগ্রামের কাহিনিকে উন্মোচিত করলে বোঝা যাবে পরিস্থিতিকে বদলে দিতে কী বিপুল প্রয়ায চালাচ্ছেন লুলা ও তাঁর অনুগামীরা। এবং সেটা বুঝতে পেরেই তাঁদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সরকারের পেটোয়া মিডিয়া। লুলার জয়ের সমীকরণ কীভাবে ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থাকে এভাবে কোণঠাসা করতে পারলেন লুলা? সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে নামা লুলা প্রথম পরিচিত হন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসাবে। ১৯৮০ সালে ব্রাজিলে প্রতিষ্ঠিত হয় ট্রাবালহাডেরোস বা ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি)। লুলা ছিলেন এই দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সেই সময় হত্যা ও বিভাজনের মাধ্যমে ব্রাজিলের বামপন্থীদের শেষ করে দিতে চেয়েছিল সামরিক একনায়কেরা। তবে শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়। এরপর ওয়ার্কার্স পার্টির টিকিটে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালে। তিনবারই পরাজিত হন তিনি। তবে এই নির্বাচনগুলি লড়ার মধ্যে দিয়ে ক্রমশ দেশের রিয়েল পলিটিক বিষয়টিকে বুঝতে পারেন ব্রাজিলের বামপন্থীরা। ক্রমশ তাঁরা বুঝতে পারেন ভোটে জিততে হলে শুধুমাত্র কট্টর বামপন্থার একক শক্তিতে হবে না, দরকার সমমনোভাবাপন্ন আরও শক্তির সঙ্গে জোট। অভিজ্ঞতাসঞ্চিত কৌশলের এই নমমীয়তা দেখা গেল ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ১৯৮৯ সালে লুলার ভোট প্রচারের মূল শ্লোগান ছিল ভূমি সংস্কার। ২০০২ সালের ভোট প্রচারে এই দাবিকে কিছুটা আড়ালে রাখলেন লুলা। জোর দিলেন সমাজ কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও সুস্থ জীবনযাপনের অধিকারের ওপর। ক্ষুধার মোকাবিলায় তিনি ঘোষণা করলেন ফোমে জিরো ও বোলসা ফ্যামিলিয়া কর্মসূচি। আর জোর দিলেন লক্ষ লক্ষ তরুণ–তরুণীকে উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে টেনে আনার কর্মসূচিতে। আপাত অ–রাডিক্যাল এই সব কর্মসূচিই এনে দিল সাফল্য। ২০০২ এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। সেই প্রথম। নির্বাচনের আগে ঘোষিত কর্মসূচির রূপায়ণে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমল, তরুণ–তরুণীরা উঠে এলেন উচ্চশিক্ষার আঙিনায়, লাগাম পরল অ্যামাজন অরণ্যের ধ্বংসপর্বে। এরই জেরে ২০০৬ সালেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন লুলা। এরপর ক্ষমতাচ্যুতি, দুর্নীতির অভিযোগ, কারাবাস ও অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের পর মুক্তির পর্ব পেরিয়ে ফের একবার দেশের প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী লুলা। ফের একবার বামে মোড় ফেরার অপেক্ষায় ব্রাজিল। ঘাঁটি অটুট প্রথম দফার ভোটের ফল থেকে স্পষ্ট যে, দেশের শিল্পাঞ্চল, সাও পাওলোর শ্রমিক এলাকা, এবং পিছিয়ে পড়া উত্তর পশ্চিমের রাজ্যগুলিই লুলার শক্ত ঘাঁটি। তবে শহুরে মধ্যবিত্তের একাংশের ভোট এবার বোলসোনারোর দিক থেকে সরেছে লুলার পক্ষে। অন্যদিকে সাও পাওলো, রায়ো ডি জেনিরোর মতো বড় শহরগুলি ঝুঁকে রয়েছে বোলসোনারোর দিকে। যদিও ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য এবং ব্রাজিলের নির্বাচনের হাওয়া মোরগ মিনাস গেরাইজে এবার প্রথম দফার ভোটে জিতেছেন লুলা। অঞ্চলভিত্তিক সমীকরণ ধরলে, দেশের উত্তর–পশ্চিমের পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলির ভোট গেছে লুলার পক্ষে। অন্যদিকে দক্ষিণ, দক্ষিণ পূর্ব, এবং উত্তরাঞ্চলের সমৃদ্ধ, শহুরে এলাকাগুলি ঝঁুকে রয়েছে বোলসোনারোর দিকে। এই পরিস্থিতিতে ঘাঁটি এলাকাগুলিতে ভোটের হার বাড়ানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন লুলা ও তাঁর শিবির। মিত্র শক্তিদের সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়ানোর কাজও চলছে। লড়াইয়ে সামিল ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম শক্তিও। লুলার নিজের কথায়, উই আর এক্সপার্টস ইন উইনিং দ্য সেকেন্ঞ রাউন্ড। ২০০২ ও ২০০৬, দুবারই দ্বিতীয় রাউন্ডে জিতেছিলেন লুলা। শ্রেণি সংগ্রাম চলবে দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা জিতে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেও তাঁকে মাঠ ছেড়ে দেবে না দক্ষিণপন্থীরা। সেনেট ও কংগ্রেসে ঘাঁটি গেড়ে বসে তারা বাধা দেবে জনমুখী কর্মসূচি রূপায়ণে। সামাজিক সম্পদ বন্টনে বৈষম্য অপসারণের নীতি তারা মানবে না। অন্যদিকে জিতলে স্বস্তি নেই বোলসোনারোরও। কারণ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির বর্ধিত দাম, দীর্ঘায়ত মন্দা সঙ্কট ঘনিয়ে তুলবে জনজীবনে। এগুলিকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলন –সংগ্রাম গড়ে তুলে চাপ বাড়াবে ব্রাজিলের বামপন্থীরা। দক্ষিণপন্থা বনাম বামপন্থাকে কেন্দ্র করে শ্রেণি সংগ্রাম আরও তীব্র হবে ব্রাজিলে। প্রকাশের তারিখ: ১৮-অক্টোবর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |