নির্বাচনী বন্ড সম্পর্কিত রায় ও ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণি

সাত্যকি রায়

নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিজেপি আসলে অস্বচ্ছতার ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে চেয়েছিল যা তাদেরকে পুঁজিপতিদের থেকে রসদ সংগ্রহ করার একচেটিয়া অধিকার এনে দেবে। যে পুঁজিপতিরা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলকে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সাহায্য করেছে তাদেরকে প্রকারান্তরে নানা অসুবিধায় ফেলার মধ্যে দিয়ে এটা বুঝিয়ে দেওয়া সহজ হবে যে কাদের ঘরে টাকা জমা পড়লেই তারা একমাত্র শান্তিতে কাজ করবার চালাতে পারবে। এরকম একটি ব্যবস্থাপনা আসলে রাষ্ট্র ও পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যেকার সম্পর্ককে এতটাই নগ্ন করে তোলে যা প্রকারান্তরে পুঁজিবাদি রাষ্ট্রের আধিপত্যের গ্রহণযোগ্যতাকেই ভঙ্গুর করে তোলার বিপদ তৈরি করতে পারে।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্র মোটের উপরে পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং বিনিময়ে পুঁজিপতিরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলির পৃষ্ঠপোষকতা করবে এতে খুব একটা বিস্ময়ের কিছু নেই। যুগ যুগ ধরে এই ঘটনাই ঘটে এসেছে। কিছু মাত্রার হেরফের হতে পারে। কিন্তু শাসক দল ও দেশের বৃহৎ পুঁজিপতিদের লেনদেনের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। এ কথাও সত্য যে দেশের বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী সমস্ত রাজনৈতিক দলই কোনও না কোনওভাবে পুঁজিপতিদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রাপ্ত টাকার বড় অংশেরই কোনও হিসাব নিকাশ থাকে না। নির্বাচনী বন্ডের পক্ষে যুক্তি হাজির করতে গিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি এরকম একটা ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করেছিল যে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক দলও পুঁজিপতিদের মধ্যেকার লেনদেনের একটি স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। প্রসঙ্গত সকলেরই জানা নির্বাচনী বন্ড চালু হওয়ার পরেও রাজনৈতিক দলগুলির প্রাপ্ত হিসাব-বহির্ভূত অর্থ ওই সমস্ত বন্ডের বিনিময় সংগৃহীত অর্থের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই বন্ডের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এই লেনদেনে দাতার নাম গোপন থাকবে। একথাও খুব অস্বাভাবিক নয় যে পুঁজিপতিরা সেই দলকেই বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে, যারা ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল তুলনামূলকভাবে কম অর্থ পেয়ে থাকে।

নির্বাচনী বন্ডের আসল বৈশিষ্ট্য হল লেনদেনের স্বচ্ছতার নামে অর্থনৈতিক রসদের উপরে শাসকদলের একচেটিয়া কর্তৃত্ব স্থাপন করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা। তথ্য যেখানে ক্ষমতার উৎস, অর্থাৎ সরকার জানবে কোন পুঁজিপতি কোন দলকে টাকা দিচ্ছে, কী কী পরিমানে দিচ্ছে, অথচ জনগণ বা অন্য দাতারা জানতে পারবে না সরকার কাদের কাছ থেকে কত টাকা পেল। ব্যাপারটা অনেকটা যদি এরকম হয় যে সবাই পরীক্ষা দেবে কিন্তু কে কী লিখেছে এবং কত নম্বর পেয়েছে এটা জানবে শুধুমাত্র শিক্ষক। ব্যক্তিগতভাবে কে কত নম্বর পেয়েছে তা পরীক্ষার্থীকে জানিয়ে দেওয়া হবে কিন্তু কোনও মেরিট লিস্ট প্রকাশিত হবে না। অর্থাৎ কোনও পরীক্ষার্থী জানতে পারবে না অন্যজন কত পেয়েছে অথবা তাদের আপেক্ষিক নম্বর কিভাবে নির্ধারিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিটির নাম শিক্ষক। কারণ তার কাছে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষার নম্বর, তারা কী লিখেছে তার তথ্য রয়েছে। কিন্তু অন্য ছাত্রছাত্রীরা যেহেতু জানতে পারবে না কিসের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হয়েছে, অথবা অন্যরা কত কী নম্বর পেয়েছে ফলে খাতা দেখায় চরম অস্বচ্ছতা থাকলেও তা প্রশ্নাতীত থেকে যাবে।

নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিজেপি আসলে অস্বচ্ছতার ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে চেয়েছিল যা তাদেরকে পুঁজিপতিদের থেকে রসদ সংগ্রহ করার একচেটিয়া অধিকার এনে দেবে। যে পুঁজিপতিরা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলকে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সাহায্য করেছে তাদেরকে প্রকারান্তরে নানা অসুবিধায় ফেলার মধ্যে দিয়ে এটা বুঝিয়ে দেওয়া সহজ হবে যে কাদের ঘরে টাকা জমা পড়লেই তারা একমাত্র শান্তিতে কাজ করবার চালাতে পারবে। এরকম একটি ব্যবস্থাপনা আসলে রাষ্ট্র ও পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যেকার সম্পর্ককে এতটাই নগ্ন করে তোলে যা প্রকারান্তরে পুঁজিবাদি রাষ্ট্রের আধিপত্যের গ্রহণযোগ্যতাকেই ভঙ্গুর করে তোলার বিপদ তৈরি করতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে রাষ্ট্রের আধিপত্য প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া সামগ্রিকভাবে পুঁজিপতি শ্রেণির পক্ষেও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনে রাখা দরকার যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের লক্ষ্য কোনও একজন বা কিছু পুঁজিপতির স্বার্থ রক্ষা করা নয়। বরং সামগ্রিকভাবে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করাটাই এই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফলে এই শ্রেণি-আধিপত্য নষ্ট হওয়াটা পুঁজিবাদের কাছে কখনোই কাঙ্খিত নয়।

একমাত্র যে রাজনৈতিক দলটি অন্য পিটিশনারদের সঙ্গে নির্বাচনী বন্ডের বিরুদ্ধে বিচারালয়ের দ্বারস্থ হয় এবং যাদের পক্ষে এই বিরোধিতা করা সম্ভব হয় তা হল সিপিআই(এম)। কারণ তারা যাদের রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন আদায় করার চেষ্টা করে থাকে, তারা কেউ পুঁজিপতি নয়। নির্বাচনী বন্ড চালু হওয়ার আগেও নয়, পরেও নয়। নির্বাচনী বন্ড চালু থাকা অবস্থাতেও এই রাজনৈতিক দল নৈতিক কারণেই এই বন্ডের মাধ্যমে কোনও অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করেনি। এদের বক্তব্য প্রথম থেকেই খুব পরিষ্কার ছিল, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক রসদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বন্টন অত্যন্ত জরুরি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আবেদনকারীদের যুক্তিগ্রহণ করে এবং নির্বাচনী বন্ডকে বেআইনি ঘোষণা করে।

ঐতিহাসিক ভাবে কোনও দেশে চরম দক্ষিণপন্থার আবির্ভাব ঘটে তখনই, যখন প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায়, বিরুদ্ধ মতামতের ভারসাম্য একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। এই ডেডলক ভাঙার জন্য পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় চরম দক্ষিণপন্থার আবির্ভাব ঘটেছে। একচেটিয়া পুঁজিপতির খোলাখুলি সমর্থনে একপ্রকার রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে, যারা একদিকে পরিচয় ও জাত্যাভিমানের রাজনীতির ভিত্তিতে শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত করে, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের সমস্ত অর্জিত অধিকারকে খর্ব করে একচেটিয়া পুঁজির মুনাফা বৃদ্ধিতে নির্লজ্জভাবে ওকালতি করে। এই ধরনের শক্তি পৃথিবীর নানা দেশে ক্ষমতাসীন হয়েছে নিম্নবিত্ত অসংগঠিত মানুষের হতাশা ও দীর্ঘশ্বাসের সুযোগ নিয়ে। ক্ষমতায় আসার পরে তারা খোলাখুলিভাবে একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে উদ্যত হয়। তারা বেছে নেয় গুটিকয়েক পুঁজিপতিকে যাদের মুনাফা বৃদ্ধি করতে দেশের নীতিকেও প্রয়োজনমত পরিবর্তন করে থাকে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও দেশের সরকার একচেটিয়া পুঁজির খোলাখুলি ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীতে পরিণত হতে হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাটা অনেক বেশি জরুরি হয়ে যায়। প্রচারমাধ্যম কিনে নেওয়া, এমএলএ-এমপি কেনাবেচা, প্রচুর অর্থের বিনিময়, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির মাথায় বসে থাকা মানুষদের স্বাধীন সত্তাকে খতম করা এবং সর্বোপরি একটি বিপুল রাজনৈতিক মেশিনারি চালু রাখার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন সেই আর্থিক রসদের উপরে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দাবি করে। গরিব শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মজুরি খর্ব করে একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মুনাফার পাহাড় বৃদ্ধি করতে সাহায্য করলে সেই পাহাড়ের একটি কণা মাত্র যদি না পাওয়া যায় তাহলে এই চরম বৈষম্যের পক্ষে মতামত সংগঠিত করার কাজ হবে কোথা থেকে? গুটিকয়েক একচেটিয়া পুঁজিপতির স্বার্থে খোলাখুলিভাবে সরকারি নীতিপ্রণয়ন, যাতে লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে যেতে পারে সেটাই নির্বাচনী বন্ডের আসল প্রয়োজনীয়তা ছিল।

ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ ন্যায়আদালত সাম্প্রতিককালে নানা রায়ের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট সংশয় তৈরি করলেও নির্বাচনী বন্ড বেআইনি ঘোষণা করার মধ্যে দিয়ে এই বার্তা পৌঁছে দিল যে পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ খতম করতে ভারত রাষ্ট্র রাজি নয়। ভারতবর্ষ এখনও মোদী-শাহের ইচ্ছা অনুযায়ী আদানি-আম্বানিদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত নয়। সঙ্গে সঙ্গে একথাও বোধহয় সত্য যে দেশের পুঁজিপতিরাও এখনও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পছন্দের সুযোগকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। চরম দক্ষিণপন্থার উত্থান ও ভারতীয় জনতা পার্টির মত দল একদিকে যেমন দ্বিধাহীনভাবে নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতি কার্যকরী করে চলেছে, অন্যদিকে ধর্মের নামে গরিব নিম্নবিত্ত মানুষকে সমবেত করার মধ্য দিয়ে তাদেরই বিরুদ্ধে কার্যকরী হওয়া নীতির প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অনন্তকালের জন্য সফল হবে এই চিন্তা যে অবাস্তব তা হয়ত ভারতবর্ষের পুঁজিপতি শ্রেণিও উপলব্ধি করতে পারছে। তাই শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিস্পর্ধি রাজনৈতিক দলগুলির অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রেখে রাজনৈতিক পছন্দের সম্ভাবনাকে জাগ্রত রাখতে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতীয় পুঁজিবাদ মানে মোদি-শাহ-আম্বানি-আদানি পুঁজিবাদ এই আবদ্ধগণ্ডির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের জন্য হয়ত দেশের পুঁজিপতি শ্রেণি এখনও প্রস্তুত নয়। নয়া উদারবাদি নীতির বিরুদ্ধে ঘনায়মান প্রতিরোধ আগামী দিনে শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে তাকে মোকাবিলা করা এবং শ্রমজীবী মানুষের আধিপত্যকে প্রতিরোধ করার জন্য দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির কাছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে তাদের পছন্দসই বিকল্প বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।


প্রকাশের তারিখ: ০৬-মার্চ-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org