|
জরুরি অবস্থা এবং আরএসএসটিম মার্কসবাদী পথ |
১০ নভেম্বর, ১৯৭৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রীকে লেখা আরেকটি চিঠিতে দেওরস আজকের বিজেপি নেতাদের দাবির সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে সেসময়ের সরকার-বিরোধী আন্দোলন থেকে আরএসএস-কে দূরত্বে রেখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন “জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে আরএসএস-এর নাম জড়ানো হচ্ছে। সরকার কোনও কারণ ছাড়াই গুজরাট আন্দোলন ও বিহার আন্দোলনের সঙ্গে আরএসএস-কে যুক্ত করছে... এইসব আন্দোলনগুলির সঙ্গে সঙ্ঘের কোনও সম্পর্ক নেই”। সোজা অর্থে জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ‘সঙ্ঘের কোনও সম্পর্ক’ ছিল না। |
জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্রে ছিল বলে বরাবরই দাবি করে আসছে বিজেপি। এবারে একধাপ এগিয়ে কেন্দ্রের সংস্কৃতিমন্ত্রকের সচিব সব রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি পাঠিয়ে ২৫ জুন ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ পালন করতে বলেছেন! সঙ্ঘের মুখপত্রে শিরোনাম, ‘আরএসএস এবং জরুরি অবস্থা: গণতন্ত্রের পরিত্রাতা’ (অর্গানাইজার, ২১ জুন, ২০২৫)! আজ, অঘোষিত জরুরি অবস্থার জমানায় যারা গণতন্ত্র, সংবিধানকে হত্যা করছে, তারাই সেদিনের ভূমিকা নিয়ে সাধু সাজার চেষ্টা করছে! নিশ্চিতভাবেই, ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি এদেশের গণতন্ত্রের এক কালো অধ্যায়। গোটা দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ ২৫ জুন দিনটিকে এদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের কালো দিন হিসেবে পালন করেন। সেদিন জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল বামপন্থীরা সহ গোটা দেশ। অনেকে জেল খেটেছেন, এলাকাছাড়া হয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে আরএসএস প্রধান পাঠিয়েছিলেন আপসবার্তা। স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো জরুরি অবস্থা-বিরোধী আন্দোলনেও সঙ্ঘের ভূমিকা আসলে এক বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। জরুরি অবস্থার ২৫ তম বার্ষিকীতে ইংরেজি তেহেলকা পত্রিকায় প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রভাস যোশী– “তৎকালীন আরএসএস প্রধান বালাসাহেব (মধুকর দত্তাত্রেয়) দেওরস ইন্দিরা গান্ধিকে চিঠি লিখে সঞ্জয় গান্ধির কুখ্যাত ২০-দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এটাই আরএসএস-এর আসল চরিত্র... এ থেকে ওদের কর্মপন্থার একটি ধাঁচ বোঝা যাবে। এমনকি জরুরি অবস্থার সময়ে, আরএসএস এবং জনসঙ্ঘের যাঁরা জেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই মাফিনামা দিয়েছিলেন। তাঁরা প্রথমে ক্ষমা চেয়েছিলেন। শুধুমাত্র তাঁদের নেতারা জেলে ছিলেন: অটল বিহারী বাজপেয়ী (বেশিরভাগ সময় হাসপাতালে), লালকৃষ্ণ আদবানি, এমনকি অরুণ জেটলিও। আরএসএস জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেনি। তাহলে বিজেপি কেন সেই স্মৃতি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছে?” জরুরি অবস্থার সময় প্রধানমন্ত্রীকে লেখা সরসঙ্ঘচালক দেওরসের কিছু চিঠি প্রকাশিত হয় তাঁরই লেখা বই হিন্দু সংগঠন অর সত্তাবাদী রাজনীতি-তে। প্রকাশ করে নয়ডার জাগৃতি প্রকাশনা। পরে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গোয়েন্দা ব্যুরোর (আইবি) তৎকালীন উপপ্রধান টি ভি রাজেশ্বরও। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিমের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্বে থাকা রাজেশ্বর তাঁর ইন্ডিয়া: দ্য ক্রুশিয়াল ইয়ার্স বইতে জানিয়েছেন– আরএসএস “কেবল এর (জরুরি অবস্থার) সমর্থকই ছিল না, তারা শ্রীমতী গান্ধির পাশাপাশি সঞ্জয় গান্ধির সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করতে চেয়েছিল”। ইন্ডিয়া টুডে-র ‘টু দি পয়েন্ট’ অনুষ্ঠানে করণ থাপারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজেশ্বর বলেছেন, জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধির বেশ কিছু পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন দেওরস। দেওরস শ্রীমতী গান্ধি এবং সঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী ছিলেন। যদিও, শ্রীমতী গান্ধি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর বইয়ে রাজেশ্বর আরও লিখেছেন: “জরুরি অবস্থার পর দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন আরএসএস-কে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সঙ্ঘের প্রধান বালাসাহেব দেওরস প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সঙ্গে একটি যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন। এবং দেশে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য গৃহীত বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছিলেন”। সঞ্জয় গান্ধির সমন্বিত বিভিন্ন অভিযান; যেমন পরিবার পরিকল্পনা (বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য) পেয়েছিল দেওরসের অনুমোদন” [হাউ আরএসএস বিট্রেড দি অ্যান্টি-ইমারজেন্সি স্ট্রাগেল, শামসুল ইসলাম]। রাজেশ্বর আরও জানিয়েছেন, “জরুরি অবস্থা-পরবর্তী নির্বাচনে সংগঠন (আরএসএস) কংগ্রেসকে বিশেষভাবে সমর্থন জানিয়েছিল”। মোহন ভাগবতের পূর্বসূরী সঙ্ঘের তৃতীয় প্রধান দেওরস ইন্দিরা গান্ধিকে প্রথম চিঠিটি লিখেছিলেন জরুরি অবস্থা জারির দু-মাসের মধ্যে। সেসময় চলছে রাষ্ট্রের সন্ত্রাস। ২২ আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে লেখা চিঠিটি তিনি শুরুই করেছিলেন শ্রীমতী গান্ধির ব্যাপক প্রশংসা করে, “আমি ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশ্যে আপনার ভাষণটি জেলে (পুণের ইয়েরওয়াড়া কেন্দ্রীয় কারাগার) বসে রেডিওতে মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। আপনার ভাষণটি সময়োপযোগী ও খুবই ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। তাই আপনাকে এই লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। জরুরি অবস্থার ওই রাষ্ট্রীয় তাণ্ডবের সময় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সরসঙ্ঘচালকের কাছে ‘সময়োপযোগী ও খুবই ভারসাম্যপূর্ণ’ বলে মনে হয়েছিল! নিজের অভিপ্রায়ের কথা অকপটে জানিয়ে শেষ করেছিলেন সেই চিঠি “আমি আপনাকে অনুরোধ করছি... আরএসএসের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুন। আপনি যথার্থ মনে করলে, আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে পারলে আমি খুবই আনন্দিত হব”। ১০ নভেম্বর, ১৯৭৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রীকে লেখা আরেকটি চিঠিতে দেওরস আজকের বিজেপি নেতাদের দাবির সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে সেসময়ের সরকার-বিরোধী আন্দোলন থেকে আরএসএস-কে দূরত্বে রেখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন “জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে আরএসএস-এর নাম জড়ানো হচ্ছে। সরকার কোনও কারণ ছাড়াই গুজরাট আন্দোলন ও বিহার আন্দোলনের সঙ্গে আরএসএস-কে যুক্ত করছে... এইসব আন্দোলনগুলির সঙ্গে সঙ্ঘের কোনও সম্পর্ক নেই”। চিঠির শেষে আবারও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কাতর আরজি জানানোর সঙ্গেই সঙ্ঘের তরফে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, “লক্ষ লক্ষ আরএসএস কর্মীর নিঃস্বার্থ উদ্যমকে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে”। এই চিঠির তুরন্ত ফলাফল হিসেবে বিজেপি-র পূর্বসূরী জনসঙ্ঘের উত্তরপ্রদেশ ইউনিট জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রথম বার্ষিকীতে (২৫ জুন, ১৯৭৬) সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে। সেইসঙ্গে, সরকার-বিরোধী কোনও কার্যকলাপে অংশগ্রহণ না করারও প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রবীণ বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর বক্তব্য, “বাজপেয়ী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে তিনি মুক্তি পেলে কোনও সরকার-বিরোধী কার্যকলাপে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন”। স্বামীর মতে, “প্যারোলে জেলের বাইরে থাকাকালীন সরকার যা করতে বলেছিল, বাজপেয়ী তাই করেছিলেন” (‘দ্য আনলার্নট লেসনস অব ইমারজেন্সি’, দ্য হিন্দু, ১৩ জুন, ২০০০)। পুলিশ আটক আরএসএস কর্মীদের জন্য একটি সাধারণ মুচলেকাপত্র (ক্ষমাভিক্ষা) তৈরি করে রেখেছিল, যার শেষ বাক্যটি ছিল “আমি এমন কোনও কার্যকলাপে লিপ্ত হব না, যা বর্তমান জরুরি অবস্থার জন্য ক্ষতিকর” (‘আরএসএস অ্যান্ড ইমারজেন্সি’, ফ্রন্টলাইন, ১৮ জুলাই, ২০১৮)। “আটকদের শর্তসাপেক্ষে মুক্তির জন্য মহারাষ্ট্র সরকার চেয়েছিল লিখিত মুচলেকাপত্র। আরএসএস এবং সঙ্ঘের আটক সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের মুচলেকাপত্রে সই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এতে জেলের মধ্যে তৈরি হয় তুমুল আলোড়ন। বাগাইতকতর, বাবু রাও সামন্ত এবং দশরথ পাতিলের মতো সোশ্যালিস্ট নেতারা ছুটে যান জনসঙ্ঘের নেতা মাহলগিরের সঙ্গে দেখা করতে, যাতে তাঁর কর্মীদের ওই মুচলেকাপত্রে সই করতে তিনি নিরস্ত করেন। মাহলগি বলেন, এই মুচলেকাপত্রে সই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরএসএস ও জনসঙ্ঘের শীর্ষ নেতারা, যাঁরা জেলের বাইরে ছিলেন” (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, ডি আর গোয়েল, রাধাকৃষ্ণ প্রকাশনা, পৃষ্ঠা-১৪১)। দেওরস শুধু ইন্দিরা গান্ধিকেই চিঠি লেখেননি, চিঠি লিখেছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী এস বি চ্যবন, গান্ধিজির অন্যতম শিষ্য বিনোবা ভাবেকে। অন্যান্য চিঠিপত্রের সঙ্গে এই চিঠিগুলিও মহারাষ্ট্র রাজ্য বিধানসভায় পেশ করেছেন চ্যবন। ১৫ জুলাই, ১৯৭৫ তারিখে (ইন্দিরা গান্ধিকে লেখার আগে, তাঁকে গ্রেপ্তারের ১৫ দিনের মধ্যেই) দেওরস প্রথম চিঠিটি লেখেন চ্যবনকে। তাতে তিনি লেখেন, “সরকার বা সমাজের বিরুদ্ধে সঙ্ঘ কোনও কিছুই করেনি, এমনকি দূর থেকেও নয়। সঙ্ঘের কর্মসূচিতেও এমন কিছুই নেই। সঙ্ঘ কেবল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত”। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিনোবা ভাবের বৈঠকের ঠিক আগে ‘আচার্য’-কে লেখা এক চিঠিতে (১২ জানুয়ারি, ১৯৭৬) দেওরস বলেন “আপনার কাছে আমার প্রার্থনা, আপনি সঙ্ঘ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর ভুল ধারণা দূর করুন, যাতে আরএসএস-এর স্বয়ংসেবকরা মুক্তি পান, সঙ্ঘের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং যাতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিকল্পিত কর্মসূচিতে সঙ্ঘের স্বেচ্ছাসেবকরা অংশগ্রহণ করতে পারেন” (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, ডি আর গোয়েল, রাধাকৃষ্ণ প্রকাশনা, পৃষ্ঠা-২৭৯)। জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে ঠিক এমনই ছিল আরএসএস-এর প্রকৃত চেহারা! ব্রিটিশ হোক বা কংগ্রেস, শাসকের বিরুদ্ধে যেকোনও আন্দোলনেই আরএসএস এবং জনসঙ্ঘ বরাবর মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে মুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করে গিয়েছে। প্রকাশের তারিখ: ২৫-জুন-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |