ভারত সরকার প্রকাশিত পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে গড়পরতা বেকারির হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। একইসঙ্গে, একই সমীক্ষায় আরেকটি তথ্যও পাওয়া যায়। তথ্যটি এই রকম, এ রাজ্যে সমস্ত ধরনের কাজেই গড় মজুরি, বেতন অথবা উপার্জনের হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। এই রাজ্যে যারা নিয়মিত কাজ পায় তাদের গড় মজুরি সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম, এ রাজ্যে যাদের অস্থায়ী কাজে নিয়োগ জোটে তারাও যা মজুরি পান সেটি সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় কম। যারা স্বনিযুক্ত যেমন ছোট দোকানদার, ছোট বৃত্তিজীবী, তাদের ক্ষেত্রেও গড় আয় সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় কম। রাজ্যটিতে কাজ আছে কিন্তু সেকাজে যা মজুরি সেটা সর্বভারতীয় গড় মজুরির (আয়ের) তুলনায় কম।
তাই এতে আশ্চর্য হওয়ার কোনও কারণ নেই, রাজ্যওয়াড়ি মাথাপিছু নিট আয়ের হিসাবেও পশ্চিমবঙ্গ এখন একটা পিছিয়ে পড়া রাজ্য। এরাজ্যে মাথাপিছু এনএসডিপি গতবছর ছিল বার্ষিক ১,৫৪,১১৯ টাকা। পাশের রাজ্য ওড়িশার এনএসডিপি একই বছরে ছিল মাথাপিছু ১,৬৩,১০১ টাকা। আয়ের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে এখন ওড়িশার নিচে। কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, কেরালা, এমনকী উত্তরাখণ্ডেও মাথাপিছু নিট আয় পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি। সরকারি তথ্য অনুসারে, ত্রিপুরায় মাথাপিছু আয় বার্ষিক ১,৭৭,৭২৩ টাকা, যা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় অনেকটাই ওপরে।
গত বছরে প্রকাশিত হয়েছে, রাজ্যওয়াড়ি মাসিক ভোগব্যয় সংক্রান্ত তথ্য। এই তথ্য থেকে আন্দাজ করা যায় রাজ্যের স্বচ্ছলতার মান কেমন, গড়পরতা রাজ্যবাসী কী পরিমাণে খরচ করার সামর্থ্য রাখেন। এক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গের ছবিটি অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি অনুজ্জ্বল। ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে-র ৫৯২ নম্বর রিপোর্টে যে তথ্য পাওয়া যায় সে অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ভোগব্যয়, মাসিক মাথাপিছু খরচ করার সামর্থ্য দিয়ে যা বিচার করা হয়, সেই অঙ্কটি হল ৩,৬২০ টাকা, সর্বভারতীয় গড় ৪,১২২ টাকা। গ্রামীণ তামিলনাড়ুতে গ্রামীণ ভোগব্যয় (মাসিক মাথাপিছু) ৫,৭০১ টাকা, অন্ধ্রপ্রদেশে তুলনীয় অঙ্কটি হল ৫,৩২৭ টাকা, এমনকী রাজস্থানেও গ্রামাঞ্চলে মানুষের খরচ করার সামর্থ্য পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি (মাসিক মাথাপিছু ৪,৫১০ টাকা)।

শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি একই ধরনের উদ্বেগজনক। শহরাঞ্চলে মাসিক মাথাপিছু খরচ করার ক্ষমতার সর্বভারতীয় গড় অঙ্কটি হল ৬৯৯৬ টাকা। পশ্চিমবঙ্গে শহরবাসীর মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয়ের ক্ষমতা হল ৫,৭৮৫ টাকা। ওড়িশার শহরাঞ্চলে মানুষের যে খরচ করার ক্ষমতা (মাসিক মাথাপিছু ৫,৮২৫ টাকা), সেটাও শহর পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি। সরকারি হিসাবে কেরালা, পাঞ্জাব, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, হরিয়ানা, কর্ণাটক অথবা রাজস্থান সর্বত্রই গড় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি।
ছবিটা আসলে এই রকম যে, এ রাজ্যে বেকার কম, মজুরিও কম। এ রাজ্যে যারা কাজ করে জীবিকা অর্জন করেন এমনকী তাদের মধ্যেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধের অভাব রয়েছে। বলা বাহুল্য, এটাই হল তৃণমূল সরকারের রাজনৈতিক পুঁজি।
গড় মানুষের সংসার টানাটানিতে রয়েছে। সহজ পথে স্বাচ্ছন্দ্য এখানে আসে না। সুতরাং, এই মাটিতেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কিংবা যুবসাথী চাষে সোনা ফলার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূল এটিকে সযত্নে লালন করে। এবং অভাবপীড়িত এই রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরে এলে তৃণমূল এই ভাতা নির্ভরতার রাজনীতি আরও বেশি প্রসারিত করবে। স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব থেকে উঞ্ছবৃত্তির প্রবণতা বাড়ে। তৃণমূলী শাসনে কাটমানির যে বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে তার কারণও এটাই। তোলাবাজি জীবিকায় রূপান্তরিত হওয়ার কারণও খুঁজে পাওয়া যাবে এখানেই।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে সবার আগে মোকাবিলা করতে হবে এই তৃণমূলী ভবিষ্যৎ। রাতারাতি ভাতা বিলোপ করা সম্ভব হবে না। কারণ যে উত্তরাধিকার তৃণমূল রেখে যাবে তার ভেতরেই থাকবে ভাতা রাজনীতির বাস্তবতা। যে উত্তরাধিকার একই সাথে তৃণমূল রেখে যেতে চায় সেই তোলাবাজির সংস্কৃতির কিন্তু একই সাথে বিলোপ ঘটাতে হবে এই রাজ্যে। রাজ্যটিতে কোনও উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নেই। কারণ বিনিয়োগকারীকে সবার আগে সামলাতে হবে তোলাবাজির দৌরাত্ম্য। এই ব্যাধি স্থানীয় কিছু কাউন্সিলরের অনুগামীর জীবিকা হিসাবেই আজ আর সীমিত নয়। স্থানীয় পুলিশ থেকে নবান্নের কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত ছড়ানো আছে এই তোলাবাজির জাল। নতুন পশ্চিমবঙ্গ গড়তে হলে সবার আগে রাজ্যটিকে এই বহুবিস্তৃত তোলাবাজির নেটওয়ার্ক থেকে মুক্ত করতে হবে। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা অবশ্যই এর যাত্রাবিন্দু। কিন্তু সমস্যাটি যেহেতু বহুদূর বিস্তৃত, নতুন সরকারকে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে অনেক সময় ধরে এই আগাছা নির্মূল করার কাজটি করে যেতে হবে।
একাজে সবচেয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে নিয়োগ দুর্নীতির বিলোপ সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে আসা এবং সরকারের হাতে থাকা শূন্যপদগুলিতে অতি দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করা। এই রাজ্য সরকার সরকারি নিয়োগ ক্ষেত্রগুলিতে অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ করেছে। তাদের মজুরি কম, কর্ম নিরাপত্তা নেই, অবসরকালীন আর্থিক সহায়তাও অনুপস্থিত। ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা মাইনের এই অস্থায়ী কর্মীরা স্রেফ চাকরি বাঁচানোর স্বার্থে উদয়ান্ত পরিশ্রম করেন এবং সংগঠিত শ্রমজীবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে লেঠেল হিসাবে কাজ করে। তৃণমূল শাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রজাতির চাকুরিজীবির যাতে বিলোপ ঘটে, সমকাজে সমবেতনের নিয়মে অস্থায়ী কর্মীরা যাতে স্থায়ী কাজে নিয়োগ পেতে পারেন, সরকারকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু এর মধ্যে দিয়েই রাজ্যে নিয়োগ চিত্রটি বদলে যাবে, এটা ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। নিয়োগ চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে এখানে চাই বড় ধরনের শিল্পায়ন— যা সংগঠিত ক্ষেত্রের নিয়োগবৃদ্ধি ঘটিয়ে দৃশ্যমান যে বাস্তব— অল্প মজুরিতে যে কোনও ধরনের কাজ খুঁজে নেওয়া— তার অবসান ঘটাতে পারে। এই ধরনের নিয়োগ সৃষ্টির জন্য চাই বড় বিনিয়োগ— সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ।
সাধ্য সীমিত থাকা সত্ত্বেও বিকল্প সরকার এই ধরনের উদ্যোগ থেকে একেবারে হাত গুটিয়ে নেবে না। সাধ্য অনুসারে বিনিয়োগ ঘটাবে। বিনিয়োগের লক্ষ্য থাকবে প্রতি পরিবারে অন্তত একটি স্থায়ী কাজ সৃষ্টি করা। তোলাবাজি বন্ধ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে শুরু করবে। বরিষ্ঠ আমলা থেকে বিডিও অফিস পর্যন্ত যে তোলবাজি ও কাটমানির জাল বিস্তৃত হয়েছে, এটি সরে গেলেই ভারী বিনিয়োগ আসতে শুরু করবে, এগুলো অবশ্যই হবে বেসরকারি বিনিয়োগ। তবে তার ওপর থাকবে একটি জনমুখী সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন। আমাদের অনুমান, এই ধরনের বিনিয়োগ এ রাজ্যে আসতেই পারে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে। বিগত বাম সরকার এই ধরনের বড় বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আসার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ভুলের শিকার হয়েছিল। এই ধরনের কর্মসূচির সমর্থনে গণ জমায়েত পরিহার করে আমলাতান্ত্রিক কিছু পদক্ষেপের মধ্যে কর্মসূচিকে সীমিত করা হয়েছিল। নতুন সরকার অবশ্যই এই ভুল করবে না। আমাদের অনুমান, তোলাবাজি ও কাটমানির সংস্কৃতি বন্ধ হলে এবং একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলিকে বাস্তবায়িত করলে পরিচ্ছন্ন কাজের সুযোগ বাড়বে, অন্তত ৪০ লক্ষ স্থায়ী কর্ম সংস্থানের সম্ভাবনা দেখে দেবে। অনুসারী শিল্প ও লজিস্টিক পরিষেবায় কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রামীণ স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে যদি ফড়িয়াদের হাত থেকে মুক্ত করে স্বউদ্যোগী সংস্থায় রূপান্তরিত করা যায় তাহলে গ্রামীণ কর্মসংস্থানেও অভূতপূর্ব বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
উন্নততর মজুরি লাভের জন্য প্রয়োজন উন্নততর প্রযুক্তির শিক্ষা লাভ করা। এ রাজ্যে পলিটেকনিকগুলি মৃতপ্রায়। নতুন যে কাজ আসছে তার সঙ্গতিপূর্ণ পলিটেকনিক ডিগ্রি তৈরি হচ্ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর কাজের সুযোগ আসছে। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রকে এবিষয়ে ওয়াকিবহাল করার কাজ হাতে নিতে হবে। যাদের এখনই কোনও প্রকৌশলে শিক্ষিত করা যাচ্ছে না, কোনও ধরনের দক্ষতা যাদের নেই, তারা যাতে অপাংক্তেয় না হয়ে পড়ে নতুন সরকারকে সেদিকেও নজর দিতে হবে।
প্রতি পরিবারের অন্তত একটি স্থায়ী কাজ জোটানো হবে এই সরকারের লক্ষ্য। এই ধরনের কাজ যত আসতে শুরু করবে, যুব সমাজের মধ্যে তোলাবাজির সংস্কৃতি ততই দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রশিক্ষণহীন যুব সমাজ, যা থেকে তোলাবাজের জন্ম হয়, তাদের জন্য নিয়োগ সৃষ্টি করার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামে বছরে ২০০ দিনের কাজ এবং শহরে বছরে ১২০ দিনের কাজ বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির অন্যতম। এই দাবি পূরণ করতে হবে। সঙ্গে আনতে হবে সরকারি পোষিত এবং সরকার অনুমোদিত প্রতিটি কাজে ন্যূনতম মজুরি প্রদানের ব্যবস্থা করা। বর্তমান মূল্যস্তর অনুযায়ী এই অঙ্কটি হবে দৈনিক ৬০০ টাকা।
ইশ্তেহার অনুসারে উৎপাদনমুখী ও উন্নয়নমূলক কাজে যুব অংশকে নিয়োগ করার একটি প্রস্তাব আছে। এই ধরনের নিয়োগে যুবশ্রীর ১৫০০ টাকা নয়, বরং মাসিক ২০০০ টাকা ভাতা, কাজের বিনিময়ে যা পাওয়া যাবে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে কর্মভূমি পোর্টালের মাধ্যমে। প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশেষ কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা এই কর্মসূচির একটি অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠবে। এ রাজ্যে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে-র তথ্য অনুয়ায়ী ৬৮ শতাংশ শ্রমজীবীরই কোনও ধরনের সামাজিক সুরক্ষা নেই। এ রাজ্যে বামফ্রন্ট অথবা বাম শক্তি নির্ভর কোনও সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের প্রথম কাজ হবে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাগুলি যাতে সর্বত্র গিয়ে পৌঁছয় তার ব্যবস্থা করা।
গত ১৫ বছর ধরে যে সরকার পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে সেটি একটি দক্ষিণপন্থী জনপ্রিয়তাবাদী সরকার। এই সরকারের পক্ষে এই ধরনের কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। বাস্তবে সেটা ঘটেওনি। কিছু রেউড়ি বিলি করা ছাড়া শ্রমজীবীদের জন্য আর কিছুই ছিল না এই সরকারের কর্মসূচির মধ্যে। নতুন যে সরকার আসবে তার দায়িত্ব হল যে দিশায় গত দেড় দশক এ রাজ্যে শাসন পরিচালিত হয়েছে সেই দিশাটির পরিবর্তন ঘটানো। কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। অসম্ভব নয় এই কারণে যে, বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি এ রাজ্যে ক্রমশ বিকল্প হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে। বিকল্প শক্তির থাকে বিকল্প ইশ্তেহার, যে ইশ্তেহারে লেখা থাকে— মন্দির-মসজিদ নয়, কাজ— বামদের বিকল্প কর্মসূচিই বাঁচাতে পারে বাংলাকে।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-এপ্রিল-২০২৬ |