পরিবেশবাদ ও বামপন্থা (ষষ্ঠ পর্ব)

অর্চনা প্রসাদ
ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকার গণতান্ত্রিক আদিবাসী সমাজ গঠনের উদ্দেশ্য এই তফসিলকে সঙ্গী করেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। ত্রিপুরা ছিল একটি রাজন্য শাসিত রাজ্য যেখানে ১৯৪৭ সালের পর বিপুল সংখ্যায় উদ্বাস্তুদের আগমন ঘটেছে। দেশভাগের আগে ১৯টি জনগোষ্ঠীতে (রিয়াং, চাকমা ও জুমিয়ারা যার মুখ্য অংশ) বিভক্ত সেখানকার আদিবাসী জনগন ছিল মোট জনসংখ্যার ৫০.৯ শতাংশ। ১৯৫১ নাগাদ এই হার কমে দাঁড়ায় ৩৬.৮৫ শতাংশে যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে বাঙালি ও অ-ত্রিপুরী আদিবাসীদের প্রাধান্য কায়েম করে সেখানকার আদিবাসীদের উল্লেখযোগ্য ভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করে।

৬ষ্ঠ পর্ব

ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসী সমাজ

 আদিবাসী ভিত্তিক গণসংগঠনগুলির দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০০০ সালে ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে ঝাড়খণ্ড নামে নতুন আদিবাসী রাজ্য গঠিত হল। তারপরই আদিবাসী নেতা রামদয়াল মুণ্ডা বলেন:
আমরা এই অঞ্চলের জনগন যারা এই স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্যে কঠিন লড়াই করেছি তারা কেবলমাত্র সংবেদনশীল ও সুবিবেচনাপূর্ণ উন্নয়নেরই অনুমতি দেবো এই অঞ্চলে।

নতুন আদিবাসী রাজ্যের দাবি কোনো নতুন দাবি ছিল না। আদিবাসী মহাসভার প্রতিষ্ঠাতা নেতা জয়পাল সিং ১৯৩০-এর দশকে প্রথম বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরে স্বতন্ত্র আদিবাসী রাজ্যের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। অনুরূপভাবে, ভারত জন আন্দোলনের গান্ধীবাদী কর্মী ও অন্যান্য ক্ষুদ্র আদিবাসী আন্দোলনের পক্ষ থেকেও একই সময়ে আদিবাসী রাজ্য ছত্তিশগড়ের দাবি তোলা হয়েছিল। পরিবেশবাদীদের মতই, এই আন্দোলনকর্মীরাও বিশ্বাস করতেন যে আদিবাসীদের হাতে ক্ষমতা ফিরে গেলেই আদিবাসী এলাকার সমস্যার সমাধান হবে। তারা আত্মশাসনকে শেষ লক্ষ্য হিসেবে দেখেন নি, বরং পরম্পরাগত আদিবাসী প্রতিষ্ঠান ও গ্রামস্তরের আত্মশাসনের স্বীকৃতির পথে প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য করেছেন, যে বিষয়টি এই অঞ্চলগুলির অনেক জায়গায় পঞ্চম তফসিল প্রবর্তনে পরিলক্ষিত হয়েছে।

অন্যদিকে বামপন্থীদের বক্তব্য হচ্ছে, আত্মশাসনের উপর সমস্ত নজর কেন্দ্রীভূত করার ফলে আদিবাসী রাজনীতির মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি বিপথে চালিত হয়ে যাচ্ছে।  অসম বিনিময় জনিত সমস্যার সমাধান ক্ষমতার হস্তান্তরে নিহিত নেই, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির শক্তিবৃদ্ধিতে রয়েছে যা আদিবাসী এলাকায় ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  ত্রিপুরায় বামপন্থীদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এই অবস্থানকে দৃঢ় করেছে।  এই ধারণা অনুযায়ী প্রাচীন আনুগত্যের শক্তি বৃদ্ধির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চেতনার বিকাশ ঘটালেই আদিবাসীরা অধিকতর উপকৃত হবে।  এর অর্থ এটা নয় যে বামপন্থীরা বর্তমান ষষ্ঠ তফসিলকে আদর্শ সমাধান হিসেবে মেনে নেয়।  ওরা বরং এই যুক্তিই উপস্থাপন করে যে সংবিধানের আরো সংশোধন এনে এই তফসিলকে উন্নত করা প্রয়োজন। তাদের মতে ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন সুনিশ্চিত করতে হলে পরিষদগুলিকে আইন প্রণয়ন ও আর্থিক বিষয়ে আরো বেশি ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে।  এর বিপরীতে, নানা আদিবাসী আন্দোলনের তরফে বলা হয় যে আত্মশাসনের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ তফসিলের তুলনায় পঞ্চম তফসিল ব্যবস্থাগত দিক থেকে অধিকতর গ্রহণীয় কারণ এখানে পরম্পরাগত শাসন কাঠামো বহাল রাখার অনুমতি রয়েছে।  ফলে কোনটি আদিবাসী এলাকার জন্যে উন্নততর রাজনৈতিক প্রশাসন, এ সম্পর্কিত বিতর্ক একদিকে জাতিভিত্তিক বনাম গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং অন্যদিকে পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠান বনাম সমত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায়নের দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়। 


নেহরুবাদী ভাবনা

১৯৩০ এর দশক আদিবাসী উন্নয়ন সম্পর্কিত নতুন ভাবনার সাথে পরিচিত হয়েছিল।  পিতৃতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক আধিকারিকরা যুক্তি দিয়েছিল যে আদিবাসীদের অভাব অনটনই তাদের বাধ্য করেছে নতুন বিধিব্যবস্থা প্রণয়নে যার মাধ্যমে জনগন  অ-আদিবাসীদের শোষণ থেকে আদিবাসীদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়।  ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইনের ৫২ ও ৯২ ধারা অনুযায়ী আদিবাসী সংখ্যাধিক্যের এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করে বর্জিত ও আধা-বর্জিত এলাকা হিসেবে পৃথক করা হয়। এর অর্থ দাঁড়াল, সংবিধানের কাঠামোর বাইরে গিয়ে গভর্নর এই এলাকাগুলির প্রশাসন পরিচালনা করবেন এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল এলাকার শাসন সম্পর্কিত নিয়ম ও পদ্ধতি দেশের অবশিষ্ট অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন হবে।  ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম পর্বে তফসিলী এলাকা গঠন নিয়ে তর্কবিতর্কের শুরু এবং এটাই পরবর্তীতে আদিবাসী কল্যাণ সম্পর্কে নেহরুবাদী ভাবনার ভিত্তি হয়ে ওঠে।  এই নীতিমালার ভাবনা অনুযায়ী আদিবাসীরা ঔপনিবেশিক পর্বে নিদারুণ অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন এবং ফলেই তাদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে এখন সুরক্ষিত করতে হবে।  উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫২ সালে নেহরু লেখায় পাই :

আমাদের মনে রাখা উচিত ভারতের কোটি কোটি মানুষ যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে তা আদিবাসী সমাজকে জানতে দেওয়া হয় নি।  আদিবাসী জনগনের সাথে বন্ধুত্ব ও প্রীতির সম্ভাষণে মিলিত হতে হবে এবং তাদের কাছে পৌঁছতে হবে মুক্তির বার্তাবাহক হিসেবে।  তারা যেন অনুধাবন করতে পারে যে আমরা দিতেই এসেছি, নিতে আসি নি।  এমনতর মনস্তাত্ত্বিক সংহতিই ভারত প্রত্যাশা করে। 

নেহরুবাদী ভাবনা মূলত এটাই চেয়েছে যে আদিবাসীদের সংস্কৃতি সুরক্ষিত করে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে, এমনকী আধুনিকীকরণও করতে হবে।  এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হয়েছে ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক ভেরিয়ের এলভিনের ভাবনার দ্বারা যিনি উপনিবেশ-উত্তর আদিবাসী সম্পর্কিত নীতিমালার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। এই নীতিমালার ঔপনিবেশিক উৎস এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এ নিয়ে এপাশ-ওপাশ করা স্পষ্ট বোঝা যাবে ১৯৩৫ থেকে ১৯৫০ অবধি উঠে আসা বিতর্কগুলি অনুসরণ করলে।  ১৯৩৫ সালে তফসিলের সমর্থকরা মনে করতেন আদিবাসী ও কৃষকদের মধ্যে সম্পর্কটা শোষণমূলক। তারা মনে করতেন এঁদের আধুনিকীকরণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি পৃথকীকরণের ব্যবস্থাই।  জাতীয়তাবাদী নৃতাত্ত্বিক ও কংগ্রেসীরা এই মতধারার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন এই যুক্তি দিয়ে যে বর্জিত এলাকা গঠনের ভাবনাটিই ভিত্তিহীন।  উপনিবেশবাদ বিরোধিতা ও সামগ্রিক ভারতীয় সত্তা বিকাশের উপর গুরুত্ব কেন্দ্রীভূত করে কংগ্রেস এই ব্যবস্থাগুলিকে সাংস্কৃতিক আদিমতার উদযাপন হিসেবে অভিহিত করেছে। 

এটা করার মধ্য দিয়ে দেশকে বিভাজিত করার ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্য সাধিত করেছে এবং এটার মাধ্যমে জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা খাড়া করেছে। জনগণের অবশিষ্ট অংশের সাথে আদিবাসীদের অভিন্নতা প্রমাণ করতে তারা বলতে শুরু করেন যে আদিবাসীদের ধর্মব্যবস্থা বৃহত্তর হিন্দু ধর্মেরই অংশ।  এই ভাবনা থেকে এ, ভি, থাক্কারের মত সমাজকর্মীরা হিন্দু সমাজের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন যাতে তফসিলী জাতি ও আদিবাসীদের প্রতি অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের দূরীকরণ হয়। 

স্বাধীনতার পর এই বিতর্কে এক অস্বাভাবিক মোড় এলো; কংগ্রেস যারা ইতিপূর্বে পৃথকত্বের বিরোধিতা ও সমন্বয়ের স্বপক্ষে যুক্তি রেখেছে, তারাই তফসিল গঠনের স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করল।  এর প্রধান কারণ, নবজাত জাতির প্রয়োজন ছিল সাংস্কৃতিক বহুত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার পরিচিতি নির্মানের।  ‘সমন্বয়’-এর পরিবর্তে ‘জাতীয় সংহতি’ হয়ে উঠল নতুন কংগ্রেস সরকারের নবমন্ত্র, যার মাধ্যমে এই সত্যের স্বীকৃতি হল যে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী লড়াইয়ের সময়ে আদিবাসীদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ছিল।  ফলে এটা স্বাভাবিক যে জাতীয় মূলস্রোতে আদিবাসীদের সংহত করার প্রক্রিয়াটি শ্লথ হবে এবং সহনশীলতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমেই তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।  এই পরিপ্রেক্ষিতেই নেহরু বলেছিলেন যে বাজার অর্থনীতির বৈরিতা থেকে আদিবাসী অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্যে আইন প্রণয়ন করতে হবে। নেহরু আদিবাসী উন্নয়ন সংক্রান্ত তাঁর পরিকল্পনার বিশদ ব্যাখ্যা করেছিলেন।  তাঁর ভাবনায়, যদিও ইতিহাসগতভাবে অভ্রান্ত নয়, ধারণা করা হয়েছিল যে আদিবাসীরা বাজার অর্থনীতির সংস্পর্শে আসে নি।  তাঁর সমস্ত সমসাময়িকদের মতই, বিশেষ করে এলউইন, নেহরু মনে করতেন, আদিবাসী অর্থনীতির মূল সমস্যার উদ্ভব তাঁদের পরম্পরাগত অধিকারের সংকোচন থেকে। তিনি জোর দিয়েছেন এই অধিকারগুলির পুনরুজ্জীবনে এবং বলতে চেয়েছেন শোষণের হাত থেকে তাদের রক্ষার করা মাধ্যমেই একমাত্র আদিবাসী অর্থনীতির স্বনির্ভর বিকাশ হতে পারে। এই প্রেক্ষিতেই, তাঁর সমসময়ের পরিবেশবাদী চিন্তকদের সাথে, বিশেষ করে এলউইনের সাথে নেহরুবাদী চিন্তাধারার সাদৃশ্য এবং এতে তাঁদের প্রভাব সুস্পষ্ট।  এই চিন্তাধারা উপনিবেশ-উত্তর পণ্ডিত ও সমাজকর্মীদের অধিকাংশকে প্রভাবিত করেছে যাঁরা উভয়বিধ তফসিলের মাধ্যমে আদিবাসী সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণের স্বপক্ষে সওয়াল করেছেন।

এই সন্দর্ভেই, প্রথম কংগ্রেস সরকার আদিবাসী সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল।  ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ ও এই উদ্যোগে একই রকম সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছিল, যেমন ৫ম তফসিল (আংশিক বর্জিত এলাকার জন্য) ও ৬ষ্ঠ তফসিল (বর্জিত এলাকায় আদিবাসী পর্ষদ) গঠন।  ৫ম ও ৬ষ্ঠ তফসিলের মধ্যে প্রধান তফাৎ হল ৬ষ্ঠ তফসিলে বিকাশের লক্ষ্যে কিছু স্বশাসন সম্বলিত আদিবাসী পর্ষদ গঠনের ব্যবস্থাপনা।  ৫ম তফসিলে এমনতর কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না এবং সেই এলাকা সরাসরি শাসিত হত রাজ্যপালের দ্বারা, উপদেষ্টা স্তরের মনোনীত আদিবাসী পর্ষদের সহযোগিতায়।  একজন সাংবাদিক যথার্থই বলেছেন, '৬ষ্ঠ তফসিলের অধীনস্থ এলাকায় জনগনই নিজের ভাগ্যনিয়ন্তা ছিলেন অথচ ৫ম তফসিলের অধীনে থাকা জনগন তা ছিলেন না'।  আদিবাসী ভূমিতে উচ্ছেদের কোনো অনুমতি ছিল না। 

মোদ্দা কথা, বামপন্থীরা সাধারণভাবে আদিবাসীদের আধুনিক উন্নয়ন ও বাজারের অপশক্তির হাত থেকে আদিবাসীদের রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক নেহরুবাদী অবস্থানের সাথে সহমত ছিল। ত্রিপুরার গণমুক্তি পরিষদের মত গণসংগঠন ১৯৪০ থেকেই আদিবাসী প্রধান এলাকার স্বশাসন ও আদিবাসী এলাকায় শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটানোর ওপর অগ্রাধিকার আরোপ করেছিল। ষষ্ঠ তফসিল গঠন এই অবস্থানের প্রমাণিতই শুধু করে নি, বরং এই প্রতিষ্ঠানগুলির বর্ধিত স্বশাসনের বামপন্থী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল। উল্টোদিকে, নব্য গান্ধীবাদী পরিবেশপন্থীরা এবং আদিবাসী আন্দোলনকর্মীরাও আদিবাসী সংরক্ষণের প্রশ্নে নেহরুবাদী ভাবনাকে সমর্থন করেছিল। তবে তা ততটুকুই যতটুকু সমর্থন করা হলে পরম্পরাগত আদিবাসী প্রতিষ্ঠানগুলির পুনরুজ্জীবন সম্ভব হয়।  এই সমর্থন সীমাবদ্ধতা আক্রান্ত এবং আদিবাসী সমাজকে ধীরে ধীরে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মূল ধারায় নিয়ে আসার নেহরুবাদী আদর্শ থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে স্বতন্ত্র।  পাশাপাশি বামপন্থীদের অবস্থান হচ্ছে আদিবাসী সমাজের গণতন্ত্রীকরণ, আবার ভারতীয় রাষ্ট্রের চৌহদ্দির অভ্যন্তরেই একটি ভিন্নধর্মী গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানো।  ফলেই ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসীদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং স্বনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের ওপর নয় বরং আদিবাসী ও আদিবাসী এলাকা ও প্রাধান্যকারী রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যে বৈষম্য নিরসনের মধ্যে। 


কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টি

নেহরুর চিন্তাধারাই স্বাধীন ভারতের আদিবাসী সংক্রান্ত নীতির ভিত্তি নির্মাণ করেছিল এবং তিনি চেয়েছিলেন আদিবাসীদের মাধ্যমে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিকাশের মধ্য দিয়ে প্রাত্যহিক জীবনধারার মধ্যে আধুনিক চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে পড়ুক। এই ভাবনার সাথে সঙ্গতি রেখেই পৃথকভাবে আদিবাসী কল্যাণ বিভাগ তৈরি করা হয় এবং শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও উপার্জন সৃষ্টিকে উৎসাহ দান করতে আদিবাসী এলাকাগুলিকে বিশেষ আদিবাসী বহুমুখী অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়।  দুঃখের বিষয়, এই অঞ্চলগুলিতে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকারের বিষয়টি নীতিনির্ধারকেরা উপেক্ষা করেছিলেন।  আদিবাসীরা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেল এবং আদিবাসী অঞ্চলের ক্ষতির মূল্যে অব্যাহত থাকল ভূমি, বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি এবং খনিজ পদার্থের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।  আদিবাসী সমাজের সুসংহত উন্নয়নের পক্ষে সওয়াল করা ১৯৬০ এর ভেরিয়ার এলউইনের প্রতিবেদনে এর উল্লেখ রয়েছে এবং এই প্রতিবেদনে আদিবাসী সংরক্ষণের নীতির সাথে জমি ও জঙ্গলের অধিকারকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।  স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম দশকে বিকাশের কেন্দ্রীভূত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছিল।  আবার আধুনিক শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলায় অগ্রাধিকারের ফলে আদিবাসী সম্পর্কিত ভাবনার কথা পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অবধি সরকারের কাছে গুরুত্ব পায় নি।  বরাদ্দের চেহারার মধ্যেই করুণ চিত্রটি ফুটে উঠবে। (সারণি-৫)

সারণি ৫ : অনুসূচিত আদিবাসীদের জন্যে পরিকল্পনা বরাদ্দ, ১৯৫০-৭৯

পরিকল্পনা

বৎসর

মোট ব্যয় (কোটি টাকা)

অনুসূচিত আদিবাসী খাতে (কোটি টাকা)

মোট শতাংশ

মাথাপিছু ব্যয় (টাকা)

প্রথম

১৯৫১-৫৬

১৯৬০.০০

১৭.৪৭

০.৮৩

৭.৭৬

দ্বিতীয়

১৯৫৬-৬১

৪৬৭২.০০

৪৮.৮৬

০.৮৭

১৮.৬৫

তৃতীয়

১৯৬১-৬৬

৮৫৭৭.০০

৫২.৫৫

০.৬১

১৭.৫৭

বার্ষিক পকিরল্পনা

১৯৬৬-৬৯

৬৭৫৬.০০

৩৪.৬৪

০.৫১

১০.৩১

চতুর্থ

১৯৬৯-৭৪

১৫৯০২.০০

৭৫.০০

০.৪৭

১৯.৭৪

পঞ্চম

১৯৭৪-৭৯

৫৪৪১১.০০

১০৫.০০

০.২২

২৫.৫৭

বাড়তি বরাদ্দ

১৯৭৪-৭৯

 

৫০০.০০

০.৯২

১২১.৬৫


অনুসূচিত উপজাতিদের জন্যে (সংবিধানের সপ্তম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত) অর্থ বরাদ্দের সিংহভাগই ছিল শিক্ষা ও সামাজিক পরিষেবা খাতে।  বিশেষ বহুমুখী আদিবাসী অঞ্চলগুলির মূল্যায়নে ভেরিয়ার এলউইন কমিটিও বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহ বলেছে যে, উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের জন্যে শুধু বরাদ্দই কম ছিল না, আদিবাসী অঞ্চলগুলিতে কৃষিক্ষেত্রে ব্যয়ের মাত্রাও ছিল শোচনীয়। প্রতিটি আদিবাসী অঞ্চলের জন্যে ৫ বছরের বরাদ্দ ছিল ২৭ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে ৫.৫০ লক্ষ টাকা বা ২০ শতাংশ ছিল সেচ, ভূমি পুনরুদ্ধার, মৃত্তিকা সংরক্ষণ এবং কৃষির জন্যে বরাদ্দ।  তাৎপর্যপূর্ণ হল, ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ ছিল প্রকল্পের মুখ্য কার্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যয়ে যা ছিল কোনো একটি খাতের সর্বোচ্চ বরাদ্দ।  যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যে গড় বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ৩.৫০ লক্ষ টাকা ও ২ লক্ষ টাকা।  শিক্ষাখাতে ব্যয় ছিল ১ লক্ষ টাকার সামান্য কম।  সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পেও ছিল একই রকম।  অন্য প্রধান ব্যয় হওয়ার কথা ছিল সমবায়ের বিকাশে।  ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী অঞ্চলের সুসংহত উন্নয়ন, কিন্তু প্রকল্পের অধীনস্থ ৪৩ টি অঞ্চলের সমীক্ষায় দেখা যায় অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় সামান্যই। সারণি-৬-এ ১৯৫৭-৫৯ সময়পর্বে প্রকল্প এলাকার গড় ব্যয় তুলে ধরা হয়েছে। 

সারণি ৬ : একটি বহুমুখী খণ্ডের গড় ব্যয়

কর্মকাণ্ড

মোট বরাদ্দ (লক্ষ টাকা)

মোট বরাদ্দের ব্যয়ের শতাংশ 

প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়

৭.০০

৪৪.৩৫

কৃষি ও পশুপালন

১.৫০

৩৫.৪২

সেচ ও মৃত্তিকা সংরক্ষণ

৪.০০

৩৩.০৫

স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ শৌচালয় ব্যবস্থা

২.০০

৫৭.৬

শিক্ষা

০.৭৫

৫৯.২

সামাজিক সচেতনতা

০.৭৫

৪৮.৭১

যোগাযোগ

৪.০০

৪৬.৪৫

গ্রামীণ শিল্পকলা ও হস্তশিল্প

২.০০

২০.২০

সমবায়

২.০০

২০.৩৪

গ্রামীণ গৃহায়ন

২.৫০

বেশির ভাগ ব্যয়িত

বিবিধ

০.৫০

-


সামগ্রিকভাবে প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টির খামতি এবং বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয়ের স্বল্পতার তীব্র সমালোচনা করেছেন এলউইন। উনি বলেছেন, এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষগুলির আদিবাসী এলাকার সমস্যা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।  সারণিতে দেওয়া পরিসংখ্যানেই প্রতিফলিত যে সর্বোচ্চ ব্যয় ঘটেছে প্রকল্পের প্রশাসনিক কাজ অথবা সামাজিক শিক্ষাদানে যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বুর্জোয়া আদর্শের পাঠদান ও আদিবাসী এলাকায় পরিষেবা প্রদায়ী শ্রেণির অনুপ্রবেশ ঘটানো। এভাবেই যে যৎসামান্য অর্থ কৃষি ও তার অনুসারী খাতে ব্যয় হয়েছে তা মূলত গেছে স্থির চাষ ও উচ্চফলনশীল শস্যে যা প্রান্তিক অঞ্চলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এটা দেখেই এলউইন মন্তব্য করেছিলেন যে এই প্রবণতার পরিবর্তন না হলে 'একদিন আসবে যখন শিক্ষাদানের জন্যে প্রায় কেউই থাকবে না, অবশিষ্ট থাকবে না কেউ বাসস্থানের জন্যে'। প্রতিবেদনে ধরা পড়ে, দ্বিতীয় পরিকল্পনার সময়পর্বে এলাকাভিত্তিক ব্যয় হয়েছে মোট পরিকল্পিত ব্যয়ের মাত্র ১৩.২ শতাংশ এবং রাজ্য সরকারের এলাকা ভিত্তিক প্রকল্প বহির্ভূত কর্মসূচির পরিস্থিতি ছিল আরো শোচনীয়। একমাত্র বিহার ও ওড়িশার মত রাজ্যেই এই প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন হয়েছে এবং সেটাও হয়েছে ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারদের মাধ্যমে।

এডউইন কমিটি এই ধারাকে বদলে দিতে চেয়েছিল।  ওরা সুপারিশ করেছিল নিম্নলিখিত ভাবে আদিবাসী এলাকার ভবিষ্যৎ বরাদ্দ নির্দিষ্ট করার: অর্থনৈতিক উন্নয়ন : ৬০ শতাংশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা : ২৫ শতাংশ এবং সামাজিক পরিষেবা : ১৫ শতাংশ। তাদের মত ছিল, এর পর থেকে সমস্ত অর্থ ব্লক প্রশাসনের মাধ্যমে বাহিত হতে হবে এবং সেটা জমা পড়বে আদিবাসী এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পে। তাদের সুপারিশ ছিল, রাজ্য সরকারগুলি আদিবাসী উন্নয়নের ক্ষেত্রে কতগুলি পূর্ব নির্ধারিত প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আরো বেশি করে কেন্দ্রীভূত নজর দিতে হবে আদিবাসী সমাজের বিদ্যমান জ্ঞান ও কুশলতা বৃদ্ধিতে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কমিটি প্রস্তাব রেখেছিল প্রকল্পগুলির বিস্তারের এবং তৃতীয় পরিকল্পনায় বহুমুখী আদিবাসী খণ্ডগুলিকে আদিবাসী উন্নয়ন খণ্ডে পরিণত করার। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষে এই প্রকল্পের আরো একটি মূল্যায়ন করা হয় এবং দেখা যায় ১৫টি রাজ্যের ৫০৪টি আদিবাসী উন্নয়ন খণ্ডে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী জনগনের মধ্যে অসাম্য কমার বদলে বেড়ে গেছে। এ ছাড়াও আরো বিস্তারিত পরিকল্পনা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গে কিছু উপখণ্ড নির্দিষ্ট করা হয় এবং উত্তর প্রদেশেও চারটি এলাকাভিত্তিক প্রকল্প আরম্ভ করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে নাগাল্যান্ডেও নতুন করে আদিবাসী উন্নয়ন খণ্ডের সূত্রপাত করা হয়। এই খণ্ডগুলির সামগ্রিক উন্নয়নে অর্থনৈতিক উন্নতিসাধনকে কর্মসূচির মূল বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর প্রাথমিক বিষয়ের মধ্যে ছিল আদিবাসীদের 'উন্নত চাষের প্রকরণের' সাথে অভ্যস্ত করে তোলা, পশুপালনের জন্যে ঋণ, ক্ষুদ্র ও জলাশয় ভিত্তিক সেচ প্রকল্প এবং হস্তশিল্পের জন্যে ক্ষুদ্র ঋণ। ১৬ বছর অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও এই কর্মসূচিগুলি আদিবাসী জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য ছাপ ফেলতে সমর্থ হয় নি। অনুসূচিত জাতি ও উপজাতি আয়ুক্ত ১৯৭৩ সালে খণ্ড স্তরের প্রকল্পগুলি সম্পর্কে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলির উল্লেখ করেছেন :

  • আদিবাসী খণ্ড উন্নয়ন প্রকল্পে বিশাল সংখ্যক সাধারণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ছিল না কোনো সুনির্দিষ্ট বিশেষ কর্মসূচি। 
  • উন্নয়ন কর্মসূচির কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতার দিক বিবেচিত হয় নি। 
  • প্রাক-সম্প্রসারণ স্তরে ভূমি সংক্রান্ত বিবাদ নিষ্পত্তির উদ্যোগ হয় নি। 
  • ৬০-৭০ শতাংশ প্রকল্প ছিল নির্মাণ কেন্দ্রিক। 
  • বহুক্ষেত্রে জনগনকে অন্ধকারে রেখেই সমবায় সমিতি গঠিত হয়েছে। 

আয়ুক্তের অভিজ্ঞতা বলছে, আদিবাসী উন্নয়নের মূল সমস্যা হচ্ছে খণ্ডের আওতাধীন এলাকায় প্রকল্পের সিংহভাগ সুযোগ সুবিধা আদিবাসী সমাজের তুলনামূলক অগ্রণী অংশের আত্মসাৎ করে নেওয়া। খণ্ড এলাকার কর্তাদের মধ্যে একটা প্রবণতা রয়েছে, তুলনামূলকভাবে সহজগম্য অঞ্চলে প্রকল্পের কাজ শুরু করা এবং সচরাচর এলাকায় বসবাসরত মানুষের প্রকৃত সমস্যা অনুধাবনের ভিত্তিতে প্রকল্প শুরু করা হয় না। আটটি রাজ্যের বিভিন্ন খণ্ডে সংগঠিত সমীক্ষার ফলাফল আয়ুক্তের এই উপসংহারকে আরো প্রামাণ্য করেছে। কঠোর বাস্তবতার চিত্র আরো বেশি করে উন্মোচিত হয়েছে যখন খণ্ড এলাকায় পরিদর্শকেরা দেখেন যে অন্ধ্রপ্রদেশের মত রাজ্যের বিশেষ খণ্ড এলাকার আদিবাসীরা তখনও বেসরকারি ঋণদাতার কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। আরেক আবিষ্কারে দেখা যায় গুজরাটের আদিবাসী উন্নয়ন খণ্ডের জনগন বিপরীত আইন থাকা সত্ত্বেও আদিবাসী জমি অ-আদিবাসীদের হস্তান্তরিত করেছে। একইভাবে মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশে এই প্রকল্প কৃষি, উচ্ছেদ, মৃত্তিকা সংরক্ষণ, ঋণজাল ও ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতিই ঘটাতে পারে নি। অন্য ভাবে বললে, অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা ও উৎপাদনে নবজীবন আনার ক্ষেত্রে সুসংহত আদিবাসী উন্নয়ন প্রকল্পগুলি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এই কথাটিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে যে কল্যাণমূলক কর্মসূচি অধিকাংশ আদিবাসী অঞ্চলের সমস্যা নিরসনে সক্ষম। 


নির্ভরশীল সমাজগুলি

পঞ্চম তফসিল ও ষষ্ঠ তফসিলের প্রবক্তাদের বিতর্ককে দেখতে হবে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নিরিখে। ষষ্ঠ তফসিল থেকে পঞ্চম তফসিলের তফাতের জায়গাটি হচ্ছে যে এখানে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত আদিবাসী পরিষদের ব্যবস্থা নেই এবং সেটি রাজ্যের রাজ্যপালের নিয়ন্ত্রণাধীন। এর এই অগণতান্ত্রিক চরিত্র সত্ত্বেও বি, ডি, শর্মা ও ভারত জন আন্দোলনের মত আদিবাসী অধিকারের বিশিষ্ট প্রবক্তারা একে সমর্থন করেছেন। 'ট্রাইবেল অ্যাফেয়ার্স ইন ইন্ডিয়া' নামের তাঁর বইয়ে বলেছেন, ঔপনিবেশিক আমল থেকে পঞ্চম তফসিলের অস্তিত্ব এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে আদিবাসীদের ওপর কার্যত সাম্রাজ্যবাদের ছায়া পড়েই নি। এটাও দেখা যাচ্ছে যে ঔপনিবেশিক শাসকেরা আদিবাসী প্রতিষ্ঠানগুলিকে ন্যায়সঙ্গত প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর জন্যে যথাযথ পরিসর উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। ফলেই এই তফসিলের অন্তর্গত সংরক্ষণের ব্যবস্থাগুলি শুধু প্রয়োজনীয় নয়, আদিবাসীদের স্বশাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পরবর্তীতে তিনি আদিবাসী চেতনার স্ফূরণ ও আজকের সময়ে আদিবাসী স্বশাসনের দাবির ধারণা তৈরিতে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। এর বিপরীতে, ষষ্ঠ তফসিলকে দেখা হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত চাপিয়ে দেওয়া হিসেবে:

সারাদেশের সমস্ত আদিবাসী সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হল তাদের সনাতনী ব্যবস্থা, পরম্পরা, বাসভূমি ঘিরে তীব্র আবেগ এবং পরিশেষে কিন্তু অন্তত নয়, এই ক্ষেত্রগুলিতে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের আতঙ্ক। জেলা পরিষদও ব্যতিক্রম নয়। মানুষের ধারণায় এটাও বহিরাগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। ফলে আমরা যা সর্বত্র প্রত্যক্ষ করি, বিশেষ করে উত্তরপূর্বে এবং সেটাও খুবই তীব্র ভাবে, তা হল জনগন ও রাষ্ট্রের মধ্যে কার্যত এক সংঘর্ষ। 

উত্তরপূর্বে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিকাশকে আদিবাসীদের পরম্পরাগত জীবনধারার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন বি, ডি, শর্মা ও ভারত জন আন্দোলন। এর বিপরীতে, পঞ্চম তফসিলকে দেখা হয়েছে এই সনাতনী ব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা হিসেবে বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে পঞ্চায়েত (তফসিল এলাকায় সম্প্রসারণ) আইনের প্রেক্ষিতে। 

কিন্তু পঞ্চম তফসিলের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যার উপর এই তফসিলের বাস্তবায়ন নির্ভরশীল সেই পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর তফসিলের সমর্থকদের একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মধ্যপ্রদেশের সাতপুরা পাহাড়ের পঞ্চম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত এলাকা বাইগা চাক, যা মধ্যপ্রদেশের অনুসূচিত আদিবাসী বাইগা জনগোষ্ঠীর মানুষের স্থানান্তর চাষের জন্যে নির্দিষ্ট এলাকা। চাকের মত অঞ্চল নেহেরু ও এলউইনকে চমৎকার সুযোগ দিয়েছিল তাদের চিন্তার রূপায়নের জন্যে যেহেতু অঞ্চলটি পঞ্চম তফসিলের অধীনে সুনির্দিষ্ট আদিবাসী এলাকা হিসেবে পৃথক করা হয়েছিল এবং বাইগাদেরও অষ্টম তফসিলের অধীনে আদিম জনগোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাইগাদের বাজার অর্থনীতি থেকে রক্ষা করা এবং ধীরে ধীরে নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রভাবিত করে বৃহত্তর ভারতীয় সমাজে তাদের প্রবেশ করানো হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রের তরফে বাইগাদের অগ্রগতির জন্যে কল্যাণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে ডঃ ডি, এস, নাগের ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা যায় নব্য স্বাধীন ভারতে বাইগাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। 

পঞ্চম তফসিল গঠন করে বাইগাদের পৃথক করে রাখার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের প্রথম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল বর্ধিত ঋণগ্রস্ততা এবং যা প্রতিফলিত হয়েছে তাদের ও তাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর ব্যর্থতায়। একটি বাইগা পরিবার গড়ে ৭.২ জন সদস্যের এবং তাদের বাস্তুজমির আয়তন সকলের প্রাথমিক খাদ্য সংস্থানের জন্যে ভীষণভাবে অপ্রতুল। এর অন্যতম কারণ বাইগারা চাষবাস শুরু করে দিয়েছিল পাথুরে জমিতে। জমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণ ছিল সেচের অভাব, অপ্রতুল অকর্ষিত জমি এবং ভূমির অবনতি। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বনকেন্দ্রিক অর্থনীতির সাথে সংযোগহীনতা যা এ ধরনের জমিতে চাষবাসের সাফল্যের জন্যে জরুরি। এই সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে জমির মালিকানা নির্দিষ্ট না থাকায়। ১৯৭৬ সালের একটি সমীক্ষায় এটাকেই বাইগাদের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সমস্ত কিছুর মিলিত ফলাফলে বাইগাদের খাদ্য সরবরাহে বিপুলভাবে আঘাত নেমে আসে এবং একে সরাসরি সম্পর্কিত করা যায় বাইগা সমাজের জমি ও জঙ্গলের ঋতুনির্ভর ব্যবহারের ধরনের পরিবর্তনের সাথে। 

এই ঋতুনির্ভর জীবনধারণ ব্যবস্থার ভাঙনের ফলে জন্ম নেওয়া সমস্যা আরো গুরুতর হয়ে পড়ল ১৯৭০ এর দশকে বাইগা চাকের বিস্তৃতি ঘটানোর পর। এই চাক এখন বিস্তৃত হয়েছে অনেক জেলা জুড়ে- শাহদল, বালাঘাট, মান্ডলা, বিলাসপুর, পান্ডারিয়া এবং রাজনন্দগাঁও-এ এবং এখানে রয়েছে ১,২১৯টি পরিবার ৩১২টি গ্রামে। ১৯৭৮ সালে এই পরিবারগুলিকে বাইগা উন্নয়ন এজেন্সির প্রশাসনিক আওতায় আনা হয় যার প্রধান লক্ষ্য ছিল আদিবাসীদের উপার্জনের উপায় সৃষ্টি করা ও চাক এলাকার অনুসূচিত জাতি ও আদিবাসীদের সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করা। এই এজেন্সিকে জেলা কালেক্টরের কর্মকাণ্ডের অধীনে আনা হয়। এজেন্সির দায়িত্ব ছিল আদিবাসীদের হস্তশিল্পকে উৎসাহিত করা, সমস্যাবলী বোঝা এবং জনস্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট ও শিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা। যদিও ১৯৮০-র শেষ অবধি এই নীতি প্রায় কোনো সাফল্যেরই মুখ দেখতে পায় নি। বাইগারা জীবনধারণের জন্যে বাধ্য হল মজুরি শ্রম এবং দড়ি বা টুকরি তৈরির মত ন্যূনপক্ষের স্বনিযুক্তির ওপর নির্ভর করতে, যার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। এর ফলেই বাইগারা বন দপ্তরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, যারা ছিল মজুরি শ্রমের বৃহত্তম ব্যবস্থাপক এবং যাদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র সমস্ত কল্যাণমুখী প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেছে বাইগা চাকে। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই প্রতিটি প্রকল্প আদিবাসী অর্থনীতির স্থবিরতার সমস্যার সমাধান না করেই আদিবাসী সমাজের কাছে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা করেছে। পরিবর্তে, এই কর্মসূচি চেয়েছে নাগরিকদের এমনভাবে রূপান্তরিত করতে যাতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির কার্যকরী সেবায় তারা লাগতে পারে। অন্যভাবে, বাজার অর্থনীতির চাপ বইতে অক্ষম এমন পেশার প্রতি উৎসাহ প্রদানের ফলে আদিবাসীরা প্রান্তিকায়নের মুখোমুখি হল। এই প্রকল্পগুলি পরিচালিত হত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা উভয়ের দ্বারাই এবং এগুলির উদ্দেশ্য ছিল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবা, কর্মসংস্থান এবং হাতেকলমে প্রশিক্ষণ প্রদান। 

এক অর্থে, আদিবাসী সমাজের বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারীদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে গত্যন্তর ছিল না যেহেতু রাষ্ট্র ওই সমস্ত অঞ্চলে প্রাথমিক চাহিদার জোগান দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ ছাড়া, পরিষেবার ধরন নির্ভর করেছে কীভাবে বিভিন্ন সক্রিয় পক্ষ বা সংস্থা আদিবাসী সমাজকে উপলব্ধি করেছে বা এ বিষয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পক্ষ স্থির করেছে তার ওপর। এর একটি বিপ্রতীপ প্রভাব পড়েছে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও পরিচিতি সত্তায় কারণ যারা পরিষেবা প্রদানকারী ছিল তারা নিজেদের মূল্যবোধ ও মতাদর্শকেও সঙ্গে করে এনেছিল। যদিও খ্রিস্টান পাদ্রীরাই প্রথম আদিবাসী এলাকায় কর্মতৎপরতা শুরু করেছিল, কিন্তু ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর দশকে এসে হিন্দু মহাসভা ও আর্য ধর্ম সেবক সঙ্ঘের মত হিন্দু সংগঠনকেও ক্রমে সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা গেল। এরা ছাড়াও কিছু কংগ্রেস কর্মী ও ভেরিয়ার এলউইনের মত উদারপন্থী নৃতাত্ত্বিকও ছিলেন যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়পর্বের নেহরুবাদী আদিবাসী নীতিকে অনেকটাই প্রভাবিত করেছেন। এই সমস্ত সক্রিয় পক্ষের কর্মকাণ্ডের সুবাদে আদিবাসীদের সামাজিক সাংস্কৃতিক চেতনা এমন একটা চেহারায় সংহত হল যেখানে আদিবাসী সমাজের মৌলিক সমস্যা, পৃথক ত্বকের, অনগ্রসরতা এবং আদিবাসী অর্থনীতির স্থবিরতার প্রতিফলন হল না। এই বাস্তবতাই ১৯৪০ এর দশকে খ্রিস্টান পাদ্রী ও তাদের বিরুদ্ধ পক্ষের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত্তি ও প্রেক্ষাপট তৈরি করল। ১৯৫০ এর শেষার্ধে পঞ্চম তফসিল এলাকায় খ্রিস্টান পাদ্রীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হল নিয়োগী কমিশনের প্রতিবেদনের পর যা এখন হিন্দুত্ববাদীরা একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। ধর্মান্তর ও পুনঃধর্মান্তরের সাম্প্রতিক বিতর্ককেও এই সন্দর্ভেই দেখতে হবে। কীভাবে পঞ্চম তফসিল অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের অনুপ্রবেশ ঘটল তার বিবরণী দেওয়াটি মূল বিষয় নয়, প্রকৃত বাস্তব হচ্ছে পঞ্চম তফসিলের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আদিবাসী সমাজের সামাজিক বা অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অথবা সাংস্কৃতিক জীবনে সহায়ক ভূমিকা নিল না। পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠানই একমাত্র সক্ষম হবে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের বিপদকে দূরে সরিয়ে রাখতে এমন ধরনের বিশ্বাস পঞ্চম তফসিল এলাকার অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত হয় না। 


গণতন্ত্রের বিকাশ

এর বিপরীতে, সমস্ত আদিবাসী এলাকায় ষষ্ঠ তফসিলের প্রয়োগ ও আদিবাসী পরিষদগুলিকে অধিকতর স্বশাসন প্রদানের দাবিতে বামপন্থীদের প্রচারাভিযান একটি দৃঢ় যুক্তি ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ষষ্ঠ তফসিলের প্রয়োগ ও স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠন ১৯৩৭ সালে অল আসাম প্লেইন ট্রাইবেল লিগ নামের বৃহত্তর মঞ্চের ফলশ্রুতি। এই লিগ আদিবাসীদের আর্থসামাজিক স্বার্থের রক্ষা ও 'লাইন প্রথা' বহাল রাখার লক্ষ্য গ্রহণ করেছিল যা ব্যতিরেকে বহিরাগতদের ঢল নেমে আদিবাসীদের পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠানগুলি ও সংস্কৃতি বিনষ্ট হয়ে যেতো। কিন্তু এই কাউন্সিলগুলি একইসঙ্গে সিয়েম, নকমাস, দলৈ এবং গ্রামীণ পরিষদগুলির মত পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠানেরও আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। স্ট্যানলি নিকোলস রায় যথার্থই বলেছেন, ষষ্ঠ তফসিলের প্রচলন ছাড়া উত্তরপূর্বের গোষ্ঠী প্রধান প্রথা বা গ্রামীণ সভাগুলির কোনো অস্তিত্বই টিঁকে থাকত না। মিজোরাম ও মেঘালয়ের অভিজ্ঞতাই দেখিয়ে দেয় ষষ্ঠ তফসিলের সমস্যাহীন প্রকৃত বাস্তবায়ন। অর্থনৈতিক ক্ষমতার অভাব এবং রাজ্য সরকার ও এই পরিষদের মধ্যকার সংঘাতই এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে অকার্যকর করেছে। স্থবিরতার এ ধরনের দৃষ্টান্তের জন্যই তারা ব্যাপক অংশের জনগনকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারে নি এবং অনেক সময়ই তাদেরকে অঞ্চলের পরম্পরাগত অভিজাতদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে।  সীমিত সাফল্য সত্ত্বেও এর সমর্থকরা মনে করেন এই তফসিলই আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সংহতির কার্যকরী সাংবিধানিক ব্যবস্থা হয়ে উঠতে সক্ষম যদি তা প্রকৃত গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয়। 

ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকার গণতান্ত্রিক আদিবাসী সমাজ গঠনের উদ্দেশ্য এই তফসিলকে সঙ্গী করেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। ত্রিপুরা ছিল একটি রাজন্য শাসিত রাজ্য যেখানে ১৯৪৭ সালের পর বিপুল সংখ্যায় উদ্বাস্তুদের আগমন ঘটেছে। দেশভাগের আগে ১৯টি জনগোষ্ঠীতে (রিয়াং, চাকমা ও জুমিয়ারা যার মুখ্য অংশ) বিভক্ত সেখানকার আদিবাসী জনগন ছিল মোট জনসংখ্যার ৫০.৯ শতাংশ। ১৯৫১ নাগাদ এই হার কমে দাঁড়ায় ৩৬.৮৫ শতাংশে যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে বাঙালি ও অ-ত্রিপুরী আদিবাসীদের প্রাধান্য কায়েম করে  সেখানকার আদিবাসীদের উল্লেখযোগ্য ভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করে। এভাবেই, ১৯৭২ সালে ত্রিপুরা যখন ভারতীয় ইউনিয়নের স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা পেল তখন সেখানকার আদিবাসীদের জনসংখ্যার হার দাঁড়াল ২৮.৯৫ শতাংশ যা তাদের সংখ্যাল্পতা আক্রান্ত এক বিপন্ন জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করে। তাদের সমস্যার জন্ম হল মূলত অ-আদিবাসীদের জনপ্লাবন ও স্বত্বাধিকারের স্বীকৃতিহীন তাদের জুম চাষের জমি থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠার ফলে ঘটা উচ্ছেদের ফলে। ফলশ্রুতিতে ঋণগ্রস্ততা বৃদ্ধি পেল এবং অর্থনৈতিক অবস্থা দাঁড়াল দুঃসহ। 

সারণি ৭ : উত্তরপূর্ব পরিষদ, ক্ষেত্রভিত্তিক বিনিয়োগ (কোটি টাকা)

ক্ষেত্র

৫ম-৮ম পরিকল্পনা

৯ম পরিকল্পনা

মোট

শতাংশ

পরিবহণ ও যোগাযোগ

১৪৭২.১৫

১০২৭.৭৫

২৪৯৯.৯০

৪৫.৪৫

শক্তি

১২৫২.২৪

১০১২.৩৫

২২৬৪.৭৭

৪১.১৮

কৃষি ও সহযোগী ক্ষেত্র

৮৯.৯১

৩৪.৩০

১২৪.২১

২.২৬

সমাজ ও গোষ্ঠী পরিষেবা

১৮৯.২৯

২৬২.১২

৪৫১.৩৮

৮.২১

অন্যান্য

৪৬.২১

১১৩.৩০

১৫৯.৫১

২.৯০

মোট

৩০৪৯.৭৭

২৪৫০.০০

৫৪৯৯.৭৭

১০০.০০

সূত্র : ৯ম পরিকল্পনার দলিল, ১৯৯৭-২০০০

এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৪৮ সালে অবিভক্ত সিপিআই তাদের প্রথম আদিবাসী অঙ্গসংগঠন গণমুক্তি পরিষদ গঠন করে। আদিবাসীদের হাতে সস্তায় খাদ্যদ্রব্য ও স্বল্প সুদে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এই সংগঠন মহাজন ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলে। ১৯৫৩-৫৪ সালে ভাগচাষীদের হাতে জমির অধিকার তুলে দেওয়ার দাবিতে গড়ে ওঠা আদিবাসী কৃষকদের লড়াইয়ের সময় কংগ্রেস সরকার জমিদারদের পক্ষে অবস্থান নেয়। দীর্ঘদিন ধরে জুমিয়াদের দখলে থাকা জমিতে তারা বাঙালি উদ্বাস্তুদের বসতি প্রদান করতে থাকে। ১৯৫৫ সালে ত্রিপুরার কংগ্রেস সরকারকে স্মারকপত্র প্রদান করে গণমুক্তি পরিষদ দাবি তোলে, যে সরকারি খাসজমিতে জুমিয়ারা দীর্ঘকাল ধরে চাষবাস করেছে, সেই জমিকে আদিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্যে সংরক্ষিত করতে হবে। তবে শুধু সংরক্ষণের দ্বারা অস্তিত্ব রক্ষাই নয়, এই লড়াই ছিল নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নের নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার আদিবাসীদের অধিকারের লড়াই। এভাবেই পরিষদ আদিবাসী জনগনের স্বার্থরক্ষা এবং আদিবাসী এলাকায় ষষ্ঠ তফসিলের প্রবর্তনের দাবি উত্থাপন করে এই বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। ১৯৮৩ সালে আদিবাসীদের কনভেনশন উদ্বোধন করতে গিয়ে বামফ্রন্টের এই প্রেক্ষিতটি তুলে ধরেন নৃপেন চক্রবর্তী:

সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের প্রবর্তনের দাবিতে এই রাজ্যের সর্বস্তরের জনগন  যে লড়াই গড়ে তুলেছিল আসুন আমরা সকলে তাকে আরো জোরদার করে তুলি। স্বশাসিত জেলা পরিষদ আদিবাসীদের কল্যাণে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করেছে তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে আসুন আমরা সকলে সহযোগিতার হাত বাড়াই। আসুন আদিবাসী ও আদিবাসী অংশের সমস্ত মানুষকে সমমর্যাদা, সম-অধিকার ও সম-উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করে ত্রিপুরাকে গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীতে পরিণত করি। 

বামপন্থীরা মূলগতভাবে স্বশাসিত জেলা পরিষদকে (এডিসি) দেখেছিল প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার হিসেবে যা আদিবাসী ও অ-আদিবাসীদের মধ্যে বৈষম্যের হ্রাস ঘটাবে। এই ব্যবস্থা একইসঙ্গে আকাঙ্ক্ষা পূরণে অধিকার আদিবাসী সমাজের মধ্যে চেতনার বিকাশ ঘটাবে এবং আদিবাসী ও অ-আদিবাসীদের ঐক্য গড়ে তুলবে। সুদূরপ্রসারী যাত্রায় এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আদিবাসী জনগনের মধ্য থেকে নেতৃত্বের জন্ম দেবে যারা আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে আদিবাসী জনগনকে সংগঠিত করবে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর সংবিধানের সপ্তম তফসিলের অধীনে ১৯৮২ সালে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৮৫ সালে একে ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যার ফলে ৬৮ শতাংশ ভূমি ও ৩০ শতাংশ জনগন এর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়। ফলে বামফ্রন্টের সামনে প্রত্যাহ্বান ছিল একে উন্নয়নের বাহন হিসেবে গড়ে তোলার। সপ্তম ও অষ্টম পরিকল্পনায় ত্রিপুরা ও উত্তরপূর্ব পরিষদের ব্যয়ের ধরনের মধ্যেকার তফাৎ থেকে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। (সারণি-৭ ও ৮) 

সারণি ৮: ত্রিপুরায় এডিসি-র ক্ষেত্রভিত্তিক বিনিয়োগ

ক্ষেত্র/বৎসর

১৯৮৪-৮৭

৮ম পরিকল্পনা

কৃষি ও আনুষঙ্গিক

৩১.৮

২১.৬

পরিকাঠামো

১৪.০

৩৪.০

শিল্প

৩.০

৪.৯

সামাজিক ও গোষ্ঠী পরিষেবা

৫১.০

৪০.০


এই সারণি থেকে এটা স্পষ্ট যে উত্তরপূর্ব পরিষদ গুরুত্ব আরোপ করেছে পরিকাঠামোর উন্নয়নে। এতদসত্ত্বেও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে উত্তরপূর্ব দুর্বলই রয়ে গেছে যা নিয়ে এস, পি, শুক্লা কমিটি ১৯৯৮ সালেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এর বিপরীতে, ত্রিপুরা সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে স্বশাসিত জেলা পরিষদের মাধ্যমে আদিবাসী অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার শক্তিবৃদ্ধিতে যা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এভাবেই বামপন্থীরা স্বশাসিত জেলা পরিষদকে আদিবাসী উন্নয়নের বাহন হিসেবে দেখেছে, তবে একেই অন্তিম লক্ষ্য মনে করে নি। 

সম্ভবত এই কারণেই বামফ্রন্ট চায় বস্তারের মত পঞ্চম তফসিলের অধীনে থাকা এলাকাগুলিতেও ষষ্ঠ তফসিলের প্রবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ের সিপিআইএম-এর উদ্যোগে হওয়া সারা ভারত আদিবাসী কনভেনশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে যে সমস্ত অঞ্চলে ষষ্ঠ তফসিলের প্রবর্তনের দাবি উত্থাপন করা উচিত সেগুলি চিহ্নিত করা এবং স্বশাসিত আদিবাসী পরিষদ গঠনের পথে অগ্রসর হওয়া। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যাতে এই পরিষদগুলিকে আরো বিধিগত ক্ষমতা লাভ করে এরা আরো কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই পঞ্চম তফসিল তুলে দেওয়া হবে এমন গুজবের মধ্যে এর অবস্থান নিয়ে উঠে আসা সাম্প্রতিক বিতর্ককে নতুন করে দেখতে হবে। এদিকে ভারত জন আন্দোলন আরো নানা আন্দোলনকর্মীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সওয়াল তুলছে যে ষষ্ঠ তফসিলের তুলনায় পঞ্চম তফসিলের মাধ্যমেই উন্নততর ভাবে পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠানগুলির অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে এই সিদ্ধান্ত এমন অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে রাষ্ট্রের চেয়ে পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠানগুলি বেশি গণতান্ত্রিক ও সমত্ববাদী। স্বাধীনতা পরবর্তী দশকগুলিতে পঞ্চম তফসিলের কর্মকাণ্ড এটাই বলে যে এই অনুমান সত্য নয় এবং এই এলাকাগুলিই বরং আদিবাসী পঞ্চায়েতের চেয়ে অনেক বেশি স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কবলে পড়েছে। যাইহোক, বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন পঞ্চম তফসিলের বিরোধিতা করে নি, তারা শুধু এটা মনে করে যে ষষ্ঠ তফসিল আদিবাসী স্বার্থরক্ষার উন্নততর ব্যবস্থা। এই তফসিলের প্রয়োজনীয়তা নিহিত রয়েছে আদিবাসী রাজনীতির গণতন্ত্রীকরণ ও একইসঙ্গে আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির বাঁচিয়ে রাখায়। বামপন্থীরা এটাও মনে করে যে এই তফসিলের কার্যকরী বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব যদি এই কাঠামোর পশ্চাৎপটে স্বশাসিত পরিষদের মূল চরিত্র ব্যাখ্যাকারী শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সমর্থন থাকে। একমাত্র তখনই পরিষদগুলি সংকীর্ণ জাতিসত্তার উত্থান প্রতিহত করার যথার্থ ব্যবস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে পারবে। 

যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গিতেও আদিবাসী ও অন্যান্য অর্থনীতির মধ্যেকার আন্তঃবিনিময়ের কাঠামোগুলির মধ্যে থাকা বৈষম্য ধর্তব্যের মধ্যে নেই। এটা তখনই সম্ভব যখন পঞ্চম বা ষষ্ঠ তফসিলের মধ্যে থাকা পরিষদগুলি আদিবাসী অর্থনীতির উৎপাদনশীলতায় আবার প্রাণসঞ্চার করতে পারে। ষষ্ঠ তফসিলের পরিষদ এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের যোগ্য কারণ এখানে আদিবাসী প্রতিনিধিদের এলাকার মানুষের প্রতি অনেক বেশি দায় ও জবাবদিহিতা রয়েছে। এটা পঞ্চম তফসিলে সম্ভব নয়। আবার এটা একমাত্র সম্ভব যদি পরিষদগুলিকে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে অধিকতর স্বশাসন দেওয়া হয়। ত্রিপুরা দেখিয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে পরিষদগুলিকে আরো কার্যকরভাবে ক্ষমতাশালী করা যায়। এরই সঙ্গে আমাদের এটাও দেখতে হবে যে বিভিন্ন প্রকল্প ও বিধিগুলি যেন আদিবাসীদের বেঁচে থাকাকে কল্যাণমুখী প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল না করে অঞ্চলের অর্থনৈতিক গণতন্ত্র সুনিশ্চিত করে। এটা পরিষ্কার যে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র সম্পর্কিত নেহরুবাদী ভাবনা এক্ষেত্রে কাজ করতে অক্ষম। সম্ভবত একমাত্র আত্মানুসন্ধানী ও আত্মসমালোচনাক্ষম বামপন্থী চিন্তা যা ইতিবাচক আদিবাসী পরম্পরার সাথে সমত্ববাদী ও সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলনে গড়ে ওঠে, তারাই এই লক্ষ্য সাধন করতে পারবে। তবে, এখনও অবধি বামপন্থী বা অভিজ্ঞতালব্ধ নব্য পরম্পরাবাদীরা কেউই আদিবাসী বিকাশের কার্যকরী চিন্তাধারার সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি হাজির করতে পারে নি। 


৭ম পর্ব

উত্তরকথন :

একটি ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়া

সমকালীন ভারত সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে এবং মুখোমুখি হচ্ছে প্রধানত তিনটি প্রত্যাহ্বানের যা শ্রমজীবী জনগনের প্রতিদিনের জীবনে আঘাত হানতে। প্রথম প্রত্যাহ্বানটি নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের যা গতি পেয়েছে ১৯৯০ এর দশকে এবং বামপন্থী জ্ঞানচর্চার মহল থেকে এর তীব্র সমালোচনা উপস্থিত করা হয়েছে। প্রগতিশীল আন্দোলনের সমস্ত শক্তিই মনে করে এই পটপরিবর্তনের ফলে জনসাধারণের মধ্যে বৈষম্য, ক্ষুধা ও ব্যাধির প্রকোপ বেড়েছে। দ্বিতীয় প্রত্যাহ্বানটি হচ্ছে হিন্দুত্ব যা বামপন্থী ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধিতা করেছে। যদিও ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের বেশিরভাগ কর্মীই সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে সুন্দরলাল বহুগুণার মত মানুষও আছে যারা মৌলবাদী শক্তির সাথেও মৈত্রীবদ্ধ হয়েছে শুধুমাত্র ওদের ক্ষমতাশালী অবস্থানের সুযোগ নেওয়ার জন্যে। কিন্তু তেহরি বাঁধের ঘটনাবলী দেখিয়ে দিয়েছে এই অবস্থান কতটা অদূরদর্শী ও সুবিধাবাদী। তৃতীয় প্রত্যাহ্বান দ্রুত ক্ষীয়মাণ জল, জঙ্গল ও জমির যোগানকে সঙ্গী করে আসা বর্ধমান পরিবেশ সংকট। বামপন্থীদের অভ্যন্তরে থাকা কিছু শক্তি এই সমস্যার নানাদিক নিয়ে বিচার বিবেচনা করলেও, সামগ্রিকভাবে বৃহত্তর আন্দোলন এখনও এই সংকটের সমগ্র চেহারটি অনুভব করে উঠতে পারে নি। এর অর্থ হল, তারা বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণে পরিবেশগত বিষয়ের ভূমিকা অনুধাবন করে উঠতে পারেন নি। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্ব পরিবেশ রাজনীতি বা রিও ঘোষণাপত্রের বিষয় নয়। বরং ভারতীয় জনগনের প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি। এই প্রশ্নতে এসেই ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী জীবনধারণ ব্যবস্থার ধারণার সাথে শাসন পরিচালনার প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নটিকে যুক্ত করেছে। এটা করার মধ্য দিয়ে তারা পরিবেশগত দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রশ্নটিকে ভারতে উন্নয়ন সম্পর্কিত রাজনীতির মুখ্য বিষয়ে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। 

অধিকার ও জীবনধারণের প্রশ্ন বাম রাজনীতির ক্ষেত্রে নতুন বিষয় নয় যেহেতু বামপন্থীরা ১৯৪০ এর দশক থেকেই অরণ্য ও জমির অধিকার নিয়ে অসংখ্য লড়াইয়ে নেতৃত্ব প্রদান করে এসেছে। তবু এর অধিকাংশকেই 'পরিবেশ' আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করা হয় না যেহেতু সেগুলি চরিত্রের দিক থেকে আধুনিকতা বিরোধী ছিল না। বামপন্থীদের ও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের তফাৎটা রয়েছে মূলত আধুনিক উন্নয়ন ও আদিবাসী সমাজের সম্পর্কের ধরন নিয়ে। এই বইয়ে ওই বিতর্কের বৃহত্তর পরিসীমা সহ পরিবেশ ও বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলেও, এই বইয়ে এটাও উল্লেখিত হয়েছে যে আদিবাসী উন্নয়নের একটি বাস্তবোচিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার স্বার্থে উভয়পক্ষকেই পরম্পরা ও আধুনিকতা নিয়ে তাদের ঘোষিত অবস্থানের পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তেমন দৃষ্টিভঙ্গিকে উপরে উল্লিখিত সবক'টি প্রত্যাহ্বানেরই বিবেচনা করতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টি থেকে আদিবাসীদের ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যান যাতে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং বিশ্বায়নের বিভিন্ন পর্বের অভিঘাতের বাস্তবোচিত অনুধাবন সম্ভব হয়। আদিবাসী ইতিহাস নিয়ে অংশীদারিত্বের চিন্তাধারা আমাদেরকে সমত্ববাদী সমাজ যে সমাজে আদিবাসীরা দেশের শ্রমজীবী জনতার অন্যান্য অংশের পাশে প্রাপ্য সম্মান পাবে সেই সম্পর্কে বৃহত্তর চিন্তাধারার দিকে চালিত করবে। 

আদিবাসী ও অ-আদিবাসী সমাজের অভিন্ন ইতিহাস রচিত হতে হবে শ্রমজীবী মানুষের সমস্ত অংশের যৌথ মোর্চা গঠন করে আসন্ন প্রত্যাহ্বানের বিরুদ্ধে ব্যাপকতম আঘাত হানার লক্ষ্যকে সামনে রেখে। আদিবাসীদের বিশেষ স্বার্থকে সুনির্দিষ্ট ভাবে চিহ্নিত করতে হবে যেহেতু তারাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রান্তিক অংশ এবং এদের সংযুক্তিকে এমনভাবে স্থিরীকৃত করতে হবে যাতে তারা জমি, জঙ্গল এবং জলের উৎসের উপর তাদের ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হবে। অবশ্যই প্রত্যাহ্বান থাকবে কীভাবে নদী ও অরণ্যে আদিবাসীদের প্রবেশাধিকারকে সমঅধিকার সম্পন্ন অন্য অংশের মানুষের অধিকারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করা হবে। এটা এজন্যই হবে কারণ আমাদের সাধারণ সম্পদের বেশিরভাগই হচ্ছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও পরিবেশ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা যৌথ সম্পদ যা স্থানীয় বা গ্রামীণ সীমানার দ্বারা বাঁধা নয়। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সেজন্যেই যৌথভাবে প্রকাশিত হতে হবে যাতে এই সম্পদগুলির দীর্ঘস্থায়িত্ব সুনিশ্চিত হয়। 

প্রগতিশীল আন্দোলনের সামনে দ্বিতীয় প্রধান কর্তব্য থাকবে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় জাতিরাষ্ট্রের ভূমিকা ও ধরন সংজ্ঞায়িত করতে হবে। এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই রাষ্ট্র একটি বৃহত্তর ভূমিকা পালন করবে, কিন্তু সেই ভূমিকা হবে ভিন্নতর যাতে একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভর এবং গণতান্ত্রিক আদিবাসী সমাজ নির্মাণের লক্ষ্য পূরণ হয়। যদিও বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্র একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভোগ করে, কিন্তু বিভিন্ন আদিবাসী এলাকায় ব্যক্তি পুঁজি এবং দাতা সংস্থার বিপুল অর্থ আগমের ফলে রাষ্ট্রের ভূমিকা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এটা বিশেষভাবে সত্য জল ও জঙ্গলের বেসরকারিকরণের পরিপ্রেক্ষিতে যে লক্ষ্যের দিকে বহু রাজ্য সরকার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলন উভয়েই একমত যে এই পদক্ষেপ জনগনের স্বার্থবাহী হতে পারে না যেহেতু এর ফলে সৃষ্টি হবে বেকারত্ব, ক্ষুধা ও অসাম্য। দীর্ঘমেয়াদী প্রত্যাহ্বান এর ফলেই থেকে যায় এই প্রবণতাকে বদলে দেওয়াতে। এটা তখনই করা সম্ভব যদি রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয়, একইসঙ্গে পুনঃউদ্ভাবিত হয় রাষ্ট্র ও বেসরকারি ক্ষেত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্র ও জনগনের সহযোগিতামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে। এর জন্যে নতুন নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত বিকল্পগুলিকে যাচাই করা হবে বিভিন্ন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানভাণ্ডারের বিবেচনার মাধ্যমে। রাষ্ট্র ও জনগনের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ককে বর্ণিত ও দৃশ্যমান করার প্রত্যাহ্বানটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদি নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে যথার্থ প্রত্যাহ্বান জানাতে হয়। 

পরিশেষে, অসম বিনিময়ের সমস্যার মোকাবিলা করে আদিবাসী অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো যাবে একমাত্র আদিবাসীদের কর্মকুশলতা ও জ্ঞানের উন্নীতকরণের কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে। এটা অর্জিত হতে পারে তখনই যখন আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিকায়িত অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটে এমনভাবে যার মাধ্যমে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী জনগনের মধ্যে সহযোগিতা শক্তিশালী হয়। এই সহযোগিতাকে সুনিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় স্তরে মূল্য সংযোজন এবং স্থানীয় সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্রদের মধ্যে দরিদ্রতমদের স্বার্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ঘটে। নতুন ধরনের অ-পুঁজিবাদী সংগঠন গড়ে তোলার জন্যে দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে এক ধরনের স্বচ্ছতার প্রয়োজন যাতে বিভিন্ন শক্তির কোয়ালিশনের তরফে প্রতিরোধ ও উদ্ভাবনের উপযোগী নতুন গণপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথ সুগম হয়। বাম ও পরিবেশবাদী উভয়পক্ষকেই এর জন্যে উদ্যোগ নিতে হবে যদি ভারতের আদিবাসীদের ভবিষ্যতে তারা প্রাসঙ্গিক থাকতে চায়। 

(সমাপ্ত)

ভাষান্তর : শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার


মূল রচনা :

লেফটওয়ার্ড বুকস, নতুন দিল্লি- ১১০০০১ থেকে এপ্রিল ২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত সাইনপোস্ট পুস্তিকা মালার নবম প্রকাশনা অর্চনা প্রসাদের 'এনভায়রনমেন্টালিজম এন্ড দ্য লেফট' (কনটেম্পোরারি ডিবেটস এন্ড ফিউচার এজেন্ডাস ইন ট্রাইবেল এরিয়াজ)।


প্রকাশের তারিখ: ২৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org