পরিবেশবাদ ও বামপন্থা

অর্চনা প্রসাদ
পরিবেশবাদ ও বামপন্থার মধ্যে কোনও নিঃসম্পর্ক নীরবতা নেই। এক তর্কমুখর সংলাপ রয়েছে দুটি ধারায়। এই সংলাপ মূর্ত হয়েছে কখনো পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির সম্মিলিত বিরোধিতার ঘনিষ্ঠ সংযোগে। কখনো বিকল্প বিশ্বের রূপরেখা বিষয়ক মতভিন্নতার আদর্শগত মুখোমুখি সংঘর্ষে। সংগ্রামের এই দুটি ধারার পারস্পরিক অনুভবের বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছেন অর্চনা প্রসাদ। বলেছেন 'একটি ভিন্নতর বিশ্ব অবশ্যম্ভাবী' এই পতাকার তলায় ক্রমেই বামপন্থার সহপথিক হয়ে ওঠা আরেকটি ধারার কথা। আজ থেকে শুরু, প্রতি সোমবার।

প্রাককথন

১৯৯১ সালের বর্ষার মরশুমে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীদের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করল নর্মদা নদীর তীরের মহারাষ্ট্রের ছোট্ট গ্রাম মানিবেলি, যে গ্রাম তখন সর্দার সরোবর বাঁধ প্রকল্পে ডুবে যাওয়ার প্রতীক্ষা করছে। গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহের পথে এই গ্রামের জলডুবি প্রতিরোধ করতে এসেছিলেন এই কর্মীরা। শ্লোগান দেওয়া হয়েছিল ‘ডুবেঙ্গে পর নেহি হটেঙ্গে’ অর্থাৎ ডুবে মরব তবু সরব না। মানুষকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করতে, এর প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র জলপ্লাবন ঘটিয়ে দেওয়া শুরু করে দেয়। কিন্তু এই কৌশলে সফল হল না রাষ্ট্র এবং বহু মাস ধরে সত্যাগ্রহ চলতে থাকার পর শেষ পর্যন্ত পুলিশী নির্যাতনের মধ্য দিয়ে সমগ্র অঞ্চলকে খালি করে দিতে হল। মানিবেলির সেই সত্যাগ্রহ শুধু নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনকেই পরিচিতি দেয় নি, বৃহত্তর রাজনৈতিক মানচিত্রে ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের জোরালো আবির্ভাবের জানানও দিয়েছিল একই সঙ্গে।

‘পরিবেশ আন্দোলন’ একটি ব্যাপকতর অভিধা যা স্থানীয় স্তরে জন্ম নেওয়া নানাবিধ সংগ্রাম ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন বিতর্কের প্রেক্ষিতে উঠে আসা জীবন জীবিকা ও পরিবেশগত নিরাপত্তার বিষয়গুলিকে উত্থাপন করে। পরিবেশ আন্দোলনের উৎপত্তি ১৯৭৩ সালে উত্তরপ্রদেশের গারওয়ালের চিপকো আন্দোলন থেকে। ১৯৭০-এর প্রথম ভাগ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে জল ও জঙ্গলের অধিকার নিয়ে একাধিক সংগ্রাম গড়ে ওঠে যা পরিবেশ সংক্রান্ত বৃহত্তর আশঙ্কাগুলিকে তুলে ধরেছিল, যেমন বনাঞ্চল এলাকায় আদিবাসীদের অধিকার, বৃহৎ প্রকল্পগুলির ফলে দেখা দেওয়া উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের বিষয় এবং বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের স্থায়ীত্ব এবং সবুজ বিপ্লব সংক্রান্ত বিষয়। এই সংগ্রামগুলি ঔপনিবেশিক কাল থেকে চলে আসা রাষ্ট্র ও তার পরিচালকদের অনুসৃত আধুনিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক বিদ্যমান ধারণাগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। ভারতের পরিবেশ আন্দোলন বিষয়টিকে দেখেছে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক ধারণার থেকে উপনিবেশ-উত্তর শাসকদের ভিন্নপথ গ্রহণের ব্যর্থতার মধ্যে যখন আধুনিক পুঁজিবাদী কর্মসূচি রূপায়নের পথে এগোতে গিয়ে সাধারণ ভাবে জনগন এবং নির্দিষ্ট ভাবে প্রান্তিক মানুষেরা দরিদ্রতর হচ্ছে এর ফলে। এই আন্দোলনের অভিমত, পরিবেশ ধ্বংসের দায় বৃহৎ শিল্পের আত্মপ্রকাশ ও আধুনিক উন্নয়নের কালে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের ধরনের।

বিকল্প হিসেবে, পরিবেশ আন্দোলন সওয়াল করেছে ‘গরিবের পরিবেশবাদ’ এর তত্ত্বের যা উন্নয়নের আধুনিক ধাঁচের সমালোচনার ওপর কেন্দ্রীভূত করে এবং ফলে সনাতনী ‘স্বনির্ভর গ্রাম অর্থনীতি’-র প্রত্যাবর্তন ঘটাতে চায়। পরিবেশবাদের এই ধারা বনাঞ্চলকে জনবসতিশূন্য করার মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণের ভারতের সরকারি পরিবেশবাদের প্রচলিত ধারণা থেকে অনেকটাই স্বতন্ত্র। উপনিবেশ-উত্তর সময়পর্বে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরির মধ্যে এই সরকারি পরিবেশবাদের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলন এই প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করে কারণ এতে বনাঞ্চল লাগোয়া অঞ্চলের বাসিন্দা আদিবাসী সমাজের বনাঞ্চলের অধিকার খর্বিত হয়। ওরা মনে করে, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের দীর্ঘ মেয়াদী উদ্দেশ্য তখনই সাধিত হবে যখন স্থানীয় জনসমাজের জীবনজীবিকাগত প্রয়োজনগুলির পূরণ হবে। ওদের আরো বক্তব্য, স্থানীয় জনসমাজই সম্পদের সংরক্ষণ অনেক সুচারুভাবে সুনিশ্চিত করতে পারে কারণ তাদের অস্তিত্বই নির্ভরশীল হয়ে আছে এই সম্পদের ভারসাম্যমূলক ব্যবহারের উপর। ফলে একটি অঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তার সুনিশ্চিত হতে পারে সনাতনী পদ্ধতিতেই এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের সাথে যেহেতু সনাতনী প্রতিষ্ঠান বা অধিকারের পুনরুজ্জীবনের একটা নিবিড় সম্পর্কও রয়েছে।

এর বিপরীতে, ভারতের বামপন্থীরা সাধারণভাবে এই মতে বিশ্বাস করে যে ভারতকে শিল্প ও কৃষির শক্তিশালী ভিতের উপরই জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং এর জন্যে প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ। কিন্তু তারা আধুনিক উন্নয়নের নীতির প্রতি শর্তহীন সমর্থন জানায় না, বরং মনে করে ভারতীয় সমাজের দরিদ্রতম অংশের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করেই উন্নয়নের নীতি রচিত হতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, উৎপাদনক্ষম প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অর্থনৈতিক বৈভব এমনভাবে বন্টন করতে হবে যাতে সমাজের দুর্বলতম অংশ, বিশেষ করে অনুসূচিত জাতি ও আদিবাসী অংশের জনগন সামন্ততন্ত্রের বন্ধন ছিন্ন করে বেরিয়ে এসে একটি  অ-পুঁজিবাদী সমাজ গঠনে অংশ নিতে পারে। আধুনিক উন্নয়নের ধারণার প্রতি বামপন্থীদের সমর্থনের শেকড় রয়েছে সনাতনী প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতায়, ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের মত তারা মনে করে না যে সনাতন প্রথাগুলি চরিত্রগতদিক থেকেই দীর্ঘস্থায়িত্ব কিংবা সমত্বের ধারণা বহন করে। বরং তারা মনে করে সনাতন সম্পর্কগুলি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সনাতনী ধরন দাঁড়িয়ে আছে আধা-সামন্তবাদী শোষণব্যবস্থার ওপর যাকে নির্ভর করেই ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব এবং প্রান্তিক অঞ্চলের অনুন্নয়ন ঘটেছিল। তারা মনে করে, আধুনিক উন্নয়নের মাধ্যমেই সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে দীর্ঘস্থায়ী একটি নীতিগত অভিমুখ নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে।

বামপন্থীরা মনে করে, স্বাধীনতার পর উন্নয়নের পথ হিসেবে নেহরু-ধাঁচ এ দেশে আধুনিক পুঁজিবাদের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। এই নীতি প্রকারান্তরে আধা-সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কগুলিকে শক্তিশালী করে সম্পদশালী ও সম্পদহীনদের মধ্যেকার বৈষম্যের বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। আধুনিক পুঁজিবাদ একইসঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংসাত্মক ও অনিষ্টকর বাণিজ্যিক ব্যবহারেরও মূলে রয়েছে। ‘পরিবেশ চিন্তা’ বা ‘পরিবেশবিজ্ঞান’ এর ধারার আদলে ‘দীর্ঘস্থায়িত্ব’-র বিচার না করে, বামপন্থীরা একে সংজ্ঞায়িত করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমত্ববাদী অ-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিরিখে। এভাবেই তারা আধুনিক উন্নয়নের একটি বিকল্প সংজ্ঞায়ন করতে ইচ্ছুক যা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কিংবা শিল্পায়ন, এগুলোর কোনোটিকেই বাতিল করবে না। বরং তারা এমন এক আধুনিকতাকে হাজির করতে চায় যা এক সমত্ববাদী সমাজ ব্যবস্থার স্বপক্ষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত অংশের মানুষের সামনে উৎপাদনক্ষম সম্পদের দরজা খুলে দেবে, যাতে তাঁরা এর উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়।

এই বইয়ে আমরা দেখবো বামপন্থীদের নেতৃত্বে হওয়া কিছু সংগ্রাম আন্দোলন কীভাবে আধুনিকতা বিরোধী অবস্থান গ্রহণ না করেও উৎপাদন সম্পর্ক পাল্টানোর দিশায় পরিচালিত হয়েছে। এ জন্যেই পরিবেশ আন্দোলনের তাত্ত্বিকেরা বামপন্থীদের অভিহিত করেন অর্থনীতিবাদী বিবেচনার প্রতি অতি পক্ষপাতসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় পুঁজিতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে। তারা যুক্তি দেয়, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে কার্যত কোনো তফাৎ নেই, দুটোরই পরিণতিতে পরিবেশের ধ্বংস সাধন এবং সনাতনী জ্ঞানভাণ্ডার, আচার এবং অধিকারের অস্বীকৃতি ঘটে। এজন্যেই হয়ত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর এলাকার আদিবাসী সমাজের নিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে বামপন্থীদের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া লড়াই সংগ্রামকে ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সাধারণত ভাবা হয় না।

বামপন্থী ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে বিতর্কের আরেকটি বিষয়, স্থানীয় এলাকার জনসমাজের হাতে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিচালন অর্পণ ও এর ওপর জনগনের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি। ‘গরিবের পরিবেশবাদ’-এর সাথে বামপন্থীদের মতপার্থক্য এ জায়গায় যে তারা সনাতনী কর্তৃত্বের কাঠামোর পুনরুজ্জীবন চায় না এবং লড়াই করে রাষ্ট্রের ইতিবাচক ও অগ্রণী ভূমিকার মাধ্যমে স্থানীয় সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী সদ্ব্যবহারের স্বার্থে। তারা বিশ্বাস করে, এটা তখনই সম্ভব হবে যখন রাষ্ট্র ও সরকারের চরিত্রবদল এমনভাবে হবে যা জনগনের ন্যায়সঙ্গত দাবিদাওয়ার স্বীকৃতি সুনিশ্চিত করবে। এজন্যেই অর্থনৈতিক উদারীকরণের এই বিদ্যমান সময়ে দাঁড়িয়ে তারা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার পরিবেশবাদীদের দাবিকে সমর্থন করে না। মূলত এই কারণেই বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্কটা সবসময়ই একটা টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে যদিও স্থানীয় স্তরে সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়ার সংগ্রামে পরস্পরের দিকে তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে সবসময়ই।

এই বইয়ে ভারতে আদিবাসী সমাজের বিকাশের প্রেক্ষিতে পরিবেশবাদী আন্দোলনের সাথে বামপন্থীদের বিতর্কের ক্ষেত্রগুলিকে চিহ্নিত করার প্রয়াস করা হয়েছে। অন্তত তিনটি কারণে এই বিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বামপন্থী ও পরিবেশবাদী আন্দোলন উভয়েরই আদিবাসী সমাজের অভ্যন্তরে এবং আদিবাসী সমাজের ঘনবসতির অঞ্চলে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুদীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। এই অঞ্চলগুলিতে আদিবাসী সমাজের অধিকারের দাবিতে আরো আন্দোলন রয়েছে যাদের অনেকেই পরিবেশবাদী আন্দোলনের সাথে অভিন্নমত এবং এরা নব্য গান্ধীবাদের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত। দ্বিতীয়ত, আদিবাসী সমাজের বিকাশ সম্পর্কিত বিতর্কগুলি প্রকৃতপক্ষে একইসঙ্গে আধুনিক উন্নয়ন এবং ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র ও প্রান্তিকায়িত মানুষের ওপর তার প্রভাব সম্পর্কিত বিতর্কও। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবেশ আন্দোলনের বক্তব্য ও বিতর্কগুলি এই বিষয়গুলিতেই কেন্দ্রীভূত থাকে। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির ইতিহাসের পুনর্নির্মাণকে ব্যবহার করা হয় এই যুক্তি দিতে যে সনাতনী জীবনযাত্রার পুনরুজ্জীবনই আধুনিক উন্নয়নের দীর্ঘস্থায়ী বিকল্প। এটা বিশেষ করে সত্যি সেই আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে যারা নর্মদা বাঁধ বিরোধী সংগ্রাম এবং এ ধরনের আরো নানা ছোট ছোট লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব পিপলস মুভমেন্টের ছাতার তলায় একত্রিত হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীন পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয় যে, পরিবেশ আন্দোলনের বিশেষজ্ঞ ও তাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণ থেকেও শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষ করে পরিবেশরক্ষা বিষয়ে তাদের সামূহিক বিশ্লেষণ থেকে।

অন্য দিকে, পরিবেশ আন্দোলনের তরফে সনাতনী প্রথা ও আদিবাসীদের আচারগুলির অনুসন্ধান এবং বিশেষ করে আধুনিক উন্নয়ন নিয়ে তাদের সমালোচনা আরো বাস্তবোচিত হবে যদি এতে রাজনৈতিক অর্থনীতির উপাদানগুলি যুক্ত করা হয়। প্রাসঙ্গিকভাবে এটাও উল্লেখ্য, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক আবহাওয়াও এমন একটি সংলাপের জন্যে উপযোগী হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণের নতুন পর্যায়ে, যখন আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সাম্প্রদায়িক শক্তির হানা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষিক্ষেত্রের সংকট ক্রমবর্ধমান, তখন বামপন্থী শক্তি ও ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের মধ্যে ঐক্য রচনা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নর্মদা মামলায় ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের রায় এবং বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদের প্রজ্ঞাপন ঘোষণা দেশের শাসকশ্রেণির নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তোলার একটা সুযোগ এনে দিয়েছে। এমন একটি আবহেই এই বই বামপন্থী রাজনীতি ও পরিবেশ আন্দোলনের চিন্তাভাবনার মধ্যেকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ওপর আলোকপাত করতে চায়। আদিবাসী সমাজের ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে বিচার করার স্বার্থে এই বিতর্ক কোন দিশায় পরিচালিত হওয়া উচিত, এখানে সে সম্পর্কেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।

উপনিবেশবাদও আধুনিকতাকে একাকার করা

সনাতনী ও আধুনিক ব্যবস্থাকে পারস্পরিক বিরুদ্ধতায় উপস্থাপনই হল ‘গরিবের পরিবেশ আন্দোলন’-এর কর্মধারার বৈশিষ্ট্য। এই পারস্পরিক বৈরিতা বিশেষ করে ব্যক্ত হয় তাদের উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক বিশ্লেষণে। এই লেখাগুলির অধিকাংশতে ঔপনিবেশিক পর্বকে একটি ‘পরিবেশগত জলবিভাজনরেখা’ বা এমন একটি সময়পর্ব হিসেবে দেখা হয় যখন সনাতনী পরিবেশগত ভারসাম্য, দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা শিল্পায়ন ও পুঁজিতন্ত্রের শক্তির আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়। এমনটা ঘটেছে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম হওয়ার ফলশ্রুতিতে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র জমি, জঙ্গল ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মালিকানা কায়েম করেছিল এবং এটাই উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি ছিল। একই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারি উপনিবেশ-উত্তর শাসন কালেও অব্যাহত থেকেছে। আদিবাসী সমাজের অধিকারের লড়াইয়ে যুক্ত আন্দোলনকর্মীরা আধুনিক শিল্পে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারকে (কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবহারকে) এই দুই শাসনকালের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে বলা হয়। প্রথমটি হচ্ছে, জীবন ধারণের জন্যে খাদ্য সংগ্রহ ও উৎপাদনের ক্ষেত্র সংকোচন এবং বাণিজ্যিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে যাওয়া যাকে আদিবাসীদের জীবন জীবিকায় অধঃপতন ঘটার মূল কারণ বলা হয়। এমনটা ধারণা করা হয় যে আদিবাসীরা যেন এর আগে টাকাকড়ি বা বাজার অর্থনীতির আওতার বাইরে ছিল। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবহার যার জন্যে স্থানীয় স্তরে আদিবাসী সমাজগুলির মধ্যেকার সংহতি এবং উপনিবেশ-পূর্ব সময়ের পারস্পরিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। এর অর্থ এটাও দাঁড়ায়, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হত যে সনাতনী সাংস্কৃতিক আচারাদি ও সনাতনী জ্ঞানভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে তাকে অকিঞ্চিৎকর করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া যা বৃহৎ শিল্প ও বাজারের স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের উপর অগ্রাধিকার দেয়। সবশেষে, বাজার অর্থনীতির বৃহত্তর ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মর্যাদা নির্ধারণে ব্যবসাবাণিজ্যগত বিচার প্রাধান্য পায়। এভাবেই আধুনিক অর্থনীতির বিশিষ্টতা দাঁড়ায় আদিবাসী স্বার্থের অপসারণ যা উপনিবেশ-পূর্ব সময়পর্বে একটি স্থিতিশীল ও সুসমন্বিত ব্যবস্থার ভিতের উপর দাঁড়িয়েছিল। যদিও বেশ কয়েকজন সমকালীন পণ্ডিত এবং আন্দোলনকর্মীরা উপনিবেশ-পূর্ব স্থিতিশীল অর্থনীতির ধারণার বিরোধিতা করেন এবং সওয়াল করেন এক ধরনের বিনম্র উপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্বপক্ষে। তাদের বিশ্লেষণও শেষ পর্যন্ত আধুনিক শিল্প সমাজ এবং সনাতনী শিল্পবিহীন সমাজকে ঘিরে একই ধরনের পারস্পরিক বৈপরীত্য জন্ম দেয়।

পরিবেশ আন্দোলনের বিশ্লেষণ এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে শিল্পভিত্তিক উৎপাদন মূলগতভাবেই লুন্ঠনকারী এবং তা শিল্পায়নের আওতার বাইরে থাকা উৎপাদন ব্যবস্থার অবসানের ঘটিয়েই প্রসার লাভ করে। ফলে পুঁজিবাদী বা সমাজতন্ত্রী নির্বিশেষে সমস্ত শিল্পসমৃদ্ধ সমাজকেই ভাবা হয় পরিবেশ এবং আদিবাসী সমাজের সাথে এর আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে সমানভাবে বিধ্বংসী। একইভাবে, ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর শাসনকালের মধ্যেও কোনো তফাৎ করা হয় না। দু’টিকেই মনে করা হয় শিল্পায়নের স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারকারী এবং এই স্বার্থের প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে। ফলেই দেখা যায় ‘গরিবের পরিবেশবাদ’ শিল্পায়নকে উপনিবেশীকরণ এবং শিল্পপ্রসারের সাথে একাকার করে দেখে। একই সাথে সাম্রাজ্যবাদকেও আলাদাভাবে কোনো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে না। এই কারণেই এই বিশ্লেষণ এটা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে কিছু কিছু সনাতনী ব্যবস্থার টিঁকে থাকা এবং কিছু কিছু প্রান্তিক অঞ্চলের অনগ্রসরতার মূল কারণ ঔপনিবেশিক শাসনই। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা উপনিবেশের আধুনিক বিকাশের পথে বাধাই সৃষ্টি করে কারণ ঔপনিবেশিক সরকার কাজ করে নিজেদের স্বার্থে, উপনিবেশের স্বার্থে নয়। সেজন্যেই, সামন্তবাদী ও আধা-সামন্তবাদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে টিঁকে থাকতেই দেওয়া হয় বরং, কারণ এতে বিশ্ব পুঁজিবাদ ও তার অসম বিনিময় ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষিত হয়।

আধুনিক রাষ্ট্র ও সাম্যতান্ত্রিক জনসমাজ

ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর শাসনকালের এমন বিশ্লেষণের সম্প্রসারণ হিসেবেই যুক্তি দেওয়া হয় যে প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণে রাষ্ট্রের ভূমিকা খুবই সামান্য বা আদৌ কোনো ভূমিকাই নেই। ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের এটাই অভিমত যে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বরাবর শিল্পপুঁজিরই স্বার্থ রক্ষা করে। তার অর্থ দাঁড়াল, ‘গরিবের পরিবেশবাদ’ আধুনিক রাষ্ট্রকে মনে করে মানুষকে তার প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বিযুক্ত ঘটানোর বৃহদায়তন শিল্পায়নের প্রকরণ হিসেবেই। তারা ভারতে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া কর্তৃত্বকেও দেখাতে চায় একইসঙ্গে পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রী উন্নয়নের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে।তাদের মতে, উন্নয়নের এই ধাঁচ ভারতীয় সমাজে বর্ধিত অসাম্য, সামাজিক অশান্তি এবং অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। তারা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে ব্যবহার করেছে সমাজের অভিজাতদের স্বার্থে যারা সমাজের অবশিষ্ট অংশের জন্যে লুন্ঠনকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। পরিবেশ আন্দোলনের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হয়, আদিবাসী সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে। তারা মনে করে, আদিবাসী সমাজেই ভারতীয় জনগনের সংখ্যাধিক্য মানুষের স্বার্থ রক্ষিত হয়।

একই মানদণ্ড থেকে, আদিবাসী এবং পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা উভয়েই পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রী সমাজকে অগণতান্ত্রিক  বলে আখ্যায়িত করে। তাদের মতে, রাশিয়া ও চীনে সমাজতন্ত্রের অভ্যুদয়ের ফলে সেখানে একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থার পত্তন হয়েছিল যার জন্যে সে দেশের সমাজের ওপর শিল্পায়ন-সর্বস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস করা হয়। পুঁজিবাদের মত, সমাজতন্ত্রের অধীনেও প্রকৃত গণতন্ত্র নেই যেহেতু জনসাধারণ সেখানেও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাছাড়া, গণতন্ত্রের বাগাড়ম্বরও ব্যবহৃত হয়েছে আদিবাসী সমাজের প্রথাগত জ্ঞানভাণ্ডার ও আচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্যেই। এই ভাবেই ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলন ব্যাপক আকারে শিল্পায়ন ও আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির প্রতি অকুন্ঠ সমর্থনের মধ্যেই সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের সাদৃশ্য দেখতে পায়।

অতএব, এই দুই ধরনের শাসন ব্যবস্থাকেই অভিহিত করা হয় জনস্বার্থ বিরোধী এবং প্রাকৃতিক সম্পদের স্বাভাবিক রক্ষক সাংস্কৃতিক বহুত্ব ও বৈচিত্র্যের পরিপন্থী হিসেবে। এর বিপরীতে, আদিবাসী সমাজের গোষ্ঠী সংগঠনকে মনে করা হয় সাম্যতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং তাদের জীবনধারার অস্তিত্বরক্ষার ধারক হিসেবে। এদেরকে আরো ভাবা হয়, বাজার অর্থনীতির পরিধির বাইরে থাকা্ ব্যবস্থা এবং স্বনির্ভর গ্রাম সমাজ হিসেবে যেখানে সমস্ত মানুষ সমান চোখে বিবেচিত হয়। গোষ্ঠী সংগঠনগুলি কতগুলি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহিতাও সৃষ্টি করেছে জীববৈচিত্র্য পরিরক্ষণ ও সংরক্ষণকে সুনিশ্চিত করে। আদিবাসীদের জীবনধারায় কিছু নির্দিষ্ট গাছের ঝাড়কে পবিত্র মান্য করার যে রীতি তাকেও জঙ্গল বাঁচানোর সনাতনী প্রথার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ‘দিস ফিশার্ড ল্যান্ড’ বইয়ে লেখকেরা যুক্তি দিয়েছেন যে কিছু শিকার-নির্ভর খাদ্য সংগ্রহ প্রথা (যাকে ধরা হয় প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ভারসাম্য মূলক রীতি হিসেবে) এখনও মিজোরাম ও মনিপুরের আদিবাসীদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং এর বিশিষ্টতা রয়েছে পবিত্র হিসেবে কিছু তরুবীথি এবং জ্বালানি কাঠকে মান্য করায় যার দরুণ প্রাকৃতিক সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার উৎসাহিত হয়। এ ধরনের যুক্তিধারার জন্যেই ‘গরিবের পরিবেশ আন্দোলন’ সওয়াল করে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের কর্মকাণ্ড থেকে রাষ্ট্রের সরে যাওয়া এবং এই কাজ আদিবাসী সমাজের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে যারা এ কাজ দীর্ঘকাল ধরে করে আসছে।

এই প্রথাগুলি স্মরণাতীত কাল থেকে চলে আসছে এবং এটাই আদিবাসী সমাজের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এমনতর স্বতঃসিদ্ধ অনুমানগুলিই আদিবাসী সমাজের অধিকার আদায়ের বেশিরভাগ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। এই আন্দোলনগুলি দাবি তোলে আদিবাসী সমাজের জীবনধারার পুনরুদ্ধার এবং সনাতনী শাসন ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের যাকে পরিবেশ-বান্ধব ও গণতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ওরা মান্য করে। এদের অন্যতম ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সভা যারা ১৯৩০ সালে পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি বহিরাগতদের বহিষ্কারের দাবি তুলেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে এরকম অসংখ্য আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আদিবাসী সমাজের অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উনবিংশ শতকের মুণ্ডা ও সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৯১০ সালের বস্তার বিদ্রোহ, বাংলার গুন্ডেম রম্পা আন্দোলন, কেন্দ্রীয় প্রদেশের অরণ্য সত্যাগ্রহ প্রভৃতি। মূলধারার জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের সাথে এদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। কংগ্রেসী জাতীয়তাবাদীরা প্রায়শই এই সংগ্রামগুলিকে প্রাচীনপন্থী ও অ-জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অভিহিত করে নিন্দাবাদ জানিয়েছে। কিন্ত ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাবঅলটার্ন চর্চার আত্মপ্রকাশের পরের সময়পর্বে আধুনিক ভারতের ইতিহাসবিদরা অনুধাবন করলেন যে আদিবাসী সমাজ বিশেষের আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাগুলি আদিবাসী ও অ-আদিবাসী সমাজের মধ্যকার বৈষম্যমূলক সম্পর্ককেই চিহ্নিত করে। এই সময়পর্বেই পরিবেশবাদীরা চিপকো ও নর্মদা আন্দোলনকে পরম্পরাগত অধিকার রক্ষার সংগ্রাম অভিহিত করে লেখালেখি শুরু করে। এই লেখাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামচন্দ্র গুহ-র ‘আনকোয়ায়েট উডস’ যেখানে গারওয়াল অঞ্চলের চিপকো-পূর্ব সময়ের আন্দোলনগুলি নিয়ে আলোচনা রয়েছে এবং এক অর্থে পরিবেশ সংক্রান্ত ইতিহাসের আগমন বার্তাও সূচিত করেছে। পরবর্তী সময়ে ডেভিড হার্ডিমান, মাধব গাডগিল এবং অন্যান্য পণ্ডিতেরা এই আন্দোলনগুলিকে ব্যাখ্যা করেছেন আদিবাসী সমাজ ও আধুনিক পৃথিবীর সাংস্কৃতিক সংঘাত হিসেবে যা আমাদের সময়ের পরিচিতি সত্তার রাজনীতির বার্তাবাহক। নানা ধারার এই সংগ্রামগুলির বেশ কিছু মিলেই গড়ে উঠেছে আজকের ভারতের পরিবেশ আন্দোলন।

উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞায়ন

আধুনিক উন্নয়ন নিয়ে তাদের সমালোচনার পরিধি থেকে দাঁড়িয়ে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বামপন্থীদের আখ্যায়িত করে আধুনিকতাবাদী শক্তি হিসেবে যারা, তাদের মতে, সংস্কৃতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে সংবেদনহীন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আদিবাসী সমাজের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহী। বামপন্থীদের মনে করা হয় কৃষি অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধ হিসেবে, যে কৃষি অর্থনীতি উদ্বৃত্ত উৎপাদনের মধ্য দিয়ে ‘সামন্ততন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে’ ফেলবে এবং উৎপাদিত উদ্বৃত্তের দৌলতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভিত্তি রচনা করবে। বামপন্থীদের এই ধারণার সাথে ‘গরিবের পরিবেশ আন্দোলন’-এর স্থানীয় স্তরে দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যমূলক উন্নয়নের ধারণা সাংঘর্ষিক। তবে এই মতপার্থক্য সত্ত্বেও, দু’টি ধারার আন্দোলনই এই বিষয়ে অভিন্ন মত যে, বিদ্যমান উন্নয়নের ধাঁচ কার্যকর নয়, কাম্যও নয়। আদিবাসী সমাজের অধিকার ও জীবন জীবিকা সংক্রান্ত আন্দোলনের দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিবেশ আন্দোলন ও বামপন্থীদের কিছুটা অভিন্ন চিন্তা রয়েছে। দু’টি ধারারই বিশ্বাস, জমি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর অধিকারের প্রশ্নটি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ব্যবস্থার মূল বিষয়। দু’টি ধারাই আধুনিক পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধাঁচের বিরোধী এবং সমত্ববাদী সমাজের দিশায় দায়বদ্ধ। পরিশেষে, পরিবেশ আন্দোলন ও বামপন্থী শক্তি উভয়েই এখনও বিকল্প উন্নয়নের ধাঁচ নির্মানের লড়াইয়ে সচেষ্ট যা একই সাথে চরিত্রের দিক থেকে অ-পুঁজিবাদী এবং স্থানীয় আদিবাসী সমাজ ও তার অর্থনীতির জন্যে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে।

বাম ও পরিবেশ আন্দোলন উভয়কেই একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে যদি এই লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে, বামপন্থীদের স্থানীয় স্তরের জ্ঞান-ঐতিহ্য সম্পর্কে সংবেদনশীল দৃষ্টি থেকে গভীর বিশ্লেষণে নিয়োজিত হওয়া উচিত যাতে স্থানীয় আচার পদ্ধতিগুলির চিহ্নিতকরণ ও উন্নতি ঘটানোর মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসী সমাজের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায়। এই বই সাক্ষ্য দেবে, মূলধারার বামপন্থী আন্দোলনের কিছু কিছু অংশে এই বাস্তবতার স্বীকৃতি ইতিমধ্যেই পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশ আন্দোলনকেও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিরোধী উগ্র অবস্থান পরিহার করতে হবে। এই বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে এই বিষয়গুলিও তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে তারা এই দু’টি বিষয় নিয়ে এগোতে পারে এবং কেন তাদের আরো বাস্তবোচিত অবস্থান নেওয়া উচিত। দু’টি ধারার আন্দোলনের পার্থক্যের জায়গাগুলি বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি, যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলার স্বার্থেও এই বিষয়গুলি আরো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আদিবাসী অঞ্চলে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার বামপন্থীদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং আদিবাসীদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং পরিচিতি সত্তার বিষয়ে তাদের অবস্থান এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে। আদিবাসীদের অধিকারের স্বপক্ষে বামপন্থীদের কর্মকাণ্ডের তিনটি ক্ষেত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি ত্রিপুরায়, যেখানে ১৯৪০ সালে ত্রিপুরার রাজার বিরুদ্ধে ভূমিহীন কৃষকদের লড়াই গড়ে তুলতে গণমুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। এই কৃষকদের অধিকাংশই ছিলেন আদিবাসী। জমি ও বনাঞ্চলের অধিকারের দাবি উত্থাপিত হয়েছিল সেই লড়াইয়ে এবং সংগঠন পরিচালিত সেই জমির লড়াইকে প্রায়শই রাষ্ট্রের হিংস্র আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বামপন্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আরো দু’টি উল্লেখযোগ্য লড়াইয়ের উদাহরণ হল অন্ধ্রের তেলেঙ্গানা ও মহারাষ্ট্রের দাহানুর ওয়ার্লিদের সংগ্রাম। ত্রিপুরার মতই গোড়ার যুগের কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সংগঠিত লড়াইগুলি একইসাথে অধিকারের দাবি ও রাষ্ট্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত ছিল যাতে শ্রেণি সম্পর্ক পরিবর্তনের ভিত তৈরি হয়। অন্যান্য প্রশ্নের প্রাথমিক দাবিগুলি ছিল মূলত আদিবাসীরা যে অঞ্চলে ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত সেখানে জমির ওপর স্বত্বপ্রতিষ্ঠা, ভূমিহীন মজুরের ন্যায়সঙ্গত মজুরি, ফসলের ন্যায্য দাম এবং বাধ্যতামূলক শ্রমদানের অবসান। বামপন্থীরা ঐতিহ্যের গুণকীর্তন করে নি কারণ এই লড়াইগুলি ছিল সামন্ততান্ত্রিক শোষণের তীব্র সমালোচনা। যেমনটা লিখেছেন পি, সুন্দরাইয়া, ১৯৪০-এর দশকে কৃষক সভার মূল লক্ষ্যই ছিল নিজাম ও দেশমুখদের অত্যাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও যুবসমাজকে সংগঠিত করা। তারা একাজে সচেষ্ট হয়েছিলেন সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের কর্মসূচির মাধ্যমে যা তাদের সদস্যদের মৌলিক শ্রেণি সম্পর্কিত দাবির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এই সময়পর্বের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ লড়াই হল গোদাবরী পারুলেকারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দাহানুর ওয়ার্লিদের সংগ্রাম। সেখানেও কৃষক সভা শুধুমাত্র জমিদারদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে শ্রমরত শ্রমজীবীদের অধিকারে জন্যেই লড়ে নি, একই সাথে লড়েছিল বনাঞ্চলের শ্রমজীবীদের অধিকারের দাবিতেও। ত্রিপুরাতেও গণমুক্তি পরিষদ রাজার ভূসম্পত্তি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বন্টন করেছিল।

গোড়ার পর্বের বামপন্থী প্রকাশনাগুলি থেকেও বোঝা যায়, সেই সময়পর্বের স্থানীয় লড়াইগুলির মূল আওয়াজ ছিল জমিদার ও বানিয়াদের শ্রেণি শোষণ থেকে আদিবাসী ও অন্যান্য নিপীড়িত কৃষকদের মুক্তি ছিনিয়ে আনা। ওই আধিপত্যকারী শ্রেণি ছিল রাষ্ট্রের প্রশাসনিক যন্ত্রের দ্বারা মদতপুষ্ট। ফলে উপনিবেশ-পূর্ব আমলের আধিপত্যকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করে এরা হয়ে উঠেছিল বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। এমন সমন্বয় প্রক্রিয়ার ফলশ্রুতিতেই সামন্ত অভিজাত ও পশ্চিমী দুনিয়ার পুঁজিপতিদের গাঁটছড়ার মধ্য দিয়েই ভারতের অভ্যন্তরে ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্বে, বামপন্থীরা এই আধিপত্যকারী গাঁটছড়ার বিরুদ্ধেই আদিবাসী সমাজ, কৃষক, শ্রমিক শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত যুবসমাজের এক যুক্তমোর্চা গড়ে তোলায় সচেষ্ট হয়েছিল। দাহানু অঞ্চলেও, ১৯৪৬-এর লড়াই কেন্দ্রীভূত হয়েছিল জমিদার ও কাঠ ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যে। মূল দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল দাহানু অঞ্চলে ঘাস কাটা ও গাছ কাটার বর্ধিত মজুরি। বামপন্থীদের এই আন্দোলন কর্মের পরম্পরায় তাদের লড়াইকে কখনোই শুধুমাত্র আদিবাসীদের দাবিদাওয়া অর্জনের পন্থা হিসেবে দেখা হয় নি। দেখা হয়েছে সামগ্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে যা সমস্ত অংশের নিপীড়িত মানুষের জন্যে উন্নত ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করবে। এ ভাবে, আদিবাসী সমাজের অধিকার রক্ষার লড়াই সমগ্র অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণের লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

এই পরিপ্রেক্ষিতেই পরিবেশ ও আদিবাসী আন্দোলন বিষয়ক চর্চার সাথে জড়িত গবেষকেরা প্রায় কখনোই কৃষক সভার গোড়ার যুগের সংগ্রামগুলিকে ‘পরিবেশ আন্দোলন’ হিসেবে দেখে নি কারণ এই সংগ্রামগুলি আদিবাসী সমাজের সংস্কৃতি ও পরিচিতিসত্তার প্রশ্নগুলিকে জোরালো ভাবে উত্থাপন করে নি। পরিবর্তে, বামপন্থীরা সম্ভবত সচেষ্ট হয়েছে এক নতুন মতাদর্শ কেন্দ্রিক পরিচিতির লক্ষ্যে যা এমন এক বিকল্প ধারা নির্মান করবে যেখানে আদিবাসী সমাজ অন্য অংশের কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের দাবিদাওয়ার সাথে একাত্ম হয়ে উঠবে। এই প্রক্রিয়ায় বামপন্থীরা একই সাথে সনাতনী ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে যাতে আধুনিক উন্নয়নের সুফল গ্রাম শহরের শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তারা বিশ্বাস করেছিল যে এটা তখনই সম্ভব হবে যখন আদিবাসী চেতনার কৌমচরিত্র রূপান্তরিত হয়ে গণতান্ত্রিক ও নাগরিক চেতনায় উত্তরন হবে। এভাবেই, বামপন্থীদের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া প্রথম যুগের আদিবাসী আন্দোলন লক্ষ্য হিসেবে শুধুমাত্র শ্রমজীবীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের দাবি অর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, তার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষের মধ্য দিয়ে আধুনিকতার একটি ভিন্নতর ভাষ্য সৃষ্টি করা অথবা গণমুখী উন্নয়নের ধাঁচ নির্মান করা। ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের সমালোচনামূলক ভাষ্য বামপন্থীদের এই সংগ্রামী ধারায় পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রশ্নকে যুক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। হয়ত এই ধারার মধ্যে কোনো সংলাপ সংগঠিত হলে রাজনীতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত ভাবনায় ক্ষেত্রে বিকল্প চিন্তার উদ্ভব সম্ভব হবে যা সমকালীন ভারতে বিশ্বায়ন ও হিন্দুত্বের বিপদের বিরুদ্ধে অর্থবহ প্রত্যাহ্বান জানাবে।

এই বইয়ের গঠন বিন্যাস

এই বইয়ের উদ্দেশ্য সমকালীন সময়ের আদিবাসী ভারতের কিছু জ্বলন্ত সমস্যার বিবেচনা এবং আদিবাসী সমাজের স্বশাসন, তার কাঠামো, জমির বন্দোবস্ত, বনাঞ্চলের অধিকার এবং উচ্ছেদের মত মূল বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা কেন্দ্রীভূত করবে। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের ফলশ্রুতিতে যে বিপদ তাদেরকে প্রত্যাহ্বানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, এই প্রশ্নগুলির তারা বিশ্লেষণ করে সেটার দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বইয়ে সেই সম্ভাবনার দুয়ার খোলার চেষ্টা হয়েছে যার মধ্য দিয়ে ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলন ও বামপন্থী শক্তি এই বিপদের মোকাবিলায় ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের একটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় এই বই অনুসন্ধান করবে এতদিন বৈরিতার সম্পর্কে থাকা দু’টি ধারার সেই অভিন্ন প্রত্যাহ্বানের ক্ষেত্রগুলি এবং আদর্শগত অবস্থানগুলির যাতে ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গঠনের পথ প্রশস্ত হয়।

পরবর্তী অধ্যায়গুলি তুলে ধরবে, আদিবাসীদের জীবন জীবিকায় ‘জমির প্রশ্ন’ প্রসঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীনির্ভর ও শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে। এখানে দেখানো হবে ভূমি সংস্কার ও অধিকারের ধরন কীভাবে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়ে আছে স্থানীয় কৃষি সমাজ ও বৃহত্তর কৃষি ব্যবস্থার আন্তঃসম্পর্কের সাথে। ভারতে আদিবাসী জীবনধারা ও সমকালীন কৃষি সংকটের মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্কও পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে আলোচিত হবে। বিশেষ করে সেই অধ্যায়ে জুম চাষ পদ্ধতি বা স্থানান্তরী চাষ পদ্ধতি প্রসঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প প্রচারিত যে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এই পদ্ধতিতে বদল এনে পরিবেশগত ভারসাম্যের কৃষি সমাজের নির্মিত হচ্ছে সে বিষয়েও আলোকপাত করা হবে। চতুর্থ অধ্যায়ে, যেখানে বিশ্বায়নের সময় পর্বে আদিবাসী সমাজ ও বনাঞ্চল নিয়ে আলোচনা রয়েছে সেখানে বনাঞ্চলের যৌথ রক্ষণাবেক্ষণ ও আদিবাসীদের জীবন জীবিকায় কাঠ ছাড়াও অন্যান্য অরণ্য সম্পদের ভূমিকার পর্যালোচনা করে বনাঞ্চলের অধিকার ও আদিবাসীদের জীবন জীবিকার আন্তঃসম্পর্কের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা ও পরবর্তী কালে বহিরাগত অর্থায়নে বিশ্ব শিল্প বাণিজ্যের জন্যে বনাঞ্চল উন্মুক্ত করে দেওয়ার উদ্যোগের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়ে, উন্নয়নের আধুনিক ধাঁচ এবং উচ্ছেদের রাজনীতি বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নর্মদা আন্দোলনের সন্দর্ভে উচ্ছেদ, পুনর্বাসন এবং উন্নয়নের আধুনিক ধাঁচ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। দু’টি ধারার আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতের ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে এখানে। শেষ অধ্যায় মূল্যায়ন করেছে আদিবাসী সমাজের স্বশাসন সম্পর্কিত বিতর্কের আলোয় আদিবাসী সমাজের কল্যাণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতার। এই প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করা হয়েছে এখানে ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলন ও বামপন্থীদের অভিন্ন মতাদর্শগত পরিসরগুলিকে  শক্তিশালী করার।

পরবর্তী পর্বগুলিতে

  • আদিবাসী সমাজ ও ভূমির প্রশ্ন
  • আদিবাসীদের জীবন জীবিকা এবং কৃষি সংকট
  • আদিবাসী সমাজ, বনাঞ্চল ও বিশ্বায়ন
  • উন্নয়ন ও উচ্ছেদের রাজনীতি
  • ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসী সমাজ
  • উত্তরকথন : ঐক্যবদ্ধ মোর্চার গঠন

ভাষান্তর ঃ শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার 


প্রকাশের তারিখ: ৩১-অক্টোবর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org