|
পরিবেশবাদ ও বামপন্থা (৩য় পর্ব )অর্চনা প্রসাদ |
যদিও বেশিরভাগ প্রগতিশীল আন্দোলন প্রান্তিক জনগণের ওপর পুঁজিবাদী কৃষি পদ্ধতির অভিঘাত সম্পর্কে করা এই বিশ্লেষণের সাথে একমত, কিন্তু তাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেন এর প্রস্তাবিত বিকল্প বিষয়ে। পরিবেশ আন্দোলনের প্রস্তাবিত বিকল্প স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সম্পত্তি, দেশজ ও বৈজ্ঞানিক বিষয়ের মধ্যেকার পার্থক্যকে। এমন বৈপরীত্যের ধরনকে সামনে এনে এই পণ্ডিতেরা দেশজ প্রজাতি ও বৈচিত্রগুলি উচ্চ ফলনশীলের চেয়ে কম উৎপাদনশীল এবং ছোট জোত বড় জোতের চেয়ে কম অর্থকরী ও উৎপাদনশীল ইত্যাকার ধারণাগুলিকে মিথ্যা প্রমাণের প্রচেষ্টা করেছেন। তাঁরা যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে, তাঁদের প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রাকার কৃষি ব্যবস্থাগুলি জৈব কৃষি, স্ব-চালিত এবং পুনরুৎপাদনশীল। এটা হয় প্রধানত এই কারণে যে এর মূলে রয়েছে দেশজ জ্ঞান ও প্রয়োগ পদ্ধতি যা বাইরের সহায়তা ছাড়াই গ্রামের প্রয়োজনের সংস্থান করতে পারে। এর ফলে সমস্ত বিজ্ঞানকেই দেখা হয় প্রাকৃতিক সম্পদ ভাণ্ডার ও লক্ষ লক্ষ কৃষক-সহ অন্যদের জীবনের ওপর হিংস্র হস্তক্ষেপ হিসেবে। |
তৃতীয় পর্ব ক্ষুদ্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমুখী আদিবাসী ও পরিবেশ আন্দোলনের গান্ধীবাদী কর্মীরা মনে করেন, ভূমি ব্যবহারের সুবিবেচক রীতির ওপর নির্ভরশীল স্বনির্ভর গ্রামীণ গণতন্ত্রই আদর্শ কৃষি সমাজের ভিত্তি। চাষ করতে হবে জীবনধারণের জন্যে, উদ্বৃত্তের জন্যে নয় এবং এর ভিত্তি হবে শ্রম-নিবিড় কর্মকাণ্ড, দেশজ জ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র উৎপাদন। কৃষিজ উদ্বৃত্তের প্রয়োজনহীনতার ধারণা থেকে জন্ম নেয় এই দৃষ্টিভঙ্গী যে, দীর্ঘস্থায়িত্ব সুনিশ্চিতকারী কৃষি পদ্ধতি হচ্ছে সেটাই যা দেশজ প্রতিষ্ঠান ও জ্ঞান ভাণ্ডারের ওপর নির্ভরশীল। ওঁরা বিশ্বাস করেন যে ওই ব্যবস্থাগুলি ছিল ক্ষুদ্রাকার, স্বনির্ভর এবং পরিবেশ-বান্ধব যা বিপর্যস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে পুঁজিবাদী বাজার, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির (বিশেষ করে সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি) অনুপ্রবেশের পর। বন্দনা শিবা সম্ভবত এই মতের সবচেয়ে সোচ্চার প্রবক্তা এবং তাঁর লাগাতার প্রচারাভিযানের মাধ্যমে তিনি এ বিষয়ে গান্ধীবাদী ও সমাজবাদীদের সংগঠিত করেছেন। এই আন্দোলন-কর্মীরা বিশ্বাস করেন, পরিবেশ সচেতনতা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব আদর্শ অ-পুঁজিবাদী কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে। বন্দনা শিবা যেমন বলেন, ‘সবুজ বিপ্লবের প্রকল্প এবং এখন বিশ্বায়নের কৃষির প্রকল্পের ভিত্তি হচ্ছে ‘জীববৈচিত্র্যের ধ্বংসসাধন, ঋণগ্রস্ততার মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকের উৎখাত, পুঁজি ও রাসায়নিকের উপর নির্ভরতা তীব্রতর হওয়া, কেন্দ্রীকরণ ও দূরগামী পরিবহণ নির্ভরতা’। এর বিপরীতে, উনি জোর দিচ্ছেন ছোট ছোট জোতে শ্রমনিবিড় কৃষির ভিত্তিতে বৈচিত্র্য বৃদ্ধির ওপর। শিবার যুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং ধরমপালের মত গান্ধীবাদী গবেষকদেরই অনুসরণ করছে যারা দেশজ জ্ঞান ও প্রযুক্তির পুনুরুজ্জীবনের পরিচিত ধারণার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তা সত্ত্বেও শিবার কর্মপদ্ধতি এই গবেষকদের থেকে স্বতন্ত্র— কারণ তাঁর ধারণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কৃষিক্ষেত্রে বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিগুলির প্রবেশপথ উন্মুক্তকারী উদারীকরণের নীতির ন্যায়সঙ্গত ও তীব্র সমালোচনা। যদিও বেশিরভাগ প্রগতিশীল আন্দোলন প্রান্তিক জনগণের ওপর পুঁজিবাদী কৃষি পদ্ধতির অভিঘাত সম্পর্কে করা এই বিশ্লেষণের সাথে একমত, কিন্তু তাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেন এর প্রস্তাবিত বিকল্প বিষয়ে। পরিবেশ আন্দোলনের প্রস্তাবিত বিকল্প স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সম্পত্তি, দেশজ ও বৈজ্ঞানিক বিষয়ের মধ্যেকার পার্থক্যকে। এমন বৈপরীত্যের ধরনকে সামনে এনে এই পণ্ডিতেরা দেশজ প্রজাতি ও বৈচিত্রগুলি উচ্চ ফলনশীলের চেয়ে কম উৎপাদনশীল এবং ছোট জোত বড় জোতের চেয়ে কম অর্থকরী ও উৎপাদনশীল ইত্যাকার ধারণাগুলিকে মিথ্যা প্রমাণের প্রচেষ্টা করেছেন। তাঁরা যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে, তাঁদের প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রাকার কৃষি ব্যবস্থাগুলি জৈব কৃষি, স্ব-চালিত এবং পুনরুৎপাদনশীল। এটা হয় প্রধানত এই কারণে যে এর মূলে রয়েছে দেশজ জ্ঞান ও প্রয়োগ পদ্ধতি যা বাইরের সহায়তা ছাড়াই গ্রামের প্রয়োজনের সংস্থান করতে পারে। এর ফলে সমস্ত বিজ্ঞানকেই দেখা হয় প্রাকৃতিক সম্পদ ভাণ্ডার ও লক্ষ লক্ষ কৃষক-সহ অন্যদের জীবনের ওপর হিংস্র হস্তক্ষেপ হিসেবে।
যদিও শিবা নিজে স্থানান্তরিত চাষ সম্পর্কে সওয়াল বা আলোচনাও করেননি, কিন্তু যে নীতিগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর বৃহত্তর কৃষি সমাজের আদর্শ, তা নিহিত রয়েছে পরম্পরাগত স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতির স্বপক্ষ নেওয়ার মধ্যেই। আদিবাসী ও পরিবেশ ইতিহাসের গবেষকদের অভিমত, উপনিবেশবাদের প্রাক-পর্যায় অবধি আদিবাসী সমাজগুলি স্বনির্ভর ছিল। তাদের কৃষি পদ্ধতি, স্থানান্তরিত চাষকে তাঁরা বিশ্লেষণ করেছেন পরিবেশ-বান্ধব এবং কর্ম ও খাদ্য সংস্থান, উভয়ের নিরিখেই প্রয়োজন মেটাবার জন্যে যথার্থ বলে। এছাড়াও, স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতিকে দেখা হয়েছে প্রাকৃতিক বৈচিত্রের বাহক হিসেবে যা পুনর্নবায়ন ও স্বাভাবিক গাছপালার জন্ম সুনিশ্চিত করে। একজন বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী অভিমত দিয়ে বলেছেন যে, সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতি দেখা যায় তাকে ভারতের শতাব্দী প্রাচীন পরিবেশ-সহিষ্ণু জীবনধারার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা উচিত। কর্তন ও দাহ পদ্ধতির (swiddening) প্রাচীনত্ব, প্রাণ ও প্রকৃতিগত প্রতিবেশে এর মানানসই হয়ে ওঠার ক্ষমতা সম্পর্কিত ধারণা নৃতত্ত্বের অন্তত পাঁচ দশক আগেকার বক্তব্য। যেমন এলউইনের বিশ্লেষণ উপেক্ষা করেছে বাইগা জনসমাজ ও পরিচিতি সত্তা বিকশিত হওয়ার ধরনকে এবং একেবারেই গুরুত্ব আরোপ করেনি স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতির সঙ্গে মজুরি শ্রম এবং বনসম্পদ সংগ্রহ ও বিক্রয়ের মত জীবনধারণের অন্যান্য পদ্ধতির সম্পর্কের উপর।
তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, যুক্তি পাল্টা-যুক্তির এই বিতর্ক বহু ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানীকে প্রভাবিত করেছে যাঁরা স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতি পরিবেশ-বান্ধব এবং স্থিতিশীল বলে সওয়াল করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ, ভারতীয় নৃবিজ্ঞান সর্বেক্ষণের জনৈক গবেষক খরারোধক ও দীর্ঘস্থায়িত্বের বিবেচনায় স্থানান্তরিত চাষ থেকে হওয়া বাজরার মত ‘হীন শস্য’ ফলনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতির দীর্ঘায়ুই প্রমাণ করে যে এটাই টিকে থাকার উপযোগী চাষ পদ্ধতি। পরিবেশ সংক্রান্ত বিশিষ্ট ইতিহাসবিদেরা প্রায় সবসময়ই আধুনিকতা বিরোধী আদিবাসী পরিচিতি সত্তা নির্মাণের জন্যে এ ধরনের বিদ্যাচর্চাকে ব্যবহার করেন এবং কৃষি বিকাশের অনাধুনিক বিকল্পের পক্ষে সওয়াল করেন। ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর সময়ে স্থানান্তর পদ্ধতির চাষের উপর নিষেধাজ্ঞাকে দেখা হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে গ্রাস করার আধুনিক ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে। অরণ্যের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যিক বনায়ন এবং কাঠ ব্যবসাকে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক অরণ্য ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য হিসেবে অভিহিত করে একে উপনিবেশ যুগের পরিবেশগত সর্বনাশের অগ্রদূত বলা হয়। পরবর্তীকালে, এই গবেষকদের অনেকেই স্থানীয় অধিকার এবং তৎপরবর্তী স্থানীয় জীবিকার ধ্বংসকে এই পরিবর্তনের চরমতম নাটকীয় অভিঘাত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যদিও জীববৈচিত্র ও দীর্ঘস্থায়িত্ব সম্পর্কিত প্রশ্নগুলি যথেষ্টই বোধগম্য, তবু সমস্যাটা দাঁড়ায় তখনই যখন এই মূল্যায়ন আদিবাসী সমাজের কৃষি পদ্ধতিকে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে না দেখে, স্থানান্তরিত চাষের স্বপক্ষে পূর্বনির্ধারিত তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে করা হয়। রাজমহল পাহাড়ের স্থানান্তরিত চাষ নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অজয় প্রতাপ এ ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন, বিদ্যমান পরিবেশগত ভারসাম্যের বাস্তবতায় এই চাষ পদ্ধতিই একমাত্র কার্যকর হিসেবে উঠে এসেছে। তাছাড়া আজকের সময়ের স্থানান্তরিত চাষের লক্ষ্য হচ্ছে ফসল বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ এবং ভূমিক্ষয় রোধ ও জীবনধারণের আয়ের সংস্থানের প্রয়োজনে। ফলে স্থানান্তরিত চাষের যে অস্তিত্ব এখন আমরা দেখি তাকে পরিবেশগত সামঞ্জস্যপূর্ণতা ও সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে এক কথায় বলে দেওয়াটা সহজ নয়। উত্তরপূর্বের স্থানান্তরিত চাষ নিয়ে পি এস রামকৃষ্ণনের নিবিড় গবেষণা থেকেও দেখা যায় যে পরম্পরাগত স্থানান্তরিত চাষের সাফল্য ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্যে এবং সেজন্যেই এই চাষ পদ্ধতির বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ঢেলে সাজিয়ে উন্নীতকরণ করা প্রয়োজন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায় যে, নির্দিষ্ট কোন্ পদ্ধতি গ্রহণ করলে স্থানান্তরিত চাষ আদিবাসীদের জীবনধারণের প্রাথমিক চাহিদা পূরণের একটি গ্রহণযোগ্য উপায় হয়ে উঠতে পারে তারও বিবেচনা করা উচিত। নয়া জনতোষী এবং গান্ধীবাদী দৃষ্টান্তে এ বিষয়গুলি কদাচিৎ বিবেচিত হতে দেখা যায় এবং স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতির রূপান্তর ও এর অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাগুলি সম্পর্কে সেখানে অজ্ঞতাই পরিলক্ষিত হয়। এর প্রধান কারণ ওঁরা স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতি ও সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতির আন্তঃসম্পর্কটা দেখতেই পান না। এই পদ্ধতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিটি মরশুমের কৃষি-কৌশলের সাথে যুক্ত হয়ে আছে উৎপন্ন ফসলের সাথে একগুচ্ছ যোগাযোগের সূত্র যা আবার কৃষক, কারিগর, পশুপালক ও আদিবাসী সমাজের মধ্যেকার সহযোগিতা ও সংঘর্ষের সম্পর্কের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। উপরোক্ত প্রশ্নের আলোয়, এটা যুক্তিসঙ্গত হয়ে পড়ে, কৃষিকর্মের এই ব্যবস্থার বেঁচে থাকায় এটাও প্রতীয়মান হয়ে যায় যে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয়স্তরে রাজনৈতিক অর্থনীতির চকিত টালমাটালে স্থানান্তরিত চাষ ব্যবস্থার ওপর প্রগাঢ় প্রভাব পড়ে। অষ্টাদশ শতকের শেষে এই অনিশ্চিত চাষ ব্যবস্থাটি টিকে থাকার জন্যে নির্ভরশীল ছিল স্থানীয় অর্থনীতির সম্প্রসারণের ওপর। রামকৃষ্ণন ও প্রতাপের পরিবেশগত মূল্যায়নও এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্পর্কে কিছুটা হলেও সচেতন এবং সেজন্যেই তাঁদের মূল্যায়নে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে কার্যকর করার স্বার্থে স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতিকে নতুন করে ঢেলে সাজানো ও উন্নীতকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর বিপরীতে, পরিবেশ আন্দোলনের নয়া জনতোষী চিন্তাভাবনায় এই দিকটি প্রায় উপেক্ষিত এবং ফলে দীর্ঘস্থায়িত্বের শ্লোগানকে বাস্তবতা বিবর্জিত এক তাত্ত্বিক প্রকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
জুম প্রথার উন্নীতকরণ এই ধরনের বিশ্লেষণ অনুসরণ করেই, পরিবেশ আন্দোলন বামপন্থীদের অভিহিত করেছে সবুজ বিপ্লব, উচ্চফলনশীল বীজ এবং এ সময়ের নতুন প্রযুক্তির প্রশ্নহীন সমর্থক হিসেবে। আদিবাসী এলাকায় লাঙল-নির্ভর স্থায়ী জমির চাষ এবং বাণিজ্যিক ফসলের প্রচলনের সমর্থক হিসেবেও দেখা হয় বামপন্থীদের, যেহেতু বামপন্থীরা পরম্পরাগত স্থানান্তরিত চাষকে ‘আদিম’ বলে মনে করে। বামপন্থীরা বিশ্বাস করে কৃষি অর্থনীতির সম্প্রসারণ হওয়া উচিত এবং একমাত্র কৃষিজাত উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের মধ্য দিয়েই তা হবে। আদিবাসী সমাজের কৃষি যেহেতু উদ্বৃত্ত উৎপাদনে অসমর্থ, তাই সেটা পশ্চাদপদ। এই যুক্তিধারা এই সূত্রের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে যে সামন্ততন্ত্রের নিগড় ভেঙে ফেলার জন্যেই এই ধরনের উদ্বৃত্ত বাঞ্ছনীয়। এটা সম্ভব হতে পারে একমাত্র লাঙল-ভিত্তিক নিশ্চল জমির চাষ পদ্ধতির সম্প্রসারণ, রাসায়নিক সার এবং উচ্চফলনশীল বীজের মধ্য দিয়ে।
পরিবেশ আন্দোলন যে ভাবে বোঝাতে চায় সেই অর্থে আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রতি বামপন্থীদের সমর্থন মোটেই শর্তহীন বা দ্ব্যর্থহীন নয়। আদর্শ কৃষি সমাজ সম্পর্কিত বামপন্থীদের মৌলিক ধারণাটি হল যে, তাকে অবশ্যই হতে হবে অ-সামন্ততান্ত্রিক ও অ-পুঁজিবাদী প্রকৃতির, অর্থাৎ প্রকৃত উৎপাদক (কৃষক ও মজুর শ্রেণি) উৎপাদনের উপকরণকে নিয়ন্ত্রণ করবে। স্বাধীন ভারতে এই আদর্শ ব্যবস্থা কায়েম করতে হলে কৃষিক্ষেত্রে, বিশেষ করে সেচের ক্ষেত্রে, আধুনিক প্রযুক্তি প্রবর্তনের পাশাপাশি, কৃষি অর্থনীতির সামাজিক সম্পর্ক বিন্যাসে ব্যাপক রদবদল ঘটাতে হবে। বামপন্থীরা প্রযুক্তি-নির্ভর সেচ ব্যবস্থাকে, বিশেষ করে বড় বাঁধ ও খালের ক্ষেত্রে, সমর্থন করেছে কারণ তারা বিশ্বাস করে যে কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধির ফলেই খাদ্য সুরক্ষা আসতে পারে। তারা এটাও বিশ্বাস করে যে এই বৃদ্ধির সুফল সমভাবে শ্রমিক, ভূমিহীন কৃষক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে বন্টন করতে হবে যা নিয়ে ১৯৩০ এর দশক থেকে বামপন্থীরা লড়ছে। এই আদর্শগত অবস্থান থেকেই বামপন্থীরা সবুজ বিপ্লবের সময়ে পরিবেশগত ভারসাম্যের দৃষ্টি থেকে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তনকে বিরোধিতা করেনি। তারা সমস্যাকে দেখেছে শস্যের প্রজাতি নির্বাচনের মধ্যে, যে প্রজাতিগুলি উচ্চহারে চাষের খরচ দাবি করে এবং সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চলের পুঁজিবাদী কৃষকদের স্বার্থকে সবল করে।
এই সমালোচনা নিহিত ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণের মধ্যে। ১৯৫০ এর দশকের শুরু থেকেই বামপন্থীরা বলে আসছে যে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সুসংহত বিকাশ প্রকল্প বা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে মার্কিনী হাইব্রিড প্রজাতির বীজ প্রবর্তন ক্ষুদ্র কৃষক ও কৃষি মজুরদের স্বার্থের পক্ষে হানিকর। এর কারণ, এই কৃষি পদ্ধতির ফলে চাষের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে যা শুধুমাত্র বৃহৎ কৃষকদের উপকৃত করেছে এবং কৃষিতে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে। সবুজ বিপ্লব নিয়ে সিপিআইএম-এর সমালোচনা এই ধারাতেই। উদাহরণ স্বরূপ, দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এবং সারা ভারত কৃষক সভার প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হরকিষেণ সিং সুরজিৎ কৃষক আন্দোলনের অবস্থান থেকে লিখেছিলেন যে,
প্রযুক্তির (সবুজ বিপ্লবের) প্রবর্তন দু’ধরনের স্বার্থের সম্মিলন ঘটিয়েছে-ভারতীয় পুঁজিপতিদের, কৃষিজ পুঁজিপতিদের এবং সার, কীটনাশক, আগাছা-নিরোধক এবং কৃষি উপকরণ উৎপাদক কৃষি সংক্রান্ত বাণিজ্যের বহুজাতিক কোম্পানিগুলির।
সুরজিৎ এটাও দেখিয়েছেন, যদিও সবুজ বিপ্লবের সময়ে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু মাথা পিছু খাদ্যের জোগান কমেছে এবং সেটা ১৯৬০ এর দশকে এই প্রযুক্তি প্রবর্তনের আগেকার সময়ের তুলনায় কমেছে। এটা ঘটেছে মূলত আশঙ্কাজনক হারে বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ায়। তার মানে, যতক্ষণ না কৃষিক্ষেত্রে বৈষম্যের নিরসন ঘটছে ততক্ষণ কোনো প্রযুক্তিই কৃষক সমাজের দরিদ্রতম অংশের কোনো উপকারে আসবে না। বামপন্থীরা সবসময়ই আধুনিকীকরণ ও প্রযুক্তিগত প্রয়োগের প্রশ্নকে সামাজিক প্রকৌশলের সাথে যুক্ত করে দেখেছে এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ত্রিপুরায় আদিবাসী কৃষি ব্যবস্থার সমস্যার নিরসন ও স্থানান্তরিত কৃষির উন্নীতকরণের প্রচেষ্টা করেছে।
বামপন্থীদের গোড়ার দিককার প্রকাশনায় জুমিয়ারা ত্রিপুরার প্রসঙ্গে উল্লেখিত হয়েছেন, যদিও শুধুমাত্র তাঁদের ন্যায়সঙ্গত সংস্কৃতিগত ও জমির দাবির প্রেক্ষিতে। ১৯৯০ এর গোড়ার পর্বেই প্রথম সারা ভারত কৃষক সভা স্থানান্তরিত চাষে কৃষকদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা সুস্পষ্টভাবে বলে এবং সেটাও ১৯৮০ এর শেষের দিকে ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকার এই মর্মে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার পর। জুম চাষ থেকে সরিয়ে এনে জুমিয়াদের অন্য জীবিকায় ‘পুনর্বাসন’-এর প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গটি কৃষি অর্থনীতি সম্পর্কে আধুনিকতাবাদী ধারণা থেকে ভিন্ন এবং নব্য জনতোষী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সংঘাত মূলক। ভূমি ব্যবহারের প্রাক-পুঁজিবাদী পদ্ধতিকে আদিম মনে করে লাঙল-ভিত্তিক নিশ্চল জমির চাষকে মান্য ভূমি ব্যবহারের পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণ হল, এই পদ্ধতিতেই কর্মসংস্থান ও আয়ের নিশ্চয়তা আসে।
এই ধারণা সত্ত্বেও ত্রিপুরা সরকারের জুম পুনর্বাসন কর্মসূচিই একমাত্র সরকারি কর্মসূচি যেখানে স্থানান্তরিত চাষের কৃষকদের কৃষি বহির্ভূত ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি শোভন জীবন দেওয়ার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। প্রাক-স্বাধীনতাকালীন সময়ে ত্রিপুরা ছিল একটি রাজন্য শাসিত রাজ্য যেখানে ১৯৪১ সালে রাজ্যের জনসংখ্যার ৫২.৮৫ শতাংশ ছিলেন আদিবাসী। দেশভাগ ও শরণার্থী জনগনের বিপুল জনপ্রবাহের পর আদিবাসীরা রাজ্যে দ্রুত সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন। ১৯৭১-৮১ সময় পর্বে (বাংলাদেশ যুদ্ধের পর) এই সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় ২৮.৪৪ শতাংশে। ১৯৯১ সাল নাগাদ এই হার সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩০.৯৫ শতাংশে। জুমিয়া অভিধাটি কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠী বাচক নয়, আদিবাসীদের মধ্যে যাঁরা স্থানান্তরিত চাষকে প্রাথমিক জীবিকা হিসেবে নিয়ে জীবনধারণ করেন তাঁদেরকেই সাধারণ ভাবে বোঝানো হয় জুমিয়া নামে। ১৯৮৩ সালের ইস্তাহারে সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা হয়েছিল অরণ্যবাসী ১৮,০০০ জুমিয়া পরিবারকে জুমিয়া পুনর্বাসন নিগমের মাধ্যমে পুনর্বাসন প্রদানের কথা। জুমিয়াদের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতার নিরিখেই তখন উঠে এসেছিল পুনর্বাসনের কথা। ওঁরা ছিলেন দরিদ্রতম অংশের মানুষ যাঁরা নিমজ্জিত ছিলেন বিপুল ঋণভারে, বাস করছিলেন প্রান্তিক ভূমিতে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জুম এমন একটি অনিশ্চিত চাষ পদ্ধতি যা থেকে বেঁচে থাকার সংস্থান হওয়া দুষ্কর। এক একর জমিতে জুম চাষের গড় খরচ ২২৬.৫০ টাকা যাতে ৬৫.৫ দিনের কর্মসংস্থান হয় এবং মোটামুটি আয় হয় ২১৮.০০ টাকা। এটা থেকেই স্পষ্ট যে জুম অর্থনীতি বছরব্যাপী কর্মসংস্থান ও উপযুক্ত মজুরি সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি প্রত্যাহ্বান হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
বস্তুতপক্ষে ১৯৮৫ সালে বামফ্রন্ট সরকারের গৃহীত প্রকল্পটি প্রথম উদ্যোগ নয়। ত্রিপুরার রাজা ব্রিটিশ সরকারের সূত্র অনুসরণ করে ১৯৩১ সালে কল্যাণপুর সংরক্ষিত অঞ্চল গঠন করে (১৯৪১ সালে এর আয়তন বৃদ্ধি করা হয়)। সংরক্ষিত অঞ্চলটি তৈরি হয় অরণ্যভূমির বাইরের একটি উর্বর এলাকায় যাতে জুমিয়ারা লাঙল-ভিত্তিক চাষে আকর্ষিত হয়। জমিতে আদিবাসীদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে প্রজাস্বত্ব আইনও বলবৎ করা হয়। মূলধারার কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কর্মসংস্থানে জুমিয়াদের স্থিত করার লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হল স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে। জুমিয়াদের লাঙল-ভিত্তিক চাষের প্রণোদিত করতে কংগ্রেস সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রদত্ত জমিতে বসত তৈরি করার। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে এই ‘স্থানান্তরিত চাষ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প’-এর আওতাধীন পরিবারগুলিকে এক খণ্ড চাষযোগ্য জমি ও প্রারম্ভিক পুঁজি হিসেবে ৫০০ টাকা সহায়তা করা হয়। আদিবাসীদের প্রাথমিক সমস্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে বসতগুলির নকশা তৈরি করা হয়েছিল এবং ১৯৬৯ সাল নাগাদ ৫৯টি এমন বসত তৈরি করেছিল কংগ্রেস সরকার। তবে এই কর্মসূচির সাফল্য ছিল সামান্য। কারণ ২৬,৩৩৮ পরিবারের মাত্র ৩৭ শতাংশ ছিল এর আওতাধীন এবং এই প্রকল্পও লাঙল ভিত্তিক চাষে বদল ঘটাতে সমর্থ হয়নি।
১৯৮০ সাল নাগাদ ১৮,০০০ জুমিয়া পরিবার তখনও অরণ্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে রয়ে গিয়েছিল যাদের জীবন জীবিকার বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালের বামফ্রন্টের নির্বাচনী ইস্তেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সমস্ত জুমিয়াদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন প্রদান করা হবে এবং পুনর্বাসন সম্পূর্ণ না হওয়া অবধি জুম চাষ নিষিদ্ধ হবে না। ১৯৮৪ সালে রাজ্য সরকার আদিবাসীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব রাখে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল:
১. আদিম ও ভূমিহীন আদিবাসীদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন।
২. ধ্বংসাত্মক ও অলাভজনক জুম চাষের (স্থানান্তরিত চাষ) অভ্যাস থেকে আদিবাসীদের সরিয়ে আনা। ৩. বনাঞ্চল ধ্বংস ও এর ক্ষতিকর পরিণতি রোধ। ৪. অনুৎপাদনশীল ও পতিত জমিতে অর্থকরী বনসৃজন ও অরণ্য সম্পদ সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ। ৫. আদিম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ৬. স্থানীয় শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের উৎপাদন। ৭. সড়ক, নির্মাণ ও জলপথ উন্নয়নের মত পরিকাঠামোর বিকাশ। ৮. স্থানিক পরিবেশের উন্নয়ন। ৯. আদিবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। ১০. আদিবাসীদের জন্যে শিক্ষা, জল সরবরাহ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ। বৃহত্তর এই লক্ষ্যের অধীনে, আদিবাসীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থায় রবার চাষ, পশুপালন ও মৎস্যচাষের মত অন্যান্য কৃষি বহির্ভূত জীবিকায় সহায়তা প্রদানে এই প্রকল্প উদ্যোগ নিয়েছিল। এই বনসৃজন সম্পন্ন করার দায়িত্ব ছিল ত্রিপুরা বনসৃজন পুনর্বাসন নিগমের ওপর। ভূমিহীন আদিবাসীদের এই প্রকল্পে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পুনর্বাসন প্রদান করা হয়। ৭ম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনায় এই অ-কৃষিমূলক হস্তক্ষেপের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ১৬,১৫০ টি পরিবারকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯,৮৪২ টি পরিবারকে বনসৃজন প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসন প্রদান করা হয়। এর বাইরে, ৪,২৯৭ টি পরিবারকে পুনর্বাসন প্রদান করা হয় পশুপালন, কৃষি, ফুল চাষ ও মৎস্যচাষের মাধ্যমে। সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল জুম চাষের এলাকায় রবার চাষের মাধ্যমে জুমিয়াদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ত্রিপুরার স্থানীয় উদ্ভিদ না হলেও সেখানকার মাটিতে রবারের ফলন ভালো হয় এবং এটা এমন এক ফলন যার জন্যে ন্যূনতম অর্থ যোগান প্রয়োজন এবং যার সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে আনারস, কফি, চা ও গোলমরিচের চাষ সম্ভব। রবার চাষের আন্তঃফসলের বাগিচায় মধুচাষও হতে পারে। অধিকাংশ আদিবাসী পুনর্বাসন প্রকল্পই রবার বাগানে আন্তঃফসল ও দীর্ঘায়ু কৃষির দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেছে। এর তত্ত্বাবধান করা হয়েছে একটি বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। জেলা পরিষদের মাধ্যমে রাজ্য সরকার প্রকল্পগুলির রূপায়ণ করেছে এবং প্রাপকদের তালিকা প্রস্তুত করেছে গ্রাম সভাগুলি। তবে প্রতিটি প্রাপককে ফলন সহ বাগিচার ওপর স্বত্বাধিকার অর্পণ দূরস্বপ্নই রয়ে গেছে। ইন্ডিয়া রাবার প্রজেক্টের মাধ্যমে রবার বাগিচা গড়ে তোলাই ছিল ৯ম পরিকল্পনার অর্থায়নে হওয়া অন্যতম প্রধান প্রকল্প। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার, রাবার বোর্ড এবং বিশ্ব ব্যাঙ্ক একত্রিত হয়ে রবার বাগিচা গড়ায় ত্রিপুরা সরকারকে সহায়তায় এগিয়ে আসে যাতে রাজ্যকে 'ভারতের দ্বিতীয় রবার রাজধানী'তে পরিণত করা যায়। ত্রিপুরার পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছিল কেরলের রবার অর্থনীতির আদলে যেখানে দরিদ্রের জন্যে রবার প্রকল্প ছিল আদিবাসী ও প্রান্তিক কৃষকদের স্থির আয়ের সুনিশ্চয়তা প্রদানের অন্যতম প্রধান প্রচেষ্টা। ক্রমে প্রান্তিক রবার চাষিও শ্রম ও কাঁচামালের যোগানদার হিসেবে বিশ্ববাজার ও বৃহৎ শিল্পক্ষেত্রের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়ল। থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার পর ভারত তৃতীয় বৃহত্তম রবার উৎপাদক দেশ। এখানে মোট উৎপাদনের ৯০ ভাগই আসে কেরল থেকে। ১৯৮০ এর দশকে দেখা পরম্পরাগত এলাকার বাইরে এর বিস্তৃতি যার মধ্যে ত্রিপুরা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প হিসেবে রবারই সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতীয়মান হল কারণ এতে জুমিয়াদের, আন্তঃ ফসল হিসেবে আনারস ও গোলমরিচের মত অর্থকরী ফসল সহ, উল্লেখযোগ্য রোজগারের সম্ভাবনা নিহিত ছিল। অর্থকরী ফসলের জন্যে টিলা জমি ও পতিত ভূমির ব্যবহার বৃহৎ শিল্প ও রপ্তানি বাণিজ্যের সুযোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে ত্রিপুরা সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির পথ সুগম করেছিল।
১৯৯০ এর শেষার্ধ্ব থেকে কেরলের অর্থনীতিতে রাবার অর্থনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির সাথে এর সংযুক্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অনুভূত হতে শুরু হয়।
১৯৯৭-৯৮ সালে যখন বিশ্ববাজারে রবারের দামে পতন হয়, তখন শিল্প মহল সন্ধান শুরু করে কেরলের প্রাকৃতিক রবারের চেয়ে সস্তা বিকল্পের। এর এক গভীর বিপ্রতীপ প্রভাব পড়ে কেরলের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির ওপর, বিশেষ করে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রান্তিকতর চাষিদের। কেরল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ভূ-বিজ্ঞান কেন্দ্রের সাথে সহযোগিতায় করা সমীক্ষায় দেখেছে, পাত্থানামথিটা, কোল্লাম ও তিরুবনন্তপুরমের আদিবাসীদের ৭০ শতাংশ জমি রবার চাষের আওতায় রয়েছে, কিন্তু খরচ বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রান্তিক চাষীরা বিপুল অঙ্কের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এই সমীক্ষার ফলাফলের সমর্থন পাওয়া যায় সেন্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মালানাদ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির প্রান্তিক রবার চাষীদের উপর করা সমীক্ষায়তেও, যেখানে এই সিদ্ধান্ত করা হয় যে খাদ্যশস্য উৎপাদন থেকে সরিয়ে আনার ফলস্বরূপ তাদের আয়ের অধিকাংশই খাদ্যে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। আরো বলা হয় যে রবার থেকে হওয়া আয় কখনোই আদিবাসীদের আয়ের মূল উৎস হয়ে উঠতে পারেনি এবং ফলে আদিবাসীদের ভিন্ন ধরনের কাজ থেকে হওয়া আয় দিয়ে পুষিয়ে নিতে হচ্ছে। তারপরও আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে মজুরির মাধ্যমে। এছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে, রবার চাষের পরিবেশগত প্রভাবে জলের লভ্যতা, মাটির গুণাগুণ এবং খাদ্য সুরক্ষা কী দাঁড়াচ্ছে সেটা নিয়ে। উপরোক্ত অভিজ্ঞতার আলোয়, ত্রিপুরার রবার প্রকল্পের বিকাশ নিয়ে পর্যালোচনা হওয়া উচিত। রবার শিল্পে উৎসাহ প্রদান করে পুনর্বাসন প্রাপ্ত জুমিয়াদের বাজার খুঁজে দিতে ত্রিপুরা সরকার একটি বহির্মুখী রবারের আঠা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করেছিল। একইসঙ্গে রাজ্যের রবার শিল্পে উৎসাহ প্রদানে বেসরকারি ক্ষেত্র থেকে বিনিয়োগ টানারও প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কেরলের অভিজ্ঞতা এবং আমদানির ক্ষেত্রে পরিমাণগত বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর তুলনায় সস্তা বিকল্পের আমদানি হওয়ার যে আশঙ্কা শিল্পপতিরা প্রকাশ করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই নীতির কার্যকরিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অবশ্য ত্রিপুরা সরকার এই বাস্তব পরিস্থিতি ও তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উদাসীন নয়। ত্রিপুরার গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী জিতেন্দ্র চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে আমদানিতে পরিমাণগত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ও বিশ্ব বাজারের সাথে রবার অর্থনীতি জুড়ে যাওয়ার পর রবারের দামে ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়েছে বেশি বেশি করে আনারসের মত উদ্যান ফসলে দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করতে। এছাড়াও আদিবাসী অর্থনীতির সমস্যার উদয় হয় মূলত উৎপাদন ক্ষমতার মন্থর বিকাশ ও উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর স্বত্বাধিকারের অভাবে। সমস্যার এই বিশেষ দিকে সরকারি প্রকল্পে যথাযথভাবে দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। যদিও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে রবার চাষিদের নিজস্ব সমিতি গঠনের এবং রবার চাষের পরিপূরক হিসেবে অর্থনৈতিক প্যাকেজ, জীবিকা সংক্রান্ত বাড়তি তৎপরতা যোগের, তবু আদিবাসী ও অ-আদিবাসী অংশের মধ্যে বৈষম্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ত্রিপুরা সরকারের তরফে কেরল প্রসঙ্গে দেওয়া সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরামর্শগুলির বিবেচনা করা উচিত যেখানে ৫০ শতাংশ প্রান্তিক জমি বহুমুখী ফসলের জন্যে সুনির্দিষ্ট করে রাখার কথা বলা হয়েছে। চাষির নিজস্ব প্রয়োজনের ফসলের সাথে স্থানীয় ও অঞ্চলগত প্রয়োজনের বৃক্ষ রোপণ যোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটা তখনই সম্ভব যদি জুম অর্থনীতির বিজ্ঞানসম্মত উন্নতিসাধন ও পুনর্বিকাশ ঘটানো হয় উত্তরপূর্বে পি এস রামকৃষ্ণন যেভাবে ব্যাপক কর্মকাণ্ড করেছেন সেই পথে।
এটা তখনই ঘটবে যখন বামপন্থীরা জুমকে পদ্ধতি হিসেবে ‘আদিম’ বা ‘সমস্যা’ মনে করা থেকে সরে এসে একে স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য চাষ পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করার সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হিসেবে মান্যতা দেবে। তার মানে স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতি আদিবাসীদের একটি যথাযথ জীবিকা প্রদান করতে পারে যদি একে উন্নীত ও বিকশিত করা যায়, কৃষিকে অর্থকরী উদ্ভিদ ও বৃক্ষ প্রজাতির সঙ্গে যুক্ত করা যায় বিবিধ ক্ষেত্রের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এভাবেই জুমের বিকাশের সঙ্গে কৃষি বহির্ভূত জীবিকাকে যুক্ত করা সম্ভব যেখানে জুমকে আর পশ্চাৎপদ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হবে না। বরং তাকে দেখা হবে একটি নতুন সম্পদ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি হিসেবে যার লাঙল-ভিত্তিক চাষের সঙ্গে সহাবস্থান ও সমৃদ্ধি সম্ভব। এই ধরনের উদ্যোগ জুমকে কেবল পরিবেশগতভাবে স্থিতিশীল করায় নিয়োজিত হলেই চলবে না, বরং আদিবাসী অর্থনীতি ও বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যেকার অসম বিনিময়ের সংশোধনেও ব্রতী হতে হবে।
২০০১ সালের গ্রীষ্মকালে ওড়িশার আদিবাসী এলাকা থেকে অসংখ্য অনাহার জনিত মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। ওড়িশার কাশীপুর জেলার আদিবাসীরা খাদ্যের অভাবে বিষাক্ত আমের শাঁস ভক্ষণ করেছিলেন। আর এটা ঘটছিল তখন, যখন ভারতীয় খাদ্য নিগমের গুদামে ৪০ লক্ষ টন খাদ্যশস্য পচে যাচ্ছে। একই গল্পের পুনরাবৃত্তি হয় পরবর্তী সময়ে যখন চরম খরা পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের সহারিয়া আদিবাসীদের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত, আদিবাসী ভারতে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা বিরল নয়। এই দৃষ্টান্তগুলি শুধুমাত্র আদিবাসী অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার প্রতিফলন নয়, একইসঙ্গে রাষ্ট্রের তরফে ওই এলাকাগুলির ক্ষেত্রে নেওয়া ভ্রান্ত নীতিরও প্রমাণ। বিশেষ ভাবে লক্ষ্যণীয়, যেভাবে সামাজিক ক্ষেত্রগুলি থেকে রাষ্ট্রের প্রত্যাহারের যুগে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থাগুলি কাজ করছে এটা তারও ইঙ্গিত দেয়। সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত রোষের ফলে কখনও এই মানুষগুলির স্বল্পমেয়াদী কিছু সুরাহা জোটে, কিন্তু এই বিকল্প খাদ্য সংগ্রহ ও বণ্টন ব্যবস্থা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এতে সমস্যার মূল শেকড় ছোঁয়া যায় না- বিগত ৫০ বছরে আদিবাসী সমাজ ও অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে তাতে এই অঞ্চলগুলিতে খাদ্য ও জীবিকার সুরক্ষা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। খুব সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে ও দেশের সিংহভাগ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতকূলের সমর্থনে যে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে তাতে আদিবাসীদের সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এতে আদিবাসী কৃষকরা চরমতম সমস্যায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন কারণ আদিবাসী এলাকায় খাদ্য উৎপাদনের যে সামান্য সুযোগ ছিল কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস তার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হল ২০০৩ সালে ছত্তিশগড় সরকারের ‘কৃষক চক্র’ এর উদ্যোগ। ‘কৃষক চক্র’ এর মাধ্যমে সরকার কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে অর্থকরী ফসল ফলাতে যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণ হয়। দুটো বাজারই নিয়ন্ত্রণ করে বৃহৎ কোম্পানিগুলি যারা স্থানিক পরিবেশ ও অর্থনীতির উপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিবেচনা না করেই নিজেদের শিল্পের প্রয়োজনীয় ফসল ফলানোয় উৎসাহ প্রদান করে জনকল্যাণের মুখোশ পরে (স্ব-সহায়ক গোষ্ঠীর মাধ্যমে)। এই কৌশল কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিকেই অনুসরণ করে যার প্রধান লক্ষ্য কৃষকদের বিশ্ব বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং তার চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে বাণিজ্যিক ফসল ফলাতে বাধ্য করা। এই পরিপ্রেক্ষিতেই কিছু আদিবাসী ও পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ থেকে দেশজ ও জৈব প্রজাতিকে উৎসাহ প্রদান সমকালীন আদিবাসী সমাজের বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অনেক আদিবাসী ও পরিবেশ আন্দোলন বিশ্বাস করে যে পরম্পরাগত স্থিতিশীল আদিবাসী কৃষি পদ্ধতির পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমেই খাদ্য পরিস্থিতির প্রতিকার হতে পারে। তাদের মতে, বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান অনাহার জনিত মৃত্যু ও আদিবাসী এলাকায় কর্পোরেট ক্ষেত্রের অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত আলোচনায় বারবার প্রকাশিত তাঁদের এই মত উঠে আসে যে, খাদ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে পরিবেশ-বান্ধব জীবন ধারণের গতিশীল ব্যবস্থার অবসানেরই প্রতিফলন ঘটে।
পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে ভিন্নমত হয়ে, বামপন্থীরা মনে করে, ক্ষুধার এই অপচ্ছায়া উদারীকরণ এবং আদিবাসী সমাজের কৃষি অর্থনীতিতে এর ক্ষতিকর প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত। অর্থকরী ফসলের দিকে সরে যাওয়া এটাই বোঝায় বৃহৎ কৃষকরা বাইরে থেকে এসে আদিবাসীদের জমি কিনে অত্যন্ত কম মজুরিতে তাদের খামারেই আদিবাসীদের কাজ করতে বাধ্য করেছে কারণ এই এলাকা সস্তা জমি ও শ্রমশক্তির জোগান দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটা সময়ে পশ্চিম মধ্যপ্রদেশের শিবপুরী এলাকার ঘন অরণ্য আচ্ছাদিত অঞ্চলে পাঞ্জাবের জমি মালিকদের জনপ্লাবন ঘটেছিল। কিছু কিছু খামার প্রতিষ্ঠান (যাদের মালিক ছিল বিশিষ্ট আমলা আর স্বাধীনতা সংগ্রামীরা) ১৯৬০ এর শেষ অর্ধে আদিবাসীদের কাছ থেকে জলের দামে জমি কিনে তাদেরকেই বাধ্য করেছিল নিজেদের জমিতে শোষিত, ভূমিহীন মজুর হিসেবে কাজ করতে। একই ধরনের পৃথকীকরণ পরিলক্ষিত হয়েছে কালাহান্ডি, বলাঙ্গির ও কোরাপুট এলাকায় যেখানে ভূমিহীন মজুর ও ছোট এবং মাঝারি কৃষকের সংখ্যার উচ্চহারে বৃদ্ধি ঘটেছিল। ১৯৭১ থেকে ১৯৯১ পর্বে, ১ একরের কম জমির মালিকানার প্রান্তিক কৃষকদের সংখ্যা ১৭ শতাংশ থেকে আনুমানিক বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশে যেখানে বৃহৎ কৃষক (১০ একরের বেশি জমির মালিক) ৪.৭ থেকে কমে হয়েছে ০.৯ শতাংশ। তবে মাঝারি কৃষকের (৪-১০.০০ একর জমির মালিক) ক্ষেত্রে ৩০.৪ শতাংশ থেকে ৯.৯ শতাংশে হ্রাসই সবচেয়ে চমকপ্রদ। সুতরাং একথা নির্বিবাদেই বলা যায় যে মাঝারি কৃষকের অনেকেই ভূমিহীন কৃষক বা প্রান্তিক কৃষকে পরিণত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ নাগাদ অধিকাংশ আদিবাসী ও দলিত (জনসংখ্যার প্রায় ৪৭ শতাংশ) উন্নত ও উর্বর চাষের জমি হারিয়ে প্রান্তিক কৃষক বা মজুরে পরিণত হয়ে যান। এর বিপরীতে, উচ্চ ফলনশীল, নীচু ও উর্বর জমি চলে যায় জনসংখ্যার ৫-১০ শতাংশের অধীনে যাদের অধিকাংশই ধনী অনুপস্থিত ভূম্যধিকারী।
আদিবাসীদের নিঃস্বতায় নিক্ষিপ্ত হওয়া তারা যে অঞ্চলে বসবাস করেন সেখানকার জীবিকা ব্যবস্থায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অধিকাংশ আদিবাসী একসাথে বনাঞ্চলে সংগ্রহ ও কৃষি মজুরির উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকেন। খনি শ্রমিকদেরও একটি অংশ তাঁরাই। কিন্তু এ সব কাজের বেশিরভাগই মরশুমী চরিত্রের এবং এই সমস্ত এলাকা থেকে বহির্গমনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। অভাব ও খরার সময়ে, বহির্গমনের হারেও কয়েকগুণ বৃদ্ধি ঘটে যায়। ওড়িশার মোট ৩০টি জেলার মধ্যে ২১টিই এবছর প্রবল খরার কবলে পড়েছে। এর ফলে ১,০০,০০০ মানুষ বহির্গমন করেছেন। নতুন শতাব্দীর আগমন মুহূর্তে ছত্তিশগড়ও বিগত ৫০ বছরের মধ্যে চরমতম খরা দেখেছে। এই অঞ্চলের আন্দোলনকর্মীদের অনুমান প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ অঞ্চল ছেড়ে চলে গেছেন। তবে এগুলিই একমাত্র খরায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল নয়। প্রশ্ন, কেন এই আদিবাসী ও দলিত প্রধান অঞ্চলগুলি বহির্গমন ও অনাহার প্রবণ হয়? উত্তর হল এই অঞ্চলের অনিশ্চিত জীবিকার ধারা যা মরশুমী কাজের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, অধিকাংশ আদিবাসী বছরে ৪০-৬০ দিন তেন্ডু পাতা সংগ্রহ করেন এবং বৃহৎ কৃষকের জমিতে বীজবপন থেকে ফসল কাটার কাজে নিয়োজিত হন। বছরের অবশিষ্ট সময়, তাঁরা হয়ত খনি অঞ্চলে চলে যান বা কোনো ঠিকাদারের সঙ্গী হয়ে নির্মাণের কাজে বা হয়ত পরিবারের কোনো একজন সদস্যকে শহরে কাজ করতে পাঠিয়ে দেন। তেন্ডু পাতা তোলার বাঁধাধরা কাজ শেষ হলে মান্ডলার মানুষ ৩৫০ কিমি হেঁটে বস্তারের খনিতে মরশুমী কাজের সন্ধানে যান (৩-৪ মাস কাজের বিনিময়ে পান ২০০০-৫০০০ টাকা)। কালাহান্ডি থেকে তরুণেরা রায়পুর যান রিকশা চালাতে এবং ছত্তিশগড়ের এই নারী পুরুষেরা বড় শহরগুলির কায়িক শ্রমের এক বড় অংশীদার হন। যখন ওঁরা মরশুমী কাজের জন্যে বাড়িতেও থাকেন তখন আয় এতটাই যৎসামান্য থাকে যে, ভবিষ্যৎ দুর্দিনের জন্যে সঞ্চয় তো দূর স্থান, নুন আনতেই তাঁদের পান্তা ফুরিয়ে যায়। গড়ে, কালাহান্ডিতে একজন নারী পাতা তোলার জন্যে প্রতিদিন ৫ টাকা মজুরি পান ও পুরুষদের দেওয়া হয় ৫ থেকে ৬ কেজি চাল। চারা রোপণ ও ফসল কাটার কাজে ওঁরা পান দিনপ্রতি ৩০-৪০ টাকা। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা ১ থেকে ২ টাকা কেজি দরে তাদের ফসলের অভাবী বিক্রয় করতে বাধ্য হন তেল, কাপড়, নূন ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী কেনার জন্যে। তেন্ডু পাতার ক্ষেত্রেও গল্পটা একই। পি, সাইনাথ লিখেছেন, একজন বিড়ি পাতা সংগ্রহকারীর জন্যে সারাদিন ১০০ গাঁট বিড়ি পাতা সংগ্রহ করেও ৩০ টাকার চেয়ে বেশি আয় করা কতটা কঠিন। এইসব তথ্য থেকে প্রশ্ন জাগে, এ দেশের দরিদ্রতম অংশের মানুষের জন্য ন্যায্য মজুরি ও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সুনিশ্চয়তার কি আদৌ কোনো রাস্তা আছে? এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এই বাস্তবতা যে আদিবাসীদের বনাঞ্চলের উপর কোনো অধিকার আর নেই যেখান থেকে অতীতে অভাবী সময়ের খাদ্য ও আশ্রয়ের সংস্থান হত। পূর্ব ও মধ্য ভারতের মৌখিক পরম্পরায় পাওয়া যায় কীভাবে মহুয়া গাছ, পাকা ফল, বীজ এবং পাতা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য ও আশ্রয়ের সংস্থান যোগাত। ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর সময়ে এই অধিকারের অস্বীকৃতি শুধুমাত্র বনাঞ্চলের কাঠ ব্যবসার রাজস্ব সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্যেই ঘটেছে তা নয়, একইসঙ্গে বনাঞ্চলের তুলনায় গৌণ বনাঞ্চলের ফলনও শিল্পের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারা অন্যতম কারণ। বণিক মহল ও রাষ্ট্র বনাঞ্চলের সবচেয়ে মূল্যবান সামগ্রী মহুয়া ও আমের শাঁসও আত্মস্যাৎ করে নিয়েছে। আদিবাসী এলাকায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে আছে এই প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্টি হওয়া ওই অঞ্চলের জীবন জীবিকায় থাকা বৈষম্য ও অস্তিত্বের সঙ্কটের সঙ্গে। এগুলো আরো প্রকট হয়েছে যথাযথ পরিকাঠামো ও পরিষেবার অভাবে, যার সিংহভাগ সুফল আত্মসাৎ করেছে তুলনায় ধনী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, কাজের বদলে খাদ্য বা বিনামূল্যে খাদ্য কর্মসূচি আদিবাসী সমাজের আশু প্রয়োজন মেটাতে পারে মাত্র। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সমাধান পেতে হলে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ, বিশেষ করে আদিবাসী ও দলিতদের স্বার্থবাহী কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস করতে হবে। যদিও পরিবেশ আন্দোলন ও বামপন্থীরা উভয়েই বিদ্যমান ব্যবস্থার কঠোরতম সমালোচনা তুলে ধরেছে, কিন্তু একটি গণমুখী স্থিতিশীল কৃষি প্রকরণের ভাবনা এখনও একটি কঠিন প্রত্যাহ্বান হিসেবে রয়ে গেছে তাঁদের কাছে। এই ধারণা বলতে শুধুমাত্র পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক বাস্তবোপযোগিতাকে বুঝলে হবে না, একটি নতুন সংগঠনগত ও প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর কথাও ভাবতে হবে যা চরিত্রগত ভাবে হবে সমত্বধর্মী ও অ-পুঁজিবাদী। কৃষিক্ষেত্রে নয়া উদারপন্থী বিশ্বায়নের বর্তমান নীতির বিরুদ্ধে একটি সামগ্রিক যৌথ লড়াই তখনই গড়ে উঠতে পারে যখন বিকল্পের একটি ভিত্তি নির্মিত হবে। পরবর্তী পর্বগুলিতে
আদিবাসী সমাজ, বনাঞ্চল ও বিশ্বায়ন
উন্নয়ন ও উচ্ছেদের রাজনীতি
ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসী সমাজ
উত্তরকথন : ঐক্যবদ্ধ মোর্চার গঠন
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার মূল রচনা : লেফটওয়ার্ড বুকস, নতুন দিল্লি- ১১০০০১ থেকে এপ্রিল ২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত সাইনপোস্ট পুস্তিকা মালার নবম প্রকাশনা অর্চনা প্রসাদের ‘এনভায়রনমেন্টালিজম অ্যান্ড দ্য লেফট’ ( কনটেম্পোরারি ডিবেটস অ্যান্ড ফিউচার অ্যাজেন্ডাস ইন ট্রাইবাল এরিয়াজ)। প্রকাশের তারিখ: ২১-নভেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |