পরিবেশবাদ ও বামপন্থা (চতুর্থ পর্ব)

অর্চনা প্রসাদ
প্রশ্নটা হল, কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যসামগ্রীর উপর যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে আদিবাসীদের উপর মধ্যস্থতাকারী ব্যবসায়ীদের শোষণ কমবে, নাকি নিশ্চিত ভাবেই বাড়বে? আমরা যদি এই বাণিজ্যের প্রক্রিয়া ও বাজারজাতকরণের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখা যাবে আদিবাসীরা স্থানীয় স্তরে একটা ন্যূনতম প্রক্রিয়াকরণের পরই তাদের দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করে থাকে। আমলকি শুকানো, তেঁতুল ও চিরঞ্জী বীজের খোসা ছাড়ানো এগুলো সাধারণভাবে সেরে নেওয়া হয় যা কাঁচা ফসলের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু এতে, প্রক্রিয়াকরণের খরচের প্রশ্নই নেই, প্রাথমিক সংগ্রহের খরচও কচ্চিৎই ওঠে। এছাড়া নিজেদের একান্ত জীবিকা হিসেবে আদিবাসীরা মহুয়ার প্রক্রিয়াকরণও করে।

চতুর্থ পর্ব 

আদিবাসী, অরণ্য ও বিশ্বায়ন

আধুনিক রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে এক যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে অরণ্যাঞ্চল। যেহেতু এক বড় অংশের  সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে এর উপর নির্ভরশীল। এই সংঘাতের প্রথম দিকটি অর্থাৎ দখলদারির বিষয়টি আগেকার অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। এটা লক্ষ্য করা অত্যন্ত জরুরি যে সরকারি অরণ্য সংরক্ষণ কর্মসূচি থেকে তৈরি হওয়া বেশিরভাগ সমস্যারই শেকড় রয়েছে ঔপনিবেশিক সময় থেকে অরণ্যভূমি ও বনজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট আমলাতন্ত্র এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে বাহ্যত মনে হয় অরণ্যের বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ হচ্ছে, কিন্তু ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর দুটি সময় পর্বেই দেখা যাবে, ভারতে কার্যত বনাঞ্চলে ব্যাপকহারে অধঃপতন ও ধ্বংসসাধন হয়েছে।  
পরিবেশ ও আদিবাসী আন্দোলন বলে আসছে যে বনাঞ্চল কর্তৃপক্ষ আদিবাসী সমাজের জীবনধারা ও জীবন জীবিকার মূল ভিত্তি যে অরণ্য তাকে সাংস্কৃতিক বা সামাজিক সত্তা মনে করে না, একে গণ্য করে একমাত্র অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে। সেজন্যই একাধিক পরিবেশ আন্দোলনের তরফে লড়াই হয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আদিবাসীদের অধিকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে এবং তারা দাবি করে, বনজ সম্পদ নিয়ে এই যে সংঘাত সেটা প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সভ্যতা ও আদিবাসীদের পরম্পরাগত জীবনধারার মধ্যেকার সংঘাতেরই প্রতীক। তারা দাবি তোলে, বনাঞ্চল ও বনজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ জনগোষ্ঠীগুলির হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক যারা পরম্পরাগত প্রথা ও আদিবাসী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই স্থির করবে সম্পদ ব্যবহারের রীতি পদ্ধতি। এর বিপরীতে, পরিবেশবাদীরা বামপন্থীদের দেখে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক সমাজের আদর্শকে সমর্থনকারী হিসেবে যার রীতিনীতির ফলে নাকি আদিবাসী সমাজের পরিবেশগত ক্ষতিসাধন ও প্রান্তিকায়ন ঘটেছে। বস্তুতপক্ষে বামপন্থীরা বিদ্যমান অর্থনীতির পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের ভূমিকা গ্রহণেরই সমর্থক, তবু তারা মোটেই কেন্দ্রীভূত ও একচেটিয়া রাষ্ট্র কাঠামোর দ্ব্যর্থহীন পূজারী নয়। বরং তারা নীতিগত দিক থেকে অরণ্যের উপর কর্তৃত্বের সমস্যাকে দেখে রাষ্ট্র পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত অংশের স্বার্থ ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষার সাপেক্ষে। এই লক্ষ্যে বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলন, দুই তরফ থেকেই অধিকারের প্রশ্ন এবং পরিচালন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে এর সম্পর্কের ওপরই প্রধানত আলোকপাত করা হচ্ছে। 

 

আদিবাসী সমাজের দক্ষতার অবমূল্যায়ন

আদিবাসী ও পরিবেশ আন্দোলনগুলি প্রায়শই বনাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সংঘাতকে দু'টি বিশ্বদৃষ্টি ও জ্ঞান ব্যবস্থার মধ্যেকার লড়াই হিসেবেই দেখে, যার একটি পাশ্চাত্য ও আধুনিক, অপরটি আদিবাসী।  আধুনিক পাশ্চাত্য ব্যবস্থাটি অরণ্য লুন্ঠনের জন্যে নির্ভর করে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও বাজারের শক্তির ওপর।  ফলেই বিজ্ঞানসম্মত অরণ্যায়নকে দেখা হয় বৃহৎ শিল্পের উপকরণ হিসেবে যা অরণ্যকে প্রাথমিক ভাবে কাঠের জন্যে ব্যবহার করে এবং প্রধানত উচ্চমূল্যের বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক বৃক্ষ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই প্রধানত চালিত হয়।  ঔপনিবেশিক সময়ে, পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলিতে কী দামে বনজ সম্পদ বিক্রয় হয় তার উপরই এই মূল্য নির্ধারিত হত না, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের জন্যে সেটা কতটা সহায়ক সেটাও বিবেচিত হত সঙ্গে।  এভাবেই বিজ্ঞানসম্মত অরণ্যায়নের প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল রেলপথ নির্মাণের সাথে যেখানে স্লিপার তৈরির জন্যে কাঠ আবশ্যক ছিল।  

নব্য গান্ধীবাদী পরিবেশ আন্দোলনকারীরা সরকারি অরণ্য সংরক্ষণ কর্মসূচির বিরোধিতা এই যুক্তিতে করে যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলি নিজেরাই অরণ্য সংরক্ষণ করে থাকে এবং বহু শতাব্দী ধরে এই পরিবেশের সাথে সুসমন্বিত হয়েই বসবাস করে আসছে।  তাঁদের আচরণ, আচার ব্যবস্থা, রীতি রেওয়াজ এবং সাশ্রয়ী-ব্যবহার প্রবণতা অরণ্য ধ্বংসের সহজাত প্রতিষেধক এবং অরণ্য সংরক্ষণের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি।  অরণ্যাঞ্চলে আদিবাসীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেই অরণ্য ধ্বংস প্রতিরোধ করা যাবে বলে যে অভিমত, তার কোনো আদর্শগত যুক্তিগ্রাহ্যতা আছে কিনা তা যাচাই করার জন্যে বহু গবেষক এবং পরিবেশ সংক্রান্ত গোষ্ঠী এখন ‘দেশজ জ্ঞান ব্যবস্থা’র অধ্যয়ন করছেন।  এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অরণ্য’ শব্দের সংজ্ঞা শুধুমাত্র বিশাল বিশাল গাছ ও কাঠের নিরিখেই নয়, বরং অন্যান্য গাছপালা ও কাঠ হিসেবে ব্যবহার্য্য নয় এমন বনজ সম্পদ যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিত্য ব্যবহারে লাগে তাকে অন্তর্ভুক্ত করেই হয়। পরিবেশের সাশ্রয়ী ব্যবহারের জন্যে স্থানীয় জ্ঞানভাণ্ডার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মকুশলতা দুটিরই প্রয়োজন যা ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর দু'টি সময়েরই বনকর্মীদের দ্বারা কোণঠাসা হয়েছে। সেজন্যই এই মতধারার কর্মী, গবেষক এবং পরিচালকেরা প্রায়শই দাবি উত্থাপন করে বলেন যে অরণ্য ব্যবহার ও সংরক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় জনগোষ্ঠীগত প্রতিষ্ঠানগুলিকে হস্তান্তরিত করা হোক এবং অরণ্যাঞ্চল পরিচালনার দৈনন্দিন দায়িত্ব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকুক শুধুমাত্র তদারকিতে। 

এটাও অনুসন্ধান করা জরুরি, কেন পরিবেশবাদীরা এতটা জোরের সাথে রাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানো এবং অরণ্যাঞ্চলের পরিচালনা জনগোষ্ঠীগুলির স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার হাতে অর্পণ করার দাবি জানান।  ইতিহাস প্রমাণ দিচ্ছে যে বনজ সম্পদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা এবং তার বর্গ বিভাজন ঔপনিবেশিক সময় থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে।  উনবিংশ শতকের মধ্য পর্বে বন বিভাগ গঠিত হওয়ার পর বনজ সম্পদকে মুখ্য ও গৌণ দু'টি বর্গে বিভাজিত করা হয়।  সেই সময়ে বর্গ বিভাজনের মানদণ্ড নির্ভরশীল ছিল সম্পদ সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার ভিত্তিতে নির্ণয় করা বাণিজ্যিক মূল্যের উপর।  ফলে ভারতীয় অরণ্য আইনে জ্বালানী কাঠ ও কড়িকাঠকে 'মুখ্য' সম্পদ ও বাকি সমস্ত তৃণ জাতীয় ও কাঠ-বহির্ভূত বনজ সম্পদকে 'গৌণ' অভিধায় সংজ্ঞায়িত করা হয়।  তবে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বোঝা গেল বন বিভাগের রাজস্ব সংগ্রহ সর্বোচ্চ পরিমাণে নিয়ে যাওয়ার জন্যে কড়িকাঠ-বহির্ভূত অথবা গৌণ বনজ সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতেও রাষ্ট্র বদ্ধপরিকর। 

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাঠ-বহির্ভূত বনজ সম্পদের রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ উপনিবেশ উত্তর সময়ের গোড়ার পর্বে অব্যাহত রাখা হয়।  ১৯৬০ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার গৌণ বনজ সম্পদের বাণিজ্যের বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে।  ১৯৬৪ সালের মধ্যপ্রদেশ তেণ্ডু পাত্তা (ব্যাপার বিনিয়ম) অধিনিয়মের মধ্য দিয়ে তেণ্ডুপাতার বাণিজ্যে একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং রাষ্ট্রই নির্দিষ্ট করে দেয়, কাদের এর বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হবে।  এই ব্যবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা সরকারকে রয়্যালটি প্রদান করে এবং সংগ্রাহকদের পাওনা মিটিয়ে দেয়।  এঁদের তারা নির্মমভাবে শোষণ করে।  একই ধরনের আরেকটি আইন অন্যান্য বনজ সম্পদের জন্যে প্রণয়ন করা হয় যার নাম ছিল মধ্যপ্রদেশ বনুপাজ (ব্যাপার বিনিয়ম) অধিনিয়ম (১৯৬৯)।  এই আইন সরকারকে রয়্যালটি আদায় ও গৌণ বনজ সম্পদ বিক্রয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করার প্রতিনিধি নিয়োগের অধিকার অর্পণ করে।  ১৯৭০ এর দশকে একই ধরনের আইন বিহারে প্রণয়ন করা হয় যেমন বিহার কেন্দু পাতা (বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৭৩ এবং বিহার বনজ ফসল (বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৮৪।  বণিকেরা সরকারকে নামমাত্র রয়্যালটি দিয়ে আদিবাসীদের কাছ থেকে বনজ দ্রব্য কিনে নিত এবং প্রাথমিক সংগ্রাহকদের বেঁচে থাকার মত মজুরিও দিত না।  এই দু’টি রাজ্য ছাড়াও একই ব্যবস্থা বলবৎ হয় অন্ধ্র ও ওড়িশায়।  রয়্যালটি আদায়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পন্ন সমস্ত দ্রব্যের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার বাসনা এবং  সক্ষমতা এর মধ্যে দিয়েই স্পষ্ট হয়। এই নীতি সর্বতোভাবেই ভারতীয় অরণ্য আইন, ১৯৫২-এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেখানে রাষ্ট্রীয় বন সংরক্ষণকে শিল্পায়নের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের অনুবর্তী রাখায় জোর দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্যিক বনসৃজনের বৃদ্ধি এবং বনাঞ্চলের কাজে সস্তা আদিবাসী শ্রমশক্তির নিয়োগ ঘটে। 

এই ধারণার মূল সমস্যা হচ্ছে যে এখানে আদিবাসীদের নিজস্ব জ্ঞান ও কুশলতাকে ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া হয় নি। এমনকি আদিবাসী কৃষক ও ভূমিহীন মজুরদের সহায়তার উপযোগী স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ ও প্রসারও সুনিশ্চিত করে নি। সারা বছরের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও এতে ছিল না, যার ফলে জীবন জীবিকার নিরাপত্তার সন্ধানে আদিবাসীদের ভূমিচ্যুতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা বাধ্য হয়েছে বড় ভূস্বামী, বণিক ও মহাজনদের সাথে শোষণমূলক সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে। এই ব্যবস্থা থেকে উদ্ভুত বেঁচে থাকার সমস্যা মানুষকে বাধ্য করেছে অরণ্য রক্ষায় সরকারি বিভাগের সাথে সহযোগিতা থেকে সরে আসতে। বহু সংস্থা ও বিভিন্ন অনুসন্ধানে এমন যুক্তিই উঠে এসেছে। এর ফলেই রাষ্ট্রের তরফে ১৯৮০-র গোড়ার দিকে সামাজিক অরণ্যায়ন কর্মসূচির সূচনা হয় অরণ্য সংরক্ষনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি গ্রহণের লক্ষ্য সামনে রেখে। বাস্তবে সামাজিক অরণ্যায়ন কর্মসূচিগুলি ছিল যেখানে বন বিভাগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। অরণ্য ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি ও সাংগঠনিক পরিকাঠামোর সামান্যতম পরিবর্তনও হয় নি এবং প্রজাতি হিসেবে সাধারণত ইউক্যালিপটাস  ও দ্রুত বর্ধিষ্ণু বাণিজ্যিক বৃক্ষকেই বেছে নেওয়া হত। এ ছাড়া অরণ্য নিধন রোধ ও বৃক্ষ আচ্ছাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত বনাঞ্চলের খামার প্রকল্পগুলিও ফলপ্রসূ হল না কারণ চাষীরাও বাজারের কথা ভেবে শিল্পের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির বাগিচা গড়ার দিকে ঝুঁকে গেল। ফলে দেখা যায় সামাজিক অরণ্যায়ন কর্মসূচিগুলি স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলির জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা ছাড়া বাড়তি কিছুই করতে সমর্থ হল না এবং রাষ্ট্র ও ভূমিহীন মজুরদের মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তনেও প্রয়াসী হল না। 

আদিবাসী জীবন জীবিকার দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী গোড়ার দশকগুলির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল তেণ্ডু পাতা, সলাই আঠা, হরিতকী ও শাল বীজের মত বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক বনজ দ্রব্যের জাতীয়করণ। এই দ্রব্যগুলির বাণিজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি উদ্যোগে কর্পোরেশন গঠন করা হয়। এই কর্পোরেশনগুলি জাতীয়করণ করা দ্রব্যগুলি প্রাথমিক সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে শিল্পপতি ও বণিকদের কাছে নিলাম করে দেয়, যাদের কেউ কেউ সেই দ্রব্য রপ্তানি করে দেশের বাইরে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, তাদের কেউ কেউ শুধু কাঠ ছাড়া অন্য দ্রব্যের বাণিজ্যে জড়িত ছিল না, খাদ্যশস্য ও অন্য ফসলের বাণিজ্যেও লিপ্ত ছিল। এটা বিশেষভাবে সত্য অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষেত্রে যেখানে গিরিজন সমবায় নিগম আদিবাসী এলাকায় রেশনের খাদ্যশস্য বিতরণের প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়। যেখানে এমনটা ঘটে নি, বিশেষ করে ওড়িশা ও ছত্তিশগড়ের দুর্গম আদিবাসী এলাকায়, বণিকদের বাড়তি ক্ষমতা প্রদান করা হয়, আর রাষ্ট্রের একচেটিয়া কর্তৃত্ব সীমাবদ্ধ থেকে যায় জেলা ও ব্লক পর্যায়েই। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ এভাবেই বণিকদের বাড়বাড়ন্তের সাথে সহবাস করে যেখানে রাস্তাঘাট ও অন্য কোনো সাধারণ পরিবহণ ব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই। বিধিগত মালিকানার এই পরিস্থিতিতে কোনো অর্থই থাকে না এবং সমস্ত ফসল, তা খাদ্যশস্য হোক বা কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্য, সবই অভাবী বিক্রির কবলে পড়েছে। 

১৯৮০ এর দশকের শুরুর দিক থেকে আত্মপ্রকাশ করল বনাঞ্চলের অধিকারের উপর কেন্দ্রীভূত সংগ্রাম যা অসংখ্য স্থানীয় স্তরের নতুন ধারার পরম্পরাগত তৃণমূল স্তরের আন্দোলনের জন্মের মধ্য দিয়ে। তারা দাবি তুলে বলল, রাষ্ট্র স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে অরণ্যের ভার তুলে দিক যারা অরণ্যের চিরাচরিত রক্ষক। ওই একই সময়ে বিদ্যমান বনজ ফসলের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণের দাবিতে বামপন্থী আন্দোলনের তরফে দাবি উত্থাপিত হলেও তা জনগোষ্ঠীগুলির স্বনিয়ন্ত্রণের দাবি অবধি যায় নি। তার পরিবর্তে, বেঁচে থাকার প্রয়োজন ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ ছিল এই দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অঙ্গ যাতে সাধারণ মানুষ বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থার অধিকতর লাভ অর্জন করতে পারে। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের আরাবাড়ি পরীক্ষানিরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল ছিল এরই উদাহরণ। দেশের বনাঞ্চলের উপর রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত দু'টি ধারার আন্দোলনই বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল। 


বণিকের হাত শক্ত করা

সম্ভবত কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সংরক্ষণ ও ব্যবহার কর্মসূচি সম্পর্কে বিভিন্ন গোষ্ঠী অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে। এটাও বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনার একটি দিক যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে আছে আদিবাসীদের ভালোমন্দ এবং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে কোনো পরিবর্তন আদিবাসী সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অভিঘাত ফেলে। এটাকে ধর্তব্যের মধ্যে নিয়েই বহু গবেষক ও দাতা সংস্থা ধারণা করে যে কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যের উন্নতি ঘটিয়ে আদিবাসীদের জীবন জীবিকার দীর্ঘস্থায়িত্ব সুনিশ্চিত করতে পারে। আদিবাসীদের জীবিকা ব্যবস্থায় কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যের ভূমিকা সম্পর্কিত গবেষণায় চমকপ্রদ ফলাফল পাওয়া গেছে, বিশেষ করে আদিবাসীদের জীবিকা ব্যবস্থায় কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ধরে নেওয়াটি যথার্থ নয়। কে. সি. মালহোত্রা এর উৎপাদনের মরশুমী চরিত্রটি তুলে ধরেছেন এবং সঙ্গে এই তথ্যটি যে কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্য পশ্চিমবঙ্গে গৃহস্থালীর বার্ষিক আয়ে মাত্র ১৭.১২ শতাংশ অবদান রাখে। একইসঙ্গে তিনি এটাও চিহ্নিত করেছেন কোন পরিস্থিতিতে কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্য আদিবাসীদের জীবিকা ব্যবস্থাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে। ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিসগড়ের আরেকটি ক্ষেত্র সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জীবিকার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি বাড়তি সুযোগ দিতে সক্ষম কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্য। এটা এ জন্যই কারণ কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্য থেকে প্রতি মরশুমে ৩০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকার চেয়ে বেশি আয় করা সম্ভব হয় না আদিবাসীদের এবং যা জীবনধারণের খরচের চেয়েও কম। ফলেই দাতা সংস্থাগুলি, বিশেষ করে বিশ্ব ব্যাঙ্কের তরফে কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যকে আদিবাসী উন্নয়নের ভিত্তি ধরার স্বপক্ষে ওকালতির বাস্তবতা নেই। যদি না বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াকরণের বর্তমান ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। 

আন্দোলনগুলির তরফে ক্রমবর্ধমান চাপ এবং এই পরিসরে দাতা সংস্থাগুলির আত্মপ্রকাশ নীতিগত অবস্থানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বদল সম্ভব করে ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছে। পরিবেশগত ভারসাম্য, সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং অঞ্চলগত চাহিদার পরিপূরণ, ১৯৮৮ সালের নতুন জাতীয় অরণ্যনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এই নীতির সাথে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন রাজ্যে বহু সমবায় সমিতি গঠিত হয়েছে।  উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রদেশ লঘু বনজ দ্রব্য সমবায় ফেডারেশন গঠন করা হয় জাতীয়করণের অন্তর্ভুক্ত দ্রব্যের সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে। প্রাথমিক বনজ দ্রব্য সমিতি যার সদস্য হচ্ছে প্রাথমিক সংগ্রাহকরা, জেলা শাসকের নেতৃত্বে জেলা বনজ দ্রব্য কেন্দ্র এবং এদের ওপরে রাজ্য স্তরের ফেডারেশন, এই নিয়ে ত্রিস্তরীয় সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়। প্রতিটি সমিতি ও কেন্দ্রকে তাদের বিক্রি করা সামগ্রীর ওপর কমিশনের দর বরাদ্দ করে দিত এবং ফেডারেশন সমস্ত দ্রব্য ক্রয় করে নিত এদের কাছ থেকে। এই ব্যবস্থাপনা করা হয়েছিল মূলত তেণ্ডুপাতার ক্ষেত্রে এবং বহু সমীক্ষায় প্রকাশ পেয়েছে যে তেণ্ডুপাতা সংগ্রাহকরা ব্যবসায়ী ও সরকারের দ্বারা নির্মমভাবে শোষিত হয়েছে। আদিবাসী সমবায় ও বাজারজাতকরণ ফেডারেশন, ট্রাইফেড গঠনের মাধ্যমে শাল বীজ, আঠা ও হরিতকী সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের সম্মিলিত ও বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রেও একই রকম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ট্রাইফেড রাজ্য ভিত্তিক সংগঠন ছিল না। এটা ছিল বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা শাখাগুলির সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় স্তর থেকে পরিচালিত সংগঠন যা আদিবাসীদের বাজারের সুরক্ষা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ১৯৯০ সাল নাগাদ কয়েকটি যৌথ অরণ্য পরিচালন সমিতি কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশে। মধ্যপ্রদেশের মত অন্য রাজ্যে, সরকার বন ধন প্রকল্পের মত উদ্যোগের মাধ্যমে চাল ও তেঁতুল ইত্যাদি জাতীয়করণের বাইরে থাকা দ্রব্য মধ্যস্থতাকারীদের অপসারণ করে গ্রাম সমিতি গঠন করে সরকারই সরাসরি ক্রয় করে। 

তবে এই ব্যবস্থাগুলির কোনোটিই আশাপ্রদ ফল জোগায় নি। মধ্যপ্রদেশের সমবায় সমিতিগুলির ১৯৯০ সাল থেকে সমস্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে জাতীয়করণকৃত দ্রব্যগুলির সংগ্রহের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বন ধন সমিতির ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা অভিন্ন।  বস্তারের জনগণের অভিযোগ অনুযায়ী, এই সমিতিগুলির কথা ছিল ব্যবসায়ীদের তুলনায় উচ্চতর মূল্যে দ্রব্য ক্রয়ের। অথচ প্রকৃতপক্ষে এরা যথেষ্ট দাম দেয়ই নি এবং দ্রব্যসামগ্রীর সম্পূর্ণ পরিমাণ ক্রয় করার মত পর্যাপ্ত অর্থও এদের হাতে ছিল না। তদুপরি এরা দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করেছিল অন্তত সাতদিনের জন্যে ধারে রেখে, যা বেশিরভাগ আদিবাসীর জন্যে চরম অস্বস্তিকর। যেহেতু বেশিরভাগ দ্রব্যসামগ্রীকেই তাদের অভাবী বিক্রয় করতে হয়েছে। এর জন্যেই স্থানীয় স্তরে মানুষ এই প্রকল্পের বিষয়ে উৎসাহ দেখায় নি এবং দরিদ্রতম আদিবাসীরা বন ধন সমিতির চেয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে তাদের দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করতেই আগ্রহী থেকেছে। ওড়িশাতেও বনজ দ্রব্য সংগ্রাহকরা জাতীয়করণের বাইরে থাকা দ্রব্যসামগ্রীর বিক্রির দরকষাকষির ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় বিরাজ করেছে, কারণ বিক্রয়ের বাজার বা দ্রব্যসামগ্রীর প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি কোনোটিই তাদের হাতের নাগালে ছিল না। এক্ষেত্রে জাতীয়করণ বহির্ভূত দ্রব্যসামগ্রীর চলাচল সংক্রান্ত আইন ও প্রক্রিয়াকরণের দুর্বলতাও দায়ী। 

দাতা সংস্থাগুলি ও এন. সি. সাক্সেনার মত পণ্ডিতদের যুক্তি ছিল, বর্তমান ব্যবস্থার সমাধান নিহিত রয়েছে বাজারের উপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ায় যাতে সংগ্রাহকরা তাদের শ্রমের ন্যায়সঙ্গত দাম পেতে পারে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, সমাধানের এই পদ্ধতিতে একটি সুষম প্রতিযোগিতা ক্ষেত্রের কথা ভাবা হয়েছে যেখানে আদিবাসী সমাজ, ব্যবসায়ীদের দল, বেসরকারি কোম্পানি এবং সরকার কোনো বিধিনিষেধ মুক্ত হয়ে বনজ দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবসার উপর নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় শামিল হবে। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যাবে অন্ধ্রপ্রদেশ গোষ্ঠীগত বন সংরক্ষণ প্রকল্প বিষয়ক বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রতিবেদনে যেখানে বলা হচ্ছে গিরিজন সমবায় নিগমের একচ্ছত্র বাণিজ্যের অধিকার প্রত্যাহার করা এবং আদিবাসীদের সরাসরি বাজারে নিজেদের সামগ্রী বিক্রয়ের অনুমতি দেওয়া উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুমান করে যে কাঠ-বহির্ভূত দ্রব্যসামগ্রীর বাজারজাতকরণের সমস্যা নিহিত রয়েছে বাজারে ঢোকার প্রবেশ পথের অবর্তমানে এবং সেটার জন্যে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী এলাকার মধ্যেকার বিনিময়ের পদ্ধতি কোনোভাবেই দায়ী নয়। সুতরাং, সংস্কারের অভাবটাই হচ্ছে সমস্যা, অসম বিনিময় নয়। ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিসগড়ের ক্ষেত্র সমীক্ষা দেখিয়ে দেয় যে এই ধারণাটি ত্রুটিপূর্ণ। যেহেতু যে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে অসম বিনিময় পরিলক্ষিত হয়েছে সেগুলো বাহ্যত জাতীয়করণ বহির্ভূত এবং বাজারের নিয়মের শাসনাধীন। এটাই দেখা যাবে ২০০১-০২ বর্ষে ছত্তিসগড়ের জাতীয়করণ বহির্ভূত প্রধান দ্রব্যসামগ্রীর তুলনামূলক দামের মধ্যে (সারণি-দুই) ।


সারণি- ২ : মধ্যভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রধান কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যের বিক্রয় মূল্য


সামগ্রী

সংগ্রাহক মূল্য

(টাকা/কেজি)

ধামতারি

(টাকা/কেজি)

মুম্বই/দিল্লি/অন্যান্য (টাকা/কেজি)

আমলকি

৩.৫০

১৫.০০

২২.০০-৩২.০০

তেঁতুল (খোসা ছাড়ানো)

৪.০০

১২.০০-১৫.০০

৩২.০০-৩৪.০০

চিরঞ্জি (খোসা ছাড়ানো)

১৫০.০০

২০০.০০-২৫০.০০

৩৫০.০০-৪০০.০০

সফেদ মুসলি

১০০.০০

-

২৫০.০০-১২০০.০০

-

প্রশ্নটা হল, কাঠ-বহির্ভূত বনজ দ্রব্যসামগ্রীর উপর যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে আদিবাসীদের উপর মধ্যস্থতাকারী ব্যবসায়ীদের শোষণ কমবে, নাকি নিশ্চিত ভাবেই বাড়বে? আমরা যদি এই বাণিজ্যের প্রক্রিয়া ও বাজারজাতকরণের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখা যাবে আদিবাসীরা স্থানীয় স্তরে একটা ন্যূনতম প্রক্রিয়াকরণের পরই তাদের দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করে থাকে। আমলকি শুকানো, তেঁতুল ও চিরঞ্জী বীজের খোসা ছাড়ানো এগুলো সাধারণভাবে সেরে নেওয়া হয় যা কাঁচা ফসলের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু এতে, প্রক্রিয়াকরণের খরচের প্রশ্নই নেই, প্রাথমিক সংগ্রহের খরচও কচ্চিৎই ওঠে। এছাড়া নিজেদের একান্ত জীবিকা হিসেবে আদিবাসীরা মহুয়ার প্রক্রিয়াকরণও করে। তারা ফুল থেকে তাড়ি তৈরি করে এবং বীজ পিষে তেল নিষ্কাশন করে গৃহস্থালীর ব্যবহারের জন্যে।  তেল নিষ্কাশনের অনুপাত হচ্ছে ১:৩ অর্থাৎ ৩ কেজি বীজ পেষণ করলে ১ কেজি তেল উপলব্ধ হয়। তেল যদিও তারা বিক্রি করে না, তবে নিজেদের জন্যে একটা অংশ রেখে ফুলের বাকি অংশ সবসময়ই ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলি হয় অভাবী বিক্রি যা দৈনন্দিনের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে নগদ টাকা হাতে পাওয়ার জন্যে করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আদিবাসীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত দ্রব্যসামগ্রীকে 'অপ্রক্রিয়াজাত' ধরে নেওয়া হয়। মূল্য তালিকার অসঙ্গতি অপসারণের দাবি সমস্ত ধারার আন্দোলনের তরফ থেকে উত্থাপিত হয়ে থাকলেও সম্প্রতি একমাত্র বামপন্থী আন্দোলনই দাবি তুলেছে জাতীয়করণ করা বা না-করা নির্বিশেষে সমস্ত কাঠ-বহির্ভূত দ্রব্যসামগ্রীর ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সুনিশ্চিত করণের। 

সরকার অরণ্যক্ষেত্র থেকে হাত তুলে নিয়ে সামগ্রিক বিষয়টা ব্যবসায়ী,কোম্পানি আর জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতার ওপর ছেড়ে দিলে এটা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। কারণ, আদিবাসীরাই অসম বিনিময় ও ভারসাম্যহীন বিকাশের বৃহত্তর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। এটা এই তথ্য থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, মূল্য সংযোজিত হয় অনেক দূরের কোনো এক স্থানে যেখানেই একমাত্র প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো রয়েছে একে বাস্তবোচিত প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করার মত। স্বেচ্ছাসেবী ক্ষেত্রের উদ্যোগগুলি আংশিক সাফল্য সত্ত্বেও পুঁজি ও ঋণ সহায়তার সমস্যায় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে আছে। দ্বিতীয় দফার সংস্কার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি থেকে সরকার সরে এলে এই প্রতিবন্ধকতাগুলি আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। প্রকৃতপক্ষে, বামপন্থীরা ছাড়া আদিবাসী অধিকারের স্বপক্ষে সংগ্রামরত প্রত্যেকটি অংশই আদিবাসী ক্ষেত্র থেকে সরকারের হাত তুলে দেওয়ার জন্যে সওয়াল করছে। কিন্তু আমাদের এই আলোচনা সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে এটা জীবন জীবিকার সমাধান নয়। বরং রাষ্ট্রের ওপর চাপ দিতে হবে যাতে নীতিগত বদল আনা এবং এমন কতগুলো প্রতিষ্ঠান গঠন করা যাতে আদিবাসীরা বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থার সর্বোত্তম সুফল পেতে পারে। 


জনগণের ক্ষমতায়ন, নাকি ক্ষমতার অপহরণ

১৯৮০-র গোড়ার দিকে বিভিন্ন সমীক্ষায় চিপকোর মত পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে বহু প্রতিবেদন রচিত হয় যেখানে সনাতনী প্রতিষ্ঠানগুলোকেই স্বাভাবিক অরণ্যরক্ষক হিসেবে সওয়াল করা হয়েছে। এ ধরনের পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনাবলী থেকে এটা বোধগম্য হয় যে ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের যথেষ্ট ইতিহাসগত জোর এবং যথার্থতা রয়েছে সনাতনী কাঠামোর অন্তর্নিহিত বৈষম্যের বিবেচনা করতে পারার মত। অরণ্যের নিয়ন্ত্রণ কারা করবে, রাষ্ট্র, নাকি জনসমাজ, এ সম্পর্কিত বিতর্কের একটি প্রেক্ষাপট এভাবেই তৈরি হল। এই প্রেক্ষিত থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার বিকেন্দ্রীকৃত অংশগ্রহণমূলক অরণ্য ব্যবস্থাপনার একটি অনানুষ্ঠানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৯০ এ এটার নামকরণ হয় যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিখ্যাত আদাবাড়ি পরীক্ষা নিরীক্ষার ভিত্তি ছিল এটাই যে কোনো ধরনের অরণ্যায়ন বা সিলভি-কালচারেল অভিযান স্থানীয় মানুষের সহায়তা ছাড়া সফল হতে পারে না। ওখানকার বিভাগীয় বন আধিকারিক এ.কে. ব্যানার্জী স্থানীয় মানুষদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে যেভাবে শাল বৃক্ষের পুনঃসৃজন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার ফলশ্রুতিতেই ওই পরীক্ষা নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়। ওই আধিকারিক ১,২৭২ হেক্টর অরণ্যভূমি অধিগ্রহণ করেছিলেন পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এবং শালবৃক্ষের প্রাকৃতিক পুনঃসৃজনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগনকে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন। এতে জনগনের জন্যে জ্বালানি কাঠেরও রোপণ করা হয় এবং তাদেরকে সেটা খরচ মূল্যে প্রদান করা হয়। তিনি এছাড়াও পালাক্রমে স্থানবদলের মাধ্যমে পশুচারণের একটি ব্যবস্থাও নির্দিষ্ট করেছিলেন। সর্বোপরি, এই প্রকল্পে প্রাকৃতিকভাবে সৃজনীশক্তিচ্যুত শালগাছ ও বাবলা গাছ রোপণের জন্যে অধিগ্রহণ করা ৭০০ হেক্টর অরণ্যভূমিতে ধানচাষও করা হয় (এবং সেটা খরচ মূল্যে বনসুরক্ষায় যুক্ত মানুষদের বিক্রয় করা হয়)। শেষে বলা হয়, এই পরীক্ষণ কর্মসূচি  সাফল্য পেলে স্থানীয় জনগণকে মোট উৎপাদনের  ২৫ শতাংশ প্রদান করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গের যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম পনেরো বছর ধার্য করা হয়েছিল দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলাকে সামনে রেখে। ১৯৮৭ সাল নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার এই পদ্ধতিকে একটি গ্রহণযোগ্য অরণ্য পুনঃসৃজনের পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে এবং আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকার মাধ্যমে বন দপ্তর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুফল বন্টনের একটা প্রকরণ স্থির করে দেয়। প্রাথমিক পরীক্ষণের প্রভাব অত্যন্ত ভালো ছিল এবং পরবর্তী কালের সমীক্ষায় দেখা গেছে হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক বৈচিত্রের একটা পুনঃসৃজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় এর ফলে এবং কাঠ-বহির্ভূত বনজ  দ্রব্যের রোপণ থেকে পাওয়া লাভও বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

এটা স্মরণ রাখা অত্যন্ত জরুরি যে এই উদ্যোগের আগে ছিল ভূমি সংস্কার ও সামাজিক প্রকৌশলের একটি পর্ব যার ফলে গ্রামীণ গরিবদের মধ্যে কিছুটা ক্ষমতায়ন ঘটেছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলির গণতন্ত্রীকরণ যা ১৯৮০-এর গোড়ার দিকে অংশগ্রহণমূলক অরণ্য ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রদান করার পথ সুগম করেছিল। যদিও সুরক্ষা কমিটিগুলি ছিল গ্রাম স্তরে, কিন্তু তাদের অর্থবরাদ্দের অনেকটাই পৌঁছেছে জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েতের মাধ্যমে। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের তরফে অবশেষে পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদন পেশ করার পনেরো বছর আগেই, আরাবাড়ি বনবিভাগ ও স্থানীয় জনগনের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। এটা শুধু আরাবাড়ির ক্ষেত্রেই সত্য নয়, রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের বিভাগীয় বন আধিকারিকরাও আরাবাড়ির অনুসরণ করতে শুরু করে। এই অর্থে, যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনা যা পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল তা অনন্য এবং একটি পরিমণ্ডলে প্রচলন করা হয় যে অঞ্চল ইতিমধ্যে প্রগতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গেছে।

অন্যান্য রাজ্যের যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার বিবেচনা করতে হবে এই নিরিখ থেকে যেখানে এই ব্যবস্থাপনার প্রচলনের আগে এমনতর সামাজিক প্রকৌশল ঘটে নি। ১৯৯০ সালে ভারত সরকারের তরফে যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। ১৯৯৫ সাল নাগাদ পনেরোটি রাজ্য নির্দেশনা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে এর বাস্তবায়ন শুরু করে। যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনা একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তের বদলে নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই নির্দেশিকার বলে যে অরণ্য সুরক্ষা কমিটিগুলি গঠিত হয় তার সম্পাদক করা হয় অরণ্যরক্ষীদের এবং তারাই পাহারাদারির দায়িত্ব তুলে নেয় যা আগে বন বিভাগের ওপর ন্যস্ত ছিল। বন বিভাগের তরফ থেকে যে ব্যাপকতায় যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার প্রচারণা হয়, তা এক অর্থে  স্বাধীনতার পর ৪০ বছর ধরে চলা কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতারই তাদের তরফে স্বীকৃতি।

কিন্তু এই প্রকল্প নিয়ে সমস্ত উচ্ছ্বাস কয়েক বছরের মধ্যেই উবে যায়। প্রকৃতপক্ষে এই প্রকল্প এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছে যে, যে সমস্ত অঞ্চলে এর প্রচলনের পূর্বশর্ত পূরণ হয় নি সেখানে এর লয় ঘটবেই। বন বিভাগের বিভাগীয় গাঁথনি ও এই ক্ষেত্রবিশেষের আইন অপরিবর্তিত থেকেছে; পরিবর্তন হয়েছে কিছু ব্যক্তি আধিকারিকের মাত্র। সবচেয়ে আমূল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যেখানে প্রশাসন ছিল বামফ্রন্ট সরকারের অধীন এবং যেখানে এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল অরণ্য ব্যবস্থাপনার প্রথাবহির্ভূত পদ্ধতি হিসেবে। এই পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকল্প নিয়ে করা সমস্ত সমীক্ষাতেই উঠে এসেছে অর্থাৎ এই পরিবর্তনের প্রধানতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে রাজ্যের বিদ্যমান সামাজিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল যেখানে আমলাতন্ত্রকে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার লক্ষ্যে চালিত করার জন্যে একটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।  বিট অফিসার এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের বাধ্য করা হয় নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সাথে বোঝাপড়ায় আসতে। অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আলাদা যেখানে বন আধিকারিকদের প্রবণতা ছিল বিদ্যমানবিকেন্দ্রীকৃত অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিকে আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করার পরিবর্তে নিজেদের পূর্বপ্রস্তুত শর্তাবলীকে জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার। 

এভাবেই, বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী গোষ্ঠীগুলি অনুভব করে যে প্রকল্প এমনভাবে রচিত হবে যেখানে পাহারাদারি হবে বিকেন্দ্রীকৃত কিন্তু রোপিত বৃক্ষের প্রজাতি নির্বাচন, বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতি এবং সুফল বন্টন হবে কেন্দ্রীয় ভাবে। পশ্চিমবঙ্গ সহ সমস্ত রাজ্যেই যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার সুফল প্রধানত গেছে সরকারের ঘরে এবং অরণ্য সুরক্ষা কমিটি ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিতই থেকেছে। যে অঞ্চলে অরণ্য সুরক্ষা কমিটিকে রক্ষা করা এবং ন্যায্য দামের জন্যে দরকষাকষি করার উপযোগী কোনো সামাজিক আন্দোলন ছিল না, সেই সমস্ত অঞ্চলে এই ব্যবস্থা সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে কার্যকর হল না। এটা বিশেষভাবে সত্য যেখানে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল বহিরাগত অর্থায়নে বন বিভাগের প্রাথমিক ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। বহু সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে যে, এই প্রকল্পের মোট খরচের এক উল্লেখযোগ্য অংশই হয়েছে পরিকাঠামো ও বেতন-ব্যয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশাখাপত্তনম ভিত্তিক সংগঠন 'সমতা' লক্ষ্য করেছে, অরণ্য পুনঃসৃজনের খাতে হস্তান্তরিত অর্থের পরিমাণ ব্যয়ের তুলনায় সামঞ্জস্যহীন ছিল। এটা থেকেই যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অনুপস্থিতি উন্মোচিত হয়। 

অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার সমান্তরালে এই প্রকল্পগুলির আবির্ভাব এ কারণেই ঘটে কারণ রাজ্য সরকারগুলি এই সময়ে নিজেদের দফতর চালানোর নতুন বিকল্প পদ্ধতির সন্ধান করছিল। এখান থেকে বহিরাগত অর্থায়নের উপর নির্ভর করা শুরু হয় যা আবার অরণ্য ক্ষেত্রকে অবারিত করার পথও ত্বরান্বিত করে। এই বিশ্লেষণ মধ্যপ্রদেশের মত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রেও সত্য যারা অরণ্য ক্ষেত্রের জন্যে সর্বাধিক অর্থসাহায্য পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনা ও তার সমতুল প্রকল্পগুলির সূত্রপাত প্রকৃতপক্ষে সেই গোষ্ঠীগুলিকে ক্ষমতাহীন করে দেয় যারা স্বতস্ফূর্তভাবে অরণ্য রক্ষা ও পুনঃসৃজনের সাথে যুক্ত ছিল সেই সময়ে। মধ্য ভারতে একতা পরিষদ, কিষাণ আদিবাসী সংগঠন এবং আদিবাসী মুক্তি মোর্চা সহ বহু সংগঠন এই দিকটির উপরই আলোকপাত করে আসছে। মধ্যপ্রদেশ অরণ্য প্রকল্প বিষয়ক যৌথ অভিযানের প্রতিবেদনে, বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ার বিরোধী বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী জোরের সাথে জরুরিভিত্তিতে এই প্রকল্পগুলি সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা ও নতুন ভাবনা চিন্তা প্রয়োজন বলে অভিমত প্রদান করা হয়েছে। 

অরণ্য সংরক্ষণের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগগুলির বদলে ওপর থেকে জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া দেখা গেছে ১৯৩১ সালের আইন অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলে গঠন করা বন পঞ্চায়েতে। এই আইন গ্রামীণ সমাজকে ক্ষমতা প্রদান করেছিল অরণ্য ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের। সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক বন পঞ্চায়েতই সনাতনী পদ্ধতিতে অরণ্য প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং বনজ সম্পদের ওপর খানিকটা স্বনিয়ন্ত্রণ উপভোগ করেছে। এগুলো ছিল বন বিভাগ ও গ্রাম সভার নীরব সমর্থনে হওয়া অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়া। বন বিভাগের সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ৬,০৬৯ টি বন পঞ্চায়েত রয়েছে যারা ৪০৫,৪২৬ হেক্টর অরণ্যভূমি রক্ষার কাজে যুক্ত; কিন্তু উপনিবেশ উত্তর বেশ কিছু পরিবর্তনের ফলে তাদের কর্তৃত্ব অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ১৯৭৬ সালে সামাজিক অরণ্যায়ন কর্মসূচি গৃহীত হওয়ার পর বন পঞ্চায়েতের নিয়মাবলীর পরিবর্তন করা হয় এবং এতে এর পরিসরের সংকোচন ঘটলেও, অরণ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বন পঞ্চায়েত পদ্ধতির কিছুটা প্রাসঙ্গিকতা থেকেও গেল। এর অর্থ এটা নয় যে এটাই সর্বার্থে আদর্শ পদ্ধতি ছিল এবং জনসমাজের দরিদ্রতম অংশ বা নারীদের উপর এর কোনো বিরূপ প্রভাব ছিল না, কিন্তু সমস্ত নেতিবাচকতা সত্ত্বেও, এই পদ্ধতিতে এক বিপুল অংশের মানুষ উপকৃত হয়েছে এবং এর ফলে অরণ্যের পুনঃসৃজনও ঘটেছে। তবে কঠিনতম প্রতিকূলতা দেখা দেয় ১৯৯৪ সালে গ্রামীণ অরণ্য যৌথ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আসার পর যখন বিশ্বব্যাঙ্ক বন পঞ্চায়েতকে যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এর ফলে অরণ্যভূমির রক্ষক, নিয়ন্ত্রকও এ সম্পর্কিত জ্ঞানের একচ্ছত্র অধিকারী হিসেবে বন দপ্তরের দাবি আরো জোরালো হয়ে পড়ে এবং ফলে পঞ্চায়েতগুলি ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। 

ওই অঞ্চলের সমাজকর্মীদের উপলব্ধি হয় যে এই ব্যবস্থা বন পঞ্চায়েত পদ্ধতির মৃত্যু ডেকে আনবে এবং তারা যৌথ মঞ্চ গঠন করে এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বামপন্থী সংগঠনগুলি এই লড়াইয়ের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেছে এবং উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের। এই জনগোষ্ঠীগুলির ধরন ও অরণ্য নিয়ন্ত্রণের মাত্রার ভিন্নতার ফলে, ব্যাপকতর অর্থে এই আন্দোলনগুলি ও বামপন্থীদের মধ্যে ঐক্য ফলপ্রসূ চেহারা নিল না এবং শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল। তবে এই বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত মিলিত কার্যক্রমের ইতিবাচক দিকটি হল, আদর্শগত দিক থেকে ভিন্ন এই দু'টি ধারাই অরণ্যভূমির বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে আদিবাসীদের সংযুক্তিকরণের বিরোধী। 


প্রত্যাসন্ন বিষয়সমূহ ও আগামীর প্রত্যাহ্বান

অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং এখন ওড়িশা, ছত্তিসগড় এবং ঝাড়খণ্ডের মত অনেক রাজ্যে বন বিভাগগুলি দ্রুততার সাথে নিজেদের পুনর্গঠন করছে এবং অরণ্যভূমির বেসরকারিকরণকে উৎসাহিত করছে। সবচেয়ে জোরালো দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যাবে অন্ধ্রপ্রদেশে যেখানে সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে শিল্পমহলকে যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার তৃতীয় অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে, বিশ্বব্যাঙ্কের তরফ থেকে মধ্যপ্রদেশে পুনঃসৃজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অরণ্য ক্ষেত্র পুনর্গঠন করার প্রস্তাবে অরণ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি ক্ষেত্রের ভূমিকা সুস্পষ্ট করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে অরণ্যভিত্তিক শিল্পগুলি ঋণদান, কেনার নিশ্চয়তা দান, প্রযুক্তি ও বস্তুগত সহায়তার মত অধিকতর অগ্রণী ভূমিকার মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ করবে। এছাড়াও তারা ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থা স্থাপন করবে যারা অরণ্যাঞ্চলের বাগিচা প্রকল্পের প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও মানসম্পন্ন চারা সরবরাহ করবে। এভাবেই বেসরকারি শিল্পক্ষেত্র তরুশালা, বীজতলা ও বাগিচায় অর্থায়ন করবে। তবে যেহেতু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন চাষী ও আদিবাসীদের পক্ষে অর্থের জোগান দিয়ে শিল্প সংস্থায় সরবরাহ করার জন্যে প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থকরী সম্পদ তৈরি করা সম্ভব নয়, এই নীতি প্রধানত ধনী কৃষক, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি শিল্পক্ষেত্রের জন্যেই সহায়ক হবে। এই নীতিতে যখন বেসরকারি ক্ষেত্রকে সুফল প্রদান করা হচ্ছে, তখন বিপরীতে রাষ্ট্রকে উৎপাদনের মূল পরিসরে না রেখে ভাবা হয়েছে শুধু নিয়ামক ও সহায়কের ভূমিকায়। এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বেসরকারি জমিতে গাছ কাটার উপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার। এ কারণে এটা মনেই হবে যে অরণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনার বিষয় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে পরিবেশগত নিরাপত্তার পরিবর্তে শিল্পক্ষেত্রে সরবরাহ সুনিশ্চিত করা যদিও বিশ্ব ব্যাঙ্কের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল রাজ্য সরকারগুলিকে ১৯৮৮ সালের জাতীয় অরণ্য নীতির বাস্তবায়নে সহায়তা করা। 

উপরে বর্ণিত পুনর্গঠন শুধুমাত্র বিশ্ব অরণ্য প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমভাবে ঘটেছে। এটা কেন্দ্রীয় সরকারের বন দপ্তরের দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনাতেও রয়েছে যারা সম্প্রতি বৃহৎ আকারে একটি জাতীয় অরণ্যায়ন কর্মসূচির ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচির একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হল অরণ্যাঞ্চলের উৎপাদনশীলতা ও অরণ্য ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষকে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান। এই কর্মসূচিতে প্রদত্ত প্রণোদনার কাঠামো সারণি- ৩ প্রদর্শিত হয়েছে।



সারণি- ৩ : জাতীয় অরণ্যায়ন অভিযান কর্মসূচির আর্থিক প্রণোদনা


উপকৃত অংশ

প্রণোদনা

কৃষক

সম্ভাব্য মূল্য ও সমর্থন মূল্য অপসারণ, বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং বিস্তৃত পরিষেবা ও উন্নত প্রজাতির বীজের মত যথাযথ প্রযুক্তিগত গুচ্ছ পরিষেবা

স্থানীয় জনগোষ্ঠী

বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসন, অংশগ্রহণের অনুকূল বাতাবরণ, মেয়াদ প্রাপ্তি, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বনজ দ্রব্যের সুষম বন্টন, অধিকার ও বিশেষ সুবিধার স্বীকৃতি

বেসরকারি বন মালিক

একটি যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবোচিত সামগ্রিক নীতি,সুস্থিত প্রশাসন, সম্প্রসারণ সুযোগ সুবিধা, বাণিজ্যিক উদারীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ, বহিরাগত খরচ সীমিতকরণে আর্থিক প্রণোদনা। 

প্রক্রিয়াকরণ শিল্প

কাঁচামালের স্থিতিশীল যোগান, নিবেশ উপকরণের যৌক্তিক মূল্য, বাজারের প্রবেশাধিকারের উন্নতির জন্যে সরকারি অর্থসাহায্য, বাস্তবোচিত বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, পরিকাঠামোর বিকাশ, উৎপাদিত দ্রব্যের উন্নতি এবং বাজার সম্পর্কিত তথ্য এবং বিভিন্ন পরিসরের সমকেন্দ্রাভিমুখ। 

বহুজাতিক

বিধিসমূহের সংস্কারে উৎসাহদান, উদারীকৃত নীতিমালা, করের আকর্ষণীয় মূল্যস্তর, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মুনাফা ফেরৎ এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকাঠামো। 

গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা

বিধিসমূহের সংস্কারে উৎসাহদান, উদারীকৃত নীতিমালা এবং স্বনিয়ন্ত্রণ, গবেষণার পরিকাঠামো, উদ্যোগী মূলধনের লভ্যতা এবং দক্ষতা উন্নীতকরণ।

প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ

আকর্ষণীয় বেতন ও ভাতা, মেধার স্বীকৃতি, সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও কর্তব্য, আমলাতন্ত্রের পুনর্বিন্যাস এবং জবাবদিহিতার স্পষ্ট সীমারেখা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্ব।

বনজ সম্পদ ও অরণ্যবাসীদের পরিষেবার ব্যবহারকারী

ন্যায্য ও স্থিতিশীল দর, পর্যাপ্ত মান, ধারাবাহিক লভ্যতা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের জ্ঞান। দেশজ জ্ঞানের সমর্থন, পরম্পরাগত প্রথার উন্নীতকরণ এবং কিছু অধিকার, বিশেষ সুবিধা এবং অরণ্য সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশীদারিত্ব।

নীতি নির্ধারক

বর্ধিত অর্থনৈতিক ও চাকুরিগত সুবিধাবলী, বর্ধিত রাজস্ব এবং আয় বর্ধন এবং মোট জাতীয় উৎপাদনে বর্ধিত অংশীদারিত্ব।

সূত্র : জাতীয় অরণ্যায়ন অভিযান কর্মসূচি, ১ম খণ্ড

 

উপরের সারণিতে দেখা যাচ্ছে যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের দীর্ঘমেয়াদী সমগ্র পরিকল্পনাটিই হল এই ক্ষেত্রের উদারীকরণ এবং শিল্প বিনিয়োগ, বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। এই লক্ষ্যে মন্ত্রক বিশ্ব ব্যাঙ্কের 'বেসরকারি' শব্দের সংজ্ঞা ব্যবহার করে যার অর্থ আরো অনেকের সাথে কৃষক, আদিবাসী, ব্যবসায়ী, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, বেসরকারি কোম্পানি এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে একত্রে অন্তর্ভুক্ত করা। এখানে খোলাখুলিভাবেই বেরিয়ে আসছে যে সরকার বা দাতা সংস্থাদের কেউই অরণ্য প্রশাসনে প্রকৃত অংশগ্রহণ ইচ্ছুক নয়। যদি রাষ্ট্র এই ক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তবে এটা পরিষ্কার যে এই জায়গা নেবে কোম্পানিগুলি কারণ জনগণ (অথবা তাদের প্রতিষ্ঠান) এই 'উদারীকরণের' সুযোগ নেওয়ার অবস্থায় নেই। নিম্নমানের পরিকাঠামো এবং এই পরিবর্তনের নিম্ন প্রবাহী প্রভাব সীমিত আকারে পড়বে শুধু শ্রম মজুরি বৃদ্ধিতে। ফলাফল হিসেবে এখানে দেখা যাবে এই ক্ষেত্রের সাথে অবশিষ্ট ক্ষেত্রের অসম বিনিময় এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পাবে। 

বামপন্থী আন্দোলন ও পরিবেশবাদীরা প্রধানত এই প্রত্যাহ্বানের প্রতিক্রিয়ায় সংস্কার প্রক্রিয়ার সামগ্রিক সমালোচনা তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বামপন্থীরা তাদের বিশ্লেষণে অরণ্যাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপর তার প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করতে পারে নি, অন্যদিকে এই বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতনতা সত্ত্বেও পরিবেশ আন্দোলন এই লড়াইয়ের ব্যাপকতার প্রতি সাড়া দিতে পারে নি। এর কারণ হচ্ছে, আদর্শগতভাবেই এরা চায় অরণ্যায়ন ক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্র সরে যাক। সংস্কারবাদের যুগে উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের অর্থনীতির পরিবেশে কারা জনগোষ্ঠীদের রক্ষক হিসেবে দাঁড়াবে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এরা অক্ষম। এই বিষয়টি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাষ্ট্রের প্রত্যাহার  আদিবাসীদের দুর্দশার বৃদ্ধিই ঘটাবে একমাত্র। প্রাকৃতিক সম্পদের উপর রাষ্ট্রের একাধিপত্য যখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায় এবং যখন তার বদল ঘটে যায়, তখন তার ভূমিকা নিয়ে পুনর্ভাবনার প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে জনগনের পেছনে দাঁড়াতে হবে কারণ তাদেরকেই শেষ পর্যন্ত তাদের সামূহিক প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বামপন্থীরা এতদিন অবধি বনজ সম্পদের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে ভরসা রেখেছে সরকার ও যৌথ অরণ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে। তাদেরকেও এখন জনগনের স্বার্থ ও পরিবেশ মণ্ডলের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে বনজ সম্পদ ব্যবহার ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অ-পুঁজিবাদী সহযোগিতার নতুন প্রকরণগুলি নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুনত্বের সাথে ভাবতে হবে। বর্তমান সময়ে বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলন উভয়ের সামনেই এটা একটা জরুরি এবং যৌথ কর্তব্য। 




পরবর্তী পর্বগুলিতে


  • উন্নয়ন ও উচ্ছেদের রাজনীতি
  • ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসী সমাজ
  • উত্তরকথন : ঐক্যবদ্ধ মোর্চার গঠন

 

মূল রচনা :

লেফটওয়ার্ড বুকস, নতুন দিল্লি- ১১০০০১ থেকে এপ্রিল ২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত সাইনপোস্ট পুস্তিকা মালার নবম প্রকাশনা অর্চনা প্রসাদের 'এনভায়রনমেন্টালিজম এন্ড দ্য লেফট' (কনটেম্পোরারি ডিবেটস এন্ড ফিউচার এজেন্ডাস ইন ট্রাইবেল এরিয়াজ)।


প্রকাশের তারিখ: ১২-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org